• ..

'টাইগার করিডর' ও বাঘ সংরক্ষণ

বাঘ বাঁচানোর জন্য শুধু বনভূমি ও জাতীয় উদ্যান বাঁচানোই কি যথেষ্ট? কতটা গুরত্বপূর্ণ এক বনের সাথে অন্য বনের যোগাযোগ করিডরের মাধ্যমে? কাকেই বা বলে করিডর? বাঘ সংরক্ষণে এই করিডরের গুরত্ব নিয়ে আলোচনায় বিশিষ্ট বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ ও Wildlife Conservation Trust এর প্রেসিডেন্ট অনীশ আন্ধেরিয়া। আজ প্রথম পর্ব


Photo: Davidvraju/ Wikimedia Commons

২০১৮ সালের সর্বশেষ বাঘসুমারি অনুযায়ী মধ্যপ্রদেশে ভারতের সবথেকে বেশি বাঘ রয়েছে। এখানকার ছ'টি টাইগার রিজার্ভ - কানহা, পেঞ্চ, বান্ধবগড়, সাতপুরা, সঞ্জয়-ডুবরি ও পান্না ছাড়াও আঞ্চলিক অরণ্যগুলি মিলিয়ে ৫২৬টি বাঘ রয়েছে।

১৯৭৩ সালে প্রোজেক্ট টাইগার সূচনা হওয়ার সময় থেকে কানহা একটা গবেষণাগারের কাজ করে এসেছে সংরক্ষণের বিভিন্ন উপায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য, যে উপায়গুলো পরবর্তীতে ভারতের অন্যত্র অবলম্বন করা হয়েছে। ছ'টি টাইগার রিজার্ভের মধ্যে কানহা, পেঞ্চ, বান্ধবগড় ও বর্তমানে পান্নাতে বাঘের সংখ্যা স্হিতিশীল, যেখানে সাতপুরা ও সঞ্জয়-ডুবরিতে তাদের সংখ্যা বাড়ছে। পেঞ্চ ও কানহা সবথেকে সুরক্ষিত কারণ তাদের সাথে অন্যান্য সংরক্ষিত বনাঞ্চলের যোগাযোগ রয়েছে করিডরের মাধ্যমে।পান্না হল সবথেকে বিচ্ছিন্ন ও তাই সবথেকে অসুরক্ষিত, তার পরেই বান্ধবগড়। এর কারণ হল অন্যান্য বাঘ থাকা বনাঞ্চলের সাথে তাদের যোগাযোগের অভাব। সাতপুরায় প্রায় ৫০টি গ্রাম বনের ভিতর থেকে বাইরে স্হানান্তরে আগ্রহ দেখিয়েছে, সেখানে আগামী বছরগুলিতে বাঘের সংখ্যায় একটা স্হিতিশীলতা আশা করা যায়। সাতপুরা দক্ষিণ-পূর্বে পেঞ্চের সাথে আর দক্ষিণ-পশ্চিমে মহারাষ্ট্রের মেলঘাট টাইগার রিজার্ভের সাথে সংযুক্ত বন্য করিডরের মাধ্যমে। সাতপুরা-মেলঘাট করিডর বরং সাতপুরা-পেঞ্চ করিডরের থেকেও ভাল। সঞ্জয়-ডুবরি, যেটা মধ্যপ্রদেশের সবথেকে নবীন টাইগার রিজার্ভ , তার সাথে বান্ধবগড়ের একটি করিডরের মাধ্যমে যোগাযোগ থাকলেও তা মোটেই খুব একটা ভাল অবস্হায় নেই। তবুও, ছত্তিশগড়ের গুরু ঘাসিদাস ন্যাশানাল পার্ক (যা কিছুদিন আগে টাইগার রিজার্ভ রূপে ঘোষিত হয়েছে) -এর সাথে এর যোগাযোগের কারণে ভবিষ্যতে এখানে বাঘের সংখ্যায় স্হিতিশীলতা আসতে পারে, যদিও তা নির্ভর করছে ছত্তিশগড় রাজ্য গুরু ঘাসিদাস ন্যাশানাল পার্কে মানুষের অনুপ্রবেশ কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার উপরে।



দীর্ঘস্হায়ী ফল লাভ


বাঘের জনসংখ্যার ওপর দীর্ঘদিনের গবেষণা করে দেখা গেছে, দীর্ঘকালীন স্হিতিশীলতার জন্য যা অন্তত ৭৫-১০০ বছর থাকবে, বাঘের জনসংখ্যায় অন্তত ১০০ টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ থাকতে হবে যার অন্তত ২০টি প্রজননক্ষম স্ত্রী বাঘ হবে। অন্য কথায় বলতে হলে, এই সংখ্যার একটা বাঘের গোষ্ঠী ছোটখাটো অরণ্য নিধন ও চোরাশিকার সহ্য করে নেবে। সুরক্ষিত টাইগার রিজার্ভ হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপ্রদেশের কোন টাইগার রিজার্ভই এই মানদন্ড পূরণ করে না। তাই এই টাইগার রিজার্ভগুলি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে না পারলে, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কোনভাবেই আগামী ১০০ বছরে স্হিতিশীল বাঘের জনগোষ্ঠী ধরে রাখতে পারবে না। মধ্যপ্রদেশের দেশের সবথেকে বেশি বাঘ থাকলেও , যথাযথ করিডরের অভাবে বাঘের সংখ্যা কমে আসবে স্হানীয় ভাবে অবলুপ্তির কারণে, যেমনটা পান্নায় হয়েছিল।

তাই বাঘের বাসস্হানগুলির মধ্যে স্হিতিশীল করিডরের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় Panthera tigris tigris এর অস্তিত্বের জন্য। নদী তীরবর্তী বনভূমি যেখানে মানুষের পদার্পনের ঘটনা কম এবং জাতীয় উদ্যান বা অভয়ারণ্যগুলি থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্হান করা আঞ্চলিক সুরক্ষিত বনাঞ্চলগুলি এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও বাঘ আছে এমন অরণ্যের কাছাকাছি থাকা মানুষজনের মধ্যে সচেতনতা খুবই দরকার বাঘ ও তার খাদ্য বনের তৃণভোজী প্রাণীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্হান কিভাবে করা যায় সেই বিষয়ে। এই শেষ বিষয়টিতে সাফল্য পাওয়া সহজ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে মানুষ ও বন্যজন্তুর মধ্যে বেড়ে চলা সংঘর্ষের ঘটনাগুলি বুঝিয়ে দেয় মনুষ্যসমাজের মধ্যে বন্যজন্তু বিশেষত: মাংসাশী ও বড় বড় তৃণভোজী জন্তুর প্রতি তাদের বেড়ে চলা আক্রোশ।

রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়গুলির মধ্যে দীর্ঘকালীন সাংস্কৃতিক পরম্পরার কারণে একবিংশ শতকেও বড় বড় স্তন্যপায়ী জীবদের টিকে থাকা সম্ভব হয়েছে বটে, কিন্তু ভবিষ্যতেও এমন সহাবস্হান সম্ভব হবে বলে ধারনা করে নিলে সেটা ভুল হবে। কারণগুলো তো চোখের সামনেই আছে- বেড়ে চলা মানুষের সংখ্যা, ধনী-গরীবের বৈষম্য, অরণ্য নিধনের কারণে নদীর গতিপ্রবাহের হঠাৎ হঠাৎ পরিবর্তন এবং অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষম প্রভাব।



