top of page
KANHA MAY 26.jpg

পরিবর্তিত কলকাতা, বিপন্ন প্রবীণ স্বাস্থ্য

  • ..
  • Jul 21
  • 7 min read

AQI সূচক। বাতাসে দূষণের পরিমাপ বুঝতে ব্যবহৃত এই কথাটি এখন বহুল প্রচলিত। কারণ কলকাতা সহ ভারতের বহু শহরের দূষণের অবস্থা সারা পৃথিবীতে সব থেকে খারাপের দিকে। এর প্রভাব কেমন পড়তে পারে বয়স্ক, প্রবীণ মানুষদের স্বাস্থ্যের উপর? কেমনই বা প্রভাব বর্দ্ধিত নগরায়নের তাদের জীবনযাত্রার উপরে? প্রবীণদের চিকিৎসায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছেন ডা: ধীরেশ চৌধুরী





সকালের আলো সদ্য ফুটেছে অথবা বিকেলে সূর্যাস্তের আগে মৃদু রোদের ছটা - একসময় এই সময় গুলোতে আমাদের কলকাতা শহরের অলিগলি, পার্ক, লেকের ধারে কিংবা গঙ্গার পাড়ে অসংখ্য প্রবীণের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত। হাতে লাঠি, কারও সঙ্গে গল্প করতে করতে হাঁটা, কোথাও আবার পার্কের বেঞ্চে বসে খবরের কাগজ পড়া কিংবা পুরোনো দিনের নস্টালজিয়া—এ যেন ছিল কলকাতার এক স্বতন্ত্র নাগরিক সংস্কৃতি। আজ সেই দৃশ্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। 

একজন জেরিয়াট্রিক কমিউনিটি চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রবীণদের বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি, আজকের প্রবীণদের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলি শুধুমাত্র কেবল উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ কিংবা ডিমেনশিয়া ইত্যাদি দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলিই নয়। বর্তমানে তাঁদের সুস্থতার অন্যতম বড় শত্রু হয়ে উঠছে এই পরিবর্তিত নগর পরিবেশ।

আমরা চিকিৎসকেরা প্রেসক্রিপশনে ওষুধ লিখি, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শ দিই, নিয়মিত হাঁটার কথা বলি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একজন বয়স্ক মানুষ যদি নিরাপদে হাঁটার রাস্তা না পান, যদি চারপাশের বাতাস দূষিত হয়, যদি প্রতিটি রাস্তার প্রতিটি মোড়ে গাড়ির বা বাইকের চড়া হর্নের শব্দের আক্রমণ হয়, যদি সামান্য বসার জন্য একটি বেঞ্চও না পায়, তাহলে সেই পরামর্শ কতটা কার্যকর হবে?

আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজ আমাদের শহরকে নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার।

শহর বদলায়, সাথে মানুষের মনও বদলে যায়:

আমাদের কাছে শহর মানে রাস্তা, উড়ালপুল, বহুতল, প্রায় প্রতিদিন গজিয়ে ওঠা নতুন মল। কিন্তু একজন প্রবীণের কাছে শহর মানে কিন্তু এসবের বাইরে আরও অনেক কিছু। এসবে তাঁরা একবিন্দুও মনের আরাম খুঁজে পায়না।

একটি পুরোনো গাছ, পাড়ার পার্ক, প্রতিদিনের চেনা চায়ের দোকান, গলির মোড়, প্রতিবেশীর সঙ্গে কুশল বিনিময় কিংবা মর্নিং কিংবা ইভিনিং ওয়াকের পরিচিত মুখগুলো—এসবই একজন বয়স্ক মানুষের জীবনের অংশ। অথচ সেইগুলোই অধরা। 

হোম ভিজিটে গিয়ে বহু প্রবীণ মানুষকে বলতে শুনেছি —

"ডাক্তারবাবু, আমাদের পাড়াটাকে আর চিনি না।" বা "আগে হাঁটতে বের হতাম, এখন বেরোতে ভয় লাগে।" আজকাল আর একটা পাখি দেখিনা, চড়ুই পর্যন্ত হারিয়ে গেছে।" কিংবা "সবুজটাই যেন হারিয়ে গেল।" এই কথাগুলো নিছক কিন্তু নস্টালজিয়া নয়। এগুলো দ্রুত পরিবর্তিত নগরজীবনের স্বাস্থ্যগত অভিঘাতের ভাষা।

হাঁটার অধিকার কি তবে হারিয়ে যাচ্ছে?

জেরিয়াট্রিক চিকিৎসায় আমরা প্রায়ই বলি - Walking is the best medicine for ageing.

নিয়মিত হাঁটা হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, পেশির শক্তি বজায় রাখে, ভারসাম্য উন্নত করে, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়, ঘুম ভালো করে এবং স্মৃতিশক্তি দীর্ঘদিন সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।

কিন্তু কলকাতার বেশিরভাগ এলাকায় বয়স্কদের হাঁটা আজ আর সহজ নয়। দখল হয়ে যাওয়া ফুটপাত, বায়ু দূষণ, শব্দের তীব্রতা ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অসমান রাস্তা, দ্রুতগতির যানবাহন, নিরাপদ জেব্রা ক্রসিংয়ের অভাব এবং পার্কের স্বল্পতা প্রবীণদের ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে আটকে দিচ্ছে। যার দরুন প্রবীণদের মধ্যে বাড়ছে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক অসুস্থতা। আর যার দরুণ শুধু পেশিশক্তি কমে তাই নয়; বরং এটি একাকীত্ব, বিষণ্নতা, পড়ে যাওয়া এবং দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা হারানোর অন্যতম কারণ। তার সাথে বেঁচে থাকার আনন্দ বা মানে হারিয়ে ফেলা। 


দূষণ: এক নীরব ঘাতক

কলকাতার দূষিত বাতাসে প্রবীণদের শ্বাস: যেন প্রতিদিনের এক অসম লড়াই - 

"একসময় যে শহরের সকালের বাতাসে প্রাণের স্পর্শ ছিল, আজ সেই বাতাসই অনেক প্রবীণের কাছে নিঃশ্বাস কেড়ে নেওয়ার নীরব অস্ত্র হয়ে উঠেছে।"

জেরিয়াট্রিক চিকিৎসক হিসেবে গত কয়েক বছর ধরে আমার যে পরিবর্তনটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে, তা হলো প্রবীণদের মধ্যে শ্বাসকষ্টের রোগীর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা। বিশেষ করে শীতকালে, ঋতু পরিবর্তনের সময় বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে গেলে প্রতিদিনই নতুন করে COPD, হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, ফুসফুসের সংক্রমণ এবং অক্সিজেনের ঘাটতি নিয়ে বহু প্রবীণ চিকিৎসার জন্য আসেন এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা অনেক গুণ বেড়ে যায়। 

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এদের অনেকেই কখনও ধূমপান করেননি। তবুও তাঁদের ফুসফুস আজ ক্ষতবিক্ষত। প্রশ্ন জাগে—তাহলে দোষী কে?

উত্তর একটাই— দূষিত বাতাস। এই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই অর্থে অনালোচিত বিষয়টি উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত অ্যাসোসিয়েশন অফ চেস্ট ফিজিশিয়ান আয়োজিত সম্মেলনে। এই নিয়ে অতি সম্প্রতি টাইমস অফ ইন্ডিয়া সংবাদ পত্রে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। 

কিন্তু কেন প্রবীণরা বেশি ঝুঁকিতে?

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফুসফুসের স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়। শ্বাসনালীর প্রতিরোধ ক্ষমতাও হ্রাস পায়। ফলে বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম কণা (PM₂.₅ ও PM₁₀), নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (NO₂), ওজোন (O₃) এবং অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাস সহজেই ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে প্রদাহ সৃষ্টি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বায়ুদূষণ কেবল হাঁপানি বা COPD-ই বাড়ায় না; এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং ডিমেনশিয়া সহ কগনিটিভ ডিকলাইন এর ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। প্রবীণ ও পূর্ব থেকেই হৃদ্‌রোগ বা শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার।

কলকাতার বাস্তব হাল:

কলকাতা একসময় তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন বায়ুর জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলো, বর্জ্য পোড়ানো এবং শিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত দূষণের ফলে পরিস্থিতি বদলেছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, PM₂.₅-এর পাশাপাশি NO₂ ও ওজোনও এখন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে, যা শ্বাসযন্ত্রের রোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। কলকাতার Air Quality Index (AQI) সাধারণত ঘোরাফেরা করে 80 থেকে 130 অর্থাৎ "সহনীয় থেকে নিম্নমানের" এবং অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো আমাদের এই প্রিয় শহর সারা পৃথিবীতে বায়ু দূষণে র ক্ষেত্রে প্রথম তিনটি শহরের একটি। কলকাতা শহরের এই উদ্বেগ জনক বিষয় আলোকপাত হয়েছে SwichOn Foundation, IQ Air ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রদত্ত বিভিন্ন তথ্যাদিতে।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কি বলছে?

এসমস্ত পরিসংখ্যানের বাইরে আরও একটি বাস্তবতা আছে, যা প্রতিদিন দেখি, অনুভব করি যখন

একজন ৭৮ বছরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন—

"ডাক্তারবাবু, আগে প্রতিদিন সকালে হাঁটতাম। এখন পাঁচ মিনিট হাঁটলেই হাঁপিয়ে যাই।"

একজন ৮০ বছরের বৃদ্ধা, যিনি কোনও দিন ধূমপান করেননি, গত দুই বছরে তিনবার COPD-এর তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

যখন শ্বাস কষ্টের আরেকজন প্রবীণ রোগী ভীত হয়ে শীত পড়ার শুরুতেই বলেন —

"ডাক্তার বাবু এবার বুঝি হাসপাতালে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।"

এই কথাগুলো কেবল ওই বয়স্ক মানুষ গুলোর ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; এগুলো এই শহরের বিরুদ্ধে এক নীরব পুঞ্জীভূত অভিমান।

শুধু COPD নয়, বাড়ছে আরও সমস্যা: 

দূষিত বাতাসের প্রভাবে প্রবীণদের মধ্যে আরও যে সমস্যাগুলো বাড়তে দেখা যাচ্ছে—

* দীর্ঘস্থায়ী কাশি

* হাঁপানির তীব্রতা বৃদ্ধি

* বারবার নিউমোনিয়া

* অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া

* ইন্টারস্টিশিয়াল ফুসফুসের রোগের অবনতি

* হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা বৃদ্ধি

আর একই সঙ্গে প্রবীণদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।

আমরা কী করতে পারি?

একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি প্রবীণদের বলবো —

* সম্ভব হলে Air Quality Index (AQI) https://www.aqi.in/in/dashboard/india/west-bengal/kolkata দেখে বাইরে বেরোন।

* দূষণ বেশি থাকলে সকালের হাঁটা এড়িয়ে চলুন।

* প্রয়োজনে মানসম্মত N95 মাস্ক ব্যবহার করুন।

* নিয়মিত এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ইনহেলার ব্যবহার করুন।

* ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোকক্কাল টিকা নিন।

* বাড়ির ভেতরের বাতাসও পরিষ্কার রাখুন। কারণ এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ 

তবে WHO স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সাময়িক সমাধান; দীর্ঘমেয়াদে বায়ুদূষণ কমানোর জন্য নীতিগত ও সামাজিক উদ্যোগই সবচেয়ে কার্যকর। তার জন্য একটা অন্যতম সহজ উপায় হলো প্রাইভেট গাড়ির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে আইনের আওতায় আনা, গণ পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় করা। প্রাইভেট হোক বা পাবলিক সমস্ত গাড়ির নিয়মিত পলিউশন সার্টিফিকেট পরীক্ষা। প্রয়োজনে ইচ্ছুক এনজিও দের এই কাজে নিযুক্ত করা। ছাত্রছাত্রীদের কে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলা। এবং সচেতনতা মূলক পদক্ষেপ। 

জেরিয়াট্রিক চিকিৎসক হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত হলো, যখন একজন প্রবীণ বলেন—

"ডাক্তারবাবু, আমরা কি আর কোনওদিন স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারব?"

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ওষুধে নেই, ইনহেলারে নেই, নেবুলাইজারের প্রেসক্রিপশনে নেই। এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের শহরের বাতাসে।


সারা পৃথিবীর সাথে সাথে ভারত দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। আগামী দুই দশকে প্রবীণ জনগোষ্ঠী প্রায় দ্বিগুণ হবে। পশ্চিমবঙ্গ ইতিমধ্যেই দেশের অন্যতম বার্ধক্য প্রবণ রাজ্য। অর্থাৎ আজ যে শহর আমরা গড়ছি, আগামীকাল সেই শহরেই আমরাও প্রবীণ হব। তাই প্রবীণ-বান্ধব শহর তৈরি করা তাই কোনো বিশেষ সুবিধা প্রদান নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য দূরদর্শী বিনিয়োগ।

ফলাফল?

অনেক প্রবীণই নিজে থেকেই বাড়ির বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দেন।

আর তখন শুরু হয় আর-একটি সমস্যা— সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।

এই শহরে প্রবীণদের সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করতে হলে শুধু হাসপাতাল বাড়ালেই হবে না; দূষণ মুক্ত পরিষ্কার বাতাসকেও চিকিৎসার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

শব্দেরও কিন্তু অসুখ আছে

বায়ুদূষণের মতো শব্দদূষণকেও আমরা এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না।

অবিরাম হর্ন, নির্মাণকাজ, যানজট এবং শহুরে কোলাহল শুধু বিরক্তির কারণ নয়; এটি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, উদ্বেগ বাড়ায়, রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে। শুধু কি তাই এই প্রজন্মের বেশির ভাগই কানে হিয়ারিং ঢুকিয়ে রাখায় কথাবার্তা, টিভি শোনা, মিউজিক শোনা সবই এখন এত উচ্চ আওয়াজে শোনা হচ্ছে যে এগুলোও প্রবীণদের এখন বিড়ম্বনা ও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত প্রবীণদের ক্ষেত্রে এই শব্দজনিত চাপ আরও বেশি বিভ্রান্তি ও আচরণগত সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন

চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সবুজ পরিবেশ মানুষের শরীর ও মনের ওপর ওষুধের মতোই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। গাছ, খোলা আকাশ, সকালের রোদ, খোলা মাঠের ধারে কিছুটা সময় কিংবা পাখির ডাক—এসব মানুষের মানসিক চাপ কমায়, উদ্বেগ হ্রাস করে, স্মৃতিকে উদ্দীপিত করে এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক অনুভূতি ফিরিয়ে আনে। প্রবীণদের কাছে তাই একটি পার্ক বিলাসিতা নয়। একটি বেঞ্চ শুধু বসার জায়গা নয়। একটু ছায়া শুধু আরাম নয়। এর থেকে অনেক বেশি  এগুলো তাঁদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবকাঠামো।




কলকাতা কি তবে প্রবীণ-বান্ধব হতে পারে?

আমার উত্তর— অবশ্যই পারে।

বরং এই শহরের ঐতিহ্য, পাড়াকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, নাগরিক অংশগ্রহণ, সহমর্মী মনোভাব, প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সকলের দায়বদ্ধতা আর শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাস কলকাতাকে ভারতের অন্যতম আদর্শ প্রবীণ-বান্ধব শহরে পরিণত করার সম্ভাবনা নিশ্চিত তৈরি করে।

কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা যাতে একই সাথে অংশীদারিত্বে থাকবে সরকার, বেসরকারি উদ্যোগ, বিভিন্ন চেম্বার অফ কমার্স, ইচ্ছুক এনজিও ও অবশ্যই জনসাধারণ। 

প্রতিটি ওয়ার্ডে Senior Friendly Zone, নিরাপদ ও দখলমুক্ত ফুটপাত, Morning/Evening Walk Corridor, প্রবীণ বান্ধব পার্ক, বসার পর্যাপ্ত বেঞ্চ, পানীয় জলের ব্যবস্থা, পরিষ্কার ও প্রবীণ উপযোগী শৌচাগার, হুইলচেয়ার-উপযোগী গণপরিবহণ, আপদকালীন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, এবং প্রবীণদের সামাজিক অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং কলকাতা পুলিশের প্রণাম এর মতন উদ্যোগ কে আরও শক্তিশালী ও উন্নত করা, যার মাধ্যমে নিশ্চিত হবে প্রবীণ বান্ধব শহরের স্বপ্ন।

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে "Senior-Friendly Tourism" —যেখানে প্রবীণরা শহরের ঐতিহ্য, নদীতীর, জাদুঘর, উদ্যান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো সহজে ঘুরে দেখতে পারবেন সুরক্ষিত ভাবে, স্বাচ্ছন্দ্যে। 

কারণ অবসর মানে জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং নতুনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ।

এটি শুধু প্রবীণদের প্রশ্ন নয়

সারা পৃথিবীর সাথে সাথে ভারত দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। আগামী দুই দশকে প্রবীণ জনগোষ্ঠী প্রায় দ্বিগুণ হবে। পশ্চিমবঙ্গ ইতিমধ্যেই দেশের অন্যতম বার্ধক্য প্রবণ রাজ্য। অর্থাৎ আজ যে শহর আমরা গড়ছি, আগামীকাল সেই শহরেই আমরাও প্রবীণ হব। তাই প্রবীণ-বান্ধব শহর তৈরি করা তাই কোনো বিশেষ সুবিধা প্রদান নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য দূরদর্শী বিনিয়োগ।

প্রবীণ বান্ধব শহর গড়ার আসল দর্শন রয়েছে এই কথাটিতে: "If you design for the young, you exclude the old, but if you design for the old, you include everyone."

রবি ঠাকুরের একটা উপলব্ধি আছে শহর নিয়ে। তাঁরই কথায় - "শহরের এই একটা দোষ, এখানে মানুষ মানুষকে বড়ো বেশি ঘেঁষে থাকে, অথচ মাঝখানে মস্ত একটা ব্যবধান।"— (চিঠিপত্র / 'ছিন্নপত্র')। চলুন সকলে মিলে সেই ব্যবধানটা ঘুচিয়ে ফেলি...



লেখক জেরিয়াট্রিক চিকিৎসক ও সমাজকর্মী। ফাউন্ডার ডিরেক্টর, বাঁচবো হিলিং টাচ ফাউন্ডেশন।


Comments


Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
 

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page