• ..

সুন্দরলাল বহুগুণা : যাঁর দর্শনকে উপেক্ষা করে ইমেজকে স্বীকৃতি দিয়েছে রাষ্ট্র

তিনি ছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তি। চিপকো আন্দোলন ও তার পরে তেহরি বাঁধ নির্মান বিরোধী আন্দোলনকে রূপকথার পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন তিনি। কোভিড কেড়ে নিল তাঁকে। কিন্তু যতদিন পৃথিবীকে বাঁচানোর লড়াই চলবে মানুষের মুখে মুখে তাঁর নাম ফিরবে। রাষ্ট্র ও তার উন্নয়নের মডেলকে প্রশ্ন করবে তাঁর আন্দোলন, তাঁর সহজ সরল জীবনধারা। লিখলেন উত্তম কুমার দেব



সুন্দরলাল বহুগুনা ও চিপকো আন্দোলনের সেই অবিস্মরণীয় ছবি


আধা শতক আগেই যে মানুষটি গাছ কেটে হিমালয়কে ন্যাড়া বানিয়ে দেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন কোভিড তাঁর প্রাণ কাড়ল ৯৪ বছর বয়সে । এতক্ষণে দেশশুদ্ধ লোক জেনে গেছে সুন্দরলাল বহুগুণা প্রয়াত । তিনি বেঁচে আছেন কিনা সেটাই যখন ভুলতে বসেছিলাম তখন সুন্দরলাল বহুগুণা মরে জানিয়ে গেলেন তিনি বেঁচেই ছিলেন । তাঁর প্রাণের হিমালয় জুড়ে এখন উন্নয়নের অট্টহাসি ।‌ প্রাণপ্রবাহিনী অলকানন্দা , মন্দাকিনী , ধৌলিগঙ্গা , ঋষিগঙ্গা , ভাগীরথী নদীর বক্ষ জুড়ে এখন অজস্র ক্ষত । শতশত বছর যে জনপদ গুলি গাঢ় সবুজ আচ্ছাদিত দুর্গম হিমালয়ের বুকে মুখ গুঁজে শিশুর মতো লুকিয়ে ছিল সেই সব নির্জন জনপদ এখন জনারণ্য কংক্রিটের জঙ্গল ।


মানুষটির কাছে হিমালয়‌ই ছিল পিতা। মাতা অবশ্যই গঙ্গা । যৌবনের প্রারম্ভ থেকে বানপ্রস্থে প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত পিতা-মাতার সেবায় চেষ্টার ত্রুটি রাখেন নি মানুষটি । সন্তানের চোখের সামনেই তেহেরি গড়োয়ালে মায়ের বক্ষ বিদীর্ণ হল ! ১৯৮০তে বাঁধ নির্মাণের তোড়জোর শুরু হতেই রাষ্ট্র , সরকার , প্রশাসন আর উন্নয়ন লবির বিশাল বুলডোজারের সামনে মাকে রক্ষা করতে দু বাহু বাড়িয়ে রুখে দাঁড়ালেন তিনি । ততদিন চিপকো আন্দোলনের সুবাদে মাথায় সাদা ফেট্টি , মুখ ভরা দাড়ি , ক্ষুদে দুই চোখের খর্বাকৃতি মানুষটি বেশ বিখ্যাত । তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে সারা দেশ থেকে তেহেরিতে ছুটে এলেন সেই মানুষেরা , যাঁদের বিশ্বাস উন্নয়নের হাড়িকাঠে পরিবেশকে বলি চড়ানো প্রকৃতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা । ১৯৮০ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত নিজের গ্রামে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেও সুন্দরলাল বহুগুণা নামের কিংবদন্তি সম মানুষটি কিন্তু পারলেন না তেহেরি ড্যামের নির্মাণ থেকে শাসকগোষ্ঠীকে পিছু হটাতে । দীর্ঘ চব্বিশ বছরের সংগ্রামে বাঁধের নির্মাণ বন্ধ ‌করতে দু'দফায় মোট ১১৯ দিন অনশনে ছিলেন এই গান্ধিবাদী নেতা ।

ভাগিরথীর পথ স্তব্ধ করে আজকের তেহরি ড্যাম

২০০১ সালে তাঁকে গ্রেফতার পর্যন্ত করে সরকার । বাঁধের কারণে এক লক্ষ স্থানীয় বাসিন্দাকে বাস্তুচ্যুত হতে হয় । শেষ পর্যন্ত এক‌ই পরিণতি বরণ করতে বাধ্য হন সুন্দরলাল বহুগুণাও । তেহেরি বাঁধের সুবিশাল জলাধার পূর্ণ হয়ে উঠলে ২০০৪ এর ৩১ জুলাই বরাবরের মতো মারোদা গ্রামে নিজের জন্মভিটা ত্যাগ করে কোটিতে চলে যান তিনি ।




তেহরি আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনে গ্রামসভায়

২৪ বছর মাটি কামড়ে লড়েও তেহেরি ড্যাম প্রকল্প থেকে সরকারকে টলাতে পারেন নি সুন্দরলাল বহুগুণা। যে সরকার সুন্দরলাল বহুগুণার কথায় কর্ণপাত করে তেহেরি বাঁধ নিয়ে বিন্দুমাত্র নমনীয়তা দেখায় নি সেই সরকার‌ই সুন্দরলাল বহুগুণার মাথায় পদ্মশ্রী , পদ্মভূষণ চাপাতে লজ্জা পায় নি । সুন্দরলাল বহুগুণা আজ মৃত ।

২০০৯ সালে পাচ্ছেন পদ্মবিভূষণ

তেহেরি ড্যাম আন্দোলন ভাঙতে সরকার যে মানুষটিকে একদিন গ্রেফতার করেছিল আজ সরকারি স্তরে , রাজনৈতিক মহলে পাল্লা দিয়ে চলছে সেই মানুষটির বন্দনা । চিপকো আন্দোলনের স্রষ্টা বলতেন, হিমালয়কে রক্ষা করতে চাইলে হিমালয়ের জঙ্গলকে রক্ষা করতে হবে , হিমালয়কে রক্ষা করতে চাইলে হিমালয়ের নদীকে রক্ষা করতে হবে ।


গাড়োয়ালের মহিলারা চিপকো আন্দোলনে



গাড়োয়ালি ব্রাহ্মণ । কিন্তু সুন্দরলালের ধমনীতে ব‌ইছে বাঙালির রক্ত । ৮০০ বছর আগে বাংলার গঙ্গা বিধৌত সমভূমি থেকেই গাড়োয়াল হিমালয়ে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন সুন্দরলাল বহুগুণার পূর্বপুরুষেরা । তাঁদের পদবি ছিল বন্দ্যোপাধ্যায় । সুন্দরলাল বহুগুণা বিশ্বাস করতেন প্রকৃতির সঙ্গে সৌহার্দ্য‌ই সুন্দর জীবনযাপনের একমাত্র পথ । যে জীবনদর্শনে আস্থা রাখতেন সেই দর্শনের নিরিখেই যাপন করতেন জীবন । ' চিপকো ' মানে জড়িয়ে ধরা । গাড়োয়ালের বনেবাদাড়ে ঠিকাদারের জল্লাদেরা যখন কুড়ুল হাতে গাছের গর্দান নিতে আসতো তখন গাড়োয়ালি কন্যারা গাছকে জড়িয়ে ধরে গাছের প্রাণ রক্ষা করত । সেই থেকে বৃক্ষ রক্ষার এই আন্দোলন ইতিহাসে চিপকো মুভমেন্ট নামে পরিচিত । মানুষকে জঙ্গল ও নদী রক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গাড়োয়াল হিমালয় জুড়ে গ্রামের পর গ্রাম চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ৪৭০০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন সুন্দরলাল বহুগুণা । প্রকৃতি বাঁচাতে গিয়ে মেয়েদের জাগিয়েছেন ।‌ বহুগুণার চিপকো আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল গাড়োয়ালের ললনারাই । উত্তরপ্রদেশের গাড়োয়াল এলাকা জুড়ে দাবানলের মতোই জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ি গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল অহিংস চিপকো আন্দোলন । আন্দোলনের জেরে ১৯৮০ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে গাড়োয়ালের বনজঙ্গলে ১৫ বছরের জন্য বৃক্ষচ্ছেদনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে উত্তরপ্রদেশ সরকার । লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে , লোকজীবনের সঙ্গে এমনকি স্থানীয় মানুষের আধ্যাত্মবোধের সঙ্গে পরিবেশ আন্দোলনকে একীভূত করতে সক্ষম হয়েছিলেন সুন্দরলাল বহুগুণা । গান্ধিবাদী বহুগুণার পরিবেশ আন্দোলন তাই একান্ত‌ই দেশজ ।


আন্দোলন থেকে আন্দোলনে


নিজের সংস্কার, অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে সুন্দরলাল বহুগুণা এই প্রতীতিতে উপনীত হয়েছিলেন, হিমালয়ের বাসিন্দাদের চাষাবাদ , উপার্জন , সমৃদ্ধি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জঙ্গল ও নদী জড়িয়ে আছে । পরিবেশ থেকে হিমালয়ের মানুষকে ছিন্ন করতে গেলে তাদের আর্থ-সামাজিক জীবনে বিপর্যয়টা হবে সুদূরপ্রসারী । বাস্তুতন্ত্র নির্ভর যে জীবনধারার জন্য জীবনব্যাপী সংগ্রাম করেছেন সুন্দরলাল বহুগুণা , সরকারের শাসন প্রক্রিয়ায় তা উপেক্ষিত । সুন্দরলাল বহুগুণার দর্শনকে উপেক্ষা করার অর্থ প্রকৃতিকে উপেক্ষা করা । হিমালয় জুড়ে জনপদে জনপদে যে উন্নয়নযজ্ঞ অব্যাহত তাতে প্রতিদিন আহত হচ্ছে প্রকৃতি । আহত প্রকৃতির পাল্টা রোষে গাড়োয়াল হিমালয় যে ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত নেই । কেদারনাথের বিধ্বংসী বন্যা থেকে চামোলি বিপর্যয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে - কানে তুলো গুঁজে বহুগুণার বাণীকে উপেক্ষা করতে থাকলে চড়া মাশুল দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে আমাদের ।

ভবিষ্যতদের সঙ্গে

লেখক পরিচিতি: উত্তম কুমার দেব একজন লেখক, সাংবাদিক , ব্লগার । নাগরিক নিউজ ডট কমের সম্পাদক । রাজনৈতিক ভাষ্যকার । হিমালয় সংলগ্ন উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার মানুষ ।

88 views0 comments
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG