• ..

শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেন: বৈচিত্র ও ইতিহাস

কলকাতার অদূরেই গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের গর্বস্বরূপ শিবপুরের আচার্য জগদীশচন্দ্র বোস বোটানিকাল গার্ডেন, যা বিশ্বের বিস্ময়। ২০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই জাতীয় উদ্যানের আশ্চর্য ইতিহাস আর তার জীববৈচিত্র নিয়ে আলোচনায় দীপ্তার্ক ঘোষ



বোটানিকাল উদ্যান। ছবি: সুনিষ্ঠা ভট্টাচার্য।


"যিনি বৃক্ষরোপণ করেন এটা জেনেও যে তার ছায়ায় তিনি কখনও বসতে পারবেন না, তিনি আসলে জীবনের অর্থ বুঝতে শিখেছেন"। -রবীন্দ্রনাথ।


সংজ্ঞা অনুযায়ী বোটানিক্যাল গার্ডেন হল এমন কোন বাগান যেখান অগণ্য গাছপালার সংরক্ষণ, বংশবৃদ্ধি ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা আছে। ২৭৩ একর জুড়ে বর্তমান যে ভারতের বৃহত্তম আচার্য জগদীশচন্দ্র বোস বোটানিকাল গার্ডেন শিবপুরে অবস্হিত তার পূর্বে রয়াল বোটানিক্যাল গার্ডেন বা ক্যালকাটা বোটানিক্যাল গার্ডেন নামেও পরিচিত ছিল।

গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে, হাওড়া জেলার শিবপুরে অবস্হিত আচার্য জগদীশচন্দ্র বোস বোটানিকাল গার্ডেন কলকাতা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে। একসময় প্রায় ৩০০ একর জমিতে এর বিস্তৃতি ছিল এবং বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ বোটানিকাল গার্ডেন রূপে পরিচিতি ছিল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অবধি। ভারত সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের অধীন বোটানিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া এর তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে।

বর্তমানে ২৭৩ একর জুড়ে থাকা এই বাগানের ১৩৭৭টি প্রজাতির ১৪১২২টি গাছ ফুসফুসের মত কাজ করে এই ভূখন্ডে। গোটা বাগানটি ২৫টি ভাগে বিভক্ত যাদের নামগুলো বিভিন্ন মহাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নামে। ২৪টি জলাশয় রয়েছে গোটা বাগানে ছড়িয়ে যারা নিজেদের মধ্যে তো সংযুক্ত বটেই, এমনকি হুগলী নদীর সাথে তাদের যোগ রয়েছে স্লুইস গেটের মাধ্যমে।ভারতের অর্থনীতিতে এই বাগান অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে চা, পাট, রাবার, মেহগনি, সিঙ্কোনার মত বাণিজ্যিক বিভিন্ন গাছের প্রবর্তনে সাহায্য করে। এছাড়াও এখানে রয়েছে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন উদ্ভিদের সমাহার। তাছাড়াও বিভিন্ন দুর্লভ ও বিপন্ন প্রজাতির গাছও আছে এখানে। কলকাতা থেকে সড়কপথে সহজ গন্তব্য হওয়ায় এখানে হাজার হাজার পর্যটক আসেন।সেপ্টেম্বার থেকে মার্চ হল এখানে আসার প্রকৃত সময়, যখন আবহাওয়া থাকে মনোরম, গরম থাকে না।


বোটানিকাল গার্ডেনের আকর্ষণেরা


সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে জিনিসটি শিবপুরের বোটানিকাল গার্ডেনের তা হল সেই বিখ্যাত “Great Banyan Tree.”। এই বিশাল বটগাছ (Ficus benghalensis) এই বাগানের থেকেও পুরানো এবং এর বয়স ২৫৫ বছরের ওপর মনে করা হয়। "চলমান বৃক্ষ" বলে বিখ্যাত এই গাছ উদ্ভিদ জগতের এক জীবন্ত বিস্ময় এই গাছ গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে জায়গা করে নিয়েছে তার বিশাল বড় ছত্রছায়ার কারণে আর সবথেকে বড় পরিধির জন্য।

ছবি: বনেপাহা্ড়ে

এমনটা মনে করা হয় যে এই গাছ তৈরি হয়েছিল পাখির মলে থাকা বীজ থেকে এবং একটি খেজুর গাছের ওপর বেড়ে উঠেছিল, একসময় এই বটগাছের শিকড়গুলি ওই খেজুর গাছটিকে মেরে ফেলে। এই বিশাল বটগাছ ১৮,৯১৭ বর্গমিটার (১.৮৯ একর) এলাকা জুড়ে রয়েছে এবং ৪০৩৩ টিরও বেশি শিকড় আছে এর। এই গাছ যে পাতা ও ডালপালার বিস্তার করেছে তার পরিধি ৪৫০ মিটার যা এই গাছটাকে একটা ছোটখাটো অরণ্যের রূপ দিয়েছে।

অরণ্যের রূপ নেওয়া সেই বিশাল বটবৃক্ষ। ছবি: বনেপাহাড়ে।

এই বিরাট ছত্রছায়া নিয়ে এই গাছটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বিস্তার যুক্ত বৃক্ষগুলির একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ৩৩০ মিটার দৈর্ঘের একটি রাস্তা এর চারপাশে বানানো হয়েছে, কিন্তু গাছটি এর বাইরেও বেড়েই চলেছে। একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে এই গাছটির ঘের গত ৩০ বছরে ২ একর বেড়েছে। বোটানিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া তা লোগোতে এই গাছটির ছবি ব্যবহার করে।


এই গাছ ছাড়াও এখানে রয়েছে কতরকমের পামজাতীয় গাছ, স্ক্রু পাইন, বোগানভেলিয়া, জুঁই, ক্যাকটাস ও বাঁশজাতীয় গাছ। জায়ান্ট ওয়াটার লিলি (Victoria amazonica), বাওবাব গাছ (Adansonia digitata), ভেনেজুয়েলান গোলাপ (Brownea sp.), ব্রেডফ্রুট গাছ (Artocarpus communis), ক্যানন বল গাছ (Couroupita guianensis), ম্যাড ট্রি (Pterigota alata var. irregularis), ডাবল কোকোনাট পাম ট্রি (Lodoicea maldivica), আফ্রিকান সসেজ ট্রি (Kigelia pinnata), রসগোল্লা গাছ (Chrysohyllum cainito), ফুল গাছের রাণী (Amherstia nobilis)- এমন কিছু গর্ব করার মত সম্পদ এখানে রয়েছে।

জায়ান্ট ওয়াটার লিলি। ছবি: লেখক।


গাছপালার পাশাপাশি নানারকমের প্রাণীর বাস এখানে। বিভিন্ন পতঙ্গ, সরীসৃপ, পাখি, উভচর ও স্তন্যপায়ীর আবাস এই বোটানিকাল গার্ডেন। এখানে যারা আসেন তাদের চোখে শেয়াল, বেজি, বিভিন্ন বিষাক্ত ও বিষহীন সাপ, কচ্ছপ নজরে পড়ে। কিছু উল্লেখযোগ্য পাখির প্রজাতি হল রোজ রিঙড্ প্যারাকীট, হাঁড়িচাচা (রুফাস ট্রিপাই), বেনে বৌ (ব্ল্যাক হুডেড ওরিওল), পরিযায়ী পাহাড়ি ময়না, কাঠঠোকরা, বসন্তবৌরি, ছাতারে, বী ইটার, জ্যাকানা, জঙ্গল আওলেট (প্যাঁচা), শিকরা, বুটেড ঈগল, হনি বেজার্ড প্রভৃতি।

রোজ রিঙড্ প্যারাকীট। ছবি: লেখক।


ঐতিহাসিক কালপঞ্জী


“I take this opportunity of suggesting to the Board [of Directors of the East India Company], the propriety of establishing a Botanical Garden… which ultimately may lead to the extension of the national commerce and riches.”- গভর্নর জেনারেল স্যর জন ম্যাকফারসানকে লেখা লেফট্যানেনন্ট কর্নেল রবার্ট কিডের লেখা ১৭৮৬ সালের চিঠি।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফ থেকে এই বোটানিকাল উদ্যান স্হাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল লেফট্যানেন্ট কর্নেল রবার্ট কিডের অনলস চেষ্টার ফলে, যিনি তখন বন্দরের সুপারিন্টেনডেন্ট ছিলেন ও ফোর্ট উইলিয়ামের বেঙ্গল ইনফ্যান্ট্রির মিলিটারি বোর্ডের সচিব ছিলেন। ১৭৮৭ সালে ইংলন্ডের কোর্ট অব্ ডিরেক্টার অবশেষে কিডের পরিকল্পনায় সায় দিল।কিডের শালিমারের বাগান বাড়ির দক্ষিণে ৩১০ একর জমি কিনে নেওয়া হল। কর্নেল কিড ওই বোটানিকাল উদ্যানের সাম্মানিক সুপারিন্টেনডেন্ট পদে নিয়োগ হলেন।তখন এর পরিচিতি ছিল 'কোম্পানির বাগান' বলে। এই বাগান স্হাপনের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু ছিল আসলে মশলা ও টীক কাঠের উৎপাদন মসৃণ করা, যা সমুদ্রপাড়ে রপ্তানি করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুনাফায় সাহায্য করবে। ১৭৯৩ এর ২৬শে মে'তে তাঁর মৃত্যুর দিন অবধি কর্নেল কিড এই বাগানের সুপারিন্টেনডেন্ট পদে কাজ করে গেছেন। সেই সময়ে বাগানে ৩০০এর ওপর প্রজাতির উদ্ভিদ ছিল।

ছবি: বনেপাহাড়ে

ছবি: লেখক

ডা: উইলিয়াম রক্সবার্গ ছিলেন কোম্পানির মাদ্রাস মেডিকেল সার্ভিসের অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন।১৭৮৯ সালে তিনি কোম্পানির প্রাকৃতিক ইতিহাসবিদ হিসাবে নিযুক্ত হন। ১৭৯৩ সালে তিনি বোটানিকাল গার্ডেনের সুপারিন্টেনডেন্ট পদের দায়িত্ব পান কর্নেল কিডের পরে। তিনিই প্রথম উদ্ভিদবিদ(botanist) যিনি বোটানিকাল গার্ডেন ও কলকাতা এলাকার প্রায় ৩৫০০ উদ্ভিদ প্রজাতির একটি বিবরণ প্রকাশ করেন। রেভারেন্ড উইলিয়াম কেরি ১৮১৪ সালে দুই খন্ডে “Hortus Bengalensis” নামে গ্রন্হের মাধ্যমে এটি প্রকাশ করেন। ১৮২০ সালে ভারতীয় গাছপালার ওপর রক্সবার্গের পর্বতপ্রমাণ কাজ নিয়ে “Flora Indica” প্রকাশিত হয়। রক্সবার্গ ভারতীয় উদ্ভিদবিদ্যার জনক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৭৯৫ সালে তিনি একটি হার্বেরিয়াম স্হাপনা করেছিলেন যা বর্তমানে “Central National Herbarium” নামে পরিচিত যাতে রয়েছে ২৫ লক্ষ শুকনো গাছের নমুনা, অনেক নথিপত্র, মনোগ্রাফ।

এরপরে ১৮১৭ সালে নাথালিয়াম ওয়ালিচ সুপারিন্টেনডেন্ট পদে যোগ দেন। ২০০০ গাছের একটি ক্যাটালগ তিনি বানা যা “Wallich Catalogue” নামে সুপরিচিত। ১৮৪৬ সাল অবধি তিনি এই পদে ছিলেন এবং বোটানিকাল গার্ডেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময়ে এই পদে থাকার দৃষ্টান্ত তাঁরই।তাঁর সময়েই বাগানের পূর্বদিকে চল্লিশ একর জমি কলকাতার লর্ড বিশপকে উপহার স্বরূপ দেওয়া হয় বিশপ কলেজ স্হাপনার জন্য যা বর্তমানে “Indian Institute of Engineering Science and Technology (IIEST) এর রূপ পরিগ্রহ করেছে। ১৮৫৭ সালে বাগানের নাম নতুন করে "রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন" রাখা হয়।

১৮৪৬ সালের সুপার সাইক্লোন অসংখ্য গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ এবং বোটানিকাল উদ্যানের প্রায় অর্ধেক বৃক্ষকে ধ্বংস করে। তিন বছর পর আর একটি সুপার সাইক্লোন, ৭৫০এর ওপর গাছকে নষ্ট করে দেয়। ১৮৭১ সালে স্যর ড: জর্জ কিং সুপার পদে আসেন। বোটানিকাল উদ্যানের বর্তমান রূপ মূলত: তাঁর নিষ্ঠাভরা ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কাজের নিদর্শন। বোটানিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া তাঁর সময়েই তৈরি হয় ও তিনি ছিলেন প্রথম প্রতিষ্ঠাতা-নির্দেশক। ১৯৫০ সালে রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের নাম ভারতীয় বোটানিকাল গার্ডেন হয়। ২০০৯ সালের ২৪শে জুন এর নাম রাখা হয় "আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোস বোটানিকাল গার্ডেন"।

সাইক্লোনের ধাক্কা। ছবি: বনেপাহাড়ে।


পরিবেশগত বিপদ

সম্প্রতি জানা যাচ্ছে একটি মারাত্মক ছত্রাকের সংক্রমণ সেই বিরাট বটগাছ ও তার আশেপাশের কিছু গাছকে বিপন্ন করে তুলেছে। বাগান কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে আশেপাশের এলাকা থেকে পয়:প্রণালীর নল বাগানের জলের প্রবাহগুলোয় বেআইনিভাবে যুক্ত করা হয়েছে এবং জীবাণুর সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

বৃহৎ বটগাছটি ১৮৬৪ ও ১৮৬৭ সালের সুপার সাইক্লোনগুলোর ধাক্কা সামলে নিলেও সাম্প্রতিক সময়ে ২০২০ সালের ২০শে মে আমফান নামক সুপার সাইক্লোন দ্বারা বেশ ক্ষতিগ্রস্হ হয়। গাছটির ১০% মোটা ঝুরি এতে ধ্বংস হয়। সাইক্লোনটিতে আরও প্রায় ১০০০ গাছ ধ্বংস হয় যার অনেকগুলিই দুর্লভ প্রজাতির। বোটানিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানী কণাদ দাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আমফানের ফলে ধ্বংস হয়েছে একটি পূর্ণবয়স্ক কল্পবৃক্ষ গাছ (Adansonia digitata), ম্যাড ট্রি (Pterygota alata var. irregularis), প্যারা রবার গাছ (Hevea brasiliensis), মালাবার চেস্টনাট (Pachira insignis), চীর পাইন (Pinus roxburghii) এবং কয়েক শতাব্দী পুরানো এক মেহগনি গাছ (Swietenia mahagoni)।

সম্প্রতি জানা যাচ্ছে একটি মারাত্মক ছত্রাকের সংক্রমণ সেই বিরাট বটগাছ ও তার আশেপাশের কিছু গাছকে বিপন্ন করে তুলেছে। বাগান কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে আশেপাশের এলাকা থেকে পয়:প্রণালীর নল বাগানের জলের প্রবাহগুলোয় বেআইনিভাবে যুক্ত করা হয়েছে এবং জীবাণুর সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। উদ্ভিদবিদদের মতে এইভাবে জীবাণুর ছড়িয়ে পড়াই কারণ বিরাট বটগাছের এই সংক্রমণের পিছনে।



লেখক পরিচিতি: লেখক প্রাণীবিদ্যায় স্নাতোকত্তর ও পরিবেশকর্মী। বর্তমানে worlsatlas.com পত্রিকার সম্পানার কাজে যুক্ত।


বনেপাহাড়ে- বাংলায় প্রথম বন্যপ্রাণ ও পরিবেশ বিষয়ক ওয়েবজিন।






Click here to join us at Facebook. LIKE and Follow our page for more updates.

209 views0 comments
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG