কাজিরাঙ্গায় সাফারি হাতির হঠাৎ মৃত্যু প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে এই ধরনের পর্যটন নিয়ে
- ..
- 1 day ago
- 5 min read
Updated: 14 hours ago
স্বর্ণময়ী। কাজিরাঙ্গায় মানুষ পিঠে নিয়ে সাফারি করাতে নিয়ে যাওয়া এক বয়স্কা হাতি। ছিল। আর নেই। গত ডিসেম্বারে এক সকালে পর্যটকদের পিঠে নিয়ে ঘুরিয়ে এনে শ্বাসের সমস্যায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। উঠে এল বিনোদনের জন্য হাতিদের কেমন দুর্দশায় পড়তে হয় তার প্রসঙ্গ । লিখছেন নবারুণ গুহ।

২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর সকালে, স্বর্ণময়ী নামে ৫০ বছর বয়সী একটি সাফারি হাতি আসামের কাজিরাঙা ন্যাশনাল পার্কে (KNP) পর্যটকদের নিয়ে দুই দফা ভ্রমণ সম্পন্ন করেছিল অরণ্যে। এরপর হঠাৎই সে ন্যাশনাল হাইওয়ে-৭১৫-এ পড়ে যায়। চিকিৎসার পর সে অল্প সময়ের জন্য আবার দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু পরে আবার পড়ে যায় এবং এবার আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি।
আমাদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে, কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যানের পশুচিকিৎসক ডাঃ এস. বড়গোঁহাই, যিনি হাতিটিকে চিকিৎসা করেছিলেন, বলেন, “আমাদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, হাতিটির মৃত্যু শ্বাসকষ্টজনিত কারণে হয়েছে। আমরা ময়নাতদন্ত করেছি, তাতে বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা নাকচ হয়েছে। এর পাচনতন্ত্রে পাওয়া উপাদান থেকে এমন কোনো ইঙ্গিত মেলেনি যে হাতিটি ঠিকমতো খাচ্ছিল না। আমরা এর লিভার, ফুসফুস, প্লীহা, কিডনি প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সংগ্রহ করেছি এবং ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে আরও প্যাথলজিকাল পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি।”
কাজিরাঙ্গার বাগোরি (পশ্চিম রেঞ্জ)-এর রেঞ্জ অফিসার বিজিত দিহিঙ্গিয়া জানান, “ কাজিরাঙ্গায় পর্যটন মরশুমে (নভেম্বর-মে) হাতির সাফারির ব্যাপক চাহিদা থাকে।” হাতির সাফারি মূলত দুইটি রেঞ্জে পরিচালিত হয়—বাগোরিতে (পশ্চিম রেঞ্জ) বেসরকারি পরিচালকদের মাধ্যমে এবং কোহোরায় (মধ্য রেঞ্জ) বন দফতরের মাধ্যমে। “সাধারণত প্রতিদিন হাতিগুলিকে দুই দফা (ভোর ৫টা থেকে ৬টা এবং ৬টা থেকে ৭টা) পর্যটক বহন করতে হয়, তবে সপ্তাহান্তে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার কারণে তাদের তিন দফা সাফারিতে ব্যবহার করা হয়,” দিহিঙ্গিয়া বলেন।
তিনি আরও জানান, “বর্তমানে ৩৯টি হাতি বেসরকারি পরিচালকদের হয়ে সাফারি চালাচ্ছে। একটি হাতি প্রতি দফায় চারজন প্রাপ্তবয়স্ক পর্যটক বহন করে, আর ছোট হাতিগুলি তিনজন করে বহন করে। প্রতি ব্যক্তি প্রতি দফায় খরচ ₹১,৩৫০।”
কাজিরাঙ্গা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১,৪৬,১৫৭ জন পর্যটক পার্কে এসেছিলেন, যার মধ্যে ১,৩৪,৪৫৮ জন ভারতীয় এবং ৬,৬৯৯ জন বিদেশি পর্যটক।
তবে স্বর্ণময়ীর এই দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু একদিকে সাফারিতে ব্যবহৃত হাতিদের প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, অন্যদিকে এই সাফারির সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকা সংক্রান্ত বিষয়গুলিকেও সামনে এনেছে।
হাতির সাফারি
বিশিষ্ট সংরক্ষণবিদ, ষাতি বিশেষজ্ঞ ও মহুত Parbati Barua বলেন, “একটি হাতি দিনে সর্বোচ্চ দু’টি ট্রিপ করতে পারে এবং কোনো অবস্থাতেই তাকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়। এরা জীবন্ত প্রাণী, যন্ত্র নয়। এই ক্ষেত্রে মহুতদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” হাতি ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে তাঁর কাজের জন্য তিনি পদ্মশ্রী পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছেন।
