রাজস্থানে শুরু হচ্ছে ক্যারাকাল সেন্সাস
- ..
- Jul 8
- 5 min read
ভারতের পশ্চিমে কিছু অঞ্চলে দেখা মেলে বিরল এই বিড়াল প্রজাতির প্রাণীটির-ক্যারাকাল। একসময়ে বিস্তৃত ভূ-ভাগে তাদের পাওয়া গেলেও বর্তমানে সীমিত অঞ্চলেই তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। তার মধ্যেও তাদের আক্রান্ত হতে হয় মানুষজনের হাতে। আসলে ক্যারাকালদের নিয়ে নেই কোন বিস্তৃত তথ্য। এই নিয়ে আগেও বনেপাহাড়েতে বার হয়েছিল রচনা। তবে আশার কথা এবার ক্যারাকালদের নিয়ে সরকারি উদ্যোগেই কাজ শুরু হতে চলেছে। জানাচ্ছেন মাধব শর্মা।

চলতি বছরের মার্চ মাসে রাজস্থানে একটি বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণী—ক্যারাকালকে (Caracal)—কাঠের স্তূপের ওপর পুড়িয়ে দেওয়ার একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটির সূত্র ধরে শনাক্ত করা তিনজন ব্যক্তিকে রাজস্থান পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং ক্যারাকালের আংশিকভাবে দগ্ধ দেহাবশেষ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের জন্য ক্যারাকালের দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত নমুনা Wildlife Institute of India-এ পাঠানো হয়।
বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের অধীনে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ১৪ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে (জুডিশিয়াল রিমান্ডে) কারাগারে পাঠানো হয়। অভিযুক্তদের দাবি ছিল, “এই বন্য প্রাণীটি আমাদের ৫০টিরও বেশি গবাদিপশু মেরে ফেলেছিল,” যা প্রতিহিংসাবশত: প্রাণীটিকে হত্যার ইঙ্গিত দেয়। তবে অভিযুক্ত বা গ্রামের কোনো বাসিন্দাই বন দপ্তরের কাছে ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করেননি, যদিও বন্য প্রাণীর আক্রমণে গবাদিপশু মারা গেলে এ ধরনের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে।
এই ঘটনার ঠিক এক বছর আগে, বিড়ালজাতীয় প্রাণীদের বিরল ও অত্যন্ত দুর্লভ সদস্য ক্যারাকালকে (Caracal) প্রথমবারের মতো রাজস্থানের Mukundra Hills Tiger Reserve-এ ক্যামেরা ট্র্যাপের ছবিতে ধরা পড়তে দেখা গিয়েছিল।
ভারতে কারাকাল
ক্যারাকাল (Caracal) Wildlife Protection Act, 1972-এর তফসিল–১ (Schedule I)-এর অধীনে সুরক্ষিত একটি বন্যপ্রাণী। তবে ভারতে এদের মোট জনসংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের অনুমান রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে, ভারতের ২৬টি জীবভৌগোলিক (biotic) প্রদেশের মধ্যে ৯টিতে, অর্থাৎ ১৩টি রাজ্যে ক্যারাকালের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালের পর থেকে তাদের বিস্তৃতি কমে মাত্র তিনটি রাজ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে, যেখানে টিকে থাকতে পারার মতো সম্ভাব্য জনসংখ্যা রয়েছে মাত্র দুটি অঞ্চলে।
১৯৪৭ সালের আগে, ক্যারাকালের বিস্তৃতি ছিল প্রায় ৮,০০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। ১৯৪৮ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে তাদের বিস্তৃতির পরিমাণ প্রায় ৪৮% হ্রাস পায়। এরপর ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তা আরও প্রায় ৯৬% কমে যায়, ফলে বর্তমানে তাদের বিচরণক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র প্রায় ১৭,০০০ বর্গকিলোমিটারে—যা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের বিস্তৃতির ৫ শতাংশেরও কম।

রাজস্থানের টাইগার রিজার্ভগুলিতে ক্যারাকালের দেখা সাধারণত ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে মিললেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরেও এবং থর মরুভূমিতেও ক্যারাকাল দেখা গেছে।
মার্চ মাসে শাহগড়ের ঘটনার কিছুদিন পর, Wildlife Institute of India জয়সলমেরের মরুভূমিতে একটি ক্যারাকালে গলায় রেডিও কলার পরিয়ে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করে। মধ্য রাজস্থান ও গুজরাটের অর্ধ-শুষ্ক (semi-arid) বাস্তুতন্ত্র ক্যারাকালের আবাসস্থলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
যেখানে বন দপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন যে থর মরুভূমিতে মাত্র তিনটি ক্যারাকাল রয়েছে, সেখানে জয়সলমেরের রামগড়ের কৃষক ও পরিবেশবিদ ছত্তর সিং জাম, যিনি মরুভূমির জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে পরম্পরাগত জ্ঞানে সমৃদ্ধ, তাঁর মতে থর মরুভূমিতে প্রায় ১০০টি ক্যারাকাল থাকতে পারে। তবে তারা মূলত ভারত-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় বাস করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে সাধারণ মানুষ কিংবা বন দপ্তরের কর্মীরা নিয়মিত যাতায়াত বা টহল দেন না, তাই সেখানে ক্যারাকালে প্রকৃত সংখ্যা এখনও অজানা।
ছত্তর সিং জাম এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “যখন একটি ক্যারাকাল বয়স্ক হয়ে যায়, তখন সে সহজ শিকারের খোঁজ করে, যেমন ছাগল বা ভেড়ার বাচ্চা। একবার তারা এ ধরনের শিকারের স্বাদ পেয়ে গেলে বারবার সেগুলোকেই শিকার করে। আর এ কারণেই পশুপালকরা তাদের হত্যা করে।”
অতীতে প্রতিশোধমূলকভাবে ক্যারাকাল হত্যার বিষয়ে তিনি জানান, “কয়েক দশক আগেও গবাদিপশুর মালিক ও রাখালদের হাতে ক্যারাকাল নিহত হওয়ার ঘটনা বেশ সাধারণ ছিল। কোনো ক্যারাকাল যদি অনেক গবাদিপশু মেরে ফেলত, তাহলে মালিকেরা একত্রিত হয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই সেটিকে ঘিরে হত্যা করতো। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে চলতি বছরের মার্চ মাসের এই ঘটনাটিই একমাত্র প্রমাণ-সহ নথিভুক্ত ঘটনা।”
কারাকাল গণনা
গত ১৫ এপ্রিল, কারাকাল সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে প্রজেক্ট কারাকাল (Project Caracal)-এর উদ্বোধনী কর্মশালার আয়োজন হয়েছিল। এতে Wildlife Institute of India (WII), Salim Ali Centre for Ornithology and Natural History (SACON), Rajasthan Forest Department এবং Tiger Watch-এর প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল ক্যারাকাল সংরক্ষণ।
রাজস্থানের অতিরিক্ত প্রধান মুখ্য বন সংরক্ষক (Additional Principal Chief Conservator of Forests) ও প্রধান বন্যপ্রাণ সংরক্ষক (Chief Wildlife Warden) কে সি এ অরুণ প্রসদা আমাদের জানান যে, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে চারটি টাইগার রিজার্ভ জুড়ে ক্যারাকাল গণনা (census) হবে। এই সমীক্ষা পরিচালিত হবে Ranthambore Tiger Reserve এবং Dholpur-Karauli landscape অঞ্চলে অবস্থিত চারটি টাইগার রিজার্ভে—
সোয়াই মাধোপুর টাইগার রিজার্ভ
ঢোলপুর করৌলি টাইগার রিজার্ভ
রামগড় বিষধারী টাইগার রিজার্ভ
মুকুন্দ্রা হিলস টাইগার রিজার্ভ
এছাড়া গবেষকেরা ক্যারাকালএর আবাসস্থল, আচরণ এবং তাদের বিভিন্ন সংকট নিয়ে গবেষণা করবেন, যাতে আগামী দুই বছরের মধ্যে একটি কার্যকর ক্যারাকাল সংরক্ষণ নীতি প্রণয়ন করা যায়।
এ ছাড়াও,থর অঞ্চলে ক্যারাকালের পৃথক গণনা পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প এবং ক্যারাকাল ওয়ার্কিং গ্রুপ (Caracal Working Group) গঠন করা হবে।
রাজস্থানের প্রধান বন সংরক্ষক (Chief Conservator of Forests) অনুপ কুমার জানা যে,
“মার্চ মাসের ওই ঘটনার পর থেকে বন দপ্তরের কর্মীরা প্রতিটি গ্রামে ও বসতিতে গিয়ে ক্যারাকালের ছবি দেখিয়ে মানুষকে সচেতন করছেন। আমরা তাদের বলছি, যদি তারা বিড়ালের মতো দেখতে এমন কোনো বন্য প্রাণী দেখতে পান, তাহলে যেন সঙ্গে সঙ্গে বন দপ্তরকে খবর দেন, যাতে আমরা প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধার করতে পারি। যারা এ ধরনের তথ্য দেবেন, তাদের পুরস্কৃত করা হবে।”

সচেতনতা ও ক্ষতিপূরণ
Tiger Watch সংস্থার নির্বাহী পরিচালক, বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী এবং Caracal: An Intimate History of A Mysterious Cat বইটির অন্যতম লেখক ধর্মেন্দ্র খান্ডাল বলেন,
“আমার বইয়ের ‘Threats in India’ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গুজরাটের কচ্ছের রান অঞ্চলে নথিভুক্ত ১৯টি ক্যারাকালের মধ্যে ৫টিকে গবাদিপশুর ওপর আক্রমণের প্রতিশোধ হিসেবে পশুপালকেরা হত্যা করেছিলেন। একই ধরনের হত্যার ঘটনা রণথোম্বর টাইগার রিজার্ভ এলাকাতেও নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়া তিনটি ক্যারাকালের মৃত্যু সড়ক দুর্ঘটনায় হয়েছিল।”
আরো পড়ুন ক্যারাকাল নিয়ে আমাদের প্রকাশিত বিস্তারিত রচনা: ভারত থেকে কি চিতার মতই হারিয়ে যাবে ক্যারাকালরা?
ক্যারাকাল সংরক্ষণ প্রচেষ্টা সম্পর্কে খান্ডাল বলেন, বন্যপ্রাণীর আক্রমণে গবাদিপশু মারা গেলে যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তা উপভোক্তাদের হাতে পৌঁছাতে অত্যন্ত বেশি সময় লাগে।
তার মতে, “বন দপ্তরের উচিত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করা এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানো। মরুভূমি অঞ্চলের মানুষ প্রায়ই ক্যারাকালকে মরুভূমির সাধারণ বন্য বিড়াল (desert cat) বলে ভুল করেন। তাই এ বিষয়ে জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি, আর এ ধরনের সচেতনতা তৈরির জন্য বিদ্যালয়ই সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান।”
এদিকে, মরুভূমি অঞ্চলে ক্যারাকালের সংখ্যা বেশি দেখা যাওয়ায় তাদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ এবং সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ছত্তর সিং বলছেন যে, “গত কয়েক দশকে মরুভূমি অঞ্চলে বহু উন্নয়নমূলক প্রকল্প, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র (সোলার প্ল্যান্ট), স্থাপিত হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পের জন্য সরকার বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করছে।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকের ধারণা, বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের জন্য জমি অধিগ্রহণে যাতে কোনো বাধা না আসে, সে কারণেই সরকার ক্যারাকালের উপস্থিতি সম্পর্কে নীরবতা বজায় রাখছে।”
গুরু গোবিন্দ সিং ইন্দ্রপ্রস্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের এর সহযোগী অধ্যাপক এবং বন্যপ্রাণীবিজ্ঞানী সুমিত ডুকিয়া ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপের ওপর জোর দিত বলছেন। তাঁর মতে,“সময়মতো ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি এবং একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে Border Security Force (BSF)-এর সঙ্গেও সমন্বয় জরুরি, কারণ ক্যারাকালের আবাসস্থল ভারতের আন্তর্জাতিক ভারত–পাকিস্তান সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত রোধ করতে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা অবিলম্বে চালু করা উচিত। এতে পশুপালকেরা প্রতিশোধমূলকভাবে ক্যারাকাল হত্যা থেকে বিরত থাকবেন এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। শাহগড়ে ক্যারাকালের হত্যার ঘটনাটি ভারতে খুবই বিরল একটি ঘটনা। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সবার সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।”
মূল প্রবন্ধটি Mongabayপত্রিকায় প্রকাশিত। ইংলিশ প্রবন্ধটির অনুমতিক্রমে অনুবাদ করা হল বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য। মূল প্রবন্ধটির লিঙ্ক: https://india.mongabay.com/2026/06/crime-against-caracal-sparks-a-census-project-for-the-cat/







Comments