• ..

ভারত থেকে কি চিতার মতই হারিয়ে যাবে ক্যারাকালরা?

বাঘ, লেপার্ড, সিংহের মত বিড়াল জাতীয় বড় বড় প্রাণীর পাশাপাশি ভারতে বন্য পরিবেশে বাস অনেক রকম ছোট প্রজাতির বিড়ালের । এদের মধ্যেই অল্পচেনা একটি প্রজাতি ক্যারাকাল। একসময়ে ভারতের অনেক স্হানে এদের খোঁজ মিললেও এখন এদের সংখ্যা সংকটসীমায়। অথচ বৈচিত্রে, ক্ষিপ্রতায়, সৌন্দর্যে প্রকৃতির অতুলনীয় দান এই ক্যারাকালরা। কেমন তাদের জীবনধারণ? কিভাবে সম্ভব ওদের রক্ষা করা? বিশেষজ্ঞরাই বা কী ভাবছেন! এই নিয়ে আলোচনায় সুমন্ত ভট্টাচার্য্য


রনথোম্বরে একটি ক্যারাকাল। ছবি: Dharmendra Khandal

"...the caracal is seen only by those whom the caracal wants to see." (Dharmendra Khandal)


ওরা থাকে লুকিয়ে।থাকে বালুভূমিতে, কাঁটাঝোপে, ঘাসবনে। ওঁৎ পেতে থাকে শিকারের জন্য। ইংরাজিতে যাকে 'ক্যামোফ্লাজ' বলে তেমন শিল্পে এরা দক্ষ অভিনেতা প্রকৃতির রঙ্গভূমিতে।"ভাগ্যবানে তাহারে দেখিবারে পায়..."। ওরা হল এক রকমের জংলি বিড়াল। ওদের বাস সেই আফ্রিকা থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে ভারতভূমিতে। ওরা হল ক্যারাকাল।প্রকৃতির লীলাভূমিতে আর এক অনবদ্য সৃষ্টি।

ক্যারাকাল মাঝারি আকারের একরকম বিড়াল। বাঘ, লেপার্ড, সিংহের মত বড়বড় বিড়াল জাতীয় জানোয়ার ছাড়াও সারা বিশ্বে যে ২৭ রকমের ছোট বিড়াল প্রজাতি আছে বন্য পরিবেশে তাদের অন্যতম। ধূসর, বা উজ্জ্বল সোনালি গায়ের রং এদের, যাতে ওদের বাসভূমির পরিবেশের সাথে মিশে যেতে পারে।তেমনটাই অভিযোজন। পেটের নীচটা সাদা।কপাল থেকে নাকে নেমে গেছে দুটি কালো দাগ।আর রয়েছে ওদের কালো রং এর কান যার শীর্ষদেশে উঠে রয়েছে একগোছা করে কালো রং এর লোম। এই কালো রঙের কানই ওদের নামের উৎস।ক্যারাকাল নামটা এসেছে তুর্কি ভাষায় 'কারাকুলাক' শব্দ থেকে যার অর্থ কালো কান।ওদের বিজ্ঞানসম্মত নাম Caracal caracal। আর দেশে দেশে স্হানভেদে ওদের রয়েছে নানা নাম।যেমন পশ্চিম ভারতের যেসব অংশে ওদের দেখা যায় সেখানে বা মধ্য এশিয়ায় ওরা 'সিয়া-গোস' (Siyeh gush) নামেও পরিচিত ফার্সি ভাষায় যার অর্থ কালো কান।আবার লাফ দিয়ে ময়ূর শিকার করার ক্ষমতার জন্য রাজস্হানে ওরা কোথাও বা পরিচিত 'মোর মার বাঘেরি' নামে। গুজরাতের কচ্ছি ভাষায় ওদের ডাকা হয় 'হারণত্র' নামে , কারণ ওদের গায়ের রঙ মিলে যায় চিংকারা হরিণের সাথে।

ক্যারাকালের পিছনের পা জোড়া সামনের দুটির থেকে লম্বা।ফলে সহজেই তারা বাতাসে দীর্ঘ দূরত্ব লাফ দিয়ে পার হতে পারে।পায়ের থাবার গড়ন এমন যাতে নি:শব্দে চলাফেরা করতে পারে।গড় ৪০-৫০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক ক্যারাকালের ওজন হতে পারে ৮-১৯ কিলোগ্রাম।ক্যারাকালকে বলা হয় ছোট বিড়ালদের মধ্যে দ্রুততম।লাফ দিতে এমনই দক্ষ এরা যে উড়ে যাওয়া পাখিকেও লাফ দিয়ে শিকার করে নেয়। আর ধূ ধূ ঘাসভূমি বা মরু প্রান্তরে শিকারের গতিবিধি শোনার জন্য রয়েছে এদের তীক্ষ্ণ শ্রবণ যন্ত্র অর্থাৎ কান দুটি। শুনলে আশ্চর্য হবেন এদের কানে রয়েছে ২০টি পেশি।এই পেশিগুলি কানকে সূক্ষ্ণ যে কোন শব্দের প্রতি সংবেদী করে তোলে, যাতে সাহায্য করে কানের ওপরের লম্বা লম্বা রোমগুলি।অন্যান্য বিড়াল জাতীয় জন্তুর মতই মিয়াও, হিসস্ বা গরগর শব্দ করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখে এরা।

ক্যারাকালের বিশেষ কান

বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি জলের দরকার হয় না ওদের।বরং শিকারের মাংস খাবার সময়েই প্রয়োজনের অনেকটা জল পেয়ে যায়। তাছাড়া দিনের বেশিটা এরা বিশ্রামে কাটায়। ভোরে, সন্ধ্যায় আর রাতের অন্ধকারে শিকারের কাজ করে বলে শক্তিক্ষয়ও কম হয়। তাই শুষ্ক বনভূমি অঞ্চলে, যেখানে বৃষ্টিপাত খুব কম- সেখানে ক্যারাকালের সহজ বসবাস।আফ্রিকায় এরা সব থেকে বেশি সংখ্যায় দেখা যায়।সাহারার দক্ষিণ ভূভাগ থেকে এদের বিস্তৃতি দক্ষিণ আফ্রিকা অবধি। শিকার ও কৃষিভূমির বিস্তারের জন্য সাব সাহারান ভূ-ভাগে এদের সংখ্যা কমে এলেও দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার সাভানা তৃণভূমিতে এদের অনেক সংখ্যায় দেখা মেলে।এমনকি পূর্ব দক্ষিণ আফ্রিকায় সবুজ বনভূমিতেও ওদের দেখা মেলে। বরং ওই শিকার আর কৃষিজমির বিস্তারে অরণ্য ও তৃণভূমি ধ্বংস হবার কারণেই মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান ও ভারতে এদের সংখ্যা কমে এসেছে চোখে না পড়ার মত।

ছোট থেকে মাঝারি স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি এদের স্বাভাবিক খাদ্যতালিকায় আসে। নি:শব্দে চলাচল, আশেপাশের প্রকৃতির সাথে মিশে যাবার ক্ষমতা, তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তি আর মাটি থেকে প্রায় দশ ফুট উঁচুতে লাফ দেবার ক্ষমতা এদের শিকারে পারদর্শী করে তোলে।এমনকি ছোট চিংকারা হরিণ বা আফ্রিকার ইম্পালা জাতীয় হরিণও এদের খাদ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। আফ্রিকার দক্ষিণে বনভূমি আর সাভানায় খাদ্যের প্রাচুর্য এদের সংখ্যা বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক। স্বাভাবিক বাসস্হানের বাইরেও আশেপাশের লোকালয় থেকে গৃহপালিত জন্তু বা মুরগী মেরে খায় এরা।

ক্যারাকালরা সাধারণত: একা থাকে।শুধুমাত্র যৌন মিলনের সময় পুরুষ ও স্ত্রী ক্যারাকাল কিছুদিন একসাথে থাকে।এই সময়ে অদ্ভুত কেশে ওঠার মত শব্দ করে সঙ্গীকে জানান দেয় উপস্হিতি। আর বাচ্চারা একটা সময় অবধি মায়ের সাথে থাকে।সাধারণত: কোন গর্তে বাচ্চাদের রাখে মা ক্যারাকাল।এদের আয়ু গড়ে ১২ বছর অবধি হয় বন্যজীবনে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে যেখানে এমন বন্য জীবকে পোষ্য হিসাবে রাখা যায়, সেখানে এদের আয়ু ১৭ বছর অবধি হতে পারে দেখা গেছে পোষ্য অবস্হায়, যেহেতু খাবার বা অন্য কারণে তাদের তেমন সংগ্রাম করতে হয় না বন্য পরিবেশের মত।