কাজিরাঙার বাসিন্দা সমাজকর্মী প্রণব দোলে বলেন, “হাতির সাফারি অনেক মানুষের জীবিকার উৎস—বিশেষ করে মহুতদের জন্য, যাদের অন্য পেশায় চলে যাওয়া কঠিন। তবে একইসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যে হাতিগুলির যথাযথ যত্ন নেওয়া হচ্ছে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “মহুতদের যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। সরকারকেও এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে এই হাতিগুলির সঠিকভাবে যত্ন নেওয়া যায়।”

সাফারি হাতিদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ
স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর ঘটনায় গভীরভাবে ভেঙে পড়েছেন পিংকু আলি, সেই ট্যুর অপারেটর যিনি মৃত হাতিটিকে কাজে লাগাতেন। কাজিরাঙার বাসিন্দা আলি গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর প্রসঙ্গে আলি বলেন, “এর আগে ওর কোনো অসুস্থতা ছিল না, কিন্তু সেদিন সকালে ট্রিপ শেষ করার পর হঠাৎ কাঁপতে শুরু করে এবং মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আমরা পশুচিকিৎসককে ডাকি, তিনি ইনজেকশন ও স্যালাইন দেন। কিছুক্ষণ পরে সে উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু আবার পড়ে যায়।”
পশুচিকিৎসক ডাঃ বড়গোহাই আরও জানান, যদিও হাতিটির শরীরে কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ ছিল না, কিন্তু যেভাবে তাদের রাখা হয় তা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, “হাতিগুলোকে প্রায়শই হাইওয়ের পাশে বেঁধে রাখা হয়। সারারাত বড় বড় যানবাহন—যেমন ট্রাক ও লরির চলাচলের কারণে তারা প্রচণ্ডভাবে বিরক্তির সম্মুখীন হয়। ঠিকমতো ঘুম না হওয়ার পরেও ভোর ৩টায় কাজিরাঙার ঠান্ডা ও কুয়াশার মধ্যে তাদের উঠতে হয়, কারণ সকাল ৫টার সাফারির জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। এতে প্রচণ্ড চাপ ও ক্লান্তি তৈরি হয়।”
বড়গোঁহাই আরও জানান যে পর্যটন মরশুম শুরু হওয়ার আগে হাতিগুলিকে তিনজন পশুচিকিৎসকের একটি কমিটির মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়—একজন বন দফতর থেকে, একজন সেন্টার ফর ওয়াইল্ডলাইফ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড কনজারভেশন (CWRC) থেকে এবং একজন কোহোরার প্রাণিসম্পদ দফতর থেকে। এরপর দেড় মাস পর আবারও একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। তিনি জানান, “স্বর্ণময়ী এই দুই পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হয়েছিল।”
বেসরকারি সাফারি মালিক বিমল শর্মা বড়গোঁহাইয়ের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, “আমরা ঠিক রাস্তার ধারে তাদের রাখি না। আমরা প্রায় ১০০–২০০ মিটার দূরে বেঁধে রাখি। বন দফতরের হাতিগুলো তাদের ট্রিপ শেষে জঙ্গলে বিচরণ করতে পারে, কিন্তু আমাদের হাতিগুলোকে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।”
শর্মার মতে, চলতি পর্যটন মরশুমে স্বর্ণময়ীই প্রথম সাফারি হাতি যার মৃত্যু হয়েছে।
কাজিরাঙা ন্যাশনাল পার্কে পূর্বে কর্মরত এক সিনিয়র বনকর্তা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক. বলেন, “বেসরকারি সাফারি মালিকরা তাদের হাতিদের মূলত শুধু কলা খাওয়ান, যা একেবারেই স্বাস্থ্যকর নয়। একটি হাতি প্রতিদিন ২০০ কেজিরও বেশি খাদ্য গ্রহণ করে এবং তাদের ৩০-৪০ ধরনের খাবারের প্রয়োজন হয়। বন দফতরের হাতিগুলো সাফারির পর জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়, ফলে তারা এই বৈচিত্র্যময় খাদ্য পায়। কিন্তু বেসরকারি মালিকানাধীন হাতিদের কোনো চরানোর জায়গা নেই, তাই তারা পর্যাপ্ত খাবার পায় না।”
মহুতের ভূমিকা
পিংকু আলি জানান, মৃত স্বর্ণময়ীর মহুত হেমচন্দ্র হাতিটির মৃত্যুর পর ভেঙে পড়ে নিজের বাড়ি মঙ্গলদইয়ে ফিরে গেছেন। একটি বেসরকারি মালিকানাধীন হাতির মহুত হওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়।
বলরাম ডেকা, যিনি ১৯৮৬ সাল থেকে এই পেশায় রয়েছেন, বলেন, “আমি বর্তমানে ‘গৌরীমা’ নামে একটি হাতির দেখাশোনা করি। আমি প্রায় তিন দশক ধরে এই হাতিটিকে চিনি। আমার বাড়ি দরং জেলার নামখোলায়, এবং অফ-সিজনে হাতিটি আমার সঙ্গেই থাকে। এর মালিক আমাকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন।”
ডেকা আরও জানান, নভেম্বর মাসে পর্যটন মরশুম শুরুর আগে হাতিটিকে নিয়ে কাজিরাঙা পৌঁছাতে তাঁর ১০ দিন সময় লেগেছিল।
ডেকা বলেন, “একজন মহুতকে তার দায়িত্বে থাকা হাতির সমস্ত কিছুই দেখাশোনা করতে হয়। প্রতিদিন ভোর ৩টায় উঠে আমাদের হাতিটিকে সকাল ৫টার সাফারির জন্য প্রস্তুত করতে হয়। তার খাবার ও স্নানের ব্যবস্থাও আমাদেরই করতে হয়। পিঠে পর্যটক নিয়ে আসন বহন করা হাতির যকৃৎ এর (লিভারের) ওপর অনেক চাপ ফেলে। তাই আমরা প্রতি তিন মাস অন্তর লিভারের জন্য টনিক দিই। এছাড়াও, গরম জলের সঙ্গে একটি লোশন মিশিয়ে তার পিঠে মালিশ করি, যাতে ব্যথা কিছুটা কমে।”
মহুতদের আয়ের বিষয়ে সাফারি মালিক শর্মা বলেন, “আমরা মহুতদের মাসিক ₹১৫,০০০ বেতন দিই এবং অতিরিক্ত ₹৫,০০০ রেশন বাবদ দিই। এছাড়াও পর্যটকদের—বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের—দেওয়া টিপস থেকেও তারা ভালো আয় করে। পর্যটন মরশুমে একজন মহুত প্রায় ₹৩,০০,০০০ পর্যন্ত উপার্জন করতে পারেন।”
তবে ডেকা জানান, বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে টিপস পাওয়ার সুযোগ এখন কমে গেছে। তিনি বলেন, “এখন বিদেশি পর্যটকদের বন দফতর কোহোরায় সরকারি সাফারিতে নিয়ে যায়।”
জীবিকা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে হাতির সাফারি আর তেমন লাভজনক নয় বলে জানিয়েছেন পিংকু আলি। তিনি বলেন, “মহুতদের বেতনসহ হাতির পিছনে প্রতি মাসে প্রায় ₹৯০,০০০ খরচ হয়, আর আয় হয় প্রায় ₹১,২০,০০০—যা খুব বেশি নয়। জিপ সাফারির প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। আগে যেখানে ১০০টি জিপ ছিল, এখন তা বেড়ে ৬০০ হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি সাফারির সব হাতি মিলিয়ে হয়তো ৩০০ জন পর্যটককে বহন করা যায়, অথচ প্রতিদিন পার্কে ৬,০০০ থেকে ১২,০০০ পর্যটক আসে।”
তবে এত সমস্যা সত্ত্বেও আলি জানান, অন্য কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তিনি এই পেশায় রয়েছেন। তিনি বলেন, “কাজিরাঙার আমাদের মতো স্থানীয়দের জন্য পর্যটন ও কৃষিই আয়ের একমাত্র ভরসা।” শর্মার মতে, কাজিরাঙায় প্রায় ২০ জন স্থানীয় ব্যক্তি বেসরকারি হাতির সাফারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে রেঞ্জার দিহিঙ্গিয়া মনে করেন, জনসাধারণের চাহিদা থাকার কারণেই এখনও হাতির সাফারি চালু রয়েছে।

শর্মা আরও বলেন, “খরচ বাড়ার কারণে হাতি পালন করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। যদি কাজিরাঙায় হাতির সাফারি বন্ধ হয়ে যায়, তবে মালিকরা হাতিগুলোকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, মন্দিরে পাঠাতে পারেন অথবা নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশের অবৈধ করাতকলগুলোতে অত্যন্ত খারাপ পরিস্থিতিতে কাজে লাগানো হতে পারে।”
তিনি আরও জানান, “অফ-সিজনে অনেক হাতিকেই রাস্তায় ভিক্ষা করতে দেখা যায়। পর্যটন মরশুমে ভালো আয় অন্তত বছরের বাকি সময়ে এই হাতি ও তাদের মহুতদের টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।”
মূল প্রবন্ধটি Mongabayপত্রিকায় প্রকাশিত। ইংলিশ প্রবন্ধটির অনুমতিক্রমে অনুবাদ করা হল বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য। মূল প্রবন্ধটির লিঙ্ক: https://india.mongabay.com/2026/01/elephants-death-spotlights-conditions-in-safari-tourism/








Comments