• ..

ভারতের বাঘ: সময়ের পথ বেয়ে অনুসন্ধান (পর্ব ১)

বাঘ ভারতের জাতীয় পশু। শৌর্যে, শক্তিতে সে পশুজগতের শীর্ষে ভারতের মাটিতে। বলা হয় বনের রাজা। হ্যাঁ, একসময়ে সত্যিই ছিল সে বনের রাজা। তারপর? তার সে রাজত্ব চলে গিয়ে অস্তিত্বের সংকট তৈরি হল কোন পথে? সারা দেশের মাটিতে যে দাপিয়ে বেড়াত, সে আস্তে আস্তে কোনঠাসা হয়ে পড়ল কেন সীমিত কিছু অরণ্যে! আজকের দিনেই বা কতটা তাকে স্বমহিমায় ফিরে পাবার আশা রাখা যায়! এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা Wildlife Conservation Trust এর সভাপতি ও National Tiger Conservation Authorityর সদস্য, ভারতের বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ ড: অনীশ আন্ধেরিয়া এবং ভারতের নরখাদক বাঘের ওপর মার্কিন গবেষক ও লেখক ডেন হাকলব্রিজের হাত ধরে। তাঁদের সাথে আলোচনায় বনেপাহাড়ে'র পাঠকদের সামনে ভারতের বাঘের সময়ের পথ ধরে যাত্রার কথা তুলে ধরছেন আমাদের সহযোগী সম্পাদক ড: ঐশিমায়া সেন নাগ।ধারাবাহিক রচনার শুরু আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে। আজ প্রথম পর্ব





In the first decade of the 20th century, the most prolific serial killer of human life the world has ever seen stalked the foothills of the Himalayas……. A serial killer that happened to be a Royal Bengal tiger.”


...............No Beast So Fierce, Dane Huckelbridge


শতাব্দীরও বেশি সময় পরে, জিম করবেটের হাতে নিহত চম্পাবতের সেই "মানুষখেকো" বাঘিনীর গল্প আমাদের কাছে নতুন করে তুলে ধরেছেন আমেরিকান লেখক ডেন হাকলব্রিজ। সেই কাহিনী অনেকটাই আলাদা আমাদের শোনা পুরানো গল্পগাথার তুলনায়। হ্যাঁ, এমনকি জিম করবেটের বলা কাহিনীর থেকেও। এই কাহিনী নির্মানে তিনি চেষ্টা করেছেন একটি বাঘের 'মানুষখেকো' হয়ে ওঠার (making of a man eater) বিষয়টা অনুসন্ধান করতে।

আজকের এই লেখায় আমরা তুলে ধরব ভারতে বাঘের একটি বিস্তৃত ইতিহাস। সময়ের পথ বেয়ে আমরা দেখার চেষ্টা করব এই অসাধারণ সুন্দর জীবটি কিভাবে বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্হায় নিজেকে খাপ খাইয়ে টিকে রয়েছে এত বড় দেশে, এমনকি সময়ের সাথে পরিবেশ-পরিস্হিতির পরিবর্তনের মধ্যেও। হয়ে উঠেছে এক কথায় এদেশের বন্যপ্রাণীদের অঘোষিত রাজা। আমরা দেখব, কিভাবে 'নরখাদকে' র তকমা লাগিয়ে এই অতুল্য সুন্দর পশুটিকে সময়ে সময়ে বদনাম করার চেষ্টা হলেও, লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছে ওরা পৃথিবীর এই বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশে।

বাঘের এই সময় সারনী ধরে পর্যালোচনায় আমাদের সঙ্গে রয়েছেন লেখক ডেন হাকলব্রিজ এবং ভারতের অন্যতম অগ্রনী সংরক্ষনবিদ ড: অনীশ আন্ধেরিয়া। তাদের সাথে আলোচনায় উঠে এসেছে কলোনিয়াল ও পোস্ট-কলোনিয়াল সময়ে ভারতে বাঘেদের অবস্হান , তাদের বর্তমান অবস্হার হালহকিকত।


যখন সময়টা ছিল বাঘেদের

যখন "যে সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যায় না কখনও"র দেশ থেকে সাহেবদের পা পড়েনি এই দেশে, রয়েল বেঙ্গল টাইগারদের পৃথিবীটা ছিল আজকের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, অচেনা। তাঁর বিখ্যাত বই “India’s Wildlife History” তে মহেশ রঙ্গরাজন ভারতের বন্যপ্রাণের সেই বৈচিত্রের কথা শুনিয়েছেন যখনও তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ধ্বংসলীলার গ্রাসে পড়ে চিরতরে ক্ষত-বিক্ষত, বিদ্ধস্ত হয়ে যায়নি। মোঘল যুগের আগে ভারতের বন্যপ্রাণ সম্পর্কে তথ্য কমই জানা যায়। যেটুকু জানা যায় তা মূলত: পৌরানিক গাথা, সংস্কৃত সাহিত্য, পর্যটকদের বিবরন আর স্হাপত্যশিল্পের থেকে। রঙ্গরাজনের বইতে প্রাচীন ভারতের বন্যপ্রাণ নিয়ে যে তথ্য সংকলিত রয়েছে তার সারমর্ম করলে একটা ছবিতে তা ধরা যেতে পারে।তা বড়ই বৈচিত্রময়।

এই রকম একটা প্রাকৃতিক পরিবেশে, যখন বন ছিল সুরক্ষিত ও প্রাণে ভরা- তখন বাঘেরা রাজত্ব করত। এ এক এমন রাজত্ব ছিল, যা কখনই পরে তারা আর ফিরে পায়নি।

দেখা যায় যে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে যখন বাল্মিকীর রামায়নের যে সংস্করন আজকে পড়ি আমরা সেই রূপ পেয়েছিল তা- তখন তো বটেই, এমনকি যখন মোঘলরা এই দেশে আক্রমণ করে- সেই যুগেও অরণ্যকে এই ভূখন্ডের অধিবাসীরা একাধারে ভয় ও শ্রদ্ধার চোখে দেখত। গভীর বন যা প্রাণবৈচিত্রে ভরপুর ছিল তা দেশের বিরাট এক ভূ-ভাগকে ঢেকে রেখেছিল। শিকার করা সবসময়েই একটা প্রচলিত ও জনপ্রিয় খেলা ছিল। এই সময়ের প্রায় সব গল্পই রাজাদের শিকার করার কথা বলেছে। তা ছিল তাদের সাহস ও শক্তির পরিচায়ক। অনেকসময়েই জঙ্গল সংলগ্ন এলাকার অধিবাসীদের সাথে রাজার দলের লোকেদের যোগাযোগ গড়ে উঠত শিকারকে কেন্দ্র করে, যখন রাজারা রাজকীয় শিকারে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করতেন।দরকার হত তাদের সহযোগীতার। বন্যপ্রাণীদের অবশ্য মাংস ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্যেও শিকার করত জঙ্গলের অধিবাসীরা। তবে এটা সহজেই বোঝা যায় যে, অনেক কম জনসংখ্যা, অরণ্যের দুর্গমতা, যাতায়াতের অপ্রতুল ব্যবস্হা, অনুন্নত পরিকাঠামো ও অস্ত্রশস্ত্র - এসব কারণে শিকারের সংখ্যা একেবারেই নগন্য ছিল আধুনিক যুগের সাথে তুলনা করলে।

এই রকম একটা প্রাকৃতিক পরিবেশে, যখন বন ছিল সুরক্ষিত ও প্রাণে ভরা- তখন বাঘেরা রাজত্ব করত। এ এক এমন রাজত্ব ছিল, যা কখনই পরে তারা আর ফিরে পায়নি। বাঘ তখন ছিল মহারাজাদের অভিলাষের বস্তু। বাঘের শিকার করা অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় ছিল, কারণ বাঘকে মারলে অসীম সাহসিকতার তকমা জুটত শিকারীর কপালে। বাঘ তখন সত্যিই 'বনের রাজা' ছিল, যাকে একমাত্র স্হানচ্যুত করার ক্ষমতা রাখত অন্য কোন শক্তিশালী রাজাই- অবশ্যই সে মানুষদের। সত্যি বলতে, এটাই ছিল ইতিহাসে বাঘেদের রাজার মত বেঁচে থাকার সময়।


বাঘ বনাম মোঘল


বাঘেরা স্বমহিমায় ছিল সে সময়েও, যে কালে মোঘল অধিপতিরা ভারতে আক্রমণ করে, এখানকার হিন্দু রাজত্বগুলির অবসান ঘটিয়ে থিতু হয়ে বসে ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর সময়কালে। সৌভাগ্যবশত: মোঘলরা তাদের সময়কালকে ধরে রাখতে চেয়েছে ইতিহাসের পাতায়, ছবিতে এবং বাঘেদের বিষয়েও তথ্য উঠে এসেছে অনেক পরিষ্কার ভাবে এই সময় থেকে আমাদের সামনে।

তখনও বাঘেদের সংখ্যা ছিল অগুনতি এবং তাদের আগ্রা বা দিল্লীর মত বড় বড় শহরের বাইরেও দেখা যেত মাঝেমধ্যে। মোঘলরাও বাঘশিকারের খেলায় মজেছিল। তথ্য বলে সুলতান জাহাঙ্গীর তার সময়কালে ৮৬ টি বাঘ মেরেছিলেন। রাজনৈতিক অভিপ্রায়ে বড় বড় শিকার অভিযান পরিচালনা হত অন্য রাজারাজড়ার সাথে। বন্যজীবের মাংসের ছিল ব্যাপক চাহিদা।

দিল্লীর নিকটে পালাম এলাকায় আকবরের শিকার অভিযান। ছবি:flickr

যদিও মোঘলরাও অনেক বাঘ ও অন্যান্য বন্যপশু হত্যা করেছে, তবুও সেসময়ে ভারতে ছিল বিস্তৃত বনভূমি। যথেচ্ছ শিকারের কথা জানা যায় না। বন কেটে ফেলার ঘটনা ঘটলেও তা ছিল নগন্য।

শিকার যখন প্রমোদ। মোঘল যুগের মিনিয়েচার চিত্র।

শাহজাহানের কৃষ্ণসার হরিণ শিকার অভিযান। সঙ্গী সে সময়ে ভারতে সহজলভ্য চিতা।


বাঘ সংহারকারীদের আগমন: শেষের শুরু


ভারতে সাম্রাজ্য স্হাপনের পর তারা নিয়ম বানালো, এদেশে এই রকম 'হিংস্র' পশুদের হত্যা যারা করবে তাদের জন্য আকর্ষনীয় পুরস্কার থাকবে। বেশি বড় পুরস্কার থাকবে তাদের জন্য, যারা গর্ভবতী বা সন্তান পালনকারী বাঘিনীকে মারতে পারবে।

সবকিছু আচমকাই পাল্টে গেল ব্রিটিশদের আগমনে। বাঘেদের শত্রু এখন অনেক অনেক বেশি ক্ষমতাবান।তাদের প্রকৃতি প্রদত্ত অসীম শৌর্য শক্তির তুলনায় ব্রিটিশ বুলেট রক্তের নেশা অনেক বেশি শক্তি ধরে।ভারতের মাটিতে এই প্রথম এমন কোন শাসক এল যারা লক্ষ্য স্হির করল ভূ-খন্ডের মাটি থেকে বাঘকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলবার। ব্রিটিশদের শিকার করা মাংশাসী জীবদের প্রতি বিতৃষ্ণা নতুন কিছু ছিল না। নিজেদের ঘর, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে তারা সেখানকার শীর্ষস্হানীয় শিকারী নেকড়েদে'র মেরে শেষ করে এনেছিল।

ভারতে সাম্রাজ্য স্হাপনের পর তারা নিয়ম বানালো, এদেশে এই রকম 'হিংস্র' পশুদের হত্যা যারা করবে তাদের জন্য আকর্ষনীয় পুরস্কার থাকবে। বেশি বড় পুরস্কার থাকবে তাদের জন্য, যারা গর্ভবতী বা সন্তান পালনকারী বাঘিনীকে মারতে পারবে। নতুন প্রভুদের খুশি করার জন্য, তাদের অনুগ্রহ লাভের আশায় ভারতের রাজা-রাজড়ারাও এই রক্তাক্ত খেলায় যোগ দিল নতুন সাজে। আর একরকম সুরক্ষা দেবার অছিলায়ও শিকার শুরু হল। সাদা চামড়ার সাহেবরা গ্রাম দেশে গিয়ে শিকার করা শুরু করল, যেখানে তথাকত্থিত 'নরখাদক' বাঘের ভয়ে মানুষ তটস্হ থাকত। এ ছিল কালো 'নেটিভ' দে'র সামনে 'মহান' হয়ে ওঠার একটা প্রক্রিয়া।

হাতির পিঠে চেপে চলছে শিকার অভিযান। ১৮৯০ এর দশকে।

সংহারলীলা যত চলতে থাকল, একদা জীবজন্তুতে ভরা বনগুলো তত খালি হতে থাকল। এবং এই ঘটনা শাসকদের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে জানোয়ারহীন বনগুলোকে নিজেদের মুঠোয় নিয়ে আসতে সাহায্য করল। বেঁচে যওয়া বাঘেরা ক্রমশ ছোট হতে থাকা বনভূমির কিছু কিছু অংশে নিজেদের কোনক্রমে টিকিয়ে রাখল।

মৃত বাঘের সাথে পোজ্ দিচ্ছেন সস্ত্রীক লর্ড কার্জন। ১৯০৩।

তবে, বাঘে-মানুষে সংঘাত কিন্তু কমার বদলে বেড়ে গেল। কারণ বাসস্হান কমে এসেছে। বনে একদা সহজ্যলভ্য শিকাররা চলে গেছে সাহেবদের টেবিলে খাবার হয়ে। অগত্যা নিজেদের বাঁচাতে বাঘেরা বনের আশেপাশে গ্রাম এলাকায় হানা দিতে থাকল গবাদি পশুর লোভে। কখনও সখনও মানুষরা হয়ে যেত তাদের শিকার।

এমনই শোচনীয় পরিস্হিতিতে হিমালয়ের কুমায়নে চম্পাবতের "ম্যান-ইটার" বাঘিনীর কথা রটে যায় যে নাকি ৪০০র বেশি মানুষকে খেয়ে ফেলেছে!

পরের পর্বে আমরা শুনব তার কথা। আর শুনব জিম করবেটের কথা। সেই সাহসী যোদ্ধা যিনি ভুল সময়ে হাতে শিকারের বন্দুক তুলে নিয়েছিলেন।

(চলবে)




লেখক পরিচিতি: ড: ঐশিমায়া সেন নাগ বায়োকেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট। বর্তমানে বন্যপ্রাণ ও সংরক্ষণের কাজে নিবেদিত। কানাডা থেকে প্রকাশিত শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট worldatlas এর অন্যতম সম্পাদক। বর্তমানে বাংলা ওয়েবজিন 'বনে-পাহাড়ে'র সহ-সম্পাদিকার দায়িত্বেও তিনি যুক্ত।



দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন



👈 Click here to join us at Facebook. Follow our page for more updates.






212 views1 comment
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG