বনে নয়, খোলামেলা জমিতেই থাকতে পছন্দ করে বনবিড়াল
- ..
- 10 hours ago
- 5 min read
জঙ্গল ক্যাট বা বনবিড়াল সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটি ছোট বিড়াল প্রজাতি, বাংলায় যাদের বলে খটাশ। অথচ এদের নিয়ে যথাযথ গবেষণার অভাব ছিল। সম্প্রতি একটি বৈজ্ঞানিক গবষণায় ওদের নিয়ে উঠে এল অনেক তথ্য যা এই ধরনের প্রাণীদের গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করতে পারে। আলোচনায় মঞ্জিরা গোরাভরম।

সম্প্রতি দেশ জুড়ে বনবিড়াল বা জঙ্গল ক্যাট নিয়ে একটি সমীক্ষা হয়েছে তাদের বাসস্থান ও তাদের সংখ্যা সম্বন্ধে জানতে। তাতে বোঝা যাচ্ছে ভারতে তিন লাখের বেশি বনবিড়াল থাকার কথা। গবেষণাদলের প্রধান ব্যক্তি কথন বন্দোপাধ্যায়ের কথায়, “এই গবেষণার আগে জঙ্গল ক্যাট বা বনবিড়াল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুবই সীমিত ছিল। তাদের পছন্দের আবাসস্থল, ওদের সংখ্যা, বাঘ ও চিতাবাঘের মত প্রাণীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, কিংবা অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য তাদের নিয়ে কেমন হয় -সে সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানতাম না। এই গবেষণাই সেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ঘাটতি পূরণ করেছে।”
৬,০০০-এরও বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জঙ্গল ক্যাটের বসবাসের উপযোগী এলাকাগুলি চিহ্নিত ও মানচিত্রায়ণ করেছেন। এ জন্য প্রধানত বাঘ সংক্রান্ত জাতীয় সমীক্ষার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা Scientific Reports-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় জানা গেছে, জঙ্গল ক্যাট উষ্ণ ও তুলনামূলকভাবে শুষ্ক জলবায়ুর অঞ্চল, মাঝারি বৃষ্টিপাত এবং মানুষের সীমিত উপস্থিতি থাকা এলাকায় বসবাস করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সারা দেশে প্রায় ৫.৪৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা তাদের জন্য উপযুক্ত আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে বন বিড়ালের উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
Salim Ali Centre for Ornithology and Natural History-এর সিনিয়র প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট শোমিতা মুখার্জি বলেন, ‘জঙ্গল ক্যাট খুব বিরল বা অত্যন্ত আলোচিত কোনো প্রাণী নয়। তাই এমন একটি অপেক্ষাকৃত সাধারণ ও ছোট প্রজাতিকে নিয়ে এত বড় পরিসরে গবেষণা করার উদ্যোগ সচরাচর দেখা যায় না। এই গবেষণার জন্য যে পরিমাণ শ্রম ও তথ্য সংগ্রহের কাজ করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
ঝোপঝাড় ও তৃণভূমির বিড়াল
জঙ্গল ক্যাট সাধারণত খোলামেলা ধরনের আবাসস্থল, যেমন তৃণভূমি (grasslands), ঝোপঝাড়পূর্ণ এলাকা (scrublands), জলাভূমি (wetlands) এবং কৃষিজমির বৈচিত্রপূর্ণ এলাকা (agricultural mosaics) পছন্দ করে। অন্যদিকে, তারা ঘন বনাঞ্চল এবং শহুরে এলাকা এড়িয়ে চলে।
তাদের লম্বা পা ও ছিপছিপে শরীর তাদের উঁচু ঘাসের মধ্যে সহজে চলাফেরা করতে সাহায্য করে, আর শরীরের রং শুষ্ক ও ঘাসে ঢাকা পরিবেশের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের আড়াল করে রাখে।
শোমিতা মুখার্জী বলেন,“জঙ্গল ক্যাটের শারীরিক গঠন স্পষ্টভাবেই নির্দেশ করে যে এটি মূলত ঝোপঝাড়পূর্ণ এলাকার বাসিন্দা একটি বিড়াল।”
তবে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, জঙ্গল ক্যাটকে প্রায়শই ‘জেনারালিস্ট’ (generalist) প্রজাতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়, কারণ তারা বিভিন্ন ধরনের আবাসস্থলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম। তা সত্ত্বেও, তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও বিস্তৃতির ধরণ থেকে বোঝা যায় যে ঝোপঝাড় ও তৃণভূমি-প্রধান পরিবেশই তাদের সবচেয়ে পছন্দের আবাসস্থল।
জঙ্গল ক্যাটের সংখ্যা নির্ধারণের চ্যালেঞ্জ
জঙ্গল ক্যাটের সংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। কারণ বাঘের মতো তাদের শরীরে এমন কোনো স্বতন্ত্র ডোরাকাটা বা বিশেষ চিহ্ন নেই, যার মাধ্যমে এক একটি প্রাণীকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যায়।
এই সমস্যার সমাধানে গবেষকরা জিপিএস কলার পরানো (GPS-collared) জঙ্গল ক্যাটের তথ্য ব্যবহার করে তাদের বিচরণক্ষেত্র (space use) নির্ণয় করেন। পরে সেই তথ্যকে উপযুক্ত আবাসস্থলের মানচিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেশের মোট জনসংখ্যার একটি আনুমানিক হিসাব তৈরি করা হয়। গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে যে ভারতে প্রায় ৩,০৮,০০০টি জঙ্গল ক্যাট থাকতে পারে। তবে এই হিসাবের মধ্যে তেমন নিশ্চয়তা নেই এটাও বলা যায়।
গবেষণার প্রধান লেখক কথন বলেন, “এই প্রথমবার আমরা এমন একটি জাতীয় স্তরের জনসংখ্যা নিরূপণের চেষ্টা করেছি। প্রকৃত জনসংখ্যার প্রবণতা (population trend) বোঝার জন্য ১৫–২০ বছর পরে আবার একই ধরনের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হবে।”
তবে শোমিতা মুখার্জী কিছুটা সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই গবেষণায় মূলত বাঘ সমীক্ষার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে জঙ্গল ক্যাটের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হয়তো তথ্যভাণ্ডারের বাইরে থেকে গেছে।
তিনি বলেন, “কোনো মডেলের নির্ভরযোগ্যতা তার ভিত্তিতে ব্যবহৃত তথ্যের মানের ওপরই নির্ভর করে।”
অর্থাৎ, গবেষণাটি জঙ্গল ক্যাট সম্পর্কে জাতীয় স্তরে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিলেও, ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সমীক্ষা চালানো হলে তাদের প্রকৃত সংখ্যা ও বিস্তৃতি সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সরকারি প্রতিবেদনে ২০১৮–১৯ এবং ২০২২–২৩ সালের মধ্যে ১৮টি রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে যে, জঙ্গল ক্যাট ভারতের সবচেয়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছোট বন্য বিড়াল প্রজাতি। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা প্রায় ৯৬,২৭৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

বিড়ালের এই প্রজাতিটি International Union for Conservation of Nature-এর রেড লিস্টে "Least Concern" (সর্বনিম্ন উদ্বেগ) শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত। এই অবস্থানের কারণে অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে তারা নিরাপদেই আছে এদেশে এবং তাদের সংখ্যা ভালো। তবে ভারতে, স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন বিপদ তো আছেই বন্যজীবদের এবং সেই কথা মাথায় রেখে, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৭২-এর তফসিল–II (Schedule II)-এর অধীনে তাদের সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে।
সড়ক ও রেলপথের সম্প্রসারণের কারণে তাদের আবাসস্থল বিপন্ন হয়ে পড়ছে দিকে দিকে , এবং বিভিন্ন কৃষিজমির মধ্যে চলাচলের সময় তাই অনেক বন বিড়াল যানবাহনের ধাক্কায় মারা যায়। তাদের আবাসস্থলের একটি বড় অংশ সরকারি নথিতে “অনুর্বর জমি” (wasteland) হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায়, সেগুলি অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য জমির চরিত্র বদলে ফেলা হচ্ছে। কথনের বক্তব্য অনুযায়ী, " এইসব জমিগুলি খুব দ্রুত কৃষিজমিতে পরিণত হচ্ছে বা অপ্রচলিত বিদ্যুৎ পরিকাঠামো নির্মানে ব্যবহার করা হচ্ছে যা এদের জন্য বিপদের। "
বন বিড়াল প্রায়ই মানুষের আশেপাশেই বাস করে, বিশেষ করে কৃষিজমি ও পশু চারণভূমিতে, যেখানে ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর প্রাচুর্য থাকে এদের খাদ্য হিসাবে। তবে তারা সাধারণত ঘনবসতি শহর এলাকা এড়িয়ে চলে। কিন্তু মানুষের কাছাকাছি বসবাসের ফলে তারা গৃহপালিত প্রাণীর সংস্পর্শে আসে। কথন জানালেন, "পথ কুকুর তাদের আক্রমণ করে, তাদের খাদ্য ছিনিয়ে নেয় ও রোগ সংক্রমণ করে"।
অন্যদিকে, শ্রীমতি মুখার্জী জানাচ্ছেন যে “প্রতি বছর অনেক জঙ্গল বিড়ালের বাচ্চাকে ফসলের ক্ষেত থেকে ‘উদ্ধার’ করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই জানেন না কীভাবে তাদের সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে হয়।” এর ফলে এসব শাবকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায় বাস্তবে।
গবেষণাটিতে গৃহপালিত বিড়ালের সঙ্গে সংকরায়ণ (hybridisation)-কেও একটি সম্ভাব্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে শোমিতা মুখার্জী বলেন, এখন পর্যন্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে জঙ্গল বিড়াল ও গৃহপালিত বিড়ালের মধ্যে সংকরায়ণের কোনো নথিভুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এটিকে বড় ধরনের সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা এখনও সময়োপযোগী নয়, যদিও এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়াও যায় না। কথন বন্দোপাধ্যায়ও একমত যে, এই সম্ভাবনাগুলি নিশ্চিত করতে জিনগত (genetic) গবেষণা এবং আরও বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।
বড় বিড়ালদের ছায়ার নীচে
বর্তমানে বন বিড়াল বিভিন্ন অরণ্যভূমি সংরক্ষণ উদ্যোগের সুফল পাচ্ছে। বাঘের চলাচল ও সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা বন্যপ্রাণী করিডর বন বিড়ালও ব্যবহার করে।
Project Cheetah-এর মতো সংরক্ষণ প্রকল্প, যার লক্ষ্য তৃণভূমির মতো দীর্ঘদিনের অবহেলিত বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করা, সেগুলিও এই বনবিড়ালের মতো ছোট বন্য বিড়াল প্রজাতিদের উপকারে আসতে পারে, কারণ তারাও এসব আবাসস্থল ব্যবহার করে।
কথনের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ শুধু বড় বিড়ালের প্রজাতিকেই নয়, একই আবাসস্থলে বসবাসকারী অন্যান্য অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত বন্যপ্রাণীকেও পরোক্ষভাবে সুরক্ষা প্রদান করে।
মুখার্জীর মতে, জঙ্গল বিড়াল এমন আবাসস্থলে ভালোভাবে টিকে থাকে যেখানে মানুষের প্রকৃতির প্রতি ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকে। তাই তৃণভূমিকে বনভূমিতে রূপান্তরিত করার পরিবর্তে, তাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই সংরক্ষণ করা জরুরি, যাতে বনবিড়ালের মতো তৃণভূমি নির্ভর প্রজাতিগুলি টিকে থাকতে পারে যা তারা ঘন অরণ্যে পারবে না।

ছোট শিকারি প্রাণীরা (small carnivores) বাস্তুতন্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, তারা সাধারণত বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সংরক্ষণ পরিকল্পনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
গবেষণাপত্রটির সহ-লেখক John Koprowski-এর মতে, বন বিড়াল কৃষিজমিতে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে ফসলের ক্ষতি কমাতে তারা প্রাকৃতিক সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
তাই সংরক্ষণ কৌশল ও নীতি প্রণয়নের সময় জঙ্গল বিড়ালের মতো ছোট প্রাণীদের গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কারণ তারা শুধু জীববৈচিত্র্যের অংশই নয়, বরং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষি উৎপাদনকে সহায়তা করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে এদের।
কথনের মতে ভবিষ্যতের রূপরেখা কিন্তু মাথায় রাখা উচিত সহজ ভাবে। বন বিড়ালদের চলাচলের পথ, তাদের নানা রোগ-বিরোগ, অন্য ছোট বিড়াল প্রজাতির সাথে তাদের মেলামেশা, বিশেষত: জনবসতি এলাকায়- এগুলো নজরে রাখা দরকার। জমির ব্যবহারের বদল বাস্তুতন্ত্রে কেমন প্রভাব ফেলছে তার ইঙ্গিত দিতে পারে জঙ্গল ক্যাটের মত প্রাণীই।

মূল প্রবন্ধটি Mongabayপত্রিকায় প্রকাশিত। ইংলিশ প্রবন্ধটির অনুমতিক্রমে অনুবাদ করা হল বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য। মূল প্রবন্ধটির লিঙ্ক: https://india.mongabay.com/2026/06/not-jungles-jungle-cats-need-open-landscapes-says-study/







Comments