top of page
  • ..

সোনালি সুতোর খোঁজে বক্সার জঙ্গলে

বনে-জঙ্গলে গেলে আমাদের চোখে পড়ে, গাছ থেকে ঝুলতে দেখা যায় তাদের। এমন এক মাকড়সাকে নিয়ে আলোচনায় পূজা চক্রবর্তী ঘোষ


ছবি: Srikaanth Sekar/flickr

পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা টাইগার রিসার্ভ একটি অতি পরিচিত নাম। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই টাইগার রিসার্ভ জৈববৈচিত্র্যে ভরপুর। বক্সার জঙ্গল আর্দ্র মিশ্র পর্ণমোচী ফরেস্ট এবং সাভানা জাতীয় ফরেস্টের সমন্বয়ে তৈরি। এখনও পর্যন্ত ৪৫০ টিরও বেশি প্রজাতির গাছ, ২৫০ টি প্রজাতির গুল্ম, ৪০০ প্রজাতির ওষধি, ১৫০ টি প্রজাতির অর্কিড, ১০০ টি প্রজাতির ঘাস এবং ১৩০ টি প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ সহ ৭০ টিরও বেশি সেজস (Cyperaceae) সনাক্ত করা হয়েছে। অন্যান্য একবীজপত্রী এবং ফার্ন এর ১৬০ টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। এছাড়া এখানে ২৮৪ টি প্রজাতির পাখি, ৭৩ টি প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪১ টি সরীসৃপ প্রজাতি এবং ৪ টি প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে।


বক্সা জাতীয় উদ্যানের মধ্যে বক্সা দুর্গ নামে একটি পুরনো দুর্গ আছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৬০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই দুর্গটিতে ব্রিটিশ যুগে একবার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। এই দুর্গটিতে পৌঁছানোর জন্য প্রায় ২ কিমি রাস্তা ট্রেক করতে হয়। এই ট্রেকিং পথে দেখা মেলে অজস্র নাম না জানা প্রজাপতির আর তার সঙ্গে প্রতি পদক্ষেপেই দেখা মেলে এক বিশেষ প্রজাতির মাকড়সার। এই মাকড়সাটির কমন নেম জায়ান্ট উড স্পাইডার (Giant Wood Spider) যা বিখ্যাত তার সোনালি বর্ণের জালের জন্য। ভারতে পাওয়া বৃহৎ আকারের মাকড়সাগুলির মধ্যে একটি। এর বিজ্ঞানসম্ম নাম Nephila pilipes । গোত্র Araneidae।


ছবি: কৌস্তভ চক্রবর্তী


যে কোন প্রজাতির মাকড়সার মতই এদেরও স্ত্রী মাকড়শারা পুরুষদের তুলনায় আকারে অনেকটা বড় হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী মাকড়সা প্রায় ৩০-৫০ মিমি পর্যন্ত লম্বা হয়। সেখানে পুরুষরা মাত্র ৫-৬ মিমি আকারের হয়। পুরুষ মাকড়সা নারীর জালে ক্লেপ্টোপ্যারাসিটিক জীবনযাপন করে, অর্থাৎ পুরুষ মাকড়সা নারীর জাল থেকে খাবার চুরি করে। স্ত্রী মাকড়সাদের উদর বাদামী বর্ণের হয় এবং তার ওপর হলুদ স্ট্রাইপ দেখা যায়। পা গুলি বেশ লম্বা হয়। স্ত্রী মাকড়সাদের এই উজ্জ্বল বাদামী ও হলুদ গাত্রবর্ণ শিকারদের আকর্ষণ করতে সাহায্য করে। এদের বোনা জালগুলি সূর্যের আলোয় সোনালী সুতোর মত চকচক করে। Carotenoids, Xanthurenic acid এবং Quinones-এর উপস্থিতি জালের এই উজ্জ্বল রঙের জন্য দায়ী। এদের জালের এই রঙ দ্বৈত ভূমিকা পালন করে। উজ্জ্বল সূর্যালোকে যখন জালটি থাকে তখন মৌমাছিরা এই হলুদ সুতোগুলির প্রতি আকৃষ্ট হয়। আবার যখন ছায়াময় স্থানে এই জালগুলি থাকে তখন গাছপালার সাথে এই রঙ ভালভাবে ক্যামোফ্লেজ করে থাকে।


ছবি: কৌস্তভ চক্রবর্তী

জায়ান্ট উড স্পাইডার (Giant Wood Spider) তাদের প্রয়োজনমত পারিপার্শ্বিক রঙের সাথে তাদের জালের রঙের তীব্রতা পরিবর্তন করতে সক্ষম। পূর্ণাঙ্গ মাকড়শারা জালের বুনন করে। জাল যত পুরনো হয় তত এর চটচটে ভাব কমতে থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের তফাতে তারা এই জালের কিছু অংশ ভক্ষণ করে এবং তারপর পুনর্বার বুনন করে। বড় আকৃতির স্ত্রী মাকড়সাদের প্রতি পূর্ণাঙ্গ পুরুষ মাকড়শা গুলি আকৃষ্ট হয়। পুরুষদের মধ্যে ছোট আকৃতির মাকড়সাগুলি দ্রুতগতির জন্য স্ত্রীর কাছে আগে গিয়ে পৌঁছায়। একাধিক পুরুষ একটি স্ত্রী মাকড়সার সাথে মিলিত হয়। তবে এই প্রজাতির মাকড়সাদের মধ্যে sexual cannibalism সাধারণত দেখা যায় না। যখন কোন বয়স্ক স্ত্রী মাকড়সা অপেক্ষাকৃত বড় আকৃতির পুরুষের সাথে মিলিত হয় তখন তাদের মধ্যে cannibalism-এর প্রবৃত্তি দেখা যায়।


ছবি: flickr


একটি পরিণত স্ত্রী ৩০০-৩০০০ ডিম উৎপাদন করতে পারে। ডিম পরিস্ফুটনের পর অপরিণত মাকড়সা গুলি ৭-১২ বার খোলস ত্যাগ করে পুরনাঙ্গ মাকড়সায় রুপান্তরিত হয়। এই মাকড়সা গুলি বিষাক্ত হয়। এদের নিউরোটক্সিক বিষ এদের শিকারের ওপর কার্যকারী হলেও মানুষের ওপর এর কোনোরূপ প্রভাব নেই। এরা সাধারণত মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে।

Giant wood spider উৎপাদিত এই সোনালি বর্ণের সিল্ককে কাজে লাগিয়ে বস্ত্র উৎপাদনের চেষ্টা হয়েছিল কিন্তু তা অর্থনৈতিক ভাবে উপযোগী হয়নি। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে মৎস্যজীবীরা মাকড়সার এই জাল সংগ্রহ করে বলের আকৃতি গড়ে জলে নিক্ষেপ করে যা মাছ ধরার টোপ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

তবে এই সিল্কের একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবহার পাওয়া গেছে টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ক্ষেত্রে। এই সিল্ককে scaffold করে স্নায়ুকোষের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে। এই বিষয়ে আরও গবেষণা ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।


লেখক পরিচিতিঃ পূজা চক্রবর্তী ঘোষ সহকারী শিক্ষিকা, ভ্রমনপিপাসু ও ভ্রমন-লেখিকা।

Comments


Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG
bottom of page