• ..

ভারতের বাঘ: সময়ের পথ বেয়ে অনুসন্ধান (পর্ব ৩)

বাঘ ভারতের জাতীয় পশু। শৌর্যে, শক্তিতে সে পশুজগতের শীর্ষে ভারতের মাটিতে। বলা হয় বনের রাজা। হ্যাঁ, একসময়ে সত্যিই ছিল সে বনের রাজা। তারপর? তার সে রাজত্ব চলে গিয়ে অস্তিত্বের সংকট তৈরি হল কোন পথে? সারা দেশের মাটিতে যে দাপিয়ে বেড়াত, সে আস্তে আস্তে কোনঠাসা হয়ে পড়ল কেন সীমিত কিছু অরণ্যে! আজকের দিনেই বা কতটা তাকে স্বমহিমায় ফিরে পাবার আশা রাখা যায়! এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা Wildlife Conservation Trust এর সভাপতি ও National Tiger Conservation Authorityর সদস্য, ভারতের বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ ড: অনীশ আন্ধেরিয়া এবং ভারতের নরখাদক বাঘের ওপর মার্কিন গবেষক ও লেখক ডেন হাকলব্রিজের হাত ধরে। তাঁদের সাথে আলোচনায় বনেপাহাড়ে'র পাঠকদের সামনে ভারতের বাঘের সময়ের পথ ধরে যাত্রার কথা তুলে ধরছেন আমাদের সহযোগী সম্পাদক ড: ঐশিমায়া সেন নাগ।ধারাবাহিক রচনার শুরু হয়েছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবসে। আজ তৃতীয় পর্ব





ভারতের ভাগ্য বদল, বাঘেদের নয়


ভারত স্বাধীনতা লাভ করল ১৯৪৭ সালে। ক্ষমতায় এলেন দেশের নেতারা। কিন্তু বাঘেদের জন্য কোন মুক্তির সংবাদ বয়ে আনল না তা। আগের মতই চলতে লাগল দমন পীড়ন। 'কলোনিয়াল হ্যাংওভার" থেকে এত সহজে মুক্তি পাওয়া গেল না!

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের "A Concise History of Tiger Hunting in India" অনুযায়ী ১৯৪৭ এর পরে ভারতে বাঘ শিকারের সংখ্যা গেছিল বেড়ে। যে ব্যাপারটা ঘটল, এবার বাঘ শিকার সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল।স্বাধীন দেশের দরকার বিদেশী মুদ্রা। সারা পৃথিবীর শিকারীদে'র জন্য ট্রাভেল সংস্হাগুলি নানা রকম লোভনীয় 'প্যাকেজ' দিতে লাগল। ভারতের দেশীয় রাজা-রাজড়ারা যারা তখনও খেতাব ধরে রেখেছেন, বাঘ হত্যার নতুন নতুন রেকর্ড করতে লাগলেন শিকারের আনন্দে।

পঞ্চাশের দশকে ভারতে বাঘ শিকার করতে আসার বিজ্ঞাপন।

'ট্রফি হান্টিং' এর ক্ষেত্রে যেহতু বড় বড়, শক্তিশালী পশুদের ওপর আলাদা করে লোভ থাকে- তাদের মেরে ফেলায় ভারতীয় বাঘেদের প্রজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জিনগত বৈশিষ্ট্যগুলিও হারিয়ে গেল। বাঘের চামড়ার তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়তে থাকল পশ্চিমি দেশের মডেল ও হলিউড তারকাদের মধ্যে। ফলে চোরাগোপ্তা শিকারেরও কমতি ছিল না। ১৯৫০ সালে একটা বাঘের চামড়ার পোশাকের ভারতে ৫০ ডলার মূল্য ছিল, যা তখনকার হিসাবে বিরাট।