বাঘেদের গোষ্ঠীভাগ


বাঘেদের অবস্হান মিশ্র প্রকৃতির পটভূমিতে। এখানে রয়েছে সংযোগহীন সুরক্ষিত বনাঞ্চল যা মূলত মানুষের কর্মকান্ড থেকে মুক্ত, অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষিত 'বাফার' বনাঞ্চল এবং আঞ্চলিক বনাঞ্চলগুলি। এই পটভূমিতে ছড়িয়ে থাকা বাঘেদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মেলামেশা সম্ভব হয় করিডরের মাধ্যমে। করিডরই বাঘেদের এক প্রাকৃতিক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াতে সাহায্য করে, কোন এলাকায় বিলুপ্তপ্রায় বাঘের সংখ্যা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে, বেশি সংখ্যাযুক্ত এলাকা থেকে অন্য কম সংখ্যার এলাকায় যেতে সাহায্য করে। বলতে হয়, বাসস্হান পরিবর্তন ও সংখ্যার বিস্তার একই সাথে চলতে থাকে যাতে বাঘেদের গোষ্ঠীগুলির অবলুপ্তি ঠেকানো যায়। এটা তখনই সম্ভব যখন বনগুলির মধ্যে যথাযথ যোগাযোগ থাকে করিডরের মাধ্যমে।



পেঞ্চের বৃহত্তর পটভূমি


মধ্যপ্রদেশের পেঞ্চের কথা আলোচনা করে দেখা যাক এই ১১৭৯ কিমি বনাঞ্চল কেন মধ্য ভারতের সবথেকে সুরক্ষিত বাঘেদের আবাসস্হল। এখানে ৪০টি'র মত বাঘ রয়েছে (হওয়া উচিত ১০০টির মত), কিন্তু এই বনটি মহারাষ্ট্রের পেঞ্চের(৭৪১ বর্গ কিমি) সাথে সংযুক্ত যেখানেও ৪০টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ রয়েছে। তা যোগ করেও ১০০ হচ্ছে না, তবে যা এই বনাঞ্চলের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে তা হল ভাল মানের করিডর যা দুই পেঞ্চের সাথে সংযোগ রক্ষা করছে উত্তর-পূর্ব দিকে কানহার (২০৫১ বর্গ কিমি) সাথে, পূর্বদিকে মহারাষ্ট্রের নভেগাঁও-নাগজিরার (১৮৯৫ কিমি)সাথে এবং উত্তর-পশ্চিমে সাতপুরার (২১৩৩ বর্গ কিমি) সাথে। করিডরগুলিতে যোগাযোগ সুগম থাকার কারণে দুই পেঞ্চ মিলিয়ে কার্যকরী পূর্ণবয়স্ক বাঘের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১০০-র ওপর যার মধ্যে প্রায় ২০টি প্রজননক্ষম বাঘিনী। এর ফলে এই জাতীয় উদ্যান কানহার থেকেও স্হিতিশীল বাঘের সংখ্যার দিক থেকে।

চলছে বাঘসুমারির কাজ। ছবি: Wildlife Conservation Trust


করিডরের ধাঁধা


তাহলে এটা অন্তত বোঝা যাচ্ছে যে, বাঘের সংখ্যার দীর্ঘস্হায়ী স্হিতিশীলতার জন্য শুধু অরণ্যের সুরক্ষিত এলাকাই যথেষ্ট নয়, বরং একই ভাগে করিডর ও সুরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরের অরণ্যের যথাযথ সংরক্ষণও প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত:, এই 'করিডর' নামক স্হানটি বিজ্ঞানী, বনাঞ্চলের পরিচালক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্য একটা ভ্রান্তি তৈরি করে যেহেতু তারা আসেন বিভিন্ন কাজের পটভূমি থেকে। করিডরকে চিহ্নিত করা যায় তার কার্যকারিতা দিয়ে, অর্থাৎ তার কাঠামোগত চরিত্র যেমনই হোক না কেন তা বাঘের চলাচলের পথ কিনা তা দেখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, অন্ধকারের মধ্যে বাঘ চাষের জমি দিয়ে চলাচল করে যেমন তারা কোন পতিত বনভূমি দিয়েও করে।তাই অরণ্য সংলগ্ন চাষের জমিও বাঘের করিডর বলেই গণ্য হওয়া উচিত। কিন্তু প্রায়ই জাতীয় উদ্যানের পরিচালকরা করিডরের কাঠামোগত চরিত্রের ওপর জোর দেন বেশি। কোন ঘন বনে ঢাকা ছোট এলাকা বা একই রকম বৃক্ষযুক্ত জমিকে মনে করা হয় বাঘের চলাচলের জন্য উপযুক্ত এবং এগুলিকে করিডর বলে চিহ্নিত করা হয় কোনরকম অনুসন্ধান ছাড়াই। এই রকম অস্বচ্ছ ধারনার ফলে করিডরকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা ও তার ব্যবস্থাপনায় অসুবিধা দেখা যায়।

সবাই মানবে যে বাসভূমির ক্রমহ্রাসমানতা জীববৈচিত্রের পক্ষে ক্ষতিকর। এমত অবস্হায়, করিডরের টিকে থাকাটা জীববৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু গবেষক তাদের বাঘেদের বাস্তুতন্ত্র ও করিডরে নিয়ে জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে অনেকসময়েই ছোট হয়ে আসা বনভূমিকেই করিডর বলে চিহ্নিত করে দেন। এটা একটা আশঙ্কাজনক প্রবণতা।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা অবশ্যই এবিষয়ে সতর্ক হবেন যাতে কাঠামোগত যোগাযোগ ও প্রকৃত কার্যকরী যোগাযোগকে আলাদা করে বুঝতে পারেন। যেমন, কোন বৃক্ষরোপণ হওয়া সংকীর্ণ জমি বা কোন নদীর ধার দিয়ে সংকীর্ণ বনভূমির ভাগ যা কিনা দুটো বনাঞ্চলকে যুক্ত করে তা যে বাঘের চলাচলের উপযুক্ত হবে তা সবসময় ঠিক নয়, যদি আশেপাশে অন্য নানারকম গোলমাল থাকে। আবার, কোন বনাঞ্চলের ভাগ বা নদী না থাকলেও যোগাযোগ চলতে পারে এক বনাঞ্চল থেকে আর এক বনে। রেডিও কলার লাগিয়ে দেখা গেছে বাঘেরা সহজেই রাতের বেলা কৃষিজমি দিয়ে চলাচল করছে।

রেডিও কলার পরানো একটি বাঘ। ছবি: PR Ganapathy, CC BY-SA 4.0

আর একটি গুরুতর গোলযোগ হল করিডরগুলিকে শুধু যাতায়াতের মাধ্যম ধরে নিয়ে তাদের জন্য যথাযথ সুরক্ষার ব্যবস্থা না রাখা। আমাদের Wildlife conservation trust এর কাজের মাধ্যমে দেখা গেছে কানহা-পেঞ্চ করিডরে রীতিমত প্রজননক্ষম বাঘের ভাল সংখ্যা রয়েছে যা সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে খুব আলাদা নয় ।

আসলে করিডরগুলি একসাথে অনেক রকম ভূমিকা পালন করে। সংরক্ষনবিদ ও অরণ্যবিভাগের পরিচালকরা সতর্ক থেকে এইসব এলাকায় জমির ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারেন যাতে করিডরের স্হিতিশীলতা নষ্ট না হয় , যা একবার নষ্ট হলে আর ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে।

(চলবে)





লেখক পরিচিতি: লেখক Carl Zeiss Conservation Award জয়ী বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ ও সংরক্ষণবিদ। Wildlife Conservation Trust এর পরিচালক ও সভাপতি। National Tiger Conservation Authority ও মহারাষ্ট্র রাজ্য বন্যপ্রাণী পর্ষদের সদস্য।Bombay Natural History Society’ (BNHS) এর গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য।



মূল প্রবন্ধটি Sanctuary Asia ( Vol. 38 No. 12)পত্রিকাতে প্রকাশিত। অনুমতিক্রমে বনেপাহাড়ের জন্য অনুবাদ করলেন সুমন্ত ভট্টাচার্য্য


বনেপাহাড়ে- বাংলায় প্রথম বন্যপ্রাণ ও পরিবেশ বিষয়ক ওয়েবজিন।



Click here to join us at Facebook. LIKE and Follow our page for more updates.

153 views0 comments
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG