আরাবল্লী: ইতিহাস, ভূগোল, সভ্যতা ও সংকট
- ..
- Dec 22, 2025
- 8 min read
হিমালয়ের থেকেও প্রাচীন পর্বতমালা আরাবল্লী। ভারতের উত্তর ও পশ্চিম অংশের ভূ-প্রকৃতি ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। থর মরুভূমি থেকে উত্তর ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকাকে পৃথক করে রাখা আরাবল্লী ভারতের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তেমনই জীববৈচিত্রের আধার। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশে আরাবল্লীর সংজ্ঞা নির্ধারন করা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে তা বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে পরিবেশবিদদের মধ্যে তো বটেই, সাধারণ মানুষের মধ্যেও। আরাবল্লী কেন গুরুত্বপূর্ণ? কিভাবে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে ভারতের বড় একটা অংশের পরিবেশ-প্রকৃতির? আলোচনায় অভিষেক চক্রবর্ত্তী।

ছোটবেলায় ভূগোল বইতে পড়া ভারতের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত আরাবল্লী পর্বতমালা আজ সারা দেশ জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কারণ সম্প্রতি একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট এবং দেশের মহামান্য সর্বোচ্চ আদালত দ্বারা তার মান্যতা ইতিহাসের থেকেও প্রাচীন এই পর্বতমালার অস্তিত্বকে সংকটের মুখে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সমস্যা ও বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ করার আগে আরাবল্লীর পরিচয় এবং গুরুত্ব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রয়োজন।
আজ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন বছর আগে, পৃথিবীতে মানবজাতির আবির্ভাবের অনেক আগে টেকটনিক প্লেটের গমনের সময় ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের বিচ্ছেদের ফলে এই ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়। পশ্চিম ভারতে অবস্থিত এই পর্বতমালা দক্ষিণে গুজরাটের হিম্মতনগর থেকে উত্তরে রাজধানী নয়াদিল্লির উপকন্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত। গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা রাজ্য এবং জাতীয় রাজধানী অঞ্চল (NCR) অবধি প্রসারিত প্রায় ৭০০ কিমি দীর্ঘ এই পর্বতমালা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম ভূমিরূপ বর্তমানে যা ক্ষয়জাত পর্বতে রূপান্তরিত হয়েছে। আরাবল্লী নামটি সংস্কৃত শব্দ 'আরা' যার অর্থ পর্বতশৃঙ্গ এবং 'বলী' যার অর্থ সারিবদ্ধ থেকে এসেছে। অর্থাৎ আরাবল্লী নামের অর্থ 'সারিবদ্ধ পর্বতশৃঙ্গ'। উঁচু নীচু প্রায় ১২০৮১ টি পাহাড় তথা উচ্চ ভূমিরূপ দ্বারা এই পর্বতমালা গঠিত। ভারতীয় উপমহাদেশের সভ্যতা সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আরাবল্লী। আমাদের প্রাচীন পুরাণ, মহাকাব্য রামায়ণ মহাভারতেও এই পর্বতমালার উল্লেখ রয়েছে। কথিত আছে এই পর্বতমালার পাদদেশে বানস নদীর জলে সৃষ্ট মাতৃকুন্ডে স্নান করে পরশুরাম মুনি মাতৃহন্তার পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। এই পর্বতমালার কিনারেই পুষ্কর সরোবরে অবস্থিত পৃথিবীর একমাত্র ব্রক্ষ্মা মন্দির। মধ্যযুগে গঠিত জৈনধর্মের পবিত্র তীর্থ দিলওয়ারা মন্দির,রণকপুরের মন্দির, ঐতিহাসিক কুম্ভলগড় দুর্গ অথবা শৈলশহর মাউন্ট আবু , আরাবল্লীর কোলেই এদের সকলের অবস্থান।
উত্তর ভারতের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে আরাবল্লী পর্বতমালার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাকৃতিক ঢালের (natural barrier)ভূমিকায় দাঁড়িয়ে এই পর্বতমালা পশ্চিমের থর মরুভূমির অগ্ৰগতিকে প্রতিহত করে যার ফলে রাজধানী নয়াদিল্লি, হরিয়ানা সহ উত্তর ভারতের একটা বড় অংশ মরুভূমিতে পরিণত (desertification) হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। এই পর্বতমালার অবস্থানের জন্য থর মরুভূমির গরম হাওয়া এবং বালুরাশি ও ধুলো পূর্ব রাজস্থান, হরিয়ানা, দিল্লি ও পাঞ্জাবে প্রবেশ করতে পারে না।এছাড়া উত্তর ভারতের প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত অনেকাংশেই আরাবল্লীর অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল।

এই পর্বতমালা থেকে সৃষ্ট চম্বল, লুনি, বানস প্রভৃতি নদীগুলি দেশের একাধিক রাজ্যের জলের চাহিদা মেটায়। এরসমগ্ৰ ভূমিরূপ জুড়ে অবস্থিত অসংখ্য অ্যাকুইফার বৃষ্টির জলকে ধরে রাখে এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বজায় রাখতে সাহায্য করে। আরাবল্লী অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যও অনন্য। এর মধ্যে সরিষ্কা,রণথম্ভর, কুম্ভলগড়, ঢোলপুরের মত সংরক্ষিত বনাঞ্চল গুলিতে বসবাস করে বাঘ, লেপার্ড, হায়না, ধূসর নেকড়ের মত বিপন্ন বন্যপ্রাণী। মার্বেলের খনি বিপন্ন করে তুলতে পারে সরিষ্কাকে, সে নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি মামলা চলছে সুপ্রিম কোর্টে। আরাবল্লীতে যোধপুরের কাছে জাওয়াইয়ের মত স্থানে রয়েছে লেপার্ডদের গুরুত্বপূর্ণ বাসভূমি যে অঞ্চল ইতিমধ্যেই খনির কাজে ক্ষতিগ্রস্থ। আরাবল্লীতে আছে প্রায় দুশো প্রজাতির পাখিও। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই সুপ্রাচীন ভূমিরূপকে সঙ্গত কারণেই দেশের 'প্রাকৃতিক ঐতিহ্য' (natural heritage) বলা যায়।
আরো পড়ুন: জাওয়াইতে লেপার্ডের সাম্রাজ্যে
প্রাকৃতিক গুরুত্বের পাশাপাশি আরাবল্লীর অর্থনৈতিক গুরুত্বও নেহাত কম নয়। দেশের সর্বাধিক খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ এলাকা হল এই আরাবল্লী পর্বতমালা।মার্বেল, চুনাপাথর, বেলেপাথর, গ্রানাইট ,তামা, জিংক, সীসা প্রভৃতি খনিজ পদার্থের অতুল ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে এই সুপ্রাচীন ভূমিরূপের অন্দরে। কথায় আছে অধিক সম্পদ বিপদের কারণ হয়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। নব্বই দশকের গোড়ায় ভারতে মুক্ত অর্থনীতির প্রচলন দেশের শিল্প ব্যবসা বাণিজ্যের জগতে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। আসে বিনিয়োগ, জনসংখ্যার বিস্ফোরণের সাথে বাড়তে থাকে চাহিদা। বেসরকারিকরণের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ যেতে থাকে কর্পোরেট পুঁজিপতিদের হাতে। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ বৃদ্ধি পায়। কখনো সরকারের মদতে কখনো বা আইনের ফাঁক দিয়ে। এই তথাকথিত উন্নয়নের বিষবাষ্প থেকে রেহাই পায়নি উত্তর ভারতের ' সবুজ ফুসফুস' ( green lung) আরাবল্লীও। ব্যপকহারে বাড়তে থাকে বেআইনি খনিজ সম্পদ উত্তোলন। ধ্বংস হতে থাকে অরণ্য। হরিয়ানা সরকারের বদান্যতায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্যে আরাবল্লী বনসৃজন প্রকল্পে নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও নতুন শতাব্দীতে আবার ব্যাপক হারে শুরু হয় অরণ্য নিধন। বন সংরক্ষণ আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কখনো সরকারি উদ্যোগেই কখনো বা পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় চলতে থাকে অবৈধ খনন এবং বিভিন্ন নির্মাণকার্য।বৃদ্ধি পায় অপরিকল্পিত নগরায়ন। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নামতে থাকে। পাল্লা দিয়ে বাড়ে জল ও ভূমি দূষণ। The Earth Science Informatics জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আরাবল্লী ভূমিরূপের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় অরণ্যের পরিমাণ কমেছে ৭০৫ বর্গ কিলোমিটার (০.৯%)। আর ১৯৭৫ সাল থেকে ২০১৯ এর মধ্যে সমগ্ৰ আরাবল্লী ভূমিরূপের প্রায় ৮% (৫৭৭২.৭ বর্গকিমি) এলাকা স্রেফ অদৃশ্য হয়ে গেছে। যেখানে মানুষের বসবাসের এলাকার পরিমাণ ১৯৭৫ সালে ছিল ৪.৫% ,২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৩%। আবার সরকারি অনুমোদনে চলা খনির পরিমাণ ১৯৭৫ সালে যেখানে ছিল ১.৮ শতাংশ এলাকায়,২০১৯ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২.২% এলাকায়।তবু বেআইনি ভাবে চলা খনি এলাকার পরিসংখ্যান তো এখানে উল্লেখ করাই হয় নি। Forest Survey of India এর সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ীই এর সংখ্যা ৩২০০ এর বেশি।

বাস্তব সংখ্যা যে আরও বেশি হবে তা বলাই বাহুল্য। এই বছরেই লোকসভার বাদল অধিবেশনে বন এবং পরিবেশ মন্ত্রক দ্বারা প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী শুধুমাত্র রাজস্থানের আরাবল্লী পর্বতমালা এলাকায় ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২৭৬৯৩ টি অবৈধ খনন, পরিবহন এবং রক্ষণএর অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে এফ আই আর এর সংখ্যা মাত্র ৩১৯৯ (১১শতাংশ)।২০১৮ সালে প্রকাশিত কেন্দ্রীয় কমিটির (Central empowered committee) এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৬৮ সাল থেকে বিগত ৫০ বছরে এই অঞ্চলে ৩১ টি পাহাড় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ২০১৭ তে WII দ্বারা প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে এর ফলে প্রাচীরের ন্যায় বিন্যস্ত আরাবল্লী পর্বতমালায় সৃষ্টি হয়েছে অন্ততপক্ষে ১২ টি ফাঁক এর, থর মরুভূমি থেকে আগত তপ্ত বায়ু,বালি ও ধূলিকণা প্রবেশ করছে হরিয়ানা এবং জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে। এমনিতেই বায়ু দূষণের জন্য কুখ্যাত ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত রাজধানী শহর। আরাবল্লী ধ্বংসের ফলে বায়ুদূষণের মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজস্থান, হরিয়ানা, দিল্লি ও উত্তর প্রদেশের একাংশে।

অবৈধ খননের বাড়বাড়ন্ত, নির্বিচারে অরণ্য নিধন, অবাধ নির্মাণ কার্য এই বিস্তীর্ণ পর্বতমালার বাস্তুতন্ত্রকে ভঙ্গুর করে তুলেছে (fragile) । গত চার দশকে বিভিন্ন সময় দেশের সর্বোচ্চ আদালত আরাবল্লীর পরিবেশ পুনরুদ্ধারে হস্তক্ষেপ করেছে। ১৯৯২ সালে বন ও পরিবেশ মন্ত্রক নির্দেশিকা জারি করেছিল যে, মন্ত্রকের অনুমোদন ছাড়া এই অঞ্চলে কোন নতুন শিল্প,খনিজ উত্তোলন,হাইওয়ে বা বাঁধ এর মত বড় নির্মাণকাজ নিষিদ্ধ। উল্লেখ্যযোগ্য ভাবে এই নির্দেশিকায় শুধুমাত্র সংরক্ষিত বনাঞ্চল নয়, স্থানীয় রেভিনিউ রেকর্ডে নথিভুক্ত আরাবল্লীর যাবতীয় ভূভাগকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বলাই বাহুল্য যে এই নির্দেশিকার প্রয়োগ বাস্তবায়িত হয় নি। ২০০২ সালে M.C Mehta v Union of India এবং T. N Godavaram Thirumulpad v Union of India মামলায় সর্বোচ্চ আদালত আরাবল্লীর ভঙুর বাস্তুতন্ত্রের বিপন্নতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির (CEC) এর একটি রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে হরিয়ানা এবং রাজস্থানে এই পর্বতমালার অন্তর্ভুক্ত সকল অংশে খনিজ পদার্থের উত্তোলন নিষিদ্ধ করেন। এছাড়া দিল্লি হরিয়ানার সীমানার ৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে সকল প্রকার খননকার্য নিষিদ্ধ করা হয়।এরপর ২০০৯ সালেও শীর্ষ আদালত রায়ে হরিয়ানার তিনটি জেলা ফরিদাবাদ, গুরুগ্রাম এবং মেওয়াটে সব রকম খনিজ পদার্থের উত্তোলন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপ ও আরাবল্লীর সংকট দূর করতে পারে নি। ২০১৮-১৯ সালে গুরুগ্রামের উপকন্ঠে অবস্থিত আরাবল্লী বায়োডাইভার্সিটি পার্কের ভিতর দিয়ে NHAI তাদের Greater Southern Peripheral Road (GSPR) প্রকল্পের অধীনে দুটি ছয় লেনের সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বর্তমানে পরিবেশ প্রেমীদের নিরন্তর আন্দোলন এবং গ্রিণ ট্রাইব্যুনালের হস্তক্ষেপের পর এই প্রকল্প স্থগিত রাখা হয়েছে। এরপর ২০২২ সালে হরিয়ানার মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী আরাবল্লী পর্বতের ১০০০০ একর অরণ্যে পৃথিবীর বৃহত্তম সাফারি পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির বিভিন্ন প্রাণী এমনকি আফ্রিকা থেকে আমদানি করা চিতাও নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় মানুষের বিকল্প জীবন জীবিকা তথা সরকারি কোষাগারের স্বার্থে ইকোট্যুরিজমের প্রসারের উদ্যোগ সব সময় স্বাগত। কিন্তু প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে বহু কোটি টাকা ব্যয় করে কৃত্রিমভাবে সাফারি পার্কের নামে চিড়িয়াখানা গড়ে তোলা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। জল গড়ায় শীর্ষ আদালতে। পাঁচ জন অবসরপ্রাপ্ত আই এফ এস আধিকারিক এবং এন জি ও ' People for Aravalis' এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতে মামলা দায়ের করে। ২০২৫ এর অক্টোবর মাসে প্রধান বিচারপতি জাস্টিস বি আর গাভাই এবং কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ পরবর্তী নির্দেশ পর্যন্ত এই প্রকল্পের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। এর আগে ২০২৪ এর মে মাসে শীর্ষ আদালত আরাবল্লী পর্বতমালা অঞ্চলে নতুন করে কোন খনন প্রকল্পের অনুমোদন এবং পুরোনো অনুমোদিত খনন প্রকল্প গুলির পুনর্নবীকরনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। এর সঙ্গে শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল যে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন মাপকাঠিতে আরাবল্লী পর্বতমালার সীমানা নির্ধারণ করছে যা অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ত্রুটিযুক্ত। এই সমস্যা দূর করতে আদালতের নির্দেশে একটি কমিটি গঠিত হয়। কেন্দ্রীয় বন, পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির বন মন্ত্রক, ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, সেন্ট্রাল এমপাওয়ার্ড কমিটি র প্রতিনিধিদের এই কমিটির সদস্যরূপে মনোনীত করা হয়। অক্টোবর ২০২৫ এ এই কমিটি আদালতে তার রিপোর্ট পেশ করে এবং জানায় যে এবার থেকে আরাবল্লী ভূমিরূপের কেবলমাত্র নূন্যতম ১০০ মিটার উচ্চতার অংশগুলিকেই আরাবল্লী র অংশরূপে বিবেচনা করা হবে। এবং এই অঞ্চলে অবস্থিত এই রূপ দুটি পাহাড়ের মধ্যে সব্বোর্চ দূরত্ব ৫০০ মিটারের বেশি হবে না। এই দুটি মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ না হওয়া সমস্ত নাতিউচ্চ পাহাড়, ভূমিরূপ আরাবল্লী পর্বতমালার অংশ নয়। এর আগে ২০১০ সালে ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মাপকাঠি অনুযায়ী নূন্যতম ৩ ডিগ্রি ঢাল,১০০ মিটার বাফার পাদদেশ এলাকা যুক্ত,সর্বাধিক ৫০০ মিটার দূরত্ব যুক্ত সকল উচ্চ ভূমিরূপই আরাবল্লী পর্বতমালার অংশ।এই রিপোর্টে শুধু উচ্চতা নয়. সামগ্রিক ভূমিরূপকেই হিসাবে ধরা হয়েছিল আরাবল্লিকে বোঝাতে। ২০২৪ সালে কিন্তু ফরেস্ট সার্ভে অব ইন্ডিয়াই এই রিপোর্টি আরো পরিবর্তন করে কোন কারণে এবং বলে যে ৩০ মিটার উচ্চতা ও ৪.৫৭ ডিগ্রী ঢালের পাহাড়গুলোই আরাবল্লির অংশ বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের সর্বশেষ রিপোর্ট তো এইসবকে ছাপিয়ে গেল। এবার পর্বতের এই নতুন সংজ্ঞা মান্যতা পেলে বর্তমানে আরাবল্লী পর্বতমালার অন্তর্ভুক্ত ১২০৮১ টি পাহাড়ের মধ্যে মাত্র ১০৪৮ টি পাহাড় তথা ভূমিরূপ আরাবল্লী পর্বতমালার অংশরূপে গণ্য করা হবে। যা বর্তমান ভূমিরূপের মাত্র ৮.৭ শতাংশ বাকি প্রায় ৯২ শতাংশ অঞ্চল আরাবল্লী ভূমিরূপের বাইরে অসুরক্ষিত অঞ্চলের আওতায় পড়বে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যর বিষয় এই যে এই বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট গত ২০ শে নভেম্বর ২০২৫ তারিখে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ দ্বারা গৃহীত হয়েছে। এছাড়া মহামান্য আদালত নির্দেশ দিয়েছেন,আরাবল্লী ভূমিরূপের মধ্যে অবস্থিত ইকো সেনসিটিভ জোন, বন্যপ্রাণ করিডোর, সংরক্ষিত অরণ্য,জলাভূমিগুলিকে চিহ্নিত করে মানচিত্র প্রস্তুত করতে হবে এবং ততদিন পর্যন্ত এই অঞ্চলে নতুনভাবে কোন খনন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। চিহ্নিতকরণ,মানচিত্র তৈরী করার পাশাপাশি সারান্ডার মডেলে একটি Management Plan for Sustainable Mining (MPSP) প্রস্তুত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। শীর্ষ আদালতের এই পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত ঘিরে আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়েছে আরাবল্লীর ভবিষ্যত নিয়ে। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী মূল আরাবল্লী ভূমিরূপের ৯২ শতাংশই যদি এখন থেকে সংরক্ষণের আওতার বাইরে হয়ে যায় তাহলে আরাবল্লীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে নতুন খনিজ প্রকল্প গড়ে তুলতে আর কোন আইনি বাধা থাকবে না। এছাড়া শিল্প, কলকারখানা,হাইওয়ে, রিয়েল এস্টেট প্রকল্প গড়ে উঠবে অবাধে।

জমি মাফিয়া, কর্পোরেট হাঙরের গ্রাসে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে উত্তর ভারতের 'সবুজ ফুসফুস' আরাবল্লী। থর মরুভূমি অবাধে অগ্ৰসর হবে হরিয়ানা, পূর্ব রাজস্থান, রাজধানী দিল্লির দিকে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমবে, যার প্রভাব পড়বে একদা সবুজ বিপ্লবের ধাত্রীভূমি পাঞ্জাব, হরিয়ানার ওপর, বিঘ্নিত হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। অবৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে অ্যাকুইফার গুলিকে বুজিয়ে দিলে বিনষ্ট হবে মাটির নীচে গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ ব্যবস্থা। ভূগর্ভস্থ জলস্তর আরো নামবে। পশ্চিমে থর মরুভূমি থেকে বালুরাশি, ধূলিকণা অবাধে প্রবেশ করবে উত্তর ভারতে, যার ফলে বাড়বে বায়ু দূষণ। দিল্লি, নয়ডা, গুরুগ্রাম, ফরিদাবাদের মত শহর, যেখানে AQI (Air Quality Index) এখনই বিপদসীমার উপরে, সেখানের অবস্থা কি হবে সহজেই অনুমেয়।
অনিয়ন্ত্রিত খনন এবং নির্মাণ কার্য বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের বন্যপ্রাণের বিপদ ডেকে আনবে, খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে। একাধারে এই বছরেরই জুন মাসে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক দ্বারা মহা সমারোহে সূচনা করা হয়েছে আরাবল্লী গ্রিণ ওয়াল প্রকল্পের। এই প্রকল্পের আওতায় আরাবল্লী অঞ্চলে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৬ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি গড়ে তোলার কথা। আরাবল্লী পর্বতমালা ঘিরে প্রায় ১৪০০ কিমি দীর্ঘ এবং ৫ কিমি প্রস্থের সবুজ বাফার এলাকা গড়ে তুলতে আনুমানিক ব্যয় হবে১৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সরকারি কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ীই পর্বতমালার ৯২ শতাংশ অংশকে আরাবল্লীর আওতা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এই ভাবে দেশের কোন প্রাকৃতিক সম্পদের সংজ্ঞা নির্ধারণের এক্তিয়ার সরকারি কমিটি অথবা শীর্ষ আদালতেরও আছে কিনা। আরাবল্লীর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে সোচ্চার হয়েছেন পরিবেশ প্রেমীরা। শুরু হয়েছে Save Aravali ক্যাম্পেন। তৈরী হয়েছে Save Aravali Trust, Aravali bachao এর মত মঞ্চ। পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনে অতীতেও ভারত পথ দেখিয়েছে বারবার। চিপকো আন্দোলন, সাইলেন্ট ভ্যালি, সর্দার সরোবর আন্দোলনের কথা এখনও মুখে মুখে ফেরে মানুষের। আরাবল্লী বাঁচাও আন্দোলনও আপামর জনসাধারণের সমর্থন লাভ করবে এবং আরও বেশি সংখ্যক মানুষ এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হবেন মনে করাই যায়। দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম ও এই ইস্যুতে সরব হয়েছে। #SaveAravalli হ্যাশট্যাগ যুক্ত পোস্টে ছেয়ে গেছে সোশাল মিডিয়াগুলি। আশা করা যায় শীর্ষ আদালত আগামী দিনে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন আরাবল্লীর ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশ পুনরূদ্ধারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন। এর ওপরেই নির্ভর করবে উত্তর ভারতের ' সবুজ ফুসফুসের' ভবিষ্যত।
লেখক পেশায় প্রশাসনিক আধিকারিক। প্রাণীবিদ্যার ছাত্র ও বন্যপ্রাণী প্রেমী।
আপনার মতামত জানান নীচের কমেন্ট সেকশানে এবং আমাদের ফেসবুক পেজে।







Comments