top of page

হাতি বারান্দায় মানুষ

  • ..
  • 3 days ago
  • 9 min read

Updated: 2 days ago

ভারতবর্ষের যে সব রাজ্যের অরণ্যে প্রাকৃতিক ভাবে হাতি পাওয়া যায় মহারাষ্ট্র তার অন্তর্ভুক্ত ছিলনা। ছিল না মধ্য প্রদেশেও। অথচ বিগত দশকগুলোয় হাতির আনাগোনা হচ্ছে সেই সব স্থানে যেখানে ঐতিহাসিকভাবেই হাতি থাকত না। কেন হচ্ছে এমন ঘটনা? হাতিদের কোন চরিত্র এই রকম করতে বাধ্য করছে তাদের? বনদপ্তরই বা কিভাবে সামাল দিচ্ছে নতুন অতিথিদের। খতিয়ে আলোচনা করলেন অভিজ্ঞ আই এফ এস অফিসার নীল মজুমদার




ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় জল খেতে উঠেছিল মারুতরাও। সেই সময় সড়সড়, পটপট এই জাতীয় শব্দ শুনে রীতিমত চমকে উঠল। তাইতো, কিসের শব্দ! আর আসছেই বা কোত্থেকে! জানলার সামনে দাঁড়িয়ে, ঠাহর করার চেষ্টা করল কিছুক্ষণ। থমথমে নিশুত রাত, এমনিতে শব্দহীন, শুনশান। তারই মধ্যে যেন গাছের ডালপালা সরিয়ে, ভেঙ্গে তছনছ করার সড়সড় মচমচ শব্দ, আসছে খুব কাছ থেকেই। ক্ষেত থেকে নয়তো! কথাটা মনে হতেই গায়ে কাঁটা ফুটল মারুতরাওয়ের। লাগোয়া দু কাঠা জমিতে কলার ফসল একেবারে তৈরি। তার ওপাশে আখ। সেখানেই ঢুকে, এই অন্ধকারে কেউ …!গাঁয়ে শত্তুরের তো অভাব নেই। আচ্ছা! ঘুঘু দেখেছ বাপ, ফাঁদ দেখনি এখনও। খাটের নিচে রাখা ‘দা টা টেনে বার করতে করতে মারুতরাও হাঁক দিল, কিষুণ, কিষুণ রে !

মারুতরাও, ছেলে কিষুণ, কিষুণের বন্ধু গোপাল, পাশের নানাজী এই রকম সাত আটজন বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। কারোর হাতে ‘দা, কারোর লাঠি, কারোর হাতে বড় টর্চ। ঘোলাটে জ্যোৎস্নায় নির্জন নিঃশব্দ চারিদিক। কোথায় যেন একটা প্যাঁচা ডাকল কর্কশ ভাবে। মারুতরাওয়ের বাড়ির আরও তিনটে বাড়ি পরে ঝাঁকাল বাঁশ ঝাড়। সেখান থেকে কাঁচা রাস্তা বাঁক নিয়েছে ডান দিকে। আরও একটু এগিয়ে প্রথমে মারুত তারপর গোপালদের ক্ষেত। পায়ে পায়ে চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে যা দেখল ওরা, সহজে বিশ্বাস হয়না। একি স্বপ্ন, না সিনেমা? অন্ধকারে গাছপালায় যথাসম্ভব গা মিশিয়ে ক্ষেতের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে যমদূতের মত তিনটি হাতি।

হাতের লাঠি থাকল হাতেই। টর্চ জ্বালানর সাহস কারোর হলনা। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে পেছন ফিরল ওরা। ঘরে ফিরেও বুকের ধুকপুক থামেনা।

