ওয়াইল্ডলাইফ বোর্ডের কাজ কি শুধু অরণ্য নিধনে সম্মতি দেওয়া? আদালতে বিশেষজ্ঞরা।
বিগত বছরগুলোয় জাতীয় বন্যপ্রানী বোর্ডের যে স্থায়ী কমিটি বিভিন্ন প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয় তাদের কাজকর্ম নিয়ে অনেক অভিযোগ তুলেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। এবার স্বয়ং এম কে রঞ্জিতসিংহের মত প্রবীণ বন্যপ্রাণী গবেষক সহ একদল পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা আদালতের দ্বারস্থ হলেন এই বোর্ডের কাজকর্মের সঠিক মূল্যায়নের দাবিতে। লিখছেন সিমরন সিরুর।

প্রাক্তন বনকর্মকর্তা, বিখ্যাত সংরক্ষণবিদ এবং গবেষকদের একটি দল জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ড (NBWL) এবং এর অধীনস্থ স্ট্যান্ডিং কমিটির কাজকর্মের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে যথাযত পরিবেশগত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই এবং বিষয়টির যথাযথ ও বিবেচনাপ্রসূত মূল্যায়ন না করেই।
দিল্লি হাইকোর্টে তাদের দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলায় (PIL) বলা হয়েছে যে, জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের (NBWL) এই স্থায়ী কমিটি ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে জমা পড়া প্রকল্পগুলির ৯৭% অনুমোদন করেছে। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কঠোরতা ও যথাযথ মূল্যায়নের অভাব (“processual rigour”-এর ঘাটতি) স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। এই কারণে অন্তত ৯৫,৭২৪ হেক্টর বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।
এই অভিযোগ এমন এক সময়ে উঠেছে, যখন Ease of Doing Business বাড়ানোর লক্ষ্যে — যা বর্তমান কেন্দ্র সরকারের ঘোষিত নীতি— জাতীয় পরিবেশগত আইন কানুনে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এই মামলার আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় বন পরিষেবার (Indian Forest Service) চারজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যাঁদের নেতৃত্বে আছেন প্রকৃতি শ্রীবাস্তব। এছাড়াও রয়েছেন বিশিষ্ট সংরক্ষণবিদ এম. কে. রঞ্জিতসিংহ, যিনি ভারতের ‘বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন ১৯৭২’ (Wildlife Protection Act) প্রণয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী হলেন জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের (NBWL) অধ্যক্ষ এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রীর সভাপতিত্বাধীন এর স্থায়ী কমিটি রয়েছে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করছেন তাঁরা এবং যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণের জন্য আইনগতভাবে এই সংস্থাগুলি গঠিত হয়েছিল, তারই পরিপন্থীভাবে কাজ করেছেন বরং!
বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন, ১৯৭২-এর নিয়ম মেনে ২০০৩ সালে জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ড (National Board for Wildlife বা NBWL) গঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্যপ্রাণী-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে পরামর্শ প্রদান করা।
এই দায়িত্বগুলির মধ্যে রয়েছে জাতীয় উদ্যান (National Park) ও অভয়ারণ্য (Sanctuary) প্রতিষ্ঠার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বন্যপ্রাণীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা, এবং দেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা।
আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত এলাকার (Protected Area) ভেতরে কোনো জমি বা বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ (diversion) করতে হলে জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের (NBWL) অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।
পরবর্তীতে সরকারের একটি বিধানের মাধ্যমে NBWL-কে তার কিছু দায়িত্ব একটি স্থায়ী কমিটির (Standing Committee) কাছে অর্পণ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই স্থায়ী কমিটি বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অপেক্ষাকৃত ছোট সংস্থা, যা NBWL-এর তত্ত্বাবধানে কাজ করে এবং নির্দিষ্ট বিষয়গুলিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সুপারিশ প্রদান করে।
তবে দিল্লি হাইকোর্টে দায়ের করা জনস্বার্থ মামলায় বলা হয়েছে যে, জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ড (NBWL) খুব কমই বৈঠক করে। ফলে এর স্থায়ী কমিটি (Standing Committee) কার্যত কোনো কার্যকর তদারকি ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যাচ্ছে।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে NBWL মাত্র একবার বৈঠক করেছে। অন্যদিকে, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে স্থায়ী কমিটি ৫৫ বার বৈঠক করেছে এবং বনভূমির অন্য কাজে ব্যবহারের (forest diversion) অনুমোদন প্রয়োজন এমন ২,১৮৬টি প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে।
আইইউসিএনের (IUCN) ওয়ার্ল্ড কমিশন অন প্রোটেক্টেড এরিয়াস-এর সদস্য এবং পরামর্শদাতা মৃদু ট্যান্ডন ২০১৯ সালে লিগ্যাল ইনিশিয়েটিভ ফর ফরেস্টস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (LIFE)-এর জন্য প্রস্তুত করা একটি প্রতিবেদনে এই স্থায়ী কমিটির প্রকল্প অনুমোদনের ধরন বিশ্লেষণ করেছিলেন। তিনি দেখতে পান যে, অনুমোদিত প্রকল্পগুলির অধিকাংশই ছিল রৈখিক অবকাঠামো (linear infrastructure) সম্পর্কিত, যেমন সড়কপথ, রেলপথ এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন।
তিনি বলেন, “রৈখিক অবকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে কমিটিতে নথিভুক্ত আলোচনাগুলি বিভিন্ন প্রকল্পেই আশ্চর্যজনকভাবে একরকম। অথচ এগুলি আলাদা আলাদা সংরক্ষিত অরণ্যের সাথে সম্পর্ক যুক্ত, যেগুলোর পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যও একে অপরের থেকে আলাদা।এমন হওয়ার প্রধান কারণ হলো, সংশ্লিষ্ট সংরক্ষিত এলাকার জীববৈচিত্র্যগত গুরুত্ব বা প্রকল্পটি সেই জীববৈচিত্র্যের ওপর কী ধরনের নির্দিষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে খুব সামান্যই আলোচনা করা হয় কমিটিতে।”
জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের (NBWL) স্থায়ী কমিটি ৯ জুলাই তার ৯১তম বৈঠক অনুষ্ঠিত করে, যেখানে ১০০টিরও বেশি প্রকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়।
কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “প্রকল্প প্রস্তাবগুলির মূল্যায়ন করা হয়েছে তাদের পরিবেশগত প্রভাব, জনকল্যাণ ও জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্ব, এবং বন্যপ্রাণী ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তাবিত প্রশমনমূলক (mitigation) ব্যবস্থার কথা বিবেচনার ভিত্তিতে।”
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “স্থায়ী কমিটি পরিবেশের সাথে মানানসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারে দৃঢ়।”
২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ভারতে সরকারিভাবে ঘোষিত (notified) ১,০১৪টি সংরক্ষিত এলাকা (Protected Area) রয়েছে, যা দেশের মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ৫.৩২ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত।
দিল্লি হাইকোর্টে দায়ের করা আবেদনে বলা হয়েছে, এই সংরক্ষিত এলাকাগুলিকে অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য দ্রুত অনুমোদন দেওয়া বা সম্পূর্ণভাবে তাদের সংরক্ষিত মর্যাদা (denotification) বাতিল করার প্রবণতা স্থায়ী কমিটির “ত্রুটিপূর্ণ, অপর্যাপ্ত এবং তড়িঘড়ি মূল্যায়নের” প্রতিফলন।
আবেদনকারীদের মতে, এই ধরনের দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া সংরক্ষিত এলাকার পরিবেশগত গুরুত্ব ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইঙ্গিত দেয়।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, কিছু ক্ষেত্রে সংরক্ষণবিদদের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও প্রকল্পগুলিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে কেন–বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের এই স্থায়ী কমিটি এই প্রকল্পকে অনুমোদন দেয়, যদিও এর ফলে পান্না টাইগার রিজার্ভ ও জাতীয় উদ্যানের প্রায় ১০ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, বহু প্রচেষ্টা ও দীর্ঘ সময়ের পর এই সংরক্ষিত এলাকায় বাঘের সংখ্যা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
আবেদন অনুযায়ী, পান্না জাতীয় উদ্যানের পরিচালক এই প্রকল্পকে অনুমোদন দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু সেই আপত্তি এবং অন্যান্য উদ্বেগকে উপেক্ষা করে বোর্ড প্রকল্পটির পক্ষে সুপারিশ করে।
আবেদনে বলা হয়েছে, “সমস্ত উদ্বেগ ও আপত্তিকে উপেক্ষা করে প্রকল্পটিকে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে।”
স্থায়ী কমিটি গ্রেট নিকোবর দ্বীপের গালাথিয়া উপসাগর এর সংরক্ষিত এলাকার মর্যাদা প্রত্যাহারের অনুমোদনও দিয়েছে। এই অঞ্চলটি লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপের একটি সুপরিচিত ডিম পাড়ার স্থান । বর্তমানে সেখানে একটি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর নির্মাণের পথ কাজ হচ্ছে।
গ্রেট নিকোবর দ্বীপে এই প্রকল্প আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে, কারণ এটি দ্বীপটির স্থানীয় জীববৈচিত্র্য এবং সেখানে বসবাসকারী বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগবিহীন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুতর সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, কোনো সংরক্ষিত এলাকার মর্যাদা প্রত্যাহার (denotification) করার জন্য জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের এই স্থায়ী কমিটির আইনগত (statutory) ক্ষমতা নেই। অর্থাৎ, বিদ্যমান আইনের অধীনে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার স্থায়ী কমিটির নেই বলেই আবেদনকারীরা দাবি করেছেন।
২০১৮ সালে সংরক্ষণবিদ টি. আর. শঙ্কর রামনের (T.R. Shankar Raman) প্রস্তুত করা এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক প্রকাশিত স্থায়ী কমিটির জন্য তৈরি একটি নথিতে এমন একটি নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল, যেখানে সংরক্ষিত এলাকায় রৈখিক অবকাঠামো (linear infrastructure) তৈরির বিষয়টাকে প্রথমেই প্রতিরোধ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; তা সম্ভব না হলে বিকল্প পথ বা নকশা বিবেচনা করা হবে; এবং সবশেষে, অন্য কোনো উপায় না থাকলে প্রশমনমূলক ব্যবস্থা (mitigation) গ্রহণ করা হবে।
মৃদু ট্যান্ডন বলেন, “সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই নথিটি একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করলেও, রৈখিক অবকাঠামো প্রকল্পগুলির বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে মনে হয় না। বিকল্প রুট বা নকশাগুলি যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয় কি না, সে বিষয়ে আলোচনার প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি স্থায়ী কমিটির কার্যবিবরণীতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।”
আবেদনে স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে যেখানে পাঁচটি বেসরকারি সংরক্ষণমূলক সংস্থা (NGO) এবং দশজন বন্যপ্রাণী ও দশ জন পরিবেশ সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, সেখানে তুলনামূলকভাবে অধিক ঘন ঘন বৈঠক করা এবং বনভূমি বা সংরক্ষিত এলাকার পরিবর্তন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী স্থায়ী কমিটিতে মাত্র একটি বেসরকারি সংস্থা— World Wildlife Fund India (WWF India)-এর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।

মার্চ মাসে পুনর্গঠিত এই স্থায়ী কমিটির বর্তমান গঠনে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব (Yadav) চেয়ারপার্সন হিসেবে রয়েছেন। সদস্য-সচিব (Member Secretary) হিসেবে আছেন অতিরিক্ত বন মহাপরিচালক (Additional Director General of Forests) রমেশ পাণ্ডে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পরিবেশ দপ্তরের চারজন কর্মরত কর্মকর্তা, Wildlife Institute of India-এর একজন প্রতিনিধি এবং ভারতীয় বন পরিষেবার (IFS) দুজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত আছেন।
এই দুই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার একজন হলেন সৌমিত্র দাসগুপ্ত, যিনি International Big Cat Alliance-এর পরিচালক। এটি ভারত সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগ।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, “বিভিন্ন বিষয়ে কোনো ভোটাভুটি হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রেই চেয়ারপার্সন একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এর ফলে কমিটির ভেতরে ও বাইরে থাকা বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং মতামত কার্যত গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।”
আবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, বর্তমান স্থায়ী কমিটিকে (Standing Committee) কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক যে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গঠন করেছে, তা বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন, ১৯৭২-এর পরিপন্থী। আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষমতা জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের (NBWL) হাতে ন্যস্ত থাকবে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, “স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনয়নের ক্ষমতা NBWL-এর পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে চলে যাওয়া শুধু আইনবিরুদ্ধই নয়, বরং এটিও প্রমাণ করে যে SC-NBWL-এর কোনো প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন (autonomy) নেই।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক এবং মামলার অন্যান্য বিবাদীপক্ষকে চার সপ্তাহের মধ্যে তাদের জবাব দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছে।
মামলাটির পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর।
আবেদনে বলা হয়েছে যে, ২০১২ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে একটি উপ-কমিটি (sub-committee) স্থায়ী কমিটির (Standing Committee) কার্যপ্রণালী পরিচালনার জন্য কিছু নিয়ম ও প্রোটোকলের খসড়া প্রস্তুত করেছিল। কিন্তু সেই নিয়মাবলি অনুমোদিত না হয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়।
এর ফলে স্থায়ী কমিটি “স্বেচ্ছাচারী, অস্বচ্ছ এবং তাৎক্ষণিক (ad hoc) পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ব্যবহার, প্রয়োজনীয় বিবেচনা-বিশ্লেষণ এবং প্রতিটি প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুপস্থিত” বলে আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে আবেদনকারীরা ইতিমধ্যে দেওয়া অনুমোদন (clearance) বাতিল করার দাবি জানাচ্ছেন না। বরং তারা এমন সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়নের দাবি করেছেন, যা নিশ্চিত করবে যে এই কমিটি একটি যথাযথ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
আবেদনে বলা হয়েছে, সংরক্ষিত এলাকার জমি অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ, সংরক্ষিত মর্যাদা প্রত্যাহার , অথবা সীমানা পুননির্ধারন (rationalisation) সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে যে, প্রস্তাবটি কীভাবে বন্যপ্রাণীর উন্নয়ন ও আরও ভালো ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় এবং কীভাবে তা বন্যপ্রাণী আইন-এর বিধানগুলির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অর্থাৎ, আবেদনকারীদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র অনুমোদন দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সিদ্ধান্তের পক্ষে সুস্পষ্ট, যুক্তিসম্মত এবং আইনসম্মত লিখিত ব্যাখ্যা থাকা আবশ্যক।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নের জন্য (impact assessment) জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের উচিত আরও বেশি সংখ্যক স্বাধীন বিশেষজ্ঞকে নিযুক্ত করা এবং তাদের মাধ্যমে বিস্তারিত মূল্যায়ন করানো। মৃদু ট্যান্ডন বলেন, “যেসব সংরক্ষিত এলাকার জমি অন্য কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, সেই এলাকাগুলির পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে স্থায়ী কমিটির আলোচনায় স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি ওই এলাকার জীববৈচিত্র্যের উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তাও বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “যেসব প্রস্তাব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বা আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতাভুক্ত সংরক্ষিত এলাকাগুলিকে প্রভাবিত করতে পারে, সেসব ক্ষেত্রে কমিটির আলোচনায় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কনভেনশন বা চুক্তির নির্দিষ্ট শর্তাবলি ও বাধ্যবাধকতাগুলিকে স্পষ্টভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে যে, গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি ভারতের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে।”
মূল প্রবন্ধটি Mongabayপত্রিকায় প্রকাশিত। ইংলিশ প্রবন্ধটির অনুমতিক্রমে অনুবাদ করা হল বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য। মূল প্রবন্ধটির লিঙ্ক: https://india.mongabay.com/2026/07/petition-accuses-wildlife-board-committee-of-rubber-stamping-diversions-with-no-application-of-mind/
পড়তে থাকুন বনেপাহাড়ে। অন্যকেও পড়ান। ছড়িয়ে যাক সচেতনতার বার্তা।