'আয়রন লেডি অব ইন্ডিয়া'। বাঘেদের ভাগ্য বদল



We have received a huge tiger’s skin. The tiger was shot by the Maharaja of Rewa only two months ago. The skin is lying in the ballroom. Every time I pass it I feel very sad that instead of lying here he might have been roaming and roaring in the jungle. Our tigers are such beautiful creatures, so graceful. You can see their muscles rippling under their skins. Such a short time ago he must have been King of the Jungle—striking terror in the hearts of other animals. I am so glad that nowadays more and more people prefer to go into the jungles with their cameras instead of guns. It seems such a shame to deprive anything of the joy of living just for our pleasure. [ Indira Gandhi's letter to son Rajiv , dated 7 September 1956]



রয়েল বেঙ্গল টাইগারদের ভাগ্যে পরিবর্তন এল ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে। তাঁর 'আয়রন লেডি' তকমার সাথে সঙ্গতি রেখেই তিনি ভারতের বাঘেদের এই দুরাবস্হা পাল্টাতে সচেষ্ট হলেন। ১৯৬৯ সালে World Conservation Union এর পরামর্শ অনুযায়ী এবং শিকারীদের কায়েমি গোষ্ঠী (যারা বছরে ৪ মিলিয়ান ডলারের শিকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল বাঘেদের মেরে)'র তীব্র প্রতিবাদ, হইচই সত্ত্বেও Indian Board of Wildlife সব রাজ্যগুলোকে ৫ বছরের জন্য বাঘ শিকার বন্ধ করতে বলল। ১৯৭২ সালে ইন্দিরা গান্ধী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি গোষ্ঠী তৈরি করলেন যার মাথা হলেন করণ সিং। এই গোষ্ঠি ১৯৭২ সালের অগাস্টে একটি রিপোর্ট জমা করল যাকে বলা হয় এক কথায়- the blueprint of Project Tiger। ১৯৭৩ সালে জন্ম নিল 'প্রোজেক্ট টাইগার'- বাঘ সংরক্ষেণের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর সবথেকে সুপরিকল্পিত যোজনা। এর প্রাথমিক সময়কাল ঠিক হল ছ'বছর- এপ্রিল, ১৯৭৩ থেকে মার্চ, ১৯৭৯, যা পরে আরো বাড়ানো হয়েছিল ভারতের বাঘেদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে। প্রাথমিকভাবে, ৯টি টাইগার রিজার্ভ ঘোষনা করা হল গোটা দেশে- করবেট (উত্তরপ্রদেশ, বর্তমানে উত্তরাখন্ড), মানস (অসম), রণথোম্বর (রাজস্হান), সুন্দরবন(পশ্চিমবঙ্গ), মেলঘাট(মহারাষ্ট্র), কানহা(মধ্যপ্রদেশ), বন্দীপুর(কর্নাটক), পালামৌ (বিহার, বর্তমানে ঝাড়খন্ডে) ও সিমলিপাল (ওড়িশা)। ৮০'র দশকের শুরুতে টাইগার রিজার্ভের সংখ্যা বেড়ে হল ১৫।

এবারে বাঘেদের জন্য মনে হল সত্যিই একটা দিশা দেখা গেল। কয়েক শতাব্দীর অত্যাচার ও অবহেলার পর এবার যেন তারা এক বন্ধু পেল ভারতের নতুন সংরক্ষণ নীতিতে। কিন্তু লড়াইয়ের তো সবে শুরু। বাঘেদের জন্য পথ কখনই কুসুমাস্তীর্ন ছিল না।খুব দ্রুতই নতুন এই আশার আলো নিভে এল। ১৯৮৪ সালে যখন ইন্দিরা নিহত হলেন আততায়ীর হাতে, তখনও বাঘেদের সংখ্যা বাড়ছিল। কিন্তু ৮০'র দশেকের শেষ দিকে আবার তারা ভারতের বন থেকে মিলিয়ে যেতে লাগল।


