top of page
  • ..

শিকারের ইতিবৃত্ত ও পূর্ব-মধ্য ভারতের অরণ্যে বন্যপ্রাণ

বর্তমানে দেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাস নিয়ে যে ক'জন উল্লেখযোগ্য গবেষণা করছেন, তাদের মধ্যে একজন রাজা কাজমি। প্রখ্যাত কনজার্ভেশনিস্ট ও পালামৌ টাইগার রিজার্ভের প্রাক্তন অধিকর্তা এস ই এইচ কাজমির পুত্র হওয়ায় ছোট থেকেই তিনি দেখেছেন ঝাড়খন্ডে বন সংরক্ষণের কাজে কতরকমের সমস্যা আমলতান্ত্রিক দিক থেকে, তার সাথে উগ্রপন্থার উপদ্রবে। তাঁর গবেষণা ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় তিনি ভারতের একটি বিরাট অংশের অরণ্যে সংরক্ষণের সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করেছেন এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে যা আগে Seminar পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এবার বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য বাংলা ভাষায় তুলে ধরা হল। আজ প্রথম পর্ব।



" ওইখান থেকে বাঘ গর্জন করে ওঠে", তাঁর কোটাম গ্রামের পাহাড়েরউপরে ঘন জঙ্গলের দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন সুরজনাথ সিং- যিনি খারোয়ার আদিবাসী সম্প্রদায়ের একজন পাহান অর্থাৎপুরোহিত। গ্রামটি ঝাড়খন্ডের পশ্চিমে ১১২৯.৯৩ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ছড়ানো পালামৌ টাইগার রিজার্ভে অবস্থিত। তিনি বললেন, "বাঘের গর্জন একটা অশুভ লক্ষণ। এর মানে হল কেশরা চন্ডী আমাদের উপরে ক্ষুব্ধ এবং আমাদের উপরে ভয়ানক কোন দুর্ভাগ্য নেমে আসতে চলেছে।এমন হলে আমরা পাহাড়ের উপরে যাই কোন ছাগল বা মোষের বাচ্চাকে পাহাড়েরউপরে গুহা-মন্দিরে বেঁধে রেখে আসি।চন্ডীর কাছে প্রার্থনা করি তাঁকে শান্ত হতে আর নেমে আসি।যদি বাঘে ওই বাঁধা জন্তুটিকে খেয়ে নেয়, আর কোন গর্জন না করে, বুঝতে পারি যে চন্ডী আমাদের বলি গ্রহণ করেছেন"। বাঘাহুত যার বাহন, সেই কেশরা চন্ডী হলেন কেশরা পাহাড়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, যে পাহাড় আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে পালামৌ অরণ্যের মধ্যিখানে।

পালামৌ: আদিবাসী জীবন

কিন্তু কেশরা পাহাড় নি:স্তব্ধ অনেকদিন ধরেই। "বাঘ আর গর্জন করেনা ঝাড়খন্ডে এবংভারতের অন্যতম পুরানো টাইগার রিজার্ভ পালামৌতে All India Tiger Estimation (AITE) এর ২০১৮-র রিপোর্ট অনুযায়ী"...বলছে একটি জাতীয় সংবাদপত্রের শিরোনাম।

"কিন্তু এখন কী অবস্থা? বাঘ তো অনেকদিনই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে মনে হয় এইসব অরণ্য থেকে", আমার পাহান বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম। " তারা হয়ত অন্তর্ধানে আছেন, তারা নিশ্চই সেখানে কোথাও আছেন।" তারপর একটু ভেবে বললেন যে, "বাঘই না থাকলে তাকে কি আর অরণ্য মানা যায়"।

বিশিষ্ট নৃতত্ববিদ রেমন্ড হামেসের মতে,"মানুষের মধ্যে সংরক্ষণ নিয়ে ভাবনা আছে, কিন্তু সংরক্ষণ নিয়ে কিছু করছে না- তবে তাকে প্রকৃতি সংরক্ষক বলা যাবে না। একজন শিকারি তার শিকার করার হরিণটি নিয়ে কী ভাবছে এবং তার ধর্ম তার সেই ভাবনার কী রসদ জুগিয়েছে সেটা মনোস্তাত্বিকভাবে ভাল প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু শিকারি শেষমেষ হরিণটিকে কী করল সেটাই বড় কথা এখানে।" তাই আমার সেই পুরোহিত বন্ধু বাঘের বিষয়ে ভাবলেও, এই শিকারী প্রাণী ও আরো বেশি করে তার শিকার করা প্রাণীরা এই এলাকায় যথেচ্ছ শিকার হয়ে এসেছে মানুষের হাতে। বাঘ ও অন্য বন্যজীবেরা ওতোপ্রতো ভাবে জড়িয়ে আদিবাসীদের কিংবদন্তি, বিশ্বাস, উপকথার সাথে। পালামৌর ব্যাপারটাও আলাদা নয়।পালামৌ সামাজিক ও পরিবেশগতভাবে পূর্ব-মধ্যভারত, বিশেষত ঝাড়খন্ডের একটি ক্ষুদ্র মহাবিশ্ব।

পূর্ব-মধ্যভারতের ভূ-প্রকৃতির মধ্যে পড়ছে পূর্ব উত্তরপ্রদেশের অরণ্য (মির্জাপুর, চান্দৌলি,শোনভদ্র জেলা), দক্ষিণ বিহারের অরণ্য(কইমুর/ভাবুয়া, রোহতাস, ঔরঙ্গাবাদ, গয়া, নওয়াদা, জামুই ও মুঙ্গের জেলা), ছোটনাগপুর মালভূমি(ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম দিকের জেলাগুলি), ওড়িশা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্রের গাড়চিরোলি, উত্তর তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গল, আদিলাবাদ, খাম্মাম আর আদিলাবাদ জেলা এবং উত্তর-পূর্ব অন্ধ্রের কিছু জেলা। এইসব রাজ্যের সীমানা জুড়ে বড় অরণ্যের বিস্তার। এসব জায়গা একসময় বিখ্যাত ছিল বাঘ ও অন্যান্য জন্তুর জন্য। বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের বিশিষ্ট বৈচিত্র নিয়ে ছড়িয়ে ও মিলেমিশে রয়েছে এই ভূ-ভাগে। তপশিলি উপজাতিদের মধ্যে ঝাড়খন্ডে ৩২টি, ছত্তিশগড়ে ৪২টি, ওড়িশায় ৬২ টি ও তেলেঙ্গানায় ৩২টি রয়েছে।

এই ভূ-ভাগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে জল, জঙ্গল, জমিকে ঘিরে সংঘর্ষের।ঝাড়খন্ড রাজ্য গঠনের এই স্লোগান এখনও ধ্বণিত হয় ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, ওড়িশার বিভিন্ন অংশে। যদিও এই বিতর্কে জল জঙ্গল জমিনের সাথে জানোয়ারের বিষয়টি স্পষ্টতই অনুপস্থিত থাকে। এই অনুল্লেখটা দুর্ভাগ্যের কারণ, শেষ না হওয়া এই জল জঙ্গল জমিনের লড়াইয়ের কালে অনেক অনেক প্রজাতি প্রাণীজগৎ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা হতে চলেছে।

মাথার ওপর ছাতার মত খাদ্যশৃঙ্খলে বাঘের অবস্থান তাকে বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থের জন্য একটি বড় সূচক হিসাবে গণ্য করা হয়। বাঘের সংখ্যা এই পূর্ব-মধ্য ভারতের অরণ্যে দ্রুত কমেছে ১৯৭২ সালে হওয়া প্রথম গণনার পরে। ২০১৮ এর বাঘের সংখ্যা গণনা একেবারে বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিল। ঝাড়খন্ড থেকে কার্যত বিলুপ্ত বাঘেরা, ওড়িশা আর ছত্তিশগড় থেকে প্রায়-নিশ্চিহ্ন। সরিস্কা বা পান্নায় যেমন স্থানীয় বিলুপ্তি হয়েছিল চোরাশিকারের জন্য , এক্ষেত্রে এইসব রাজ্যে যেভাবে বাঘ ও অন্যান্য শিকারী প্রাণী সহ বড় অংশের তৃণভোজী প্রাণীদের যে বিলুপ্তি ঘটল সম্পূর্ণভাবে তা নিয়ে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, জীববিজ্ঞানী ও সংবাদমাধ্যমে তেমন কোন আলোড়ন হল না। তার সাথে মানুষের অধিকারের দাবিতে যে আন্দোলন তাতেও অবহেলিত থেকে গেছে সেই জীবজন্তুর কথা যা তাদের সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে, বাস্তুতন্ত্রের সাথে তো বটেই।

এই নীরবতাকে প্রশ্ন করতে হবে। আরো বেশি করে এই কারণে যে গত তিন দশকে সামাজিক স্তরে বন সংরক্ষণকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আর এই নিয়ে বেশ আলোচনাও হচ্ছে। কিছু সমাজকর্মী তো এই সব আদিবাসী সম্প্রদায়কে ‘natural conservationists’, ‘born conservationists’, ‘best conservationists’ ,‘natural protectors of wildlife’ বলে অভিহিত করছেন। কিন্তু তারা কি আদৌ বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল!

বন্য জীব ও বন হল ভারতের এই অংশে ছড়িয়ে থাকা আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে খুঁজে পাওয়া সাধারণ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। এই দুটির মধ্যে বনই অবশ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে। কারণ তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ছাড়াও, অরণ্য তাদের অর্থনীতির কেন্দ্রে। অরণ্যে তারা গবাদি পশু চড়ায়, জলের যোগান দেয়, তেন্দু আর মহুয়ার মত সামগ্রীর জোগান দেয়। খাদ্য নিরাপত্তা আর ভেজষ ঔষধের জন্যও তারা অরণ্যের উপর নির্ভরশীল। শেষে বলতে হয় এটা তাদের বিনোদনের স্থানও বটে, অর্থাৎ শিকারের জায়গা। অন্যদিকে বন্যপ্রানী বিশেষত বাঘেরা তাদের সম্প্রদায়ের উৎপত্তির গল্পকথার সাথে জড়িয়ে।বিভিন্ন জীবজন্তুকে টোটেম বা প্রতীক হিসাবে ব্যবহারে এক একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। এই সাংস্কৃতিক সংযোগ ও ঐতিহাসিকভাবে একই স্থানে বসবাসের নিদর্শন এমন ধারনার জন্ম দেয় যে এই মানুষে-পশুতে সহাবস্থানই হয়ত স্বাভাবিক।

ছত্তিশগড়: জঙ্গলের গভীরে থাকা গ্রাম

কিন্তু আমরা কি এই সহাবস্থানের সাথে সংরক্ষণকে মিলিয়ে ফেলতে পারি? এই সরলীকরন প্রকৃত বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। বিগত দশকগুলোয় উন্নয়ন কর্মকান্ডের ফলে প্রত্যন্ত সম্প্রদায়গুলির জীবনযাত্রায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। এক জায়গায় থিতু হয়ে বসবাস আর কৃষিকাজ থেকে পাঁঠা বা মুরগীর মাংস এসেছে জীবনে শিকার করার পরিবর্তে। গ্রাম সমাজের সাথে বাইরের বাজারের একাত্মতা বেড়েছে সড়ক যোগাযোগের উন্নতির সাথে, মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের সাথে, দূরদর্শন, বিদ্যুতের সুবিধার সাথে আর তরুণদের দূর-দূরান্তে কাজ করতে যাবার সাথে সাথে। এর সাথে সাথে, বস্তুগত সুবিধার জন্য আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি যে সম্পর্ক বজায় রেখেছে এখনও অরণ্যের সাথে, তবে বন্যপ্রাণীদের সাথে উপযোগী সম্পর্ক আর তারা অনুভব করেন না আগের মত।

১৯৭২ সালে যখন বন্যপ্রাণী আইন এসে বন্যপ্রাণী শিকার ও তার শরীরের অংশ নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিল তার আগে অবধি তাও বন্যপ্রাণীর একটা উপযোগিতা ছিল আদিবাসীদের মধ্যে, যদিও তা অরণ্যের উপযোগিতার থেকে বেশি নয় কখনই। তখন এই ব্রয়লার মুরগি বা পাঁঠার যোগান অপ্রতুল ছিল, বরং মাংসের যোগান আসত বনের শিকার করা পশু থেকে। বন্যপ্রাণীর দেহাংশ বেচেও রোজগার হত। অনেক বনবাসী 'বিটার' বা শিকারে সাহায্যকারী হিসাবে কাজ করতেন শহুরে শিকারিদের জন্য।কিন্তু ১৯৭২ এর পর আদিবাসীদের একাংশ বন্যপ্রাণীর প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন বা বিতৃষ্ণও হয়ে যায়।

এই বিতৃষ্ণা মূলত: জন্মায় বন সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইন ও বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে তাদের ধারনা থেকে (বিশেষত সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টির জন্য) যার জন্য অবাধে বনে প্রবেশ করা নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, ফলে বন থেকে প্রয়োজনের জিনিস সংগ্রহ করা তাদের জন্য অসুবিধাজনক হয়ে যায়। বনের পথে তাদের যাতায়াত বাধাপ্রাপ্ত হয়, ব্যহত হয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ সুবিধাগুলো পাওয়া। এছাড়া বন্যজীবের থেকে প্রাণ ও সম্পত্তিহানির বিষয়টি রয়েছেই।

স্বাধীনতার পরবর্তী যে সংরক্ষণ আইন যা বন ও ভূমির অধিকারে বাধাস্বরূপ, তাকে ব্রিটিশ যুগের বন সংরক্ষণ আইনেরই অনুরূপ বলে মনে করা হয়।অনেক আদিবাসীই বন্যজীবকে তাদের বন ও জীবিকায় সরকারি হস্তক্ষেপের প্রতীক রূপে দেখতে থাকে। একজন ঝাড়খন্ডের বনরক্ষী আমায় একবার বলেছিলেন, " আমরা যখন হাতি তাড়তে যাই তখন এই লোকরা বলে যে, 'নিজেদের' হাতি নিয়ে যাও আমাদের গ্রাম-ক্ষেত থেকে। জল জঙ্গল জমি ওদের, কিন্তু হাতি হয়ে গেল বনবিভাগের!"

বিভিন্ন বন ও নাগরিক বিভাগের প্রতি এই যে গভীর বিতৃষ্ণা তার ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে এখানে পরিচয় সত্ত্বা, জমি ও অরণ্যের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন বিদ্রোহে স্বাধীনতার আগে ও পরে। এর থেকেই অংশত বোঝা যায় দেশের এই অংশেই মাওবাদিরা কিভাবে শিকড় বিস্তার করেছিল যা অন্যত্র বনাঞ্চলে করতে পারেনি।

এই আলোচনায় অবশ্যই আসবে শিকারের কথা যা আদিবাসী সংস্কৃতির একটা অংশ।বন্যপ্রাণীদের শিকারকে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়- একটা হল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রথাগত শিকার আরে একটা হল সারা বছর মাংসের জন্য শিকার।সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রথাগত শিকার সাধারণত: শুরু হয় বসন্তকালে অথবা কখনও ফসল ওঠার পরের উদযাপন হিসাবে। এই ধরনের শিকার উৎসবের সময়, হাজার হাজার আদিবাসী সম্প্রদায়ের পুরুষেরা অরণ্যে যান শিকারের জন্য।যেমন সিংভূম ও পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাংশ মিলে সাতটি বনবিভাগে এক লাখ বা তার বেশি শিকারী ছড়িয়ে পড়েন এই সময়ে। এই ধরনের সম্প্রদায়গত শিকার এক একটা গোষ্ঠীর সমাজ সংস্কৃতির অংশ।

সাঁওতালরা পালন করেন 'দিশম সেন্দ্রা' (সেন্দ্রার অর্থ শিকার করা ঝাড়খন্ড জুড়ে প্রচলিত সব আদিবাসী ভাষায়), অন্যদিকে মুন্ডা ও ওঁরাওরা পালন করেন 'ফাগু-সেন্দ্রা'। 'বিশু-শিকার' বলে যে দলবদ্ধ শিকার হয় দলমা পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গে তা তো প্রায়ই খবরে আসে। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার সিমলিপাল অরণ্যের "অখন্ড শিকার' ও জানা। বস্তার ও গড়চিরোলির 'কেধ/কেধকুল' আর 'পরধা' নামে শিকার উৎসবগুলি পালন করে যথাক্রমে দারোয়া এবং মুরিয়া, মারিয়া,ভাটরাস, পরজাস সম্প্রদায়। তেমনি কোন্দাদোরা ও খন্দরা অন্ধ্রপ্রদেশের ভিজিয়ানাগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় একটি শিকার উৎসব পালন করে যার নাম- 'ইতিকা পোঙ্গল'।

এই ভূ-ভাগের অন্য যেসব আদিবাসী গোষ্ঠীর নিজস্ব শিকার উৎসব আছে তারা হল, বীরহোর, বোনদো, গাদাবা, জুয়াঙ, ভূঞাঁ। এইসব গোষ্ঠীগত শিকারের সংখ্যা ও তাদের সময়কাল পরিবর্তিত হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, অনেকগুলি 'কোধ' আর 'পরধা' হয়ে থাকে বস্তারে প্রতি বছর।

একটা সময় এই শিকার উৎসব গুলির নিজস্ব নিয়ম ছিল, সময়ের সাথে যা হারাতে বসেছে। এখন এইসব শিকার উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে 'যা পারো শিকার কর', অর্থাৎ অপরিণামদর্শীর মত বন্যপ্রাণী নিধন যেখানে সংখ্যা বা কাকে মারা হচ্ছে সেটা কোন বিষয় নয়-পাখি হোক বা স্তন্যপায়ী, সাধারণ কোন প্রজাতি হোক বা বিলুপ্তপ্রায়, পুরুষ অথবা স্ত্রী পশু, কম বয়সী বা প্রাপ্তবয়স্ক জন্তু। এই ধরনের শিকার ব্যাপক আকার নিয়েছিল বস্তারে।E. Rooke ১৯০৮ সালে Bombay Natural History Society-র অপ্রকাশিত পান্ডুলিপিতে লিখে গেছেন, "সুকমা জমিদারিতে একবার ১৯টি বাইসন বা ইন্ডিয়ান গাউর জালে ধরা পড়ে যাদের গোটা দলটাকেই হত্যা করা হয়।"

১৯৫৭-৫৮ সালে এই শিকার উৎসবের বিপর্যয়কর ঘটনাবলীর বর্ণনা দিয়ে গেছেন ডি.জি,শর্মা নামক বনবিভাগের অফিসার- " অনেকগুলি গ্রাম একত্রিত হয়ে হাকা বিটিং করে অথবা জঙ্গলে আগুন দিয়ে দেয় আর জাল বা ফাঁদ পেতে রাখে জানোয়ারদের পালানোর পথে...অনকে বন্য জন্তু ধরা পড়ে ও মারা যায়। কোন নিয়ম এক্ষেত্রে সংখ্যা, লিঙ্গ, বনের আইনি সুরক্ষা বা মারার পদ্ধতির ক্ষেত্রে মানা হয় না। তীর-ধনুক, বল্লম, কুঠার, ফসল রক্ষার জন্য দেওয়া গাদা বন্দুক ব্যবহার করে সব রকমের প্রাণী শিকার করা হয়, কাউকে ছাড়া হয় না। এমনকি বাঘ, বাইসন, বুনো মোষ, প্যান্থার, ভাল্লুকও শিকার হয়।অনেক সময় আহত অবস্থায় বাঘ পালিয়ে যায় ও নরখাদক হয়ে পড়ে, সে এক ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি করে।পরধা শিকারে এইসব দক্ষ শিকারীদের শিকারের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়।"

ষাটের দশকের মাঝামাঝি বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী জর্জ শ্যালার যিনি বস্তারে ক্ষেত্রসমীক্ষা (fieldwork) করছিলেন , তিনি লেখেন, "পশ্চিম বস্তার জেলায় আদিবাসীদের নির্বিচারে শিকার একটা বড় অংশে বন্যপ্রাণীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে এমনকি বাঁদরও দেখা যায় না"।

নিয়মের আরো একটি বড় ব্যতয় হল যে কোন ব্যক্তির এইসব শিকারে এখন অংশ নিয়ে ফেলা, তারা সেই আদিবাসী গোষ্ঠীর সদস্য হোক বা না হোক, স্থানীয় হোক বা বহিরাগত। এমনকি অনাদিবাসী, শহুরে লোকজন কাছাকাছি বা দূরের শহর থেকে- এমনকি ৫০০-৭০০ কিলোমিটার যাত্রা করে এসে এইসব শিকারে অংশ নিচ্ছে (বিশেষত: সেন্দ্রা ও অখন্ড শিকারে)।

শিকার হওয়া বনবিড়াল। ছবি: সৌম্যদীপ মন্ডল, পরিবেশকর্মী।

বর্তমানে সময়ে সবার জন্য উন্মুক্ত, যা ইচ্ছা মারো তেমন শিকারের উদাহরণ হল বাৎসরিক যে সেন্দ্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে দলমা পাহাড় সংক্রান্ত অরণ্যে এবং পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পশ্চিম ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলায়। স্বল্প সময়ের ২-৩ দিনের এই শিকারে দলমা পাহাড় ও পূর্ব সিংভূম, সরাইকেলা-খারসোয়ানের সন্নিহিত জঙ্গলে ৪০,০০০-৫০,০০০ শিকারীকে জড়ো হতে দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গে ৪৫ দিন ধরে চলা দীর্ঘতর শিকার উৎসবে ৫০,০০০-৬০,০০০ শিকারী অংশগ্রহন করে।

২০১৮ এ এমন এক সেন্দ্রার ঝুলিতে ভরে উঠেছিল একটি বাঘ (বিগত একশ বছরে প্রথম বার) থেকে বনের পাখির ডিম, নেকড়ে থেকে শিয়াল, বন বিড়ালের বাচ্চা থেকে তাদের মা, ভাম বা সিভেট, বন্য বরাহ,হরিণের বিভিন্ন প্রজাতি(এমনকি শিশুও) থেকে সাধারণ সব পাখি বাচ্চা সহ।

শিকার হওয়া ভাম বিড়াল (small indian civet)। ছবি: সৌম্যদীপ মন্ডল, পরিবেশকর্মী।

যা কিছু খাওয়া যায় শিকার হয়ে যায়। পূর্ব-মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় এমন শিকার চলে।বিভিন্ন বন্যপ্রাণী আইন ও Forest Rights Act অনুযায়ী নিষিদ্ধ ও বেআইনি হলেও বনদপ্তর এই শিকার আটকাতে অক্ষম, যেহেতু যথেষ্ট ক্ষমতা ও লোকবল তাদের নেই যাতে এত বড় সংখ্যায় শিকারীর প্রবেশ সেখানে আটকানো যায়। বস্তার বা দক্ষিণ ওড়িশার এলাকাগুলিতে মাওবাদিদের প্রভাবে বনদপ্তর অস্তিত্বহীন।

(ক্রমশ)


Footnotes:


1. R. Hames, ‘Wildlife Conservation in Tribal Societies’, in Biodiversity: Culture, Conservation, and Ecodevelopment. Westview Press, Boulder, Colorado, 1991, pp. 172-99.


2. R.S. Chundawat, The Rise and Fall of the Emerald Tigers: Ten Years of Research in Panna National Park. Speaking Tiger Publishing, New Delhi, 2018.


3. G. Shahabuddin, Conservation at the Crossroads. Permanent Black, Ranikhet, 2010.


4. Ashish Kothari, Neema Pathak, R.V. Anuradha and Bansuri Taneja (eds.), Communities and Conservation: Natural Resource Management in South and Central Asia. Sage Publications and Unesco, New Delhi, 1998.


5. https://www.survivalinternational.org/articles/3462-tigerconservationists


6. E. Rooke, Wild Animals and Birds of Bastar. Unpublished manuscript in files of Bombay Natural History Society. Bombay, 1908.


7. D. Sharma, ‘Parad or Butchery of Wild Life in Bastar’, Indian Forester 84(6), 1958, pp. 350-353.


8. G.B. Schaller, The Deer and the Tiger: A Study of Wildlife in India. University of Chicago Press, Chicago,1967, p. 101.


9. https://www.conservationindia.org/articles/hunting-festivals-of-west-bengal-an-untold-story-of-wildlife-massacre


10. Kent Redford, ‘The Empty Forest’, BioScience 42(6), 1992, pp. 412-422.


11. Schaller, op. cit., p. 101.


12. Madhu Ramnath, Woodsmoke and Leafcups: Autobiographical Footnotes to the Anthropology of the Durwa People. HarperCollins/Litmus, Delhi, 2015.


13. S.P. Shahi, Backs to the Wall: Saga of Wildlife in Bihar, India. Affiliated East-West Press, India, 1977.


** প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।


Copyright :Seminar Publications, Delhi


লেখক পরিচিতি: লেখক পরিচিতি: রাজা কাজমি একজন সংরক্ষন বিশেষজ্ঞ, বন্যপ্রাণীর ইতিহাস নিয়ে গবেষক, লেখক।




79 views0 comments
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG
bottom of page