আমরা যখন ঘুমিয়ে, কাণ্ড চলছে জমিয়ে
- ..
- 3 hours ago
- 10 min read
প্রতি বছর উত্তরবঙ্গের হিমালয়ের অরণ্যে আয়োজন হয় মথ দেখার উৎসবের। উদ্যোগে শিলিগুড়ির হিমালয়ান নেচার এন্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশন বা ন্যাফ। সেই শিবিরের একজন উৎসাহী পর্যবেক্ষকের কলমে উঠে এলো মথেদের আশ্চর্য দুনিয়ার খোঁজখবর। বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য লিখছেন মহুয়া সিংহ।

সে এক অমোঘ টান।ছোটবেলায় ভর সন্ধ্যে বেলায় পড়া ফাঁকি দেবার আর যখন কোনও যুৎসই উপায়ই নেই ধারেকাছে, তখনই কেল্লাফতে।লোডশেডিং ।সেই রাতে সেইটুকু সময় আমরা মুঠো ভরে অন্ধকার ধরতাম। এখন সেই ভালোলাগাগুলো আলো হয়ে ফুটে রয়েছে মনের কোণে কোণে। খোলা আকাশের নিচে চলে যেতাম। ছাতে কিংবা রেললাইনের ধারে। ঝিঁঝিঁ পোকা,ব্যাং গুলো থেমে থেমে কোরাসে গলা মেলাত যেন। মাঝে মাঝে খুরুলে প্যাঁচা। অন্ধকারে খানিক বাদেই চোখ সোয়ে যেত। জোনাকি গুলো আলোর ফুলকির মত ভেসে ভেসে পার…।গাছ গুলোতে ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। স্টিলের তিন ব্যাটারির টর্চটা বাগিয়ে ধরতাম। হলদে আলোর রাস্তা ধরে চোখ খুঁজত ডালে আবডালে যদি দেখা মেলে তার…বাবুজির (বাবাকে ওই নামেই ডাকতাম ) সঙ্গে সঙ্গে নিষেধ বার্তা… “উঁহু , আলো ফেলো না গাছে” ।টর্চের আলোর থেকেও তেজী আর জোরালো আমাদের প্রশ্ন , কেন! কি হয় ? বাবুজির শান্ত স্বর বোঝানোর , “ওদের কষ্ট হয়, অন্ধকারে থাকবে বলেই না দিনের আলোর সঙ্গে আড়ি ওদের , দিনের বেলা ঘাপটি মেরে থাকে ওরা , তখন দিনের সজাগ যারা তারাই ওড়ে , বেড়ায় , খায়দায় কিন্তু নিশাচরেরা রাতের জীব ,এখন যেমন ওবেলার সবাই ঘুমাচ্ছে। এই জন্যই চব্বিশটা ঘণ্টাকে দুই দিয়ে ভাগ করেছে নিজেরা। মিলেমিশে আছে তাই।কারোর সঙ্গে কারোর ঝগড়া নেই।“ টিকটিকিটা তিনবার ঠিক ঠিক ঠিক বলে। আর সন্দেহ থাকেনা। টর্চের আলোটা আর মনকে টানে না।পাশের ঘরের জ্যেঠু বলতেন, আমরা ছোটবেলায় রাতে তক্ষকের ডাকও শুনেছি। এইভাবে গল্পে গল্পে কাটতো সময়।সেই তখন থেকেই নিশাচর নিয়ে খুব কৌতূহল মনে। একেক সময় ঘরে সাদা চুনকাম দেওয়ালে এসে বসত খয়েরি ডানার প্রজাপতি। ডানা পেতে বসত। বড়রা সংশোধন করে বলতো । এগুলো মথ । প্রজাপতির ভায়রা ভাই, রাতে ওড়ে ।

কলেজ জীবনের পর থেকে পাহাড়ে জঙ্গলে বেড়াতে গেলেই দেখতাম, সন্ধ্যে হলেই করিডোরে আলোর নীচে দেওয়াল জুড়ে যেখানে সেখানেই ইতিউতি ছড়িয়ে বসে রয়েছে নানা ধরনের পোকা। বেশির ভাগই মথ ,বিটল , মৌমাছি , ম্যানটিস , দুএকটা ফড়িং আর নানারকম অচেনা সব পোকারা । তবে শুধু রাতের পতঙ্গকুল দেখার সম্মিলিত প্রয়াস কিছু হয়ে ওঠেনি।তাই আস্ত একটা শিবির হবে শুধু মথ দেখার জন্য, সেই সুযোগ পেয়ে আকর্ষণে রাশ আর টানি কি করে! তল্পিতল্পা নিয়ে তাই সঙ্গী হই দলের।আয়োজক দলের নাম হিমালয়ান নেচার এন্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশন, শিলিগুড়ি। আমার পাখিতুতো বান্ধবী অন্তরার থেকে খবর পাই। সংগঠন গত ছয় বছর ধরেই টানা এই শিবির পরিচালনা করছেন। গত চারবছরের সঙ্গী আমি। ঘন বর্ষার মাস জুলাই'তেই ন্যাশনাল মথ উইক পালন করা হয় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। সেই সপ্তাহেরই সুবিধেজনক দিন চারেক বেছে নিয়ে এই মথ দেখার আয়োজন করে সংগঠন ।নানারকম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রয়েছে , যে কেউ নাম নথিভুক্ত করে এই প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারেন। একটা সমীক্ষাও হয়।আবার মূল উদ্দেশ্যই হল এই পতঙ্গ টি সম্পর্কে একটা সচেতনতা বাড়ানো। ২০২৩ সালে এই শিবির হয়েছিল কালিংপং জেলার পাপরখেতি অঞ্চলের দারাগাও গ্রামে (১৫০০-২০০০ ফুট উচ্চতা), ২০২৪ সালে কালিংপং জেলার টাকনা গ্রামে (৬০০০ ফুট উচ্চতা ), ২০২৫ সালে কালিংপং জেলার লুংসেল গ্রামে (৩৫০০-৪০০০ ফুট উচ্চতা) আর এই বছর ১৮-২১ শে জুলাই হল দার্জিলিং জেলার সিভখোলা নদীর ধারে লালেগুরাস রিভার ক্যাম্প সাইটে (১০০০ফুট উচ্চতা)।

শিবির সাকুল্যে গোটা দিন চারেক চললেও তার প্রস্তুতি পর্ব চলতে থাকে চারমাস আগে থেকেই। তার মধ্যে অন্যতম মুখ্য কাজ হল স্থান নির্বাচন।জঙ্গল ঘেরা একটা উন্মুক্ত চত্বরের খোঁজ করতে হয়, আশেপাশে গ্রাম যেন না থাকে। মথ দেখার কাজটা যেহেতু মূলত গোটা রাত ধরেই প্রায় চলে তাই গ্রামের আলো না থাকাটাই প্রয়োজন। কাজেই গ্রামের বেশ খানিকটা তফাতেই শিবিরের খুঁটি পোতা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে নিশাচর মথ নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের কৃত্রিম আলোতে আকর্ষিত হয়ে আসে। তাই ১৬০ ওয়াটের একটা মার্কারি ভেপার ল্যাম্প আর ৩৬৫ ন্যানোমিটার ইউভি আলো জোগাড় করা হয়।সাদা পর্দার থেকে কৃত্রিম আলোটা এক ফুট মত দূরত্বে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আয়োজন বলতে এই টুকুই। রোজই সান্ধ্য আসরে সবাই মিলে একসঙ্গে বসে মথালাপ হয়। এক এক দিন, এক এক জন কথক নিজেদের ঝুলি থেকে এই বিষয় নিয়ে গল্প বলেন। আমরা মানে কচিকাঁচার দলের কাছে অন্যতম আকর্ষণ থাকে এই আড্ডায় যুধাজিৎ দাশগুপ্তের মুখ থেকে গল্প শোনা। আমি কিন্তু বয়স দিয়ে কচিকাঁচা বিচার করছি না। প্রকৃতি-চর্চায় যে প্রকৃতির যত কাছে সে জ্যেষ্ঠ ।যে তার থেকে যত দূরে সে কনিষ্ঠ। আমরা যারা দেখতে শুরু করেছি, বিড়াল ছানার মত সদ্য ফোঁটা চোখ নিয়ে, তারা ওনাদের মত জ্যেষ্ঠদের তুলনায় কচিকাঁচাই। মথ দেখার দলে নাম লিখিয়ে মজাটাকে পুরাদস্তুর উপভোগ করার জন্য যোগ্যতা থাকতে হবে তিনটি , জোঁক ও অন্যান্য পোকা মাকড়ের অল্প বিস্তর কামড়কে উপেক্ষা, মনের মধ্যে কয়েকটা জিজ্ঞাসা আর চোখের পাতা বুজে আসলেও তাকে তোয়াক্কা না করার ক্ষমতা । ওই তিনটে রাত কার্যত আমরা জাগরণেই কাটাই।

পাহাড় বেয়ে উপত্যকায় আঁধার নামার সঙ্গে সঙ্গেই সাদা পর্দার সামনের আলো গুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের থাকার জায়গা থেকে বেশ কয়েকশো মিটার দূরেই থাকে ব্যবস্থাটা। কারণ অল্প হলেও সেখানে কিছুটা ঘরের আলো জ্বলেই। প্রথম দিকে অল্প অল্প করে, তারপর ধেয়ে আসতে থাকে মথ-কুল, আশেপাশের ঝোপ জঙ্গলেও তারা এসে বসে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন অতিথির আগমনে পর্দাটা ভরে ওঠে। বিচিত্র তাদের রঙ , তাদের সাজ, ডানার গঠন। এই ডানার সাজের পেছনে কারণ তো কিছু আছেই। কেউ দেখতে অবিকল শুকনো পাতা, কেউ বা গাছের শুকনো ডালের মত। কারুর ডানায় আবার প্যাঁচার চোখের মত গোল গোল ছাপ, কারোর ডানা বিলকুল স্বচ্ছ, কারোর ডানায় নর কঙ্কালের চিহ্ন সুস্পষ্ট, আরও কত কি।

বিশেষজ্ঞদের দেওয়া পরিসংখ্যান মনে পড়লে কেমন যেন ঝাঁকুনি লাগে মনে। বিশ্বে আজ অবধি এক লক্ষ ষাট হাজার প্রজাতির মথ আবিষ্কৃত হয়েছে। তার মধ্যে ভারতবর্ষে পাওয়া গিয়েছে ১২ হাজার ২৮৬ টি প্রজাতি। প্রজাপতির সংখ্যাটা ১৪১৭। রঙ বেরঙের নানাধরনের প্রজাপতির সঙ্গেই আমাদের বেশি আলাপ কারণ তারা দিনের বেলা ফুলে ফুলে ওড়ে মধুর টানে। কিন্তু রাতের আধারে আমরা যখন ঘরে সেঁধিয়ে যাই ,তখন বাইরে কি চলছে সে আর ঠাহর আমরা কি করে করব? তাই নিশাচর মথের সঙ্গে আমাদের আলাপ হবার বিশেষ সুযোগ থাকে না। তারা আমাদের কাছে অপরিচিতই থেকে যায় । সাদা পর্দা জুড়ে হরেক রকমের মথ দেখি আর ভাবি এদের আমি দেখছি এদের জীবদ্দশার শেষ ক'টা দিন।কারণ আজকের রাতের অতিথি, এই পূর্ণাঙ্গ মথটি যাত্রা শুরু করেছিল সেই ডিম থেকে। ওর মা সঠিক পুরুষ সঙ্গীটিকে বেছে নিয়ে মিলন সাঙ্গ করে নির্দিষ্ট গাছের পাতা খুঁজে ডিম পেড়েছিল।কারণ ডিম ফুটে লার্ভা ছানা যেমন খুশি গাছের পাতা খাবে না। তার নির্দিষ্ট পোষক গাছের পাতাই খাবে। পাতার গন্ধ বিচার করে মা সেই গাছ চিনে নিতে কোনও ভুল করেনা। এই খোঁজ সে বংশ পরম্পরায় শিখে এসেছে অভিব্যাক্তির ইতিহাস ধরে, কোষের ভেতর জিনের ভাষা পড়ে। মথ-মায়ের কাজ শেষ ।উপযুক্ত পরিবেশে ছানা ডিম ফুটে বের হবে।ছানা এখন ভারী পেটুক , হরদম তার শুধু খাই খাই বাতিক। শুধু খোলস ছেড়ে এক দশা থেকে আরেক লার্ভা দশায় যাবার খানিক আগে পরে নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে থম মেরে থাকা। বাকি সময় নানা সাজে লুকিয়ে থাকা, বেশির ভাগ ছানাই এই সময় রাতের বেলাই খায়, দিনের বেলা নানা সাজে মিশে থাকে তার নিজের ডাল পাতার ঘরে। উন্মুক্ত পরিবেশে মা তাদের ছেড়ে দিয়েছে, লার্ভাদের নিজেদেরকে লুকিয়ে-চুরিয়ে রাখাটাও তাই তাদের বেঁচে থাকারই একটা কৌশল।নানারকম খাদকদের থেকে নিজেদের আড়াল করতে হবে।প্রাণ ভীষণ দামী।কেউ নিজেকে ঢেকে রেখেছে দংশক রোম দিয়ে, কেউবা বিষাক্ত স্পর্শে দেয় দূরে থাকার বার্তা ,কেউ কেউ নিজেকে ঢেকে রেখেছে বিস্ময়কর গাত্রবর্ণে ,কেউ কেউ গাছের গায়ে শুকনো কাঠির মত লেগে রয়েছে। কাউকে দেখে বোঝার উপায়ই নেই যে তারা আদৌ কোন প্রাণ। পরিবেশের সঙ্গে মানানসই সাজে লুকিয়ে বসে থাকা এই সব হতবাক করা প্রাণের হদিশ আমরা পাই শিবিরে গিয়ে। আমাদের দলেরই কারোর কারোর চোখে ধরা পড়ে যায়।ছবি তুলে রেখে দেওয়া হয়, সান্ধ্য আড্ডায় তাদের ছবি দেখিয়ে দলের সকলকে জানানো হয় সে সব, চর্চা চলে। চোখে ধুলো দেওয়াটাই তাদের কাজ তাই বেশিরভাগ দেখা রয়ে যায় অধরা অথচ মন বলে তারা ছড়িয়ে রয়েছে সবাই। লার্ভা দশা খাওয়া দাওয়ার পাট সাঙ্গ করে কোকুন বা গুটি বানিয়ে ঘুমোতে যায় । সেখানে তার শরীরটা ভেঙ্গে চুরে সাজ বদল হয়।গুটি কেটে যে বেরিয়ে আসে তার ওড়ার দুটো পাখনার সাজ দেখে বিশ্বাস করা যায়না সে জীবনের অন্য কোনও দশায় দেখতে একদম অন্য রকম ছিল। সে নিজেও বুঝি আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে চিনতে পারবে না আর। ছোট বেলার সাজ আর এ সাজে বিস্তর ফারাক এক।
দিনে ওড়া মথ যে নেই, তা নয়।তবে বেশীরভাগ মথই নিশাচর । বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, রাতে ফোটা অধিকাংশ ফুলের পরাগায়নে মথ দায়ী । অবশ্য এমন মথও রয়েছে যাদেরকে দিনের বেলা, সন্ধ্যে বেলায়ও ফুলে ফুলে মধুর খোঁজে দেখা যায় । উদাহরণ স্বরূপ হামিংবার্ড হক মথের কথা বলা যায়। নিজেই দেখেছি পুটুস (ল্যানটানা) , জারবাস (Stachytarpheta sp.) , নয়নতারা , টগর প্রভৃতি ফুলে আসতে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বেশীরভাগ প্রজাপতি- মৌমাছি –এরা যেমন সুবিধাবাদি পরাগায়নকারী (opportunistic pollinator) ,কিছু মথের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে তারা নির্দিষ্ট ফুলের পরাগায়নকারী (specific pollinator)। এ প্রসঙ্গে মাদাগাস্কারের সেই বিখ্যাত Xanthopan morganii নামের হক-মথ আবিষ্কারের গল্পটা মনে আসে।

আর ইউকা চাষে অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ভর করে Tegeticula আর Parategeticula গণের মথের পরাগায়ন সফল ভাবে হল কিনা, তার উপর। এক্ষেত্রে স্ত্রী মথ ইউকা ফুলের ভেতর ডিম দেয়। সেই সময় তার শরীরের বিভিন্ন অংশে ফুলের পরাগ গুলি লেগে যায় । পাশের ফুলে সেই একই কাজ করার সময় সঙ্গে বোয়ে আনা পরাগ এসে পরে ওই ফুলের গর্ভমুণ্ডে।তার সুবাদে ফলটি ফলে সফলভাবে । ভেতরে থাকা মথের ছানারা ফলের শাঁস খেয়ে বড় হতে থাকে। পারাস্পরিক মিথস্ক্রিয়তায় বেঁচে থাকে দুজনেই। জেড এস আই এর থেকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, বিজ্ঞানীরা অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় ২০১৮-২০১৯ সালে একটি সার্ভে করেছিলেন। মথ সংগ্রহ করে তাদের শরীরের থেকে ফুলের পরাগ গুলি বেছে নিয়ে গাছের ফ্যামিলি জানার চেষ্টা করেছিলেন। সেখানে দেখা গিয়েছে প্রায় সাতটি মথ ফ্যামিলির ৩৭ রকম প্রজাতি ওই অঞ্চলে প্রাপ্ত ১১ টি অর্থনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ গাছের ফুলের পরাগায়নের জন্য সরাসরি যুক্ত।এরকম আরও অনেক নিবিড় অধ্যয়নে হয়তো অনেক বেশি তথ্য এসে হাজির হবে আমাদের সামনে।

মথ রাতের বেলায় ওড়ে বলে এরকম ভাবার কোনও কারণ নেই যে তারা চলে ফেরে কি করে! তারা দেখতে পায়, গন্ধ পায়, এমনকি শুনতেও পায়। আমাদের দেখা শোনা স্পর্শের সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না মোটেই ।এমনকি কেউ কেউ তার বুকের মধ্যে লাগানো টিম্পাল নামের অঙ্গাণুর সাহায্যে শব্দ সৃষ্টিও করতে পারে। এই সবই ভাষার আদান প্রদান চলে আমাদের অগোচরে।ওই যে মাথার দুপাশে লাগানো মথের দুটো অ্যান্টেনা সেটাই করে নাকের কাজ। তার ভেতরেই ছড়িয়ে রয়েছে গন্ধ বার্তা বুঝে নেবার জন্য প্রয়োজনীয় সব স্নায়ু গ্রাহক গুলি। দূরদূরান্ত থেকে তার সঙ্গিনীটি যেই নাকি ফেরোমন ছড়িয়ে দেবে বাতাসে, উপযুক্ত সঙ্গী গন্ধ বার্তা পড়তে পড়তে পোঁছে যাবে তার কাছে।ফুল ফুটলে তা থেকেও যে গন্ধ বের হয়, সে ভাষা পড়তেও মথেরা সমান পটু । সেই একই ভাবে সে খুঁজে পায় তার ডিম দেবার উপযুক্ত গাছটি ।গাছের সঙ্গে, ফুলের সঙ্গে মথের সম্পর্ক তাই অতি নিবিড়। নির্দিষ্ট ফুলে এসে পরাগায়নের কাজটিও তাই সে করে দেয় অকৃপণ ভাবেই।রাতের আপাত ফ্যাকাসে রঙের ফুলগুলো চাঁদের আলোয় প্রতিফলন করে তার বার্তা ।মথ সে ভাষায় আকৃষ্ট হয়ে আসে। এমনকি ফুল যে বায়বীয় পদার্থ ভাসিয়ে দেয় বাতাসে সেটাও টের পায় মথ ।সব সাদা ফুলের অবশ্য মথ দ্বারা পরাগায়ন ঘটে না।ব্যতিক্রম আছেই। অনেক রঙীন ফুলেও পরাগায়ন করে তারা।মুখের চোষক নলটি দিয়ে (প্রবোসিস)ফুলের লম্বা নালী পথে মধু ভাণ্ডারে পৌঁছে যায় সে। অভিযোজনের ইতিহাসেও এরকম নিদর্শন আছে লেখা।
পর্দায় তাই রাশি রাশি মথ দেখি আর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ভাবি, আজ তার হাতে গোনা জীবন থেকে একটা মূল্যবান সময় কেড়ে নিলাম আমরা। কৃত্রিম আলোয় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে উড়তে উড়তে চলে এসেছে আমাদের পাতা আলোর ফাঁদে , সেই সুবাদেই দেখতে পাচ্ছি এদের, বিজ্ঞানের তথ্য ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছে কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল যে… হয়তো কোনও ফুলে কিংবা হয়তো ওর মিলনসঙ্গীর খোঁজে , কে জানে! ভাবি প্রত্যেক ডানার পেছনে এতো গল্প, এরা আছে মানে এদের নাম না জানা পোষক গাছ গুলো জঙ্গলের কোথাও ছড়ানো রয়েছে প্রকৃতির নিজস্ব আড়ালে। কোন পাতার তলায় চলছে এদের ছানাদের জীবন!এরা আছে মানে এদের খাদকরাও থাকবে অত্যাবশ্যক খাদ্য-জালে জড়িয়ে যেমন পতঙ্গভুক পাখি বাদুড় আর কত প্রাণ। আমরা এসেই যখন পড়েছি আজ, পর্দার মথ গুলোকে ক্যামেরা বন্দী করে ফেলি যতদূর সম্ভব। বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ নানারকম সিটিজেন সায়েন্স অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। সেখানে মথের ছবি গুলো নথিবদ্ধ করে রাখলে বিশেষজ্ঞগণ সেগুলো দেখে বুঝতে চেষ্টা করতে পারেন ওই অঞ্চলের স্পিসিস ডাইভার্সিটি । এইটুকু প্রয়াস আমরা আগ্রহীরা করতেই পারি। ঘন বর্ষার শিবির, মাঝে মাঝে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির তাড়সে দাঁড়ানো যায়না ,ছবিও তোলা যায় না। তাই ফিরে আসি ছাউনির নিচে , বৃষ্টি কিছুটা ধরলে আবার গিয়ে খুঁজি নতুন কোনও অতিথি এলো কিনা। আমাদের সঙ্গী হয়ে রাতভর জেগে থাকেন আয়োজক দলের প্রোগ্রাম কোঅরডিনেটর, তাঁর ডাকে উৎসাহী হয়ে পর্দার সামনে চোখ বুলিয়ে যান স্থানীয় মানুষ জন। তারাও ভাবেন এতো কেউ ছড়িয়ে আছে তাদেরই ঘরের পাশে । গত বছরের আগের বছর টাকনা তে শিবির চলাকালীন অনিমেষ বসুর (প্রোগ্রাম কোর্ডিনেটার) উদ্যোগে একদিন দুপুরে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে দারুণ একটা আড্ডা হয়েছিল। আড্ডাটা যে কতটা ফলপ্রসূ হয়েছিল কি বলি! আমাদের সঙ্গে রেবেকা ( যাঁদের অতিথি হয়ে আমরা সবাই ছিলাম) আর তার দুই ছেলে ম্যাল্কম আর মেলভিন পরের দিন ওই স্কুলের এক দঙ্গল কচিকাঁচাকে দলে জুটিয়ে নিয়ে চললো আমাদের সঙ্গে। কত কি যে তারা আমাদের দেখালো , কত রকম বুনো ফুল, কত ধরনের মথের লার্ভা বুনো গাছের পাতায়, আমায় একপ্রকার টানতে টানতে গিয়ে দেখিয়ে আসলো হাইডরাঞ্জিয়া গাছে প্রায় ছয় ইঞ্চির হক মথের লার্ভাটা । রেবেকার উৎসাহ বলার মত। সেও তার বাগান ঘুরিয়ে আমায় দেখাতে লাগলো কোন কোন রঙের প্রজাপতিদের সে ফুলের মধু খেতে দেখেছে, পাতায় ডিম পারতে দেখেছে। আমাদের আগাছাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য , নানা রকম পোষক উদ্ভিদের উপকারিতা বিষয়ে যে আর্জি আমরা তাদের কাছে রেখেছিলাম, এখনও তারা সেটা রেখে চলে । বুনো গাছে শূককীট দেখলে ছবি পাঠায় , বুনো গাছের বাগানে পাতার তলায় পিউপা দেখলেও আমাদেরকে জানায়। ভাষার তফাত ব্যবধান তৈরি করে না। জঙ্গলকে ভালোবাসার মানুষ নিনাদি আমাদের মধ্যে দো-ভাষিণীর কাজটি করে দেন হাসিমুখে। সকলের মিলিত প্রয়াসে দুটো একটা করে মথের পোষক গাছ রাখতে চাই বাঁচিয়ে । সংরক্ষণের প্রচেষ্টা করি গুটি গুটি । রেবেকাদের মত স্থানীয় সচেতন মানুষ গুলো এই সব শিবিরের সুফল বলেই মনে হয়। আমরা তো শিবির সেরে ফিরেই আসবো নিজেদের ঘরে। ম্যাল্কমদের হাতে ভার দিয়ে, ওরাই তো আগামী।

প্রায় সারারাত জেগে মথ দেখা শেষ হলে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। মথ গুলো বেশীরভাগ উড়ে চলে যায় । হাতে গোনা কয়েকটা দিনভর পর্দায় বসেই থাকে। আমাদের তোলা ছবি গুলো আই ন্যাচারালিস্ট নামক প্ল্যাটফর্ম এ তুলে দেওয়া হয়।সারাবছর ধরে বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে চলতে থাকে যতটা সম্ভব তাদের শনাক্তকরণের কাজ।কারণ কাজটি বেশ কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রেই শুধু ছবি দেখে বলা যাবে না তাদের প্রকৃত পরিচয়।সম্প্রতি ২০২৪ -এ আমাদের মথ শিবিরে প্রাপ্ত প্রায় সাড়ে চারশো রকমের মথের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে জি বি আই এফ।এই তালিকা প্রকাশের কাজটি সম্ভবপর হয়েছে মূলত আমাদের দলের অন্যতম উৎসাহী মথ পর্যবেক্ষক ডাঃ পূরব চৌধুরীর প্রচেষ্টায় এবং সৌমিক পালের উদ্যোগে।
পরিশেষে বলি, আমরা যখন ঘুমিয়ে, নিশাচর প্রাণ গুলো আপন আপন কাজে ব্যস্ত ।পরিবেশে এদের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা তাদের বিস্ময়কর দেহ সুষমায় আহ্লাদিত হই ঠিকই ,কিন্তু আমাদের আনন্দ দেওয়াটা ওদের জীবনের উদ্দেশ্য নয়। একটা মথ মানে তালিকায় শুধু একটি সংযোজন নয়,তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েকটা পোষক গাছ, কয়েকটা ফুলের সফল পরাগায়ন, প্রজন্মের পর প্রজন্মের বেঁচে থাকার হাতছানি,তাদের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা খাদক প্রাণী গুলো ।একটা জঙ্গল মানে কয়েকটা গাছ শুধু নয়,তার পাতায় পাতায় জড়ানো প্রত্যেকটা জীবন। কিন্তু অন্ধকার জঙ্গলের পথ সাফ করে বিছিয়ে দেওয়া চলছে ঝলমলে উন্নতির আলো। অন্ধকারে অভ্যস্ত নিশাচর প্রাণীগুলোর এই আলোকোজ্জ্বল পথ অচেনা লাগে। তারা তাদের চেনা পথ হারিয়ে ফেলে।তাই নিঃশব্দে তাদের হারিয়ে যাওয়ার কাণ্ড টাও চলে জাঁকিয়ে ।এও কি আমাদের ঘুমিয়ে থাকা নয়? মনে হয় তিন লক্ষ বছর বয়সের নবীন মানুষটি তিরিশ কোটি বছর বয়সের প্রবীণ মথটাকে বলছে চোখে জোরালো আলো ঠেকিয়ে , "দেখো, আমি শ্রেষ্ঠ জীব"। সবজান্তা বুদ্ধিমান মানুষকে কেউ কি আর বলার আছে সেই কথাটা ,"উঁহু , ওদের চোখে আলো ফেলো না, ওদের কষ্ট হয়।"







Comments