• ..

গাছেদের সেতু দিয়ে মিলল রেলপথ দিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া হুলক গিবনরা

ব্রিটিশ যুগে তৈরি রেলপথ আলাদা করে দিয়েছিল অসমের হোলঙ্গাপার হুলক গিবন অভয়ারণ্যের হুলক গিবনদের। তাদের জোড়া লাগাল গাছেদের তৈরি সেতু। কিভাবে বনকর্মী, সংরক্ষণবিদদের প্রচেষ্টা রূপ পেল বাস্তবের তা নিয়ে লিখলেন অনুরাগ বরুয়া


একটা একাকী হুলক গিবন ডাল থেকে ডালে লাফাচ্ছে এবং তারপর একটা বড় ঝাঁপ দিচ্ছে রেললাইনের এপার থেকে ওপারে, যে রেললাইন তার বনের আবাসগৃহকে দু'ভাগে ভাগ করে চলে গেছে।

এটা সত্যিই একটা ভাল খবর, একরাশ আশায় ভরা লাফ পশ্চিমা হলক গিবন(Hoolock hoolock)দে'র জন্য, যাদের বাস অসমের হোলঙ্গাপার হুলক গিবন অভয়ারণ্যে।


হোলঙ্গাপার হুলক গিবন অভয়ারণ্যে একটি মহিলা হুলক গিবন। ছবি: Miraj Hussain/ Wikimedia Commons (CC BY-SA 4.0)

হুলক গিবনরা হল ভারতের একমাত্র এপ (ape) জাতীয় প্রাণী। এরা সাধারণত: মাটিতে থাকার চেয়ে গাছের ডালে ডালে থাকতেই পছন্দ করে। তাই তাদের আবাসস্হলের মধ্যে দিয়ে রেললাইন চলে যাওয়া মানে একপ্রকার খাদ তৈরি হয়ে যাওয়া। এমনিতেই গত ৪০ বছরে তাদের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ৯০% এর মত উত্তর-পূর্ব ভারত ও মায়ানমারে বন কেটে কৃষিজমি বাড়ার সাথে সাথে। এদের সংখ্যা এখন আনুমানিক ৩,০০০।

এই রেললাইন সেই ব্রিটিশ যুগে তৈরি যা এই অভয়ারণ্যকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে_ ছোট একটি ৩৭০ একরের এবং অপরটি ৪,৮২০ একরের। ৩ টি গিবন পরিবার ছোট অংশটিতে বাস করে বড় বনাঞ্চলের ২৩টি পরিবারের থেকে আলাদা হয়ে - এটি ২০০৬ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়। সেই গিবনরাই অবশেষে রেলপথ অতিক্রম করতে শুরু করল ১৫ বছরের চেষ্টায় রেলপথ বরাবর রোপণ করা গাছেদের ডালের তৈরি করা ছাউনি ব্যবহার করে।

এই প্রচেষ্টা শুরু হয় সেই ২০০৪-০৬ সাল থেকে স্থানীয় বন্যপ্রাণ সংস্থা আরণ্যকের প্রস্তাব মেনে যাতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় জোরহাট জেলার বনবিভাগ ও U.S. Fish and Wildlife Service’s Great Ape Conservation Fund সংস্থা। ২০০৬ সাল থেকে স্থানীয় বাসিন্দা ও বনবিভাগের সহযোগিতায় আরণ্যক রেলপথের দু'ধার বরাবর শুরু করে প্রায় ৩০০০ গাছের চারা রোপণ করা। ৭১টি এমন প্রজাতি বেছে নেওয়া হয় যারা গিবনদের বাসস্থান ও খাদ্যের সংস্থানে সহায়তা করে। আরণ্যকের মেরুদণ্ডী প্রাণী গবেষণা বিভাগের প্রধান শ্রী দিলীপ ছেত্রী বলেন, " এত বছর ধরে গাছগুলি বেড়ে উঠে অবশেষে রেলপথের উপর ছাউনি তৈরি করেছে"।


একটি পুরুষ হুলক গিবন। ছবি: Miraj Hussain/ Wikimedia Commons(CC BY-SA 4.0)

প্রথম কিছু এই গাছেদের ক্যানপি বা ছাউনি ধরে যাতায়াত চোখে পড়ে ২০১৯ সালে বলে জানালেন হোলঙ্গাপার হুলক গিবন অভয়ারণ্যের বনরক্ষী হেমন্ত ভুঞাঁ।" এই বছরে এই যাতায়াত তো বেড়েছেই" গর্বের সাথে দেখালেন তিনি একটি ঝকঝকে রেকর্ড বুক। " এই বছরের জানুয়ারি থেকে অনেক বার ওদের পারাপার করতে দেখা গেছে"।

দিলীপ ছেত্রী বলেন, " একক পুরুষ গিবনদের ছোট থেকে বড় অংশে আবার উল্টোপথেও যেতে আসতে দেখা গেছে"।

প্রথম কিছু যোগাযোগ ও পারাপার যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেহেতু গিবনরা বহুগামী নয়, তাই পরিবারের মধ্যে তাদের প্রজনন হয় না- তাই ছোট এলাকায় গিবনদের প্রজননে সমস্যা হচ্ছিল। কমে যাচ্ছিল তাদের সংখ্যা। তাদের এলাকায় খাদ্যেরও অভাব দেখা দিয়েছিল।


পুরুষ হুলক গিবনের সেই লাফ। ভিডিও: Mongabay



"এবছরে এপ্রিল মাসে একটি চার সদস্যের গিবন পরিবার ছোট বনাঞ্চল থেকে বড় অংশে পার করে যায়, যেটা সত্যিই একটা ভাল খবর", ছেত্রী জানালেন। "এছাড়াও আরও অনেক রকম প্রজাতি যেমন capped langur, rhesus macaque এবং বড় কাঠবিড়ালিরাও এখন এই প্রাকৃতিক সেতু ব্যবহার করে রেলপথ পারাপার করছে।"

এই সাফল্য সংরক্ষণ কর্মীদের উৎসাহিত করছে তাদের এই কাজ আর এগিয়ে নিয়ে যেতে। " আমরা এই বৃক্ষরোপণ আরও এগিয়ে নিয়ে যাব, যাতে এমন আরও প্রাকৃতিক সেতু বানানো যেতে পারে যা গিবন সহ অন্যান্য প্রাণীরাও ব্যবহার করবে," ছেত্রী বললেন।


রেলপথের কাছাকাছি বাড়ন্ত গাছ নিয়ে কিছু সমস্যাও দেখা দেয়। অনেক সময় রেলকর্মীরা গাছ বা চারা কেটে ফেলে রেলপথকে ট্রেন চলাচলের জন্য পরিষ্কার রাখতে। তবে বনকর্মী ভুঞাঁ জানালেন, বন বিভাগ যথেষ্ট চেষ্টা চালাচ্ছে এই ব্যবস্থা এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং রেল দপ্তরও এগিয়ে আসছে।

"কখন কখনও ঝড়বৃষ্টির পর রাতের বেলাতেও আমাদের দেখতে আসতে হয় যে গাছ পড়ে রেলপথ আটকে গেছে কিনা," ভুঞাঁর বক্তব্য।" রেল বিভাগকেও এমন সমস্যায় পড়তে হয়, তবে আমরা একে অপরকে সাহায্যের চেষ্টা করি। সবকিছুর পরেও, এই গিবনদের ব্যাপারে আমরা আবেগপ্রবণ"।



মূল প্রবন্ধটি Mongabay পত্রিকায় প্রকাশিত। ইংলিশ প্রবন্ধটির অনুমতিক্রমে অনুবাদ করা হল বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য। মূল প্রবন্ধটির লিঙ্ক: https://news.mongabay.com/2021/10/a-bridge-of-trees-reunites-gibbons-separated-by-a-railway-line-in-india/


অনুবাদ: সুমন্ত ভট্টাচার্য্য।

127 views0 comments
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG