গুজরাতের বনতারায় বিরল বন্যজীবের সংগ্রহ ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে উঠছে প্রশ্ন
- ..
- 10 minutes ago
- 9 min read
গুজরাতের জামনগরে আম্বানি গোষ্ঠীর বানানো পশু উদ্ধার কেন্দ্র বনতারা ঘিরে অনেক প্রশ্ন। কিভাবে সেখানে দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন প্রাণী আমদানি হচ্ছে তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক দেশে এবং বিদেশেও। সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বনতারাকে সব অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থা CITES যারা বিভিন্ন দেশের মধ্যে বন্যপ্রাণী লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে ও চোরাচালান রোধে নজরদারি চালায় তারা বনতারায় বিভিন্ন বিপন্ন প্রজাতির পশু আমদানি নিয়ে অনেক প্রশ্ন তুলেছে। লিখছেন সিমরন সিরুর।

আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ বাণিজ্য বিষয়ক সংস্থা বা Convention on International Trade in Endangered Species of Wild Fauna and Flora(CITES)-এর এক রিপোর্টে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত তদন্তের ফলাফলের বিপরীত চিত্র উঠে এসেছে—যেখানে চলতি বছরের শুরুর দিকে অম্বানি পরিবারের মালিকানাধীন ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা ও পশু উদ্ধার কেন্দ্র 'বনতারা’র প্রাণী সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে পরিষ্কার 'ক্লিনচিট' দেওয়া হয়েছিল।
বিপন্ন বন্যপ্রাণীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চুক্তি হল CITES। ১৯৭৬ সাল থেকে ভারত এই সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ। সম্প্রতি প্রাণী আমদানি–রফতানি নিয়ে ভারতের ভূমিকা এবং বিশেষ করে বিপুল সংখ্যক প্রাণী বনতারায় পাঠানো নিয়ে বেশ কয়েকটি সদস্য-দেশ প্রশ্ন তোলে। তার পরই ১৫ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর ভারতে এসে তথ্য-সংগ্রহ অভিযান চালায় CITES-এর সচিবালয়।
অম্বানি পরিবারের সদস্য অনন্ত অম্বানির উদ্যোগে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে তুলেছে বনতারা। সাম্প্রতিক সময়ে যে সব বন্যপ্রাণী ভারতে এসেছে, তার বেশির ভাগই গিয়েছে এই কেন্দ্রে—এমন অভিযোগই উঠেছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে।
সাইটস সচিবালয়ের ওই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, ভারত কিভাবে CITES এর নিয়ম মেনে অনুমতি দেয়—বিশেষ করে বন্যপ্রাণী আমদানি–রফতানির অনুমতি (পারমিট) দেওয়া এবং তা নজরদারির ব্যবস্থাপনা—তার খতিয়ে দেখা।
বনতারা—যার অন্তর্গত আছে Greens Zoological Rescue and Rehabilitation Centre (GZRRC) এবং Radha Krishna Temple Elephant Welfare Trust (RKTEWT)—এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪০ হাজারেরও বেশি প্রাণী সংগ্রহ করেছে। এদের মধ্যে বহু প্রজাতিই বিপন্ন কিংবা বিলুপ্তপ্রায়।
CITES-এর তদন্তে এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি যে প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া ভারত প্রাণী আমদানি করেছে। তবে সংস্থাটি ভারতের যাচাই–প্রক্রিয়ার বেশ কয়েকটি ফাঁকফোকর নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। CITES-এর মতে, এই নজরদারির ঘাটতিতে এমন লেনদেন সম্ভব হয়েছে যা আন্তর্জাতিক চুক্তির নিয়ম লঙ্ঘন করেছে।
বিশেষ করে শিম্পাঞ্জি এবং ওরাংউটানের মতো প্রাণীদের ক্ষেত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে CITES সচিবালয়। তদন্তকারীদের মতে, যেসব নথিতে এই প্রাণীগুলিকে ‘বন্দিদশায় প্রজনন হওয়া’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তা CITES–এর সংজ্ঞা অনুযায়ী তা সন্দেহজনক।

CITES কর্তৃপক্ষ মনে করেছে যে বাস্তবে যে যাচাই হয়েছিল, তাতে সাধারণত একটি রপ্তানি পারমিট বা পুনঃরপ্তানি সার্টিফিকেট খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং সেগুলির সত্যতা ও বৈধতা যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীদের আমদানির বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আরো নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন ছিল।
সংস্থাটি সুপারিশ করে যে ভারত যেন বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীর আমদানি প্রক্রিয়া ও যাচাই ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা না করা পর্যন্ত বিপন্ন প্রজাতির আমদানি স্থগিত রাখে— এবং “আমদানি লাইসেন্স" জারি করার পূর্বে এই পদ্ধতির নিয়মাবলি আরও কঠোর করে। পাশাপাশি খতিয়ে দেখার ব্যবস্থাও জোরদার করতে বলা হয়, যেন কোনও ধরনের নিয়ম লঙ্ঘন না ঘটে এই সব ক্ষেত্রে। যদিও পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কুয়েতের মত দেশগুলির দাবিতে এবং ভারত সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই সুপারিশ তারা ফিরিয়ে নেয়।
CITES-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- "এই ধরনের সতর্ক ও নিবিড় যাচাই-বাছাই না করলে ভারত এমন প্রাণী আমদানি করে ফেলবে, যেগুলো সম্ভবত বন্য পরিবেশ থেকেই সরাসরি সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বন্দী অবস্থায় প্রজননের ফলে জন্ম বলে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে— অথচ বাস্তবে সেগুলো বন্দী অবস্থায় প্রজনন করা হয়নি"।
CITES সচিবালয় যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছে, তা ১৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া আদেশের সঙ্গে মেলে না। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল যে যেহেতু প্রাণীগুলো বৈধ পারমিটের মাধ্যমে আমদানি করা হয়েছে, তাই “কেউ সেই পারমিটের বাইরে গিয়ে বা সেগুলোর বৈধতা কিংবা সরকারি কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না।”
বনতারায় বন্যপ্রাণ পাচার ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের তদন্ত করতে গঠিত একটি বিশেষ তদন্তকারী দলের (SIT) প্রতিবেদন বিবেচনা করেই আদালত এই রায় দেয়।
CITES কি বলতে চাইছে
CITES সচিবালয়ের এই পরিদর্শনে আসার উদ্দেশ্য ছিল— ভারত কীভাবে জীবিত প্রাণী বৈধভাবে সংগ্রহ ও আমদানি করে তা বোঝা, এবং বিশেষভাবে বনতারা প্রকল্পের উপর নজর দেওয়া। CITES-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বনতারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৪১,৮৩৯টি পাখি, স্তন্যপায়ী, উভচর এবং সরীসৃপ আমদানি করেছে— এবং ভারতের কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃক অনুমোদন অনুযায়ী তাদের কাছে সর্বোচ্চ ৮৪,৮২২টি প্রাণী রাখার অনুমতি রয়েছে।
রিপোর্টে যদিও স্বীকার করা হয়েছে যে বনতারায় আনা প্রাণীদের জন্য সেখানে “অসাধারণ উচ্চমানের এবং অত্যাধুনিক সুবিধা” রয়েছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে “এই সুবিধাগুলো প্রাণীদের রাখার এবং যত্ন নেওয়ার জন্য উপযুক্তভাবে তৈরি— এ বিষয়ে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই।”
তবে CITES প্রাণী আমদানির পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, বিশেষ করে সেইসব প্রজাতির ক্ষেত্রে— যেগুলো বিলুপ্তির মুখে রয়েছে অথবা অবৈধ বাণিজ্যের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে (কনভেনশনের অ্যাপেনডিক্স I ও II–তে তালিকাভুক্ত প্রজাতি)।
উদাহরণ হিসেবে, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা এবং পরে বনতারায় পাঠানো একটি “বন্দী অবস্থায় প্রজনন হওয়া” বনোবোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পারমিটে উল্লেখ ছিল যে প্রাণীটির উৎস ইরাক। কিন্তু সচিবালয় খতিয়ে দেখতে পায় যে ইরাক কখনও বনোবো আমদানি করেনি— যা প্রাণীটির প্রকৃত বন্দী অবস্থায় প্রজনন হয়েছে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ তৈরি করে।

“CITES একটি পারমিট বা অনুমোদন -নির্ভর ব্যবস্থা, এবং নথিপত্র অপরিহার্য এখানে — কিন্তু এই পারমিটগুলো তখনই কার্যকর যখন সেগুলোর পেছনে যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়ে থাকে,” — বলেন মেগ্যান নাটালি, যিনি বন্যপ্রাণ অপরাধবিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ এবং পরামর্শদাতা ।
তিনি আরও বলেন, “যদি আমদানিকারী দেশের কর্তৃপক্ষ এসব নথিকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেয় এবং নিজেদের যাচাই প্রক্রিয়া না চালায়, তাহলে বাণিজ্য আইনসঙ্গত বলে মনে হলেও তার আড়ালে অবৈধ পাচারের চক্র লুকিয়ে যেতে পারে। ফলে ফাঁকটি নথিপত্রে নয় — বরং কঠোর তদারকির অভাবে।”
কনভেনশনের অ্যাপেনডিক্স I এবং II–তে তালিকাভুক্ত প্রজাতির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারী কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হয় যে—
ওই প্রজাতির প্রাণীটির এই রপ্তানি তাদের বন্য পরিবেশে বেঁচে থাকার ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না,
বাণিজ্যের আগে এগুলো বৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, এবং
পরিবহনের সময় প্রাণীগুলোর আঘাত, স্বাস্থ্যহানি বা নিষ্ঠুর আচরণের সম্ভাবনা যেন যথাসম্ভব কম থাকে।
অন্যদিকে, আমদানিকারী কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হয় যে—
সেটি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়,
আমদানিটি বন্য পরিবেশে ওই প্রজাতির টিকে থাকার ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না, এবং
যে প্রতিষ্ঠান প্রাণীটি গ্রহণ করবে, সেটি ওই প্রজাতির জন্য উপযুক্ত বলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত।
CITES-এর আওতায় বাণিজ্য সংক্রান্ত পারমিট ভারতে পরিচালনা করে পরিবেশ, অরণ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক (MoEFCC), এবং এগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই-বাছাই করে কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
আদালতের নিযুক্ত কমিটির রিপোর্ট
প্রাণী সংগ্রহের বিষয় ছাড়াও, সুপ্রিম কোর্ট SIT-কে নির্দেশ দিয়েছিল দেশীয়ভাবে হাতি স্থানান্তর, প্রাণী মৃত্যুহার, বনতারায় প্রদত্ত পশু-চিকিৎসার মান এবং আদালতে দায়ের হওয়া দুটি আবেদনে উত্থাপিত আরও বেশ কিছু বিষয় তদন্ত করতে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি জাস্টি চেলমেশ্বরের নেতৃত্বে SIT উপসংহার টেনে জানায় যে CITES-এর অধীনে বাণিজ্যের জন্য পারমিট জারি হলে ভারতীয় আইনে সেটির আইনি বৈধতার একটি অনুমান থাকেই। ফলে বনতারা বা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উপর এই দায়বদ্ধতা থাকে না যে প্রাণী রপ্তানির আগে দাতা চিড়িয়াখানা প্রাণীটি বৈধভাবে সংগ্রহ করেছিল কি না— তা অতিরিক্তভাবে তদন্ত করে দেখতে হবে। “এটি একটি সম্পূর্ণ আইনগত অবস্থান, যা এই ধরনের অনুমতির বাস্তব প্রেক্ষাপট এবং CITES–এ সংরক্ষণের যে মূল লক্ষ্য নির্ধারিত রয়েছে, সেগুলোকে ধর্তব্যে আনে না,” — মন্তব্য বিধি সেন্টার ফর লিগ্যাল পলিসির ক্লাইমেট অ্যান্ড ইকোসিস্টেমস দলের প্রধান দেবাদিত্য সিনহা।
তিনি আরো বলেন যে, “এই জরুরি বিষয়গুলো উপেক্ষা করার ফলে SIT অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছে— যেমন: এই ধরনের অনিয়ম থেকে কে লাভবান হচ্ছে এবং বন্য প্রাণীর চাহিদা বাড়লে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থলে সংরক্ষণ প্রচেষ্টার উপর কীভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”
নিজেদের প্রতিবেদনে CITES স্পষ্ট জানিয়েছে যে CITES–এ তালিকাভুক্ত প্রজাতির বাণিজ্য বৈধ রাখতে এবং পরিবেশের ক্ষতি এড়াতে আমদানিকারী দেশগুলোর পাশাপাশি রপ্তানিকারী ও পরিবহনকারী দেশগুলোর সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।
বনতারায় বিপুল পরিমাণ প্রাণী আমদানির বিষয়টি বিবেচনা করে CITES পরামর্শ দিয়েছে যে, ভারত যেন জরুরি ভিত্তিতে নিজের বন্যপ্রাণী আমদানির বিষয়টি পর্যালোচনা করে এবং আরও কার্যকরী যাচাই প্রক্রিয়া তৈরি করে। প্রাণী আমদানি করার পারমিট জারি ও প্রাণী পরিবহনের আগে যেকোনো অনিয়ম সনাক্ত করার জন্য এই যাচাই প্রক্রিয়াটি যেন যথোপযুক্ত হয়।
কমপক্ষে ২০ জন সাংবাদিক, সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ এবং বন্যপ্রাণী প্রেমী অনলাইন ও অফলাইনে সাক্ষ্য দিয়ে এসআইটি-কে তথ্য সরবরাহ করেছেন। ১৭ দিনের মধ্যে প্রতিটি আমদানি করা প্রাণীর জন্য ১৩ খণ্ড নথিপত্র পর্যালোচনা করার পর এসআইটি সিদ্ধান্তে জানিয়েছে যে প্রক্রিয়াগতভাবে বনতারা কোনও ভারতীয় বা আন্তর্জাতিক নিয়ম, বিধি বা আইন লঙ্ঘন করেনি।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বনতারা বা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনও আইনি পদক্ষেপ নিষিদ্ধ করেছে, যদি সেই মামলা ইতিমধ্যেই এসআইটি'র তদন্ত করা একই ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে হয়।
তবে, সাইটস (CITES)–এর রিপোর্টে কিছু প্রাণী আমদানি নিয়ে এমন সমস্যার উল্লেখ রয়েছে যেখানে এসআইটি কোনও অনিয়ম খুঁজে পায়নি।
উদাহরণস্বরূপ, বনতারা তার কেন্দ্রের জন্য আনা কোন প্রাণী'কে কিনেছে এমন সম্ভাবনাকে খারিজ করে দেয় এসআইটি এবং জানায় যে প্রাণী আনার বিনিময়ে অর্থ প্রদান করা হয়েছে—এমন অভিযোগ “কাল্পনিক” এবং “আইনের দৃষ্টিতে ভিত্তিহীন।” প্রাণী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে যে ইনভয়েস তৈরি করা হয়েছিল, তা শুধুমাত্র বীমা ও পরিবহন খরচের জন্য ছিল বলে এসআইটি জানায়।
কিন্তু সাইটস (CITES) সচিবালয় জানায় যে চেকিয়া থেকে আনা প্রাণীদের ক্ষেত্রে দেশটি পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে তারা নিশ্চিত—এই প্রাণীগুলো উদ্ধারের উদ্দেশ্যে রপ্তানি করা হয়নি, বরং বনতারায় বিক্রি করা হয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্রের ম্যানেজিং অথরিটি এমন ইনভয়েস সরবরাহ করেছে যেখানে প্রাণীদের তালিকা, প্রতিটির মূল্য, কর এবং অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য রয়েছে—যা তাদের দাবিকে সমর্থন করে।
সাইটস (CITES)–এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারত ও চেকিয়া উভয়েই “লেনদেন এবং বিভিন্ন ইনভয়েসগুলো সম্পর্কে ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করছে।” প্রাণী কেনাবেচা কনভেনশনের অধীনে নিষিদ্ধ নয়, তবে তা করতে গেলে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়—যাতে বনতারার কার্যক্রম “অজান্তেই এমন কোনও অবৈধ উপায়ে বন্যপ্রাণী সংগ্রহের কারণ না হয়ে ওঠে, যেগুলো পরে বন্দী অবস্থায় প্রজনন হয়েছে দাবি করে বৈধ বলে দেখানো হয়।”
নাতালি ব্যাখ্যা করে বলেন, “সাইটস (CITES) এর আইন লঙ্ঘনের বিচার করার জন্য এখনও কোনও আন্তর্জাতিক আদালত নেই, এবং কনভেনশন নিজেও কোনও ফৌজদারি শাস্তি দিতে পারে না। তবে, সাইটস স্ট্যান্ডিং কমিটির ক্ষমতা রয়েছে ব্যাখ্যা চাইবার, সংশোধনমূলক পদক্ষেপের জন্য চাপ দিতে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে নিয়ম না মানা রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্য স্থগিতের সুপারিশ করতে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “তাই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যেখানে দেশে আইনি চ্যালেঞ্জের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনও সাইটস কনভেনশন সমমনা রাষ্ট্রেদের চাপ, স্বচ্ছতা এবং স্ট্যান্ডিং কমিটির রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করে—চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর থেকে জবাবদিহি চাইতে পারে এবং গোটা ব্যবস্থার নিয়ম রক্ষা করতে লড়তে পারে।”
সাইটস (CITES) সচিবালয় বনতারায় আমদানি করা একটি মাউন্টেন গরিলা (Gorilla beringei beringei) সম্পর্কেও সমস্যা চিহ্নিত করেছে। ২০২৫ সালের মার্চে, অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম সুডডয়চে জাইটুং (SZ) প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায় যে সংযুক্ত আরব আমিরাত-ভিত্তিক ক্যাপিটাল চিড়িয়াখানা একটি মাউন্টেন গরিলা বনতারায় রপ্তানি করেছে—যদিও পৃথিবীর কোথাও এই প্রজাতির গরিলা বন্দী অবস্থায় রাখা বা প্রজনন করা হয় না।

সংযুক্ত আরব আমিরাত সাইটস সচিবালয়কে জানায় যে পূর্ব-মধ্য আফ্রিকার বাসিন্দা এই গরিলাটি হাইতি থেকে আমদানি করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ভারতকে পুনরায় রপ্তানি করা হয়েছে। সাইটস রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে: “সাইটস ট্রেড ডেটাবেসে কোনও ধরনের গরিলা (প্রজাতি নির্বিশেষে) হাইতিতে রপ্তানির কোনও রেকর্ড নেই।” রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, “এই ক্ষেত্রেও সাইটস সচিবালয়ের মতামত যে আরও অনেক বেশি সতর্কতা ও যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত ছিল ভারতের।”
এসআইটির তদন্তে এই বিষয়ে নির্ভর করা হয়েছিল বিভিন্ন হলফনামা, বিবৃতি এবং দাতা চিড়িয়াখানাগুলির (যার মধ্যে ক্যাপিটাল চিড়িয়াখানও অন্তর্ভুক্ত) সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ওপর। সংক্ষিপ্ত এসআইটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে গরিলাটির উপ-প্রজাতি ভুলভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল, তবে রিপোর্টে না মূল উপ-প্রজাতির নাম, না সংশোধিত উপ-প্রজাতির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। গরিলার প্রকৃত প্রজাতি এবং কীভাবে এই ভুল নথিভুক্তকরণ ঘটলো—এসব বিষয়ে স্পষ্টীকরণের জন্য আমরা এসআইটির কাছে প্রশ্ন পাঠালেও কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত–ভিত্তিক আরেক দাতা চিড়িয়াখানা ক্যাঙ্গারু অ্যানিম্যাল শেল্টার, যার ব্যবস্থাপক সম্পর্কে SZ প্রতিবেদন বলেছে যে তিনি বাণিজ্যিক বন্যপ্রাণী ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তারা এসআইটিকে জানায় যে “ইসলামের অনুগত অনুসারী হিসেবে তারা প্রাণীদের সেবা করা, তাদের উদ্ধার ও আশ্রয়দানকে ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করেন।”
জার্মান সংরক্ষণ সংস্থা প্রোওয়াইল্ডলাইফ–এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং বনতারার প্রাণী সংগ্রহ প্রক্রিয়ার কট্টর সমালোচক ড্যানিয়েলা ফ্রেয়ার বলেন,
“প্রশ্ন ওঠে—এসআইটি কেন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতামত না নিয়ে সেই কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেছে যারা পারমিট দিয়েছে বা প্রাণী সরবরাহ করেছে?”
গ্লোবাল হিউম্যান সোসাইটির অডিট রিপোর্ট
সমালোচকরা আরও উল্লেখ করেছেন যে এসআইটি কোন স্বাধীন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদের সঙ্গে কোনও পরামর্শ করেনি। বিধি লিগালের দেবাদিত্য সিনহা বলেন, “এসআইটিতে কোনও স্বাধীন বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানী বা সংরক্ষণবিদের অনুপস্থিতি উদ্বেগজনক, বিশেষ করে যখন তদন্তের মূল বিষয় wildlife-এর ওপর প্রভাব এবং সংরক্ষণ সম্পর্কিত।”
এসআইটি তাদের তদন্তে সহায়তার জন্য তিনজন কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে যুক্ত করেছিল—অভিষেক কুমার, ভারতীয় বনসেবা (IFS)–এর কর্মকর্তা এবং প্রাক্তন চিড়িয়াখানা পরিচালক; মোহিত জাঙ্গিড, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটে কর্মরত ভারতীয় রাজস্ব পরিষেবা (IRS)–এর কর্মকর্তা; এবং মহীপ কুমার, মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রধান প্রধান বন সংরক্ষক বা PCCF (বন্যপ্রাণী)।
এইসব কর্তাব্যক্তিদের পাশাপাশি, এসআইটি গ্লোবাল হিউম্যান সোসাইটি–এর একটি অডিটকেও বনতারার কল্যাণকাজ ও সংরক্ষণ পদ্ধতির মান যাচাইয়ের মাধ্যম হিসাবে উল্লেখ করেছে। গ্লোবাল হিউম্যান সোসাইটি (GHS) হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এনজিও আমেরিকান হিউম্যান অ্যাসোসিয়েশন–এর আন্তর্জাতিক শাখা, যা মূলত চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত প্রাণীদের জন্য বিখ্যাত সেই সার্টিফিকেশন প্রদান করে—“এই চলচ্চিত্র নির্মাণে কোনও প্রাণীকে ক্ষতি করা হয়নি।”
গ্লোবাল হিউম্যান সোসাইটি বনতারাকে তাদের স্বাক্ষরিত “সার্টিফায়েড হিউমেইন” (Certified Humane) ট্যাগ প্রদান করে ১০ সেপ্টেম্বর—যা প্রকাশ পায় এনজিও–র আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে। এই ঘটনাটি ঘটে এসআইটি তাদের রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়ার ঠিক এক দিন আগে। সনদে উল্লেখ করা হয়েছে যে বনতারা “প্রাণীকল্যাণ, উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং সংরক্ষণে সর্বোচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করেছে।”

এসআইটির সংক্ষিপ্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে,গ্লোবাল হিউম্যান সোসাইটির পক্ষ থেকে সাত সদস্যের একটি দল কোন এক (অনুল্লেখিত) মাসে টানা নয় দিন ধরে বনতারা পরিদর্শন করে এবং সেখানকার ভেটেরিনারি কার্যক্রম, খাদ্য, বাসস্থানের নকশা, সংরক্ষণমূলক প্রজনন, জরুরি প্রস্তুতি এবং কর্মীদের কর্ম সংস্কৃতি–সহ একাধিক বিষয় “ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা” করে।
রিপোর্টে আরও যোগ করা হয়েছে যে এই সার্টিফিকেশনের মেয়াদ পাঁচ বছর।
তবে এই অডিটের শর্তাবলি স্পষ্ট নয়। প্রেস কনফারেন্সে দেখানো সার্টিফিকেটে উল্লেখ আছে যে এটি মাত্র এক বছরের জন্য বৈধ, এবং তা শুধুমাত্র সেইসব “স্থানে প্রযোজ্য, যেগুলো গ্লোবাল হিউম্যান সোসাইটি ও বনতারার মধ্যে স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম চুক্তিতে সংজ্ঞায়িত।”
অডিট রিপোর্ট বা সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম চুক্তি—দুটিরই কোনওটাই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। গ্লোবাল হিউম্যান সোসাইটি–এর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest ) এড়াতে তারা বহিরাগত অডিটরদের নিয়োগ করে এই ধরনের মূল্যায়ন করার জন্য।
গ্লোবাল হিউম্যান সোসাইটি'র প্রেস বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে মূল্যায়নে ব্যবহৃত মানদণ্ডগুলো নির্দিষ্ট প্রজাতির জন্য প্রযোজ্য (species-specific), তবে বনতারায় সংরক্ষিত ও আশ্রিত ২,০০০টি প্রজাতির সকলকেই মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছিল কিনা—সেটি সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
সাইটস (CITES) সচিবালয় আরও সুপারিশ করেছে যে বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো (WCCB)–কে যথেষ্ট জনবল ও ক্ষমতা প্রদান করা হোক, যাতে তারা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ বাণিজ্য রোধে কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
এছাড়া, যেসব দেশের জারি করা পারমিট সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছে, তাদের সঙ্গে ভারতকে যোগাযোগ ও সমন্বয় করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—যাতে “আমদানিকৃত প্রাণীগুলোর সাইটস কনভেনশনের বিধান অনুসারে লেনদেন হয়েছে কিনা” তা যাচাই করা যায়।
মূল প্রবন্ধটি Mongabayপত্রিকায় প্রকাশিত। ইংলিশ প্রবন্ধটির অনুমতিক্রমে অনুবাদ করা হল বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য। মূল প্রবন্ধটির লিঙ্ক: https://india.mongabay.com/2025/11/global-biodiversity-assessment-counters-supreme-courts-clean-chit-to-vantara/







Comments