বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ১
শুরু হল বনেপাহাড়ের পাতায় নতুন ধারাবাহিক আখ্যান। কেন্দ্রবিন্দুতে বাঘ। ভারতের জাতীয় পশু। ভারতের অরণ্যের রাজা। পৃথিবীতে অল্পই বাঘ রয়েছে বন্য পরিবেশে। আর তার ৭০% রয়েছে ভারতে। বাঘ আছে মানে সেই অরণ্য সুরক্ষিত, তার বাস্তুতন্ত্র সজীব। অথচ তাকে বাঁচাতে যে লড়াই তার কথা ক'জন জানি! বনের অন্তরমহলে তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে যে পৃথিবী তার কত না-জানা রহস্য। সেইসব কথা উঠে আসবে সায়ন্তন ঠাকুরের লেখা এই আখ্যানে। আজ প্রথম পর্ব।

চরণচিহ্ন দিয়ে যাও
চরণচিহ্ন অর্থাৎ পায়ের ছাপ, অরণ্যে যে কোনও ধরণের প্রাণীর উপস্থিতি বোঝার এটিই প্রথম ধাপ। গেম ট্র্যাক অর্থাৎ যে জংলা সুঁড়িপথ ধরে প্রাণীরা যাতায়াত করে, সেখানে ধুলার উপর অথবা জলে ভেজা নদী তীরের নরম মাটির উপরেই পড়ে থাকে এই হদিশ-চিহ্ন। অভিজ্ঞ বন-বিশেষজ্ঞরা বলেন ‘রিডিং পাগমার্ক ইজ অ্যান আর্ট’! কথাটি মিথ্যা নয়, অনেক দিনের অভিজ্ঞতা,খর দৃষ্টি, অনুমান ক্ষমতা ও জ্ঞান না থাকলে ধুলাপথে বা গহিন অরণ্যে পায়ের ছাপ দেখে সেই প্রাণীটির সম্পর্কে ধারণা করা সত্যিই কঠিন।
আজকের পর্বে আমরা সেই পায়ের ছাপ, বিশেষত বাঘের পায়ের ছাপ বা পাগমার্ক নিয়ে আলোচনা করব। আপনারা নীচে ১ নং ছবিটি এখন একবার দেখে নিন। খেয়াল করুন, এখানে নখের চিহ্ন কিন্তু নাই, তার মানে ‘বেড়াল বা ক্যাট ফ্যামিলি’র প্রাণীদের নখ থাবার মধ্যে গোপন থাকে, চলাচলের সময় বা স্বাভাবিক অবস্থায়, কিন্তু শিকার বা আত্মরক্ষার সময় ওই তীক্ষ্ণ নখ বেরিয়ে আসে থাবার আড়াল থেকে আর সেটি যে কতটা প্রাণঘাতী তা নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না!
‘ডগ বা কুকুর ফ্যামিলি’র সঙ্গে এটাই কিন্তু পদচিহ্নে মূল তফাত, নীচের ২ নং ছবিটি দেখুন, এইটে নেকড়ের পায়ের ছাপ। তাহলে, প্রথমে ডগ বা ক্যাট ফ্যামিলি আমরা চিনব নখের চিহ্ন দেখে, তাহলেই স্পষ্ট বুঝতে পারব।
এখন দেখি, আমাদের দেশের অরণ্যে ডগ ফ্যামিলির কোন্ কোন্ পশু আছে—নেকড়ে, হায়না, বেজি, ভালুক, বুনো কুকুর বা ঢোল। মূলত এদেরই দেখা যায়। এরাও সবাই শিকারি প্রাণী অর্থাৎ বাঘের খাদ্য নয়।
আরও কিছু তফাৎ খেয়াল করুন, ডগ ফ্যামিলির থাবার আয়তন বা প্যাড সাইজ কিন্তু বেড়াল পরিবারের প্রাণীদের থেকে কম চওড়া। এর কারণ, কুকুর শ্রেণীর প্রাণীরা ছুটে শিকার করে কিন্তু বেড়াল পরিবারের প্রাণী চুপিচুপি নিঃশব্দে শিকারের পিছু নেয়।
তাছাড়াও লক্ষ্য করে দেখুন, কুকুর শ্রেণীর প্রাণীদের থাবা থেকে মাঝের দুটি আঙুলের দূরত্ব বেড়ালদের থেকে একটু বেশি। তবে হায়না কিন্তু এর ব্যতিক্রম, পরে বিশদে বলব।

পাগমার্ক দেখে বাঘ চেনার জন্য প্রথমেই জেনে রাখা দরকার, আমরা কী কী তথ্য এই পায়ের চিহ্ন থেকে জানতে পারবঃ
১। বাঘটি নারী না পুরুষ
২। এটি সামনের পা নাকি পেছনের পায়ের ছাপ
৩। ডান পা নাকি বাম পা
৪। বাঘটির আনুমানিক বয়স, আর বয়স আন্দাজ করতে পারলে তার ওজন সম্পর্কেও একটা ধারণা করা সম্ভব।
৫। বাঘটি আহত কিনা
৬। চলন কেমন, অর্থাৎ স্বাভাবিক দুলকি চালে হাঁটছিল নাকি দ্রুত বেগে চলে গেছে। এই তথ্য থেকে তার শিকার বা প্রে সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যাবে।
৭। কতক্ষণ আগে হেঁটে গেছে বাঘ, অর্থাৎ পায়ের ছাপ টাটকা নাকি পুরনো
দুই নং পয়েন্ট দেখে নিশ্চয় একটু অবাক হচ্ছেন? কিন্তু মজার কথা হল বাঘ চারপেয়ে হলেও তার পায়ের ছাপ কিন্তু হয় একজোড়া! কারণ সামনের পা ও পেছনের পা প্রায় একই জায়গায় পড়ে, কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবে হাঁটার সময় সামনের পায়ের ছাপের উপর সামান্য আগুপিছু অবস্থায় পেছন-পায়ের ছাপ পড়ে।
এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা, বাঘবনে বাঘের পায়ের ছাপ কোথায় খুঁজব? মোটামুটি ভাবে যেখানে খোঁজা হয় তা অনেকটা এইরকমঃ
১। ধুলামলিন সুঁড়িপথ
২। জংলা পথ, যা মূল গেম-ট্র্যাক থেকে ডাইনে বা বামে চলে গেছে
৩। জঙ্গলে যে পথ ধরে সাধারণত জন্তুরা হাঁটাচলা করে। এই পথের হদিশ আপনাকে দেবে আপনার সাফারির অভিজ্ঞ গাইড ও জিপসি গাড়ির চালক। কথায় বলা হয় বটে, সাপের লেখা আর বাঘের দেখা—দুই-ই নাকি ভাগ্যে না থাকলে হয় না কিন্তু এখানে মনে রাখা ভালো জঙ্গলে বাঘ খুঁজে বের করার পেছনে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও বিজ্ঞান রয়েছে, আছে অসীম ধৈর্য ও উপযুক্ত জ্ঞানের ভূমিকা; তাই আগামী যে-কোনও বন সফরে সবকিছু ভাগ্যের উপর না ছেড়ে নিজেও চেষ্টা করুন। এই সম্পর্কে পরে বিশদে আলোচনা করব।
৪। নদীখাত, এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
৫। জঙ্গলের ভেতরে যেখানে কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক জলাশয় রয়েছে
৬। শুকনো নদী খাত অথবা ঝোপ
৭। নুনী বা কৃত্রিম সল্টলিক। বনদপ্তরের তৈরী করা এইসব নুনীর কাছে আসলে পাথুরে নুন চাটতে আসে তৃণভোজী পশুর দল, যারা বাঘের স্বাভাবিক খাদ্য, অতএব তাদের সন্ধানে এই অঞ্চলে বাঘের আসার সম্ভাবনাও খুব বেশি থাকে।
তাহলে শুরু করা যাক, পায়ের চিহ্ন শেখার কাজ। প্রথমেই নীচের ছবিটি দেখুন।

বাঘের পায়ে আঙুলের সংখ্যা চার, যদিও আরেকটি গোপন আঙুল রয়েছে, তাকে বলে Dew Claw। শুধু সামনের দুটি পায়ের নীচে ডানদিকের অংশে থাকে, সাধারণ ভাবে চলাচলের সময় এটি লুকিয়ে থাকে, শুধুমাত্র শিকারের সময় এই আঙুলের নখ অস্ত্র হিসাবে বেরিয়ে আসে। তাই পায়ের ছাপে একে দেখা যায় না। শুধুমাত্র চারটে আঙুল ও মাঝের নরম মাংসল অংশের ছাপ পড়ে। ওই মাংসল অংশকে প্যাড বলা হয়।
এখন একবার বাঘের হাঁটা খেয়াল করুন, দরকারে ইউটিউবে যে-কোনও অভয়ারণ্যের ভিডিও দেখে নিন, যেখানে সে ক্যামেরার মুখোমুখি হেঁটে আসছে। কেমন রাজকীয় ছন্দময় চলন, দুলকি চাল আর পায়ের পাতাও ফেলছে কি নরম ভঙ্গিমায়! কোনও শব্দ হয় না, বেড়াল পরিবারের সবার হাঁটার ধরণই এমন, তাই তো ফ্যাশন ওয়ার্ল্ডে কদর করে এই হাঁটাকে ‘ক্যাট ওয়াক’ বলা হয়। এভাবে হাঁটতে পারে ওই মাংসল অংশ বা প্যাডের জন্য, প্রথমে সামনের পা, তারপর পেছন-পা। চারটে পা-ই স্পষ্ট দেখা যায়।
ছবির ডানদিকে যে দাগ এঁকেছি, তাকে বলে PML-Pugmark Length। আর নীচের দাগটিকে বলা হয় PMB-Pugmark Breadth। ছবি দেখেই বোঝা যাচ্ছে এদের, তাই এবার আসি বিশ্লেষণে।
এটি ডান পা নাকি বাম পা?
চেনা খুব সহজ, আপনার দুটি হাতের পাঞ্জা প্রসারিত করুন, বুড়ো আঙুল মুড়ে নিন, এবার ছবিটির উপর প্রথমে ডান হাতের পাঞ্জা রাখুন। বাঘের আঙুলে আপনার আঙুল বসছে? উঁহু! আপনার মাঝের সবথেকে বড়ো আঙুল বা মধ্যমা রয়েছে বাম দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে অথচ ছবিতে বাঘের সবথেকে বড়ো আঙুল আছে বাম দিক থেকে তৃতীয় স্থানে, তাহলে? এবার বাম হাত রাখুন। কি, মিলে গেল তো? অর্থাৎ এটি বাঘের বাম পা!
আচ্ছা, বাম পা তো বুঝলাম, কিন্তু সামনের না পেছনের? অর্থাৎ Front or Hind বুঝব কীভাবে?
এটিও খুব সহজ; বাঘের অনামিকা ও মধ্যমা, অর্থাৎ সবথেকে বড়ো আঙুল আর তার তুলনায় একটু ছোট আঙুলের ডগার মাঝের দূরত্ব কি খুব বেশি? না, এখানে বেশি নয়, তাহলে এটি সামনের পা। যদি পেছনের পা হত, তাহলে কেমন দেখায়? নীচের ছবিটি দেখুন।

বোঝা যাচ্ছে? এইটে হল পেছনের পা।
এবার তাহলে আপনাদের জন্য রইল দুটি প্রশ্ন
১। ২ নং ছবিতে ডান পা নাকি বাম পা, কোনটি দেখা যাচ্ছে?
২। ১ নং ছবির PML কি PMB এর থেকে বেশি? নাকি কম?
এই দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাঘ আর বাঘিনীর রহস্য!
[ক্রমশ]

লেখক পরিচিতি: শ্রী সায়ন্তন ঠাকুর, বাংলা ভাষার একজন কথাকার ও ঔপন্যাসিক। এখনও অবধি বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে গল্প-উপন্যাস-রম্য রচনা নিয়ে বাইশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ধানসিড়ি প্রকাশন থেকে 'অরণ্যকথা' সিরিজের বইগুলি অন্যতম।