বেশ কয়েক বছর আগে, মাহারাষ্ট্রের সিন্ধুদুর্গ জেলার মাঙ্গোলি গ্রামে মারুতরাওদের এই প্রতিক্রিয়া খুব একটা অস্বাভাবিক বলা চলেনা। কারণ সিনেমা টিভির পর্দায় এবং দু একবার সার্কাসে ছাড়া হাতি দেখার কোনো অভিজ্ঞতা ওদের হয়নি। তাও শেখানো পড়ানো হাতি নয়, জঙ্গলের নির্ভেজাল হাতি। ভারতবর্ষের যে সব রাজ্যের অরণ্যে প্রাকৃতিক ভাবে হাতি পাওয়া যায় মহারাষ্ট্র তার অন্তর্ভুক্ত ছিলনা। ছিলনা, বলতেই হবে কারণ একরাত্রে দেখা দুঃস্বপ্নের মত ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। তারপর আসেপাশের কোণাল, খনিয়ালে, শিরঙ্গে, পিকোলি, সোনাবল এই সব গ্রামে বার বার দেখা গেছে তাদের। কখনও কলার ক্ষেতে, কখনও আখের ক্ষেতে, কখনও কাজু বাগানে, কখনও ধান জমিতে। সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল, সংসারের অবলম্বন, ভেঙ্গে, খেয়ে ,ছিঁড়ে, মাড়িয়ে তছনছ করেছে তারা যথেচ্ছ ভাবে। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে পার্শ্ববর্তী কোলহাপুর জেলার মাডবলে, তুড়িয়ে, জঙ্গমহাটি, কলসগাদে, ইত্যাদি গ্রামেও। ক্রমশঃ এদের সংখ্যা বেড়েছে। সিন্ধুদুর্গ এবং কোলহাপুর এই দুটি জেলা মহারাষ্ট্রের দক্ষিণ প্রান্তে, কর্ণাটক রাজ্যের গা ঘেঁষে। দুঃস্বপ্নের এই হাতিগুলিও মহারাষ্ট্রে এসেছিলকর্ণাটক থেকেই।


জঙ্গলের কোন অংশে রয়েছে কচি ঘাস, কোথায় সবুজ পাতার অফুরন্ত ভান্ডার, কোনদিকে গেলে সহজে পৌঁছনো যাবে জলাশয়ের কাছাকাছি, দলনেত্রীর স্মৃতিতে এই সব তথ্য চমৎকার ভাবে সাজিয়ে রাখা থাকে। শুধু তাই নয়, বছরের কোন সময়, কোনদিকটা শুকনো, কোনদিকে কোনসময় আগুন লাগে এই সব অতি আবশ্যক খবরও তার নখ দর্পনে।

অতঃপর মনে প্রশ্ন জাগে, হাতিরা হঠাৎ কর্ণাটক থেকে মহারাষ্ট্রে চলে এসেছিল কেন? আর যদিবা চলে এল, তারা ফিরে গেলনা কেন?

এর মধ্যে প্রথম প্রশ্নটির উত্তর খুব একটা কঠিন নয়, কারণ হাতিদের জন্যে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। হাতিরা ভ্রাম্যমান, খাঁটি পরিযায়ী। বন থেকে বনান্তরে ঘুরে বেড়ান এটা তাদের শখ নয়, জীবন ধারণের জন্যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং বিশিষ্ট একটি উপায় মাত্র। এবং হাতিদের কাছে মহারাষ্ট্র- কর্ণাটকের সীমা টীমা এসব কোন ব্যাপারই নয়। হাতির এই ‘পরিভ্রমণ’ নিয়ে এইখানে আরও কয়েকটি জরুরী কথা সেরে নেওয়া যেতে পারে।

পূর্ণবয়স্ক একটি ভারতীয় হাতি সারাদিনে প্রায় ২৫০ থেকে ২৮০ কিলো খাবার খায়, যার মধ্যে, ঘাস, পাতা, ফুল, গাছের ছাল, ফল, গাছের শেকড় সবই আছে। যদিও এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ তারা হজমই করতে পারেনা। কিন্তু হজম শক্তির এই দুর্বলতার সঙ্গে ভারসাম্য রাখার জন্যে এতখানি খাবার তাদের খেতেই হয়। হাতিরা আট দশ থেকে কুড়ি পঁচিশটির দলে একসঙ্গে থাকে। দীর্ঘদিন হাতিদের খাওয়া দাওয়া পর্য্যবেক্ষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে হাতিরা অমিতব্যায়ী। তারা যতটা খায়, ভেঙ্গে, ফেলে, ছড়িয়ে নষ্ট করে তার থেকে অনেক বেশি। অর্থাৎ সোজা গণিতের হিসেবেই বোঝা যাচ্ছে, এতগুলি হাতিকে জঙ্গলের কোনো একটি বিশিষ্ট অংশে খুব বেশি দিন ‘অতিথি’ করে রাখা কোনো জঙ্গলের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই হাতিরা কিছুদিন পর পর অরণ্যের এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে বিচরণ করে।

শরীর কেন্দ্রিক এই অদ্ভুত প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে একেবারে মানানসই হাতির অসাধারণ স্মৃতি শক্তি। মাতৃ-তান্ত্রিক হাতি সমাজে দলের নেতৃত্বে সব সময় থাকে একটি বয়স্কা মহিলা হাতি। জঙ্গলের কোন অংশে রয়েছে কচি ঘাস, কোথায় সবুজ পাতার অফুরন্ত ভান্ডার, কোনদিকে গেলে সহজে পৌঁছনো যাবে জলাশয়ের কাছাকাছি, দলনেত্রীর স্মৃতিতে এই সব তথ্য চমৎকার ভাবে সাজিয়ে রাখা থাকে। শুধু তাই নয়, বছরের কোন সময়, কোনদিকটা শুকনো, কোনদিকে কোনসময় আগুন লাগে এই সব অতি আবশ্যক খবরও তার নখ দর্পনে। এসব এখন আর মানুষের ধারণা বা মজার গল্প নয়, প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। এই দুর্দান্ত স্মৃতির ভিত্তিতেই দল নেত্রী তার দলবল নিয়ে স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়।


বন্য হাতিকে সাময়িক ভাবে অজ্ঞান করে তার গলায় রেডিও ট্রান্সমিটার যুক্ত একটি কলার পরিয়ে দেবার প্রয়োগটিকে বলা হয়, ‘রেডিও কলারিং’। জ্ঞান ফিরে আসার পর, এই হাতি আবার দলে ফেরে এবং তার স্বভাব অনুযায়ী ঘুরেও বেড়ায় যথারীতি। কিন্তু রেডিও ট্রান্সমিটার থেকে পাওয়া সিগন্যাল, রিসিভারের সাহায্যে গ্রহণ করে জানা যায় তার অবস্থান। এইভাবে দীর্ঘদিন তথ্য সংগ্রহ করে এবং পরে তা সরজমিনে তদন্ত করে হাতি সম্মন্ধে জানা গেছে নানা মূল্যবান কথা। আফ্রিকার মালি অঞ্চলের হাতিরা বছরে ৪৫০ কিলোমিটার এবং ভারতীয় হাতির কোন কোন দল বছরে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার ভ্রমণ করে কিংবা চীনের হাতিরা ২০২২ সালে তাদের সক্রিয়তার স্থানগুলি প্রায় ৫০০ কিলোমিটার উত্তরে সরিয়ে নিয়েছিল এবং উত্তরাখন্ডের হাতিরা তাদের বাসস্থান হিমালয়ের নিম্ন উচ্চতা থেকে মধ্যম উচ্চতার দিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ২০২০ সালে, জানা গেছে এই ধরণের গবেষণায়।


পড়ুন লেখকের অন্য রচনা: ছোট গল্প: ভালো থেকো ইসমাইল ভাই



কেরালার অরণ্য থেকে হাতিদের চিহ্নিত একটি দল প্রতি বছর আগষ্ট মাসেই তামিলনাডু বেড়াতে যায় কিংবা তামিলনাডুর নীলগিরি অঞ্চলের হাতিরা বর্ষা শুরু হতেই পোকামাকড়ের কামড়ে উত্ত্যক্ত হয়ে এভারগ্রীণ অরণ্য থেকে অপেক্ষাকৃত শুকনো অরণ্যে চলে যায় এই জাতীয় তথ্যও মানুষ জানতে পেরেছে। বিশেষজ্ঞরা এও জানিয়েছেন যে হাতিরা মোটামুটি ভাবে জীবনের ৭৫ শতাংশ ভ্রমণকরেই কাটায়। হাতিদের এই ভ্রমণ অনেক সময় বৃত্তাকার পথে ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে ঘুরে সম্পন্ন হয়।

বন থেকে বনান্তরে যাওয়ার জন্যে যে সব পথ বা নিরিবিলি যে সব জায়গা গুলি হাতিরা ব্যাবহার করে, বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা তার নাম দিয়েছেন, ‘এলিফ্যান্ট- করিডোর’, সাদা বাংলা ভাষায় বলা যেতে পারে, ‘হাতি বারান্দা’। গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রায় ১৫০ টি হাতি বারান্দা রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে পশ্চিম বাংলায়(২৬টি)। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ নিয়মিত ব্যাবহৃত। আবার এও সত্যি, ব্যাবহৃত সব পথগুলি যে প্রতি বছর ব্যাবহার করা হবে ‘তা নয়। সমান্তরাল অন্য পথ বেছেনেওয়ার পদ্ধতিও আছে। এমনকি হাতিদের একটি দলের একটি পরিক্রমা যে বাৎসরিক হতে হবে তার কোনো মানে নেই, দু’ তিন বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় নিয়েও একটি পরিক্রমা সম্পন্ন হতে পারে।

বলাবাহুল্য, মানুষ ‘গজ গামিনী নারী’ সম্মন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল হলেও গজ গমনের এই কূটকচালি তথ্য সকলের গোচর নয়, হওয়ার কথাও নয়। তাছাড়া, স্বভাবসিদ্ধ ভাবে মানুষ জবর দখল বা গেড়ে বসার নীতিতে বিশ্বাসী। তাই সজ্ঞানে হোক, অজ্ঞানে হোক, ব্যক্তিগত স্বার্থে হোক বা সামুদায়িক প্রয়োজনে হোক, মানুষ ঢুকে পড়েছে সেই সব ‘বারান্দায়’ এবং ত্বরায়িত করেছে ‘হাতি- মানুষ সংঘাত’।

মহারাষ্ট্রের সিন্ধুদুর্গ, কোলহাপুর, রত্নাগিরি বা সাঙ্গলি জেলায় হাতিদের এই উপদ্রবও নতুন হলেও অভূতপূর্ব কিংবা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। তৎকালীন মধ্যপ্রদেশের সরগুজায় অবিভক্ত বিহার থেকে হাতি ঢুকে পড়া এবং এই ক্ষয় ক্ষতি নিয়ে লেখা পড়া হয়েছে বিস্তর। তামিলনাডু, কর্ণাটক, কেরালার যথাক্রমে মধুমালাই, বন্দীপুর ও বায়নাড অঞ্চলের মধ্যে রাজ্যসীমার তোয়াক্কা না করে হাতিদের নিত্য যাতায়াত লেগেই আছে। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামে, ক্ষেতেখামারে হাতি ঢুকে তান্ডবলীলা করার খবর সংবাদপত্রের নিয়মিত শিরোনাম। এই একই সমস্যার অসংখ্য উদাহরণ প্রায়ই শোনা যায়, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, আফ্রিকার হাতি অঞ্চল থেকে।

পরিবেশ এবং বিবর্তমান সময়ের সঙ্গে হাতির সম্পর্কও অন্যান্য বন্যপ্রাণিদের তুলনায় ভিন্নতর। হাতি প্রাণিটিকে জীববিজ্ঞানীরা রেখেছেন ‘এলিফ্যান্টায়ডি’ (Elephantidae) পরিবারে। উল্লেখ করা উচিত হবে, এই পরিবারে হাতির আরও যে সব জ্ঞাতিগুষ্টিরা ছিল, পৃথিবী ও পরিবেশের বিবর্তন তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে বহুকাল আগেই। সব শেষ আত্মীয়রা মারা গেছে অন্তত দশ হাজার বছর আগে। এমনকি, হাতিদেরও মাত্র দুটি মুখ্য প্রকার (Genus) পৃথিবীর দুটি অঞ্চলে সীমিত হয়ে রয়ে গেছে। প্রথমটি, আফ্রিকার হাতি, ল্যাক্সডোন্টা (Laxodonta) আর দ্বিতীয়টি এশিয়ার হাতি, এলিফাস (Elephas). আফ্রিকার হাতির দুটি প্রজাতি, Laxodonta Africana আর Laxodonta cyclotis এবং এশিয়ার হাতির একটিই প্রজাতি, Elephas maximus, সারা বিশ্বে পর্বত প্রমাণ এই প্রাণিটির মাত্র তিনটিই প্রজাতি।

 আফ্রিকার হাতি
আফ্রিকার হাতি


এশিয় হাতি যা কিনা একদা পশ্চিমে ইরাক, সিরিয়া থেকে পূর্বে চীনের পীত সাগর অবধি অবাধে বিচরণ করত, এখন সীমিত রয়ে গেছে ভারত- ভিয়েতনামের মধ্যবর্তী অঞ্চলটুকুতে। ( এ বছর অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হাতির আদমসুমারি অনুযায়ী ভারতে হাতির মোটামুটি একটা সংখ্যা আন্দাজ করা হয়েছে প্রায় বাইশ হাজার চারশো পঞ্চাশের কাছাকাছি, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাতি রয়েছে কর্ণাটক রাজ্যে)। হাতিদের এখনও টিকে থাকাটাই যে একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার, এই কথাগুলি সেইদিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। অতিকায় শরীর, প্রচুর খাদ্য ও পানীয়ের প্রয়োজনীয়তা, অতিকায় শরীরের অনেকগুলি প্রাণি একসঙ্গে আশ্রয় পেতে পারে এমন ঘন জঙ্গলের অপ্রাচুর্য্য, এই সব কথাগুলিই হাতির বিপক্ষে। এছাড়াও আছে। প্রায় ৭০ বছর পরমায়ুর হাতিদের দীর্ঘজীবি বলা চলে। কিন্তু, জীববিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন হাতিদের প্রজনন পরাক্রম খুব বেশি নয়। দীর্ঘ মেয়াদি গর্ভাবস্থা, একবার সন্তান উৎপাদনের পর প্রায় চার বছরের দীর্ঘ বিশ্রাম, ইত্যাদি কারণে সারা জীবনে চার বা পাঁচটির বেশি সন্তান উৎপন্ন করার ক্ষমতা থাকেনা স্ত্রী হাতিদের। এই সমস্ত দিক বিবেচনা করে গবেষকরা মত প্রকাশ করেছেন, বিবর্তনশীল এই পৃথিবীতে হাতিরা ক্রমশঃ অচল হয়ে আসছে। অনেকে আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, হাতিরা বস্তুত ‘লিভিং ফসিল’ নিজেদের যুগকে অতিক্রম করে বেঁচে আছে তারা।

অন্যপক্ষে, মানুষের দিকটাও একটু ভেবে দেখা দরকার। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সভ্যতার অগ্রগতির তার প্রয়োজন ও চাহিদা বেড়েছে। গ্রামের সঙ্গে অরণ্যের বিরাট ব্যাবধান মুছে গিয়ে অরণ্যের সীমার ভেতর গ্রাম ও গ্রামের ক্ষেত খামার হাত বাড়িয়েছে। তাছাড়া, রাস্তা তৈরি, রেল লাইন স্থাপন, নানা আকারের সেচ প্রকল্প, খনি ও কল কারখানা, মানুষ ঘটিত এই সব ক্রিয়া কলাপের জন্যেই প্রয়োজন জমির যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অরণ্যের জমি থেকে নেওয়া হয়েছে। অরণ্যের একমাত্র অংশীদার বা বলা যেতে পারে অরণ্যের একছত্র অধিকারী না হয়েও মানুষ তার বিভিন্ন কাজে অরণ্যের জমি ব্যাবহার করে বসে আছে, এখনও করছে। যে অনুপাতে জনসংখ্যা বেড়েছে সেই অনুপাতে যে আর্থিক বিকাশ হয়নি, সে কথা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে! বস্তুতঃ, হাতির বাসস্থানই হল, ‘অনগ্রসর’বলে চিহ্নিত দেশ গুলিতে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় এও দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ বাস করে হাতির বাসস্থানের ভেতরে অথবা কাছাকাছি। সুতরাং হাতি ও মানুষের সংঘাত নেহাত অস্বাভাবিক বলা চলেনা।

মানুষ যেখানে হাতি বারান্দায় অনাধিকার প্রবেশ করেছে, সেখানে সংঘাত ঘনিয়ে এসেছে, একথা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু যেখানে এমনটি হয়নি সেখানেও কেন এই কালান্তক প্রাণিটির সম্মুখীন হতে হয়েছে মানুষকে? এই প্রসঙ্গে মহারাষ্ট্রের উদাহরণটি ভবে দেখা যেতে পারে। এই রাজ্যের কোন জঙ্গলে (যে ঘটোনার উল্লেখ করেছি শুরুতেই তার আগে) গত দুই বা আড়াই শতকে কোথাও কোনো হাতি দেখতে পাওয়া যায়নি। (অবশ্য, অতীতে কখনও যে ছিল একথা জানা যায় জীবাশ্ম থেকে)। তাই কোলহাপুর বা সিন্ধুদুর্গ জেলার মানুষরা জোর করে হাতির রাজ্যে অনুপ্রবেশ করে ভাগ বসিয়েছে, একথা খুব একটা যুক্তি সঙ্গত মনে হয়না। অথচ তার জন্যে যা খেসারত দিতে হয়েছে তা রীতিমত বেদনা দায়ক। মারা গেছেন দু’জন নির্দোষ মানুষ, গুরুতর আহত হয়েছেন অনেকে। ফসলের বার্ষিক ক্ষতির যে হিসাব কষা হয়েছে বন দফতরের কাগজ পত্রে তাও যথেষ্ট চিন্তজনক।

বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ অধিনিয়ম (১৯৭২) অনুযায়ী হাতি ‘প্রথম সিডিউলের’ প্রাণি। তাকে মারা, আঘাত করা, বন্দী করা, বিষ প্রয়োগ বা অন্য কোনো ভাবে তার ক্ষতি করা গর্হিত এবং দন্ডনীয় অপরাধ। তাই কোলহাপুর সিন্ধুদুর্গের সেইসব ক্ষতিগ্রস্থ মানুষরা বনবিভাগের সাহায্যে কাজে নেমে পড়েছিল ঠিকই কিন্তু তাদের প্রয়াস সীমিত ছিল ঢাকঢোল কাঁসর বাজিয়ে, ক্যানেস্ত্রা পিটিয়ে, প্রবল আওয়াজের ফটকা ফাটিয়ে, লঙ্কা বা এই জাতীয় কিছু পুড়িয়ে ধোঁওয়া করে হাতিদের ভয় দেখিয়ে খেদিয়ে দেওয়ার মধ্যেই। হাতি হামলায় ভারতবর্ষের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ রাজ্য, পশ্চিম বাংলা থেকে আধিকারিক এবং কর্মচারীদের একটি দলকে আমন্ত্রিত করা হয়েছিল। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্থ গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাঁদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। অন্য অনেকে আবার কৃষকদের ফসল বদলানর উপদেশ দিয়ে, আখ, কলা ইত্যাদির বদলে হাতির প্রিয় নয় এমন ফসল যেমন, তামাক, লঙ্কা, ইত্যাদি লাগাতে বলছেন। নানা রকম চেষ্টা করা হয়েছে ও হচ্ছে। হাতিরাও সাময়িক ভাবে সরে গেলেও এলাকা ছেড়ে চলে যায়নি।

ইতিমধ্যে আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালে মহারাষ্ট্রের একেবারে অন্য প্রান্তে, অরণ্য অধ্যুষিত গড়চিরোলি জেলায়, (ওড়িষ্যা থেকে) ছত্তিশগঢ হয়ে ঢুকে পড়েছিল বেশ কিছু হাতি। ২০২২ এ তারা ফিরে গিয়েছিল কিন্তু ২০২৩ এ আবার তারা ফিরে এসেছে এবং এবার তাদের সংখ্যাও ভারি। মহারাষ্ট্রের পূর্ব সীমান্তের এই অরণ্যে হাতিরা অতঃপর পাকাপাকি ভাবে বাস করতে শুরু করেছে। উৎসাহিত হয়ে মহারাষ্ট্রের বন বিভাগ ইতিমধ্যেই, গডচিরোলির পার্শ্ববর্তী গোন্দিয়া জেলায় একটি ‘এলিফ্যান্ট রিজার্ভ’ গঠন করার প্রস্তাব কেন্দ্র শাসনের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। বলাবাহুল্য, মহারাষ্ট্রের এইসব গহীন জঙ্গল জানা অতীতে কখনই হাতি বারান্দা ছিলনা, হাতির বাসস্থানও ছিলনা।

শুধু মহারাষ্ট্রের একেবারে দক্ষিণ ও পূর্বপ্রান্তের এই ঘটনা নয়, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন হাতি অঞ্চলে ঘটে যাওয়া এই ধরণের অগণিত ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে আছে, এই লেখার শুরুতে তোলা দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর। হাতিরা ফিরে গেলনা, বা চলে গেলনা কেন? চলে গেলনা কারণ তারা ঠিকানা বদলেছে। শুধু যে খাদ্য ও পানীয়ের জন্যেই হাতিরা ঘুরে বেড়ায় কিংবা বলা উচিত ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হয় তা নয়, মানুষের সৃষ্টি করা নানারকম অসুবিধা, গাছ কাটা, জঙ্গলের জমিতে ক্ষেতখামার কিংবা জঙ্গল ধেঁষা জায়গায় বাড়ি ঘর, রাস্তা, পুল, টানেল, ফ্লাইওভার, রেল লাইন বিস্তার ইত্যাদিও হাতিদের এক একটি জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ, বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই ছেড়ে যাওয়া ঠিক পরিভ্রমণ নয়, পাকাপাকি ঠিকানা বদল। ছত্তিশগঢে এবং পার্শ্ববর্তী উড়িষ্যা ও ঝাড়খন্ডে তৈরি হওয়া কিছু খনির জন্যে হাতিরা ভিটে মাটি ছেড়ে পূর্ব মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলি জেলায় ঢুকে পড়েছিল, এমন মত প্রকাশ করেছেন অনেকেই। দক্ষিণ মহারাষ্ট্রে হাতিরা ঢুকে পড়েছিল কর্ণাটকের ডান্ডেলি অঞ্চল থেকে সেখানে কয়েক বছর অনাবৃষ্টির বা অল্পবৃষ্টির জন্যে এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বাড়ি ঘর, রাস্তা পুল ইত্যাদি নির্মাণ কার্যকলাপের জন্যে। প্রসঙ্গতঃ জানিয়ে রাখা ভালো, মহারাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চল কৃষি ও উদ্যানপালনের জন্যে অত্যন্ত সম্পন্ন এবং শ্রীমন্ত। হাতিরাও এদিকে এসে পেয়েছিল তিলারি সেচ প্রকল্পের জল, সুস্বাদু কলার ক্ষেত, মিষ্টি আখের ফসল। পাশের জঙ্গলে দিনের বেলায় গা ঢাকা দেবার চমৎকার ব্যাবস্থা। এসব ছেড়ে তারা ফিরে যাবেই বা কেন? আখ, কলা, কাজু ছেড়ে জঙ্গলের শুকনো পাতা কাঁটা, ডালপালা, কন্দমূল খেতে কারই বা ভালো লাগে? হাতি বলে কিপছন্দ অপছন্দ কিছুই নেই! পরে তেমন বেগতিক দেখলে, আধার কার্ডে, ঠিকানা পরিবর্তনের আবেদন করে দিলেই হবে!


[ মূল লেখাটি মুম্বাই সংস্করণ আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবারের ক্রোড়পত্রে বার হয়েছিল। এখানে তথ্যগত বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।]


লেখক পরিচিতি: লেখক অবসরপ্রাপ্ত আই এফ এস আধিকারিক এবং ঔপন্যাসিক।


(লেখাটি আপনার কেমন লাগল, আপনার মতামত নিচে কমেন্ট বক্সে অবশ্যই লিখবেন।)

Comments


86060474-00b1-415d-8c11-9c4471c9c5e7.png
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
 

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page