লবণাক্ত মরুভূমি এবং বুনো গাধার দল
- ..
- Jun 1
- 5 min read
গুজরাতের কচ্ছের রান শুধু তো ঊষর এক অঞ্চল না, প্রাণ প্রাচুর্যেও ভরপুর এই মরু অঞ্চল। সেখানকার জীববৈচিত্রে কথা উঠে এল কণাদ চৌধুরীর লেখায় ও ক্যামেরায়।

গুজরাট রাজ্যের মধ্যে তো বটেই, এই দেশের মধ্যেও সব চাইতে বড়ো জেলার নাম কচ্ছ। ভারতের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য যেমন, হরিয়ানা, কেরলম কিংবা গোয়া অথবা ইউরোপের দু-চারটে ছোটো ছোটো দেশ যেমন সুইজারল্যান্ড কিংবা ডেনমার্কের চাইতেও এই জেলা আকারে বৃহৎ। গুজরাটের মানচিত্রের দিকে তাকালে উত্তর প্রান্তে পাকিস্তানের সীমানা ঘেঁষে কচ্ছ জেলার যে অংশটা দেখা যাবে, সেই এলাকাটাই কচ্ছের 'রান' নামে পরিচিত। দুটো ভাগে বিভক্ত এই রানের অপেক্ষাকৃত ছোট দক্ষিণ-পূর্ব অংশটাকে বলা হয় 'লিটল রান অফ কচ্ছ', বাকি অংশটা 'গ্রেটার রান অফ কচ্ছ' নামেই পরিচিত। অতীতে কোনো এক সময় এই অঞ্চল সমুদ্রেরই অংশ ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে ভূমিকম্পের কারণে সমুদ্রতল ওপরে উঠে আসার ফলে সমুদ্রের মূল অংশের সঙ্গে এখানকার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে এলাকাটা এক বিশাল লবণাক্ত কাদা জমিতে পরিণত হয়। গুজরাটি বা সিন্ধি ভাষায় 'রান' শব্দের অর্থ মরুভূমি; অবশ্য চরম আবহাওয়া, অনুর্বর ফসলবিহীন জমি, ভূকম্পনের প্রবণতা, সব কিছু মিলিয়ে এই এলাকার অধিবাসীদের জীবন এবং জীবিকার পক্ষে এই 'রান' আক্ষরিক অর্থেই হয়ে দাঁড়ায় এক রণভূমি বা যুদ্ধক্ষেত্র। গ্রীষ্মকালে এখানে অসহনীয় গরম, বর্ষাকালে বৃষ্টিতে এবং নদীবাহিত জলে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তৈরি হয় এক অগভীর জলাশয়, অক্টোবর মাস থেকে সেখানে জল সরতে আরম্ভ করলে সেখানেই পড়ে থাকে সাদা নুনের আস্তরণে ঢাকা দিগন্তবিস্তৃত এক বিশাল প্রান্তর, যেটাকে বলা হয় 'গ্রেটার রান অফ কচ্ছ' বা 'হোয়াইট রান'। লিটল রানের ভূ-প্রকৃতি কিছুটা অন্যরকম। সেখানে জমির চেহারা শুকনো কাদার মতো, যার উপরিভাগ অনেকাংশেই ফেটে ফেটে যাওয়া, উদ্ভিদ বলতে শুধু বাবলা বা অন্যান্য কাঁটাঝোপ। সেখানকার জীববৈচিত্রের মধ্যে আছে ফ্লেমিংগো আর পেলিকান, কয়েক প্রজাতির শিকারি পাখিরা, যেমন বাজ, হ্যারিয়ার বা ঈগল, আর আছে বুনো গাধা বা 'এশিয়াটিক ওয়াইল্ড অ্যাস', যাদেরকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় 'খুর'। পৃথিবীতে একমাত্র লিটল রানেই এই বিপন্ন প্রজাতির বুনো গাধাদের দেখা মেলে। এই 'ওয়াইল্ড অ্যাস স্যাংচুয়ারি' এখন সংখ্যায় মাত্র হাজার সাতেক বুনো গাধার আবাসস্থল।‘গ্রেটার রান অফ কচ্ছ'-এর মূল প্রবেশদ্বার হলো ভুজ, যা কচ্ছ জেলার প্রধান শহর। আহমেদাবাদ থেকে ভুজের দূরত্ব তিনশ কিলোমিটারের কিছুটা বেশী হলেও, তুলনায় 'লিটল রান অফ কচ্ছ' আহমেদাবাদের অনেকটাই কাছে। তবে আহমেদাবাদ থেকে সকাল সকাল গাড়ি নিয়ে বেরোলেও পাটনের 'রানি কী বাও' এবং মধেরার সূর্য মন্দির দেখে জাইনাবাদের রিসোর্টে যখন এসে পৌঁছানো গেল, তখন দিনের শেষে সূর্যদেব প্রায় পাটে বসেছেন। অনেকখানি খোলামেলা জায়গা জুড়ে গাছপালায় সুসজ্জিত রিসোর্ট-টাকে প্রথম দর্শনেই বেশ ভালো লেগে গেল, সারাদিনের ঘোরাঘুরির ক্লান্তি অপনোদন করার পক্ষে বেশ চমৎকার জায়গা। রিসোর্ট থেকে আগেই জানানো হয়েছিল যে লিটল রান ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য সকালে এবং বিকেলে, দিনে দুটো সাফারি করানো হয়। বিকেলের সাফারিতে যোগ দিলে লিটল রানে সূর্যাস্তের চমৎকার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যেতে পারে। সেই কথা জানা থাকলেও বিকেলের সাফারির সময়সূচি অনুযায়ী রিসোর্টে পৌঁছানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অতএব রিসোর্টের বাগান থেকেই সেদিনের অস্তগামী সূর্যকে বিদায় জানাতে হলো। সন্ধের দিকে একটি বড়ো বাসে চড়ে একদল বাঙালি পর্যটক এসে পৌঁছালেন রিসোর্টে। সামান্য আলাপে জানা গেল তারা সোদপুরের এক ভ্রমণ সংস্থার ব্যবস্থাপনায় গুজরাট ঘুরতে এসেছেন, আয়োজক তথা ট্যুর ম্যানেজার একজন বাঙালি ভদ্রমহিলা। এদের নিজস্ব রান্নার আয়োজন ছিল, রিসোর্টের মধ্যেই অস্থায়ী রান্নাঘর বানিয়ে সেখানে বাঙালি রুচির 'নন-ভেজ' রান্নাবান্নার আয়োজন শুরু হয়ে গেল। অন্য অতিথিদের জন্য অবশ্য রিসোর্ট থেকেই গুজরাটি থালির ব্যবস্থা হয়েছিল। নিরামিষ হলেও অতি উপাদেয় ছিল সেই গুজরাটি নৈশাহার।সকালে রান সাফারির সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষই করে দিয়েছিলেন। সকাল সাতটায় সূর্য ওঠার প্রায় সাথে সাথেই বেরিয়ে পড়া হলো তাদের জিপে চড়ে। আমাদের চালকের নাম লালা, সে রিসোর্টের কর্মী আবার সাফারিরও গাইড। প্রথমে গাড়ি চললো এক গ্রামের মধ্যে দিয়ে। সেখানে দেখা গেল, পরনে সাদা পোশাক, মাথায় সাদা পাগড়ি আর হাতে লম্বা লাঠি নিয়ে পুরুষেরা সকাল সকাল তাদের পালিত পশুদের নিয়ে চলেছেন চারণভূমিতে। অসংখ্য গবাদি পশুদের দেখে মনে হয়েছিল, পশুপালনই সম্ভবত সেই গ্রামের মানুষদের প্রধান জীবিকা। তবে গ্রামের অপরিচ্ছন্ন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ গুজরাটের মতো একটি বিকশিত রাজ্যে খুব একটা প্রত্যাশিত ছিল না। রান এলাকায় ঢোকার পরে লালা গাড়ি নিয়ে চক্কর কাটতে শুরু করলেন আর চিনিয়ে দিতে লাগলেন রানের প্রকৃতি এবং প্রাণীদের। এই রকমের ভূ-দৃশ্য আগে কোথাও কখনো চোখে পড়েনি। দিগন্ত বিস্তৃত রুক্ষ, ফুটিফাটা মাঠ, যার মধ্যে সবুজের চিহ্ন বলতে কেবল বাবলা কাঁটার ঝোপ আর ক্বচিৎ কখনো দু-একটা বড়ো গাছ। মাঝে মাঝে উঁচু দ্বীপের মতো এক এক টুকরো ভূ-খণ্ড জেগে উঠেছে, যাদেরকে বলে 'বেট'। বর্ষায় জল জমে গেলে যেগুলো বন্যপ্রাণীদের আশ্রয় হিসাবে কাজ করে। লিটল রান পক্ষীপ্রেমীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় জায়গা, নানা রকমের পাখির দেখা মেলে সেখানে। লালা দেখিয়ে দিলেন একটা 'ওয়েস্টার্ন মার্শ হ্যারিয়ার' আর একটা 'মন্টাগুস হ্যারিয়ার'-কে, যাদের মোটামুটি ভালোই ছবি পাওয়া গেল।

এই রানের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু লবণাক্ত জলাভূমি, যেগুলো আবার জলচর পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র। সেখানে সচরাচর ফ্লেমিংগো আর পেলিকানদের দেখা মেলে, কিন্তু এই দিন তাদের অবস্থান ছিল জলের অনেকটাই অভ্যন্তরে।

এক ঝাঁক পেন্টেড স্টর্কের দেখা পাওয়া গেল অবশ্য বেশ কাছ থেকেই। চতুষ্পদদের মধ্যে দেখা মিললো নীলগাই-এর, আর দেখা গেল এখানকার প্রধান আকর্ষণ সেই বুনো গাধাদের। লালা জানালেন, এরা সাধারণত ছোট ছোট দলে ঘুরে বেড়ায়, যদিও পুরুষ গাধারা একলা থাকতেই বেশি পছন্দ করে। ভারতের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে এরা অন্যতম দ্রুতগতির প্রাণী, দৌড়ানোর সময় যাদের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় আশি কিমি স্পর্শ করে। একটা সময় এদের সংখ্যা হাজারের নীচে নেমে এসেছিল, যদিও উপযুক্ত সংরক্ষণ কর্মসূচির ফলে সেই সংখ্যা এখন অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে।

চোখের দেখা বেশ ভালোভাবেই দেখতে পেলেও ক্যামেরায় এদেরকে ধরে রাখার প্রচেষ্টায় খুব একটা সাফল্য অবশ্য মিললো না।প্রাণী বৈচিত্র্য থেকে এবার আসা যাক নেহাতই কেজো জিনিসের কথায়। নুন যে রান্নার একটা অপরিহার্য উপাদান, সেটা তো সবারই জানা আছে। তবে রান্নাঘরের বাইরেও বিভিন্ন শিল্পে রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে নুন, বা সোডিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহৃত হয়। ভারতে প্রস্তুত নুনের প্রায় আশি থেকে নব্বই শতাংশ আসে গুজরাট রাজ্য থেকে, যার একটি বড়ো অংশ উৎপন্ন হয় এই লিটল রান এলাকায়। সেই উৎপাদন পদ্ধতির প্রায় পুরোটাই আবার মানুষের কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল।

বর্ষাকালে জল সরে যাওয়ার পরেই লিটল রান এলাকায় সপরিবারে চলে আসে 'আগারিয়া' বা নুন চাষীদের দল, যারা প্রায় পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বংশ পরম্পরায় এই কাজই করে আসছে। লোকালয় থেকে দূরে এই জনমানবশূন্য পরিবেশে অস্থায়ী ঝোপড়ি বানিয়ে তারা এখানে থেকে যায় গ্রীষ্মকালের শেষ অবধি প্রায় আট মাস। মাটির নীচে জলস্তর থেকে লবণ সম্পৃক্ত জল তুলে মাটির ওপর বড়ো বড়ো অগভীর এবং আয়তাকার চৌবাচ্চা বা 'সল্ট প্যান' বানিয়ে সেই জল তারা জমা করেন। গ্রীষ্মের কড়া রোদের তাপে জল বাষ্পীভূত হয়ে লবণের কেলাস তৈরি হতে থাকে। তাছাড়াও চাষীরা দিনের মধ্যে বার-দশেক 'সল্ট প্যান'-এর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত হেঁটে হেঁটে একটি কাঠের তক্তা দিয়ে জলকে নাড়িয়ে বাষ্পীভবনকে ত্বরান্বিত করেন। এই ভাবে মাস দুয়েক চলার পরে পাওয়া যায় সাত-আট ইঞ্চি পুরু নুনের আস্তরণ। নুন প্রস্তুতকারকরা সেই নুন সংগ্রহ করে নিয়ে যায় কারখানায়, সেখানে পরিশোধনের পরে তবেই সেই নুন বিপণনযোগ্য হয়ে ওঠে। যে বিষয়টা বেশি করে মনকে নাড়া দিল, সেটা হচ্ছে এই 'আগারিয়া'-দের’ ‘ওয়ার্ক এনভায়রনমেন্ট', বা কাজের পরিবেশ। লোকালয় থেকে অনেক দূরে, চরম আবহাওয়া এবং প্রতিকূল পরিমণ্ডলের মধ্যে মাথার ওপর অস্থায়ী একটি ছাউনি বানিয়ে, এবং সেখানে সপরিবারে মাসের পর মাস ধরে বসবাস করে যে পরিশ্রমসাধ্য কাজ এদেরকে করতে হয়, সেটা প্রত্যক্ষ না করলে বিশ্বাস করাটা বেশ শক্ত। এদের কাজের জায়গায় পরিশ্রুত পানীয় জল, বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্য পরিসেবা অথবা উপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, এসবের কোনো কিছুই সহজলভ্য নয়, বরঞ্চ অমিলই বলা চলে। নিয়মিত প্রখর রৌদ্রালোকে আর অতি-লবণাক্ত জলের সংস্পর্শে আসার ফলে এই নুন চাষী সম্প্রদায়ের মানুষেরা নানা রোগব্যাধিতেও আক্রান্ত হয়।

নুনের মতো একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু উৎপাদনের কাজে মানুষের জীবিকার্জনের সমস্যগুলোও যে এইভাবে জড়িয়ে আছে, সেটা জানা ছিল না।লিটল রান অফ কচ্ছের দিগন্তবিস্তৃত লবণাক্ত ঊষর প্রান্তর, সেই প্রান্তরে বিলুপ্তপ্রায় বন্য গাধা বা 'খুর'-দের অবাধ বিচরণ, নুন চাষী 'আগারিয়া'-দের কঠোর জীবনসংগ্রামকে প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা, এই সব কিছুই দীর্ঘকাল স্মৃতিতে থেকে যাবে। লিটল রান অফ কচ্ছ না দেখলে 'ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া'-র এক অজানা দিক অধরাই থেকে যেত।
ছবি: প্রথম ছবি- Wikimedia Commons
দ্বিতীয় ছবি- লেখক
লেখক পরিচিতি: লেখক পেশায় প্রযুক্তিবিদ। আইআইটি, খড়গপুর থেকে এয়ারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন এবং পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন। কর্মজীবনে এয়ার ইন্ডিয়া-র আধিকারিক, বর্তমানে সম্পূর্ণ অবসরপ্রাপ্ত।







Comments