বিদায় ডিজে, বিদায় কানহা বনের রাণী
সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের কানহা টাইগার রিজার্ভ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল সেখানকার বিখ্যাত বাঘিনী ধাওয়াঝান্ডি কে, যে বিগত কয়েক বছর ধরে পর্যটকদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল ডিজে নামে। শুধু তাকে সপরিবারে দেখার জন্যই নিমেষে উধাও হয়ে গেছে কানহার মুক্কি জোনের সাফারি পারমিট বছরের পর বছর। এখন ভূপালের বন বিহার চিড়িয়াখানায় দিন কাটবে তার। কিন্তু তার স্মৃতি অমলিন থেকে যাবে অরণ্যপ্রেমী মানুষের মধ্যে, কানহাকে যারা ভালোবাসেন তাদের মধ্যে। কানহা থেকে লিখলেন মৃত্যুঞ্জয় কানোয়ার।

প্রথমবার তাকে আমি দেখেছিলাম ২০১৩ সালে।
তখন তার বয়স সবে এক বছর। ওর মায়ের সঙ্গে