প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন


এই শতাব্দীতে বাঘেদের হালহকিকৎ


২০০৫ সালে ভারতের বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের এক বিশেষ টাস্ক ফোর্স Joining The Dots নামে একটি রিপোর্ট পেশ করল ভারতের বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পগুলির পরিস্হিতি নিয়ে।তাতে যে ছবি উঠে এল ভারতের বাঘ সংরক্ষণের হাল নিয়ে তা সত্যিই উদ্বেগজনক। বাঘেদের অবস্হা যে বেশ সঙ্গীন তা স্পষ্ট হল। বাসস্হানের অভাব, চোরাশিকার, প্রতিহিংসা বশত: হত্যা এবং সর্বাঙ্গীন উদাসীনতা বাঘেদের সংখ্যা কমানোর পিছনে যথেষ্ট ছিল। রিপোর্টটিতে উল্লেখ করা হল, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে সহযোগীতার অভাব, অর্থনেতিক অপব্যবহার, ভুল স্হানান্তরন নীতি এবং সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগের অভাব- সব মিলিয়ে বাঘ সংরক্ষণকে খাদের কিনারায় এনে দাড় করিয়েছে।

আর একটা আকস্মিক খারাপ খবরে দেশ জুড়ে হইচই পড়ে গেল যখন Wildlife Institute of India (WII)'র ২০০৫ সালের মার্চের একটা রিপোর্টে জানা গেল যে, সরিস্কা টাইগার রিজার্ভে কোন বাঘই নেই, যেখানে আগে নাকি ২৪-২৫ টি বাঘ ছিল। সি বি আই তদন্ত বসল। জানা গেল যে, ২০০২ সালের জুলাই থেকে সেখানকার বাঘেদের নির্বিচারে চোরাশিকার করা হয়েছে। এই হত্যার ঘটনা ধামাচাপা পড়ার কথায় ভারতের বাঘেদের করুণ অবস্হার কথা সবার গোচরে এল। প্রশ্ন উঠে গেল 'প্রোজেক্ট টাইগার' এর কার্যকারিতা নিয়ে। এটা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটা নিদারুণ শিক্ষা ছিল। কিন্তু সময়ও হাতে বেশি ছিল না। দ্রুত ভারতের বাঘেদের রক্ষা করার জন্য কিছু করার দরকার হয়ে পড়েছিল।

প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এবং Tiger Task Force এর সুপারিশে National Tiger Conservation Authority (NTCA) গঠন করা হল ২০০৫ সালের ডিসেম্বারে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী মনমোহন সিং এর উদ্যোগে এর গঠন হল এবং এই সংস্হাকে দায়িত্ব দেওয়া হল প্রজেক্ট টাইগার ও ভারতের সব টাইগার রিজার্ভের সুষ্ঠ পরিচালনার জন্য।


নতুন শতাব্দীর তারকার সম্মান



ছবি: matrishva vyas


NTCA এর সঠিক পরিচালনায় বিভিন্ন কঠিন বাঁধাকে পার করে একবিংশ শতাব্দীতে বাঘেরা টিকে রইল দ্রুত পরিবর্তনশীল এই পৃথিবীতে। বাঘেদের ভারতে বর্তমান হালহকিকৎ জানতে আমরা কথা বলেছিলাম ড: অনীশ অন্ধেরিয়ার সাথে যিনি শুধু বাঘ বিশেষজ্ঞই নন, বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির সম্পর্ক নিয়েও যিনি অগাধ জ্ঞান রাখেন। তিনি একাধারে Wildlife Conservation Trust, India এর সভাপতি, আবার NTCA, মহারাষ্ট্র ও কাশ্মীরের State Board of Wildlife এর সদস্য।

" এই শতাব্দীর প্রথম দশকটায় বাঘ সংরক্ষন বাঘ সংরক্ষণের বিষয়টা নানারকম বাধায় পড়ে একেবার চোরাগলিতে চলে গেছিল।" ড:অন্ধেরিয়া বললেন। বাধাগুলোর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেন যে, " আসলে ২০০৬ সাল অবধি আমাদের কাছে বাঘেদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে তেমন তথ্য ছিল না। তাই বুঝতে পারছিলাম না যে, কত বাঘকে আমরা রক্ষা করতে পেরেছি আর কত সংখ্যায় তাদের হারিয়েছি। বিভিন্ন টাইগার রিজার্ভের সংরক্ষণের নিয়ম কানুনও আলাদা ছিল। বাফার জোন থাকলেও, তার কোন সঠিক সূচিত অবস্হান ছিল না। চোরাশিকার তো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে ব্যাপক আকারে হত, এমনকি কোথাও কোথাও বনের ভিতরেও। অন্যান্য দেশে সহজেই বাঘেদের চোরাশিকার বা পোচিং করার পরে, এবার মাফিয়ারা ভারতের দিকে নজর দিয়েছিল। যথাযথ ক্ষতিপূরণের তেমন ব্যবস্হা ছিল না ফসল বা গবাদি পশু নষ্ট হলে। ফলে বনের কাছাকাছি থাকা লোকেরা বাঘ ও অন্যান্য বন্যজীবকে প্রতিহিংসা বশত: হত্যা করত প্রায়ই। বাঘেদের জন্য খাদ্য- এমন প্রাণীর সংখ্যাও অনেক বনাঞ্চলে বা তার আশেপাশের এলাকায় কম ছিল।"

ড: অন্ধেরিয়ার দেওয়া এত সব তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে বাঘ সংরক্ষণ এই একবিংশ শতাব্দীতে দাড়িয়ে কোন মুখের কথা নয়। ২০০৬ সালে প্রথমবার ক্যামেরা ট্র্যাপিং এর মাধ্যমে যে ব্যাপক বাঘ সুমারির ব্যবস্হা নেওয়া হয় তাতে বাঘের সংখ্যা ধরা পড়ে ১,৪১১। এই পরিসংখ্যান দেশে কাঁপুনি ধরিয়ে দেবার মত, যেখানে বাঘকে জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসাবে তুলে ধরা হয়।

ট্র্যাপ ক্যামেরা

তবে, দেশের একটা বড় অংশের সংকল্প এবার বেশ শক্ত ছিল। সংবাদমাধ্যমে এই ১,৪১১ সংখ্যাটা ঝড় তুলল। ভারতের সবদিক থেকে বাঘেদের বাঁচানোর জন্য আওয়াজ উঠতে থাকল। সরকার ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরাও আগের থেকে সক্রিয় হয়ে উঠল। বাঘ এখন সবার চোখে তারকা, সম্মানের প্রতীক যেন। সব মিলিয়ে বাঘ সংরক্ষণের ব্যবস্হা মজবুত হল আগের থেকে। তাদের সংখ্যাও বাড়তে থাকল। সারা ভারতের বাঘ গণনায় ২০১০, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংখ্যাটা এসে দাড়াল ১৭০৬, ২২২৬ ও ২৯৬৭ তে। ভারতের দিকে উচ্ছসিত প্রশংসার ঢেউ ভেসে এল।

কিন্তু ঠিক কী কী কারণ ছিল এই বাঘের সংখ্যা বাড়ার পিছনে? পরের পর্বে আমরা ড:অন্ধেরিয়ার থেকে শুনব সেই নিয়ে।

(চলবে)








লেখক পরিচিতি: ড: ঐশিমায়া সেন নাগ বায়োকেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট। বর্তমানে বন্যপ্রাণ ও সংরক্ষণের কাজে নিবেদিত। কানাডা থেকে প্রকাশিত শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট worldatlas এর অন্যতম সম্পাদক। বর্তমানে বাংলা ওয়েবজিন 'বনে-পাহাড়ে'র সহ-সম্পাদিকার দায়িত্বেও তিনি যুক্ত।




প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

153 views0 comments
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG