• ..

'ন্যাশানাল পার্কের বাইরেও রয়েছে বন্যপ্রাণী। ওদের বাঁচান': দ্য গ্রাসল্যান্ড ট্রাস্ট

গত সপ্তাহে পুনার 'দ্য গ্রাসল্যান্ড ট্রাস্ট' এর কাজকর্ম নিয়ে বিস্তৃত একটি প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছে বনেপাহাড়ে'র পাতায়। এইবারে থাকল দ্য গ্রাসল্যান্ড ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী মিহির গোডবোলের একটি সাক্ষাৎকার। তাদের কাজকর্মের পরিধি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর সাথে কথা বলেছেন বনেপাহাড়ে'র সম্পাদক শ্রী সুমন্ত ভট্টাচার্য্য





ভারতে সম্ভবত: প্রথম অ-সরকারি স্তরে তৃণভূমিকে বাঁচানোর জন্য পরিকল্পনা মাফিক কাজ শুরু করেছেন পুনার দ্য গ্রাসল্যান্ড ট্রাস্টের সদস্যরা। তৃণভূমির যে গুরুত্ব বাস্তুতন্ত্রে রয়েছে, তা যে পরিক্তত্য জমি নয়, তাঁকে বাঁচাতে কিভাবে এগানো দরকার তা নিয়ে চলছে গবেষণা, প্রচার। এই নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম দ্য গ্রাসল্যান্ড ট্রাস্ট সংস্হার মুখ্য পরিচালক মিহির গোডবালের সাথে।


বনেপাহাড়ে: ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে তৃণভূমি সংরক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে কী বলবেন?

মিহির: বনভূমির মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ এই তৃণভূমি। এরাও আমাদের জন্য বিশুদ্ধ জল আর বাতাসের উৎস। লাখ লাখ গবাদি পশু আর তাদের পালকদের জীবিকাও এর ওপর নির্ভরশীল । এছাড়াও বিরাট এক বৈচিত্র্যপূর্ণ বন্যজীবের বাসস্থান তো বটেই। তৃণভূমি না থাকলে হারিয়ে যাবে গ্রেট ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড,লেসার ফ্লোরিকান ও তাদের মত আরও কত প্রজাতি।

মিহির গোডবোলে

বনেপাহাড়ে: যদিও আপনাদের সংস্হা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৯ এ , তবে আপনারা তো এই বিষয়ে অনেকদিনই কাজ করছেন। আপনারা কিভাবে শুরু করছিলেন এই সব নিয়ে কাজ প্রথমে? ইতিহাসটা একটু বলুন।

মিহির: এই এলাকায় আমরা সেই ২০০৮-০৯ সাল থেকে কাজ করছি। ওই সময়ে শোলাপুরের কাছে নানাজ অভয়ারণ্যে আমি একটা নিরীক্ষণ বা সার্ভের কাজে যাই। তখনই আমার এই ধরনের বাস্তুতন্ত্রের বিশিষ্টতা আর তার অনন্য কিছু বাসিন্দাদের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা অর্জন হয়।মানচিত্রে চোখ রেখে দেখতে পেলাম পুনা শহরের সীমানাতেও এমন ভূ-ভাগ রয়েছে। সেই এলাকা ঘুরে দেখে আমরা বুঝতে পারি জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্যের দিক থেকে কত আকর্ষক এই এলাকা। ন্যাশনাল পার্কগুলো বা বাঘেদের মত সেলেব্রিটি স্ট্যাটাস পাওয়া প্রজাতিরা অনেকটাই মনোযোগ পায়। কিন্তু এই ধরনের বাসভূমি ও তার বাসিন্দাদের সংরক্ষণ নিয়ে ততটা মাথাব্যথা নেই। তখনই এই ধরনের বাসভূমি সংরক্ষণ ও তার মুখ্য বসবাসকারী প্রজাতি 'গ্রে উলফ' সংরক্ষণের বিষয়টা নিয়ে কাজ করার কথা ভাবনায় আসে।


বনেপাহাড়ে: আপনারা এখন পুনা শহরের কাছাকাছি তৃণভূমিতে কাজ করছেন। আপনাদের কাজের পরিধি দেশের অন্যত্র ছড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা রয়েছে?

মিহির: অবশ্যই। কোন কর্মকাণ্ড ততক্ষণ ফলপ্রসূ হয় না যতক্ষণ না সমমনস্ক ব্যক্তিরা একজোট হচ্ছেন ও কাজটা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আমরা এমন সহযোগীদের অপেক্ষায় আছি যারা এই কর্মকাণ্ড অন্য রাজ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবেন।


স্ট্রাইপড হায়েনারও বাস এখানে। ছবি: The Grasslands Trust


বনেপাহাড়ে: ভারতে আর কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ তৃণভূমি এলাকা আছে?

মিহির: রাজস্হান, গুজরাত, রাজস্থান, কর্ণাটকের শুষ্ক এলাকার তৃণভূমি বা ঝোপঝাড়ময় ভূ-ভাগগুলো দারুণ এলাকা এই হিসাবে।

বনেপাহাড়ে: Wildlife Institute of India কিভাবে সাহায্য করছে আপনাদের এই সব বিষয়ে?

মিহির: Indian grey wolves নিয়ে WII সম্প্রতি দুটো গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষা চালায়, যাতে দ্য গ্রাসল্যান্ড ট্রাস্ট অংশ নিয়েছিল। এর মধ্য একটা ছিল howling survey যেখানে নেকড়ের চিৎকার রেকর্ড করা হয়। প্রতি নেকড়ের চিৎকারই আলাদা বলে মনে করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করে ওদের চিৎকার রেকর্ড করে ওদের সংখ্যা নিরূপণ করা যেতে পারে। দ্বিতীয় প্রোজেক্টটিতে মহারাষ্ট্র জুড়ে ৮ টি নেকড়েকে রেডিও কলার পরানো হয়। এর মাধ্যমে নেকড়েদে'র সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারা যাবে ও তা এদের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে সাহায্য করবে।


বনেপাহাড়ে: যে এলাকায় আপনারা কাজ করছেন, কাজ শুরু করার পরে কোন পরিবেশগত দিক থেকে আশাবাদী হওয়ার মত পরিবর্তন দেখতে পেয়েছেন?

মিহির: আমাদের এন জি ও-র বয়স মাত্র দু'বছর। যেসব প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি তারা দীর্ঘমেয়াদী ফল দেবে। কিন্তু এর মধ্যেই ওইসব এলাকায় যেসব মানুষের মধ্যে আমরা কাজ করছি তাদের ভাবনাচিন্তায় একটা তাৎপর্যপূর্ণ বদল এসেছে, যারা মূলত: বন্যপ্রাণীদের কাছাকাছি থাকে। আগে ওখানকার জীবজন্তুগুলো খুব একটা গুরুত্ব পেত না। ওখানকার লোকজনের ধারনা ছিল না যে এই সব প্রজাতিরও গুরুত্ব আছে। কিন্তু আমরা যে সব সচেতনতা মূলক প্রচার করেছি তাতে তারা এইসব বন্যপ্রাণীদের ব্যাপারে সজাগ হয়েছে।

ইন্ডিয়ান গ্রে উলফ্ এর দল। ছবি: The Grasslands Trust

আরো দেখুন: জীববৈচিত্র্যের আধার তৃণভূমি ধ্বংসের মুখোমুখি


বনেপাহাড়ে: স্হানীয় কর্তৃপক্ষ কেমনভাবে দেখছে আপনাদের কাজকর্ম?তারা কি এই সব বিষয়ের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল? বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও কর্তাব্যক্তিদের এইসব 'পরিক্তত্য' জমির বিষয়ে ভাবনার কোন পরিবর্তন হয়েছে?

মিহির: স্হানীয় কর্তৃপক্ষ এব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করছেন বলব।বরং আমরা যেসব কাজকর্ম চালাচ্ছি তা তারা সক্রিয়ভাবে সমর্থন করছে বিভিন্নভাবে। সে তাদেরও নিত্যনতুন ভাবনার আদানপ্রদান করে হোক বা পরিকাঠামোগত সাহায্যই বলুন।

বনবিভাগ তো এখন যথেষ্টই সাহায্য করছে। আমাদের অনেক প্রকল্প ওদের সাথে যৌথভাবেই চলছে। বনবিভাগের নীচতলার কর্মীদের আমরাও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি যাতে ওরা জীবজন্তুদের নজরে রাখতে পারে আরও ভালভাবে এবং বন্যজীব দেখা গেলে তা যথাযথ ভাবে জানানোর একটা ব্যবস্হা গড়ে উঠে। সম্প্রতিই একটা কর্মশালার আয়োজন হয়েছিল মহারাষ্ট্রের PCCF এর উপস্হিতিতে যেখানে এই 'ওয়েস্টল্যান্ড' রক্ষা করার ব্যাপারে বনকর্মীদের মধ্যে সচেতনতায় জোর দেওয়া হয় ও অপ্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ যাতে সেখানে না হয় বোঝানো হয়।

তৃণভূমির বাসিন্দাদের আস্তানা। ছবি: The Grasslands Trust


বনেপাহাড়ে: বৃক্ষরোপণও তো দরকার।কিন্তু তৃণভূমি তার সঠিক জায়গা নয়। বনসৃজনের বিকল্প ভাবনা কেমন হওয়া উচিত বলে আপনারা মনে করেন?

মিহির: বন্যজীবের বাসস্হানের জন্য সক্রিয় হয়ে বৃক্ষরোপণের দরকার নেই।বরং তেমন বাসভূমির সুরক্ষা প্রয়োজন।অনেক সময়েই সদুদ্দেশ্য নিয়ে কোন ভুল পরিকল্পনায় করা বনসৃজনের কাজ বরং স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রের ভালোর বদলে ক্ষতি করে।


বনেপাহাড়ে: এই সমস্যা দেশের অন্যত্র কিভাবে সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে? দেশের পরিবেশবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের প্রতি আপনাদের বার্তা কী?

মিহির: শুধুমাত্র বড় বড় ন্যাশনাল পার্কের দিকে বা বাঘ-হাতির মত নজর কাড়া জন্তুর দিকে ফোকাস রাখলেই হবে না। নিজের বাসস্থানের আশেপাশেও দেখুন। অনেক বেশি জীবজন্তু সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে বাস করে।চেষ্টা করুন ওদের বাঁচাতে, কারণ আপনি না করলে আর কেউ তো করবে না সঠিক জ্ঞানের অভাবে। আর এইভাবে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্যের অনেক কিছুই আমরা হারিয়ে ফেলব।


বনেপাহাড়ে: পরিবেশ-বান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনা কেমন এমন তৃণভূমিতে? পুনার আশেপাশে তেমন কোন প্রকল্প নিয়েছেন আপনারা?

মিহির: নিয়ন্ত্রিত আকারে পর্যটন নিশ্চই স্হানীয় বন্যপ্রাণীর উপকারে আসবে। তখন সেইসব এলাকার বাসিন্দারা তাদের বন্যপ্রাণীদের জন্য গর্ব অনুভব করবেন।প্রথাগত পেশা যেমন, চাষবাস বা পশুপালনের পাশাপাশি পর্যটন থেকেও তাদের অতিরিক্ত কিছু রোজগার হবে- এটা তাদের বন্যপ্রাণীদের সংরক্ষণে আরও উৎসাহিত করবে, বন্যপ্রাণী দ্বারা গবাদি পশু হত্যার মত ঘটনা ঘটলেও।

সম্প্রতি বনদপ্তরের সাথে মিলে আমরা পর্যটকদের জন্য এমন একটা ব্যবস্হা করার উদ্যোগ নিয়েছি, যা পর্যটকদেরও আকর্ষণ করবে আর স্হানীয় মানুষজনেরও তাতে উপকার হবে।


বনেপাহাড়ে: শেষ প্রশ্ন, দ্য গ্রাসল্যান্ড ট্রাস্টের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী কী?

মিহির: সেটা তো সময়ের সাথেই নির্ধারিত হবে, বর্তমান প্রকল্পগুলির ফলাফলের ওপর নির্ভর করে।



চিঙ্কারা হরিণের বাস এখানে। এরা খাদ্যশৃঙ্খলে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভিডিও: The Grasslands Trust





বনেপাহাড়ে- বাংলায় প্রথম বন্যপ্রাণ ও পরিবেশ বিষয়ক ওয়েবজিন।


Click here to join us at Facebook. LIKE and Follow our page for more updates.

91 views0 comments
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG