top of page
  • ..

রইলাম প্রতীক্ষায়: কানহা সফর বৃত্তান্ত, পর্ব ২

মধ্য ভারত তো বটেই, গোটা দেশের অন্যতম সেরা অরণ্য ও টাইগার রিজার্ভ হল কানহা। হাঁলো ও বানজার নদীর মাঝে অবস্থিত এই অরণ্যের ভ্রমণকাহিনী, বাঘদর্শনের গল্প লিখলেন প্রতীক মহাপাত্র। আজ দ্বিতীয় পর্ব।



সন্ধ্যেবেলার ক্যাম্পফায়ারের আসরে জমলো সারাদিনের সফর ফিরে দেখার ইতিবৃত্ত। বিশেষ করে জমতো বাঘের গল্প। কিন্তু কানহা মানেই তো শুধু বাঘ নয়। অরণ্য মানেই প্রাণের অসীম স্পন্দন, যা প্রতিনিয়ত আমাদের হাতছানি দিয়ে নীরবে ডেকে চলেছে। কেউ সাড়া দিচ্ছি, কেউ বা বুঝেই উঠতে পারছিনা সেই আবেদন। মধ্যপ্রদেশের অন্যতম পরিচিতি, এক আইকনিক স্পিসিসের দেখা পেতে অরণ্যপ্রাণপ্রেমীরা বছরের নানান সময়ে ক্যামেরা বাগিয়ে, একরাশ উৎসাহ বুকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছে এখানে। আর সেই অমোঘ প্রজাতি হলো হার্ড-গ্রাউণ্ড বারাশিঙ্গা (Rucervus devaucelli branderi)। ভারতের উত্তর-পূর্বাংশের ইস্টার্ন বারাশিঙ্গা (Reucervus decaucelli ranjitsinhii) হলো সবচেয়ে বড় উপপ্রজাতি। আর সবচেয়ে ছোট হলো ওয়েটল্যাণ্ড বারাশিঙ্গা (Rucervus devaucelli devaucelli)। অসম, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং হিমাচল প্রদেশ – এই চারটি রাজ্যে মোট পাঁচটি স্থানিক উপবিভাগ বা population-এ বারাশিঙ্গার তিনটি উপপ্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়। আমরা যাদের সন্ধানে বেরিয়েছি, সেই হার্ড-গ্রাউণ্ড বারাশিঙ্গার দেখা মিলত এতদিন কেবলমাত্র কানহায়। এখন সাতপুরা এবং বান্ধবগড়ে যথাক্রমে ২০১৬ এবং ২০২৩-এ এদের বন্য পরিবেশে কানহা থেকে নিয়ে এসে উন্মুক্ত করা হয়েছে। International Union of Conservation of Nature বা IUCN-এর Red Data Book-এর তালিকায় বারাশিঙ্গার অবস্থান 'Vulnerable' পর্যায়ে, যা থেকে আমরা তাদের সার্বিক সংরক্ষণের পরিস্থিতিগত দিকের একটি আভাস পাই।



পরের দিন আমাদের সাফারি ছিল কানহা জোনে — সকাল-বিকেল, পর পর। শীতের ভোরের নরম আলোয় স্নাত সোনালী তৃণপ্রান্তরে যখন পৌঁছলাম, তখন সবে পর্যটকদের আনাগোনা আরম্ভ হয়েছে। একজোড়া বারাশিঙ্গা দম্পতি – হরিণ ও হরিণী ছাড়া আর একটিও প্রাণী নেই কাছাকাছি। আমাদের এই ছোট্ট টিমে প্রত্যেকের দায়িত্বের জায়গা ছিল ভীষণ সুসংহত। প্রতিদিনই ভোর পৌনে পাঁচটা নাগাদ আমি সবার ঘুম ভাঙাতাম। দীপকদা ফ্রেশ হয়ে এগিয়ে যেতেন জিপসি বুকিং পর্ব ঠিকঠাক রয়েছে কি না, সেই তদারকিতে। কিরণ ম্যাম, বালাজী স্যার আমি আমাদের ক্যামেরা ও ব্যাগপত্রসহ সমস্ত জিনিস গুছিয়ে মোটামুটি আগামী তিনঘন্টার কিছু অমোঘ অনুভূতির আমন্ত্রণে বেরিয়ে পড়তাম।

বালাজী স্যারের কাছ থেকে আমার একটি শিক্ষণীয় বিষয় ওঁর সফর পরিকল্পনার মুনসিয়ানা। কোন জোনে কখন গেলে সম্ভাব্য কী কী দেখা যেতে পারে, সেই বিষয়ে অনেক আগে থেকেই যাবতীয় হোমওয়ার্ক সেরে রাখতেন তিনি। বারাশিঙ্গা দর্শনের ব্যাপারেও তার ব্যতিক্রম ঘটলো না। কানহার অন্দরের অন্যতম ঐশ্বর্য বারাশিঙ্গা – একথা আমাদের অনেকেরই সম্যকভাবে জানা। কিন্তু ভারতের জঙ্গল মানেই শুধু বাঘ নয়, বাঘের পাশাপাশি অন্যান্য আরণ্যকদেরও যে সমান গুরুত্ব আরোপ করা উচিত, সেই নৈতিক দায়িত্বের দিকটি যেন কোথাও আরও একবার প্রতিফলিত হলো।



হিন্দি শব্দ 'বারাশিঙ্গা'-র জনপ্রিয় হয়ে ওঠা মূলত দু'টি কারণে বলে ধরা হয়। প্রথমত, পুরুষ বারাশিঙ্গার শিং বা antler-এর প্রতিটিতে অন্তত ছ'টি করে শাখা (tines) থাকে সাধারণত। ফলে দু'টি শিং মিলিয়ে মোট বারোটি শাখা। অন্য কারণটি হলো পুরুষ বারাশিঙ্গা শীতে এই সময়ে তাদের মিলনকালে (rutting season) যে তীব্র ডাকের বাতাবরণে তৃণপ্রান্তর ভরিয়ে তোলে, তার সম্মিলিত আওয়াজ অন্তত বারোটি শিঙের (মহিষের শিং দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ অসমীয়া বাদ্যযন্ত্র) মতন শোনায়। প্রখ্যাত সংরক্ষণবিদ বিলি অর্জন সিং দুধওয়া টাইগার রিজার্ভের উপকণ্ঠে তাঁর টাইগার হ্যাভেনে (Tiger Haven) থাকাকালীন শেষ বয়সে চাইতেন যে তাঁর গাড়ির হর্নের আওয়াজ হোক বারাশিঙ্গার তীব্র স্বরের রেকর্ড। এক সহজ, অনাবিল চাওয়া। আমরা কানহা'তে একাধিকবার এই প্রণয়গীতির সাক্ষী হয়েছি এই সফরের দরুণ।



বর্ষায় ঘন সবুজ আস্তরণে ছেয়ে যাওয়া অরণ্যে বারাশিঙ্গার ঘন কমলা রঙের বর্ণচ্ছটা দেখতে না পেলেও শীতের সোনালি ঘাসবনের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বারাশিঙ্গা পরিবারের নানান মুহূর্ত আমাদের কাছে এসে ধরা দিল। ২০১৮-র ১৪ জানুয়ারি ছিল আমাদের সফরের দ্বিতীয় দিন। আর এদিনের সাফারির দু'টি শিফটেই আমরা বারাশিঙ্গা অবলোকনের মনস্থির করেছিলাম। তবে অন্যান্য আরণ্যকেরা দৃষ্টি এড়ায়নি। গাইডদের মধ্যে চাপা স্বরে আলাপচারিতা শুনছিলাম, কাছাকাছি এক বাঘিনী কিছুক্ষণ আগেই চিতল হরিণ শিকার করেছে। সেই সংহার পর্ব দেখেছেন এবং লেন্সবন্দী করেছেন অনেকেই। ভাগ্যের কী পরিহাস! বাঘের সন্ধানে বেরিয়ে তার দেখা না পেলে এক শ্রেণির বনপাগলেরা ব্যর্থ মনোরথ মনে করেন নিজেদের, আর আমরা বারাশিঙ্গা-অবলোকনের মধ্যেই এরকম রোমহর্ষক একটি খবর পেলাম! ত্রস্ত চিতল আর সম্বরের সাবধানবাণীর সূত্র ধরে শেষে প্রতীক্ষার অবসান! ঘড়ির কাঁটা বিকেল সাড়ে চারটে পেরিয়েছে।

ছোটি মাদা বা বাবাথেঙ্গা ফিমেল (আমাদের আগের দিনে সফরের খ্যাতনামা বাঘিনী ধোয়াঝাণ্ডি ফিমেলের মা) একটি কমবয়সী হরিণী'কে শিকার করেছে! তার গলায় কামড় দিয়ে শাবকদের কাছে নিয়ে যাচ্ছে একপ্রকার নৈশভোজের আয়োজনের জন্য। রিসর্টে ফেরার আগে এ হেন দৃশ্য দেখার পর কোথাও সুপ্ত আশাবাদ আরও বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের ড্রাইভার কৈলাশ খেরওয়ার এবং গাইড ঝামসিং যাদব জানালেন যে তাঁরা অন্যান্য গাইডদের সাথে একটু আগেই বার্তালাপের দরুণ জানতে পারেন যে কানহা'র বিখ্যাত বাঘ মুন্না (KTR T-17) কানহাঘাট নামের একটি জায়গায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। কানহা আসার আগেই খবর পেয়েছিলাম যে সুপখার ফিমেলের এলাকায় ঢুকে ক'দিন আগেই তার দুই শাবকদের মধ্যে একটিকে মেরে ফেলে মুন্না। মার্জারগোষ্ঠীর নৃশংস রেওয়াজ শিশুহত্যা বা infanticide। ফলত, সুপখার ফিমেলের সাথে তার লড়াই বাধে ও বয়সের ভারে জর্জরিত মুন্না'কে (তখন তার বয়স হয়েছিল প্রায় পনেরো বছর) পিছু হঠতে হয়। সেই লড়াইয়ের বেশ কিছু বেদনাদায়ক স্মারক রয়ে গিয়েছিল মুন্নার শরীরে। বিশেষত সামনের ডান পায়ের আর থাবার জখম ছিল মারাত্মক। তারই চিকিৎসার জন্য সমবেত হন বনকর্মীরা।



সূর্যের আলো স্তিমিত হয়ে আসতে তখন বড়জোর আর আধ ঘন্টা বাকি। জিপসির লম্বা লাইনের মধ্যে ভিড়ে গিয়ে দূরবীণে চোখ রেখে ক্রমাগত খুঁজতে থাকলাম কানহা'র এই প্রবীণ শার্দুল'কে। অনেকেই ঈশারা মারফৎ বোঝালেন যে তাঁরা দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু অতি কষ্ট করে তার কানের পেছনের দু'টি সাদা চিহ্ন আর লেজের প্রান্ত ছাড়া পুরোপুরি মুন্নার দর্শন পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হলো না। আমাদের গাড়ির অনতিদূরেই ছিল মুন্নার চিকিৎসার জন্যে আসা টিমের গাড়ি। নেতৃত্বে একজন আধিকারিক আর. ভি. পাঠক। তাঁর কাছ থেকে আমরা একটু আগেই যে লড়াইয়ের কথা আলোচনা করছিলাম, তার বিশদ বৃত্তান্ত সম্পর্কে জানতে পারি। ডি. এস. এল. আর.-এর স্ক্রিনে তিনি মুন্না'কে অ্যান্টিবায়োটিক ডোজ দেওয়ার খুব সংক্ষিপ্ত একটি রেকর্ডিং-ও দেখান। তাঁর ক্যামেরার মনিটর থেকে আমি নিজের ক্যামেরায় মুন্নার রাজকীয়ভাবে বসে থাকার একটি স্ক্রিনশটও নিয়ে রাখলাম।

নানান ছবি দেখাতে গিয়ে আমাদের চোখে পড়লো কিছু অনভিপ্রেত ছবি। আমরা এখানে এসে পৌঁছনোর আগের দিন সঙ্গম মেল নামের একটি অতিকায় বাঘের সাথে সাম্রাজ্য ও শাবকদের প্রতিরক্ষার জন্যে লড়াইয়ে প্রাণ হারায় কানহা'র সবচেয়ে বয়স্কা বাঘিনী বুদবুদি ফিমেল। গায়ের ডোরাকাটার মাঝেই কিছু জায়গায় জলের বুদবুদ বা bubbles-এর মতন চিহ্ন থাকায় এই নামকরণ। কানহা'র বুক থেকে তাকে হারানো এবং তার ময়না তদন্তের ছবিগুলি এভাবে দেখার অনুভব সত্যিই হৃদয়বিদারক!

(চলবে)


ছবি: লেখক




লেখক পরিচিতি: লেখক পেশাগতভাবে শিক্ষক এবং ইংরেজি সাহিত্যের গবেষণার আধারে সম্পৃক্ত। বন্যপ্রাণ তাঁর অন্যতম ভালোবাসার জায়গা। অরণ্যধর্মী কাজ হিসেবে তিনি স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে প্রকৃতি সচেতনতামূলক শিবিরের এবং তথ্যচিত্রভিত্তিক নিবন্ধ রচনার সাথে যুক্ত বনেপাহাড়ের সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য।




85 views0 comments

Commentaires


Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG
bottom of page