শাবককে খেতে শিখাচ্ছে মা ক্যারাকাল। রনথোম্বর টাইগার রিজার্ভে এই বিরল দৃশ্য ধরা পড়েছে Dharmendra Khandal এর ক্যামেরায়।

ভারতের বিচিত্র জীববৈচিত্র যেমন আমাদের গৌরবের, তেমনই জনাকীর্ণ এই দেশে তাকে রক্ষা করা কতটা দুরূহ তা বোধহয় ক্যারাকালের ক্ষীয়মাণ অস্তিত্বই প্রমাণ করে। IUCN (International Union for Conservation of Nature and Natural Resources) এই জীবকে আফ্রিকায় এদের যথেষ্ট সংখ্যায় উপস্হিতির কারণে ‘Least Concern’(কম উদ্বেগজনক) তালিকায় রাখলেও সর্বত্রই এদের নিয়ে খুব কম গবেষণা হয়েছে এবং এদের সঠিক সংখ্যা কোন দেশেই জানা নেই।জানা নেই তারা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে!ভারতে তো এদের নিয়ে প্রকৃত গবেষণার খুবই অভাব।যদিও বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন ১৯৭২ অনুযায়ী বাঘ, সিংহ বা লেপার্ডেরমত ক্যারাকালও সর্বোচ্চ সুরক্ষার মান্যতা প্রাপ্ত Schedule 1 তালিকাভুক্ত। ভারতে খুব কম সংখ্যক মানুষ যদিও এই শিকারি বিড়ালটির সম্পর্কে খোঁজ রাখেন, ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘেঁটে কিন্তু দেখা যাচ্ছে একসময় ভারতের একটা বড় অংশে এদের অস্তিত্ব ছিল। শিকারে দক্ষতার জন্য ভারতে তাদের গুরুত্ব ছিল দীর্ঘকাল ধরে হারিয়ে যাওয়া চিতার মত, আজ আমরা সেটা ভুলে গেলেও।"দীর্ঘ-করন" নামে এক রকম বিড়ালের কথা জানা যায় পুরাতন সংস্কৃত সাহিত্যে।মধ্যযুগে সুলতানি ও মোগল শাসনকালে শিকারের জন্য এদের ব্যবহার ছিল।চতুর্দশ শতাব্দীতে ফিরোজ শাহ তুঘলক "সিয়া-গোস খানা" চালু করেন একটা বড় সংখ্যার ক্যারাকালকে পোষার জন্য।আকবরের সময় এদের ব্যবহার আরও বেড়ে যায় মৃগয়াকার্যে। এমনকি ঐতিহাসিক নথিতে প্রমাণিত এই শিকারে উপযোগিতার জন্য ক্যারাকালকে তাদের প্রাকৃতিক বাসভূমি থেকে অনেক দূরে লাদাখে বা পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাতেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ধর্মেন্দ্র খন্ডাল, ঈশান ধর ও জি ভি রেড্ডি ২০২০ সালে তাদের প্রকাশিত একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাপত্রে ভারতের বিভিন্ন স্হানে ক্যারাকালের অস্তিত্বের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং বর্তমান সংকট নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন।তাঁদের মতে ভারতের বেড়ে চলা জনসংখ্যা এবং বড় অংশের বনভূমি আর তৃণভূমিকে চাষের ক্ষেতে ও লোকালয়ে পর্যবসিত করায় এই রকম প্রাণীদের স্বাভাবিক বাসস্হান সংকুচিত হয়ে পড়েছে।বস্তুত: ১৮৮০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ভারত ২,৬০,০০০ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি এবং ২,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার তৃণভূমি পরিণত হয়েছে চাষের জমিতে জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে! ফলত: একসময়ে যে ক্যারাকালের অস্তিত্বের হদিশ পাওয়া গেছিল পূর্বদিকের ওড়িশা বা ছত্তিশগড় থেকে ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র হয়ে সেই সুদূর উত্তর-পশ্চিম ভারত অবধি, তার অল্প কিছুই এসে ঠেকেছে এখন রাজস্হান ও গুজরাতের কিছু অংশে।

ইওরোপিয়ান গবেষক De Brett ১৯০৯ সালে বস্তারে ক্যারাকালদের আদিবাসীদের খাদ্য হিসাবে লক্ষ্য করে সে কথা লেখেন।১৮৮৯ সালে অমরকন্টকে ব্রিটিশ অফিসার ও লেখক জেমস ফরসিথ একটি ক্যারাকল শিকার করার কথা লিখেছেন তাঁর বিস্তৃত গ্রন্থ The Highlands of Central India: Notes on Their Forests and Wild Tribes, Natural History, and Sports এ। গবেষক Thackston মোগল সম্রাট জাহাঙ্গিরের ১৬১৬ সালে আজমেরে একটি ক্যারাকাল শিকারের তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। ১৯১১ সালে মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে ক্যারাকলের খোঁজ পাওয়া যায় যেখানে এদের 'ঝুয়া' বলে ডাকা হত।পুরানো নথি থেকে দেখা যাচ্ছে ১৮৯২ সালে উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরে একটি ক্যারাকাল এক শ্রমিককে আক্রমণ করলে তাকে গুলি করে মারা হয়।পাঞ্জাব সরকারের ১৮৮৪ সালের রিপোর্টে পাঞ্জাবের ঝাঙ্গ এলাকায় (বর্তমানে পাকিস্তানে) ক্যারাকালের উপস্হিতির বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে যাদের সেখানে 'বড় বিলা' বলা হত। আবার ১৯৬১ সালে J.C. Taylor জানাচ্ছেন তার ১২ বছর বয়সে একটি ক্যারাকালের দ্বারা আক্রান্ত হবার কথা।

দুঙ্গারপুরের উদয়বিলাস প্রাসাদে একটি বাঘ ও একটি ক্যারাকলের মাউন্ট করা ট্রফি। ছবি: Dharmendra Khandal

সেটিকেও গুলি করে মারা হয়। ক্যারাকালের হাতে মানুষকে আক্রমণের এই দুটি ঘটনাই জানা যায়।১৯০৯ সালে ব্রিটিশ অফিসার O’Malley র লেখায় দেখা যাচ্ছে ওড়িশার সম্বলপুরে কুকুরের আক্রমণে একটি ক্যারাকালের মৃত্যুর কথা।১৯৪৮সালে দুঙ্গারপুরের মহারাওয়াল লক্ষণ সিং একটি গণনাকার্যে তার রাজত্বে ৪৮টি ক্যারাকালের খোঁজ পান।১৯৫৯ সালে প্রখ্যাত বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ পিকে সেন ঝাড়খন্ডের হাজারিবাগ অঞ্চলে ক্যারাকালের দেখা পান। প্রখ্যাত বাঘ বিশেষজ্ঞ শ্রী কৈলাস শাঙ্খালা , রাজস্হানের মুখ্য বনাধিকারিক শ্রী বিষ্ণু শর্মার সাথে ১৯৮৪ সালে বন বিড়ালের ওপর একটি গবেষণাপত্রে ক্যারাকালদের হালহদিশ খোঁজার চেষ্টা করেন রাজস্হানে। সেখানে পালি অঞ্চলে ১৯৮০ সালে চামড়ার জন্য পাঁচটি ক্যারাকালকে হত্যার কথা উল্লেখ করেন। প্রখ্যাত বাঘ গবেষক রঘু চান্দাওয়াত ১৯৭০ এর দশকে মধ্যপ্রদেশের সীহর জেলা ও গান্ধীসাগর অভয়ারণ্যে দুবার ক্যারাকলের দেখা পান। ১৯৭৫ সালে বনাধিকারিক অশোক সিং উত্তর প্রদেশের মির্জাপুরে দুটি ক্যারাকালের বাচ্চাকে উদ্ধার করেন ও ছবি তোলেন। এমনই সব অসংখ্য আশ্চর্য তথ্য উঠে এসেছে ধর্মেন্দ্র খন্ডালদের বিস্তৃত গবেষণাপত্রে পুরানো দিনের নথিপত্র ও প্রমাণ ঘাঁটাঘাটি করে। এভাবে ১৬১৬ সাল থেকে ২০০০ সাল অবধি তারা ক্যারাকালের অস্তিত্বের এমন ৮৯টি প্রমাণ পেয়েছেন যা পাঞ্জাব, ওয়াজিরিস্তান, রাজস্হান ,গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড, ওড়িশা, অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্রে এদের বাসভূমির কথা মনে করিয়ে দেয়।অথচ ২০০১ সালের পর মাত্র তিনটি রাজ্য- গুজরাত, রাজস্হান ও মধ্যপ্রদেশে তাদের দেখা গেছে।

দুঙ্গারপুর রাজপ্রসাদে ঊনবিংশ শতকে আঁকা ক্যারাকালের একটি ফ্রেসকো ছবি। ধর্মেন্দ্র খান্ডালের মতে ল্যাজটি ছাড়া বাকি ছবিটি ক্যারাকলের নিখুঁত উপস্হাপনা করছে। ছবি: Dharmendra Khandal

বিগত বছরগুলোয় সবচেয়ে বেশিবার ক্যারাকাল নজরে এসেছে রাজস্হানে, যার মধ্যে রনথোম্বর টাইগার রিজার্ভ রয়েছে উল্লেখযোগ্য স্হানে। ক্যামেরা ট্র্যাপিং এর মাধ্যমে রনথোম্বর তো বটেই, সরিস্কা, চিতোরগড়, টোডগড়, কুম্ভলগড়ের সুরক্ষিত বনাঞ্চলেও ধরা পড়েছে ওদের উপস্হিতি।সুরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরেও সোয়াই মাধোপুর, প্রতাপগড়, উদয়পুর, আলোয়ার জেলার অনেকস্হানে ওদের চলাচলের প্রমাণ পাওয়া গেছে।গুজরাতের একমাত্র কচ্ছ অঞ্চলে এই শতকে ওদের উপস্হিতির খবর পাওয়া গেছে ১৯ বার।২০১৯সালে নখতারনার রামপার গ্রামে একটি পুরুষ ক্যারাকাল শিকার ধরতে গিয়ে কুয়োয় পড়ে গেলে সেটিকে উদ্ধার করা হয় ও সেই ঘটনার ভিডিও করা হয়। মধ্যপ্রদেশেএই শতকে মাত্র দুবার দেখা মিলেছে ২০০১ এবং২০০৭ সালে। তাও ২০০১ সালে ক্যারাকালটিকে গাড়ি চাপা পড়ার পর মৃত অবস্হায় পাওয়া যায়।গবেষক ধর্মেন্দ্র খন্ডাল জানালেন, "পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকেই বনকর্মী ও অফিসাররা আমাকে ছবি পাঠিয়ে থাকেন কোন বিড়াল জাতীয় জন্তু জঙ্গলে দেখতে পেলে যে সেটা ক্যারাকাল কিনা। তবেপ্রায় সব ক্ষেত্রেই সেগুলো জংলী বিড়াল আসলে। ক্যারাকালের দেখতে পাবার ঘটনা খুবই কম।" ধর্মেন্দ্রজিকে জিজ্ঞাসা করি কিভাবে সম্ভব এদের পার্থক্য করা! তিনি বললেন, "দুজনেই প্রায় একই রকম লম্বা। তবে জংলি বিড়ালের(jungle cat) মুখে সাদা দাগ থাকে, যেখানে ক্যারাকালের কালো দাগ থাকে। আর জংলি বিড়ালের ল্যাজের আগায় কালো রং এর চক্রাকার দাগ থাকে।ক্যারাকালের ল্যাজ একই রং এর পুরোটা। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল ওদের কানে। দুজনের কান লম্বা হলেও, ক্যারাকালেরটা বেশি লম্বা। আর ক্যারাকালের কানের পিছনদিক পুরো কালো, যেখানে জংলি বিড়ালের কানের উপর দিকে অল্প কালো।এছাড়া, ক্যারাকালের কানে বড় বড় কালো চুল বা লোম থাকে।" তাঁদের মতে মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ বা মহারাষ্ট্রে যদি ক্যারাকাল থেকেও থাকে কমসংখ্যায়, গবেষণার অভাবে সেগুলো চোখে পড়ছে না।

ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়া রনথোম্বরের ক্যারাকালের সন্ধ্যা বেলার চলাচল। ছবি: tiger watch

ধর্মেন্দ্র খন্ডালের মতে, "যে কোন প্রজাতি কোন এক জায়গা থেকে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ক্যারাকালের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে আফ্রিকা থেকে। ক্যারাকালদের বসতির শেষ কিনারা হল ভারত। শেষ কিনারায় তাদের সংখ্যা তাই হয়ত প্রথম থেকেই কম। যদিও এটা আমার ধারনা।এর পিছনে কোন প্রমাণ নেই।" তবে তিনি নি:সন্দেহ যে ভারতের সুরক্ষিত বনাঞ্চলে যেভাবে বাঘ ও লেপার্ডের কথা মাথায় রাখা হয়, তাতে এমন ছোট শিকারি প্রাণীদের টিকে থাকার জন্য লড়াইটা কঠিন করে দেয়। বিশেষত: খাবারের জন্য অধিক শক্তিশালী লেপার্ড এদের প্রতিযোগী।সুরক্ষিত অঞ্চলের বাইরে যে তৃণভূমি বা শুষ্ক গুল্মজাতীয় অরণ্যকে পতিত জমি হিসাবে দেখা হয় এবং তা কৃষিও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করে ফেলা হয়, তাতে এদের বসবাসের স্হান কমে আসছে। কমে আসছে ওদের খাদ্য যেসব প্রাণী (prey)তাদের সংখ্যাও।কচ্ছের নারায়ণ সরোভর অভয়ারণ্যের কাছাকাছি নানারকম প্রকল্প বিশেষত: খনি ও বায়ুবিদ্যুৎপ্রকল্পের জন্য যেমন গ্রেট ইন্ডিয়ান বাস্টার্ডের মত পাখি বিলুপ্ত হবার মুখে, ক্যারাকালের মত প্রাণী সংকটে পড়েছে সেখানে।

সরকারের তরফ থেকে কি কোন সাড়া পাওয়া গেছে ক্যারাকালদের সংরক্ষণের বিষয়ে? জানতে চেয়েছিলাম ধর্মেন্দ্রজির কাছে। "সরকার আসলে এত ছোট প্রজাতি নিয়ে হয়ত তত উৎসাহী নয়। তারা বরং চিতার মত charismatic প্রজাতি নিয়ে বেশি উৎসাহী।যদিও সম্প্রতি সরকার প্রজাতিটিকে endangered ঘোষণা করেছে।জানিনা আমাদের গবেষণাপত্রটির কোন প্রভাব আছে কিনা এতে! বনবিভাগ থেকে আমার সাথে যোগাযোগও করা হয়েছে", জানালেন তিনি। সংরক্ষণবিদদের মধ্যেও উৎসাহ তত চোখে পড়ে না ক্যারাকাল নিয়ে।ধর্মেন্দ্রজির মতে,হয়ত এদের সংখ্যা এতই কমে গেছে, এদের রক্ষা করার কোন প্রয়াস তত ফলপ্রসূ হবে বলে কেউ মনে করছে না।তাই হয়ত উৎসাহ কম।

আরো পড়ুন: চিতারা কেন ভারত থেকে হারিয়ে গেল?


তাহলে ক্যারাকালের জন্য কি কিছুই করার নেই? ধর্মেন্দ্রজির মতে, সবার আগে দরকার যথাযথ গবেষণা, ফিল্ড ওয়ার্ক।যেটা প্রায় হয়নি বললেই চলে। আর দরকার তাদের উপযুক্ত বাসস্হানগুলো চিহ্নিত করা।সরকারেরযদি সত্যিই ইচ্ছা থাকে সঠিক পরিকল্পনা করে এগানো দরকার। সরকার যে "recovery of species" প্রকল্পের ঘোষণা করেছিল দুই বছর আগে বিভিন্ন বিপন্ন প্রজাতির জন্য যেমন ক্যারাকাল, অসমে পিগমি হগ ডিয়ার,সিঙ্গলিলায় রেড পান্ডা প্রভৃতি তার তো তেমন কোনকাজ হয়নি। এটা করার জন্য দরকার একটা উপযুক্ত দল তৈরি করা।সরকারি দলের বাইরেও যারা কাজ করছে এই সব নিয়ে তাদের যুক্ত করা দরকার। ক্যারাকালের জন্য রনথোম্বর আর কচ্ছ খুব গুরত্বপূর্ণ এলাকা।কচ্ছে যেমন বিক্রম সিং সোধা এই নিয়ে কাজ করছেন। বাঘ বাঁচানোর থেকে এই ধরনের প্রজাতি বাঁচানোর কাজ অনেক কঠিন কারণ এদের নিয়ে এখনও কোন পরিকল্পনা নেই।সেটা করতে হলে সরকারের বাইরে যে বৈজ্ঞানিক, গবেষকরা আছেন তাদের সাহায্য নিতেই হবে। বাঘ সংরক্ষণের কাজও তাদের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল, যা পরে সরকার পুরোপুরি নিজের আয়ত্বে নিয়ে নেয়।

ক্যারাকাল নিয়ে ধর্মেন্দ্র খান্ডাল তার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই লিখছেন। তাঁর আশা বইটি প্রকাশ হলে হয়ত আরো কিছু মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছবে।

রনথোম্বরে ফিল্ড ওয়ার্কে ধর্মেন্দ্র খান্ডাল (ডানদিকে) ও তার দল

জিজ্ঞাসা করেছিলাম, রনোথোম্বরে ওয়াইল্ডলাইফ সাফারিতে কেন ক্যারাকালের দর্শন মেলে না অথচ আপনাদের ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ে? জানালেন, ক্যরাকালরা মূলত অরণ্যের সীমানায়ও তার বাইরে থাকে। আর সাফারি হয় বনের কোর এলাকায় যেখানে এরা থাকেনা। তাঁদের গবেষণায় ক্যামেরা ট্র্যাপও অরণ্যের বাইরে বা তার সীমানা এলাকায় লাগানো হয়েছিল যেখানে ওদের চলাচল।

আরো পড়ুন: জীববৈচিত্র্যের আধার তৃণভূমি ধ্বংসের মুখোমুখি


ক্যারাকালের বাস তথাকথিত পতিত জমিতে। এমনই 'পতিত' জমিতেই থাকে নেকড়ে, হায়েনা ও আরো অনেক বিরল প্রজাতির প্রাণী। অথচ সরকারী নীতিতে জোর দেওয়া হচ্ছে এইসব জমির চরিত্র বদলে কৃষিকাজ বা অন্য পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য। এর ফলে সুরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে যে সব প্রাণীর বাস তাদের সংরক্ষণ ধাক্কা খাচ্ছে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানসম্মত না হলে একের পর এক প্রজাতি আমরা হারাতে থাকব। ক্যারাকালদের সংখ্যা ভারতে সংকটসীমার অনেক গভীরে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে আমরা এমন একটি সুন্দর ও বিচিত্র প্রজাতিকে ভারতের মাটি থেকে চিরতরে হারিয়ে ফেলব।


তথ্যঋণ: Khandal, D., I. Dhar & G.V. Reddy (2020). Historical and current extent of occurrence of the Caracal Caracal caracal (Schreber, 1776) (Mammalia: Carnivora: Felidae) in India. Journal of Threatened Taxa 12(16): 17173–17193. https://doi.org/10.11609/jott.6477.12.16.17173-17193.


Vanishing Cats of Rajasthan. J In Jackson, P. (Ed) Proceedings from the Cat Specialist Group meeting in Kanha National Park. [Sharma, V. & Sankhala, K. 1984.]



Singh, R.; Qureshi, Q.; Sankar, K.; Krausman, P.R. & Goyal, S.P. (2014). "Population and habitat characteristics of caracal in semi-arid landscape, western India". Journal of Arid Environments. 103: 92–95.


Is the Enigmatic Caracal in Line to Becoming India’s Second Wild Cat Species Lost? [Divyajyoti Ganguly on conservationindia.com ]


Sunquist, F. & Sunquist, M. (2002). "Caracal Caracal caracal". Wild Cats of the World. Chicago: University of Chicago Press. pp. 38–43. ISBN 978-0-226-77999-7.



নিজের বসতিতে একটি ক্যারাকাল। ছবি: wikimedia commons/ Louise Joubert


লেখক পরিচিতি: লেখক পেশায় চিকিৎসক। প্রকৃতি ও অরণ্যপ্রেমী। 'বনেপাহাড়ে' ওয়েবজিনের সম্পাদনার দায়িত্বে।



বনেপাহাড়ে- বাংলায় প্রথম বন্যপ্রাণ ও পরিবেশ বিষয়ক ওয়েবজিন।


Click here to join us at Facebook. LIKE and Follow our page for more updates.






462 views0 comments
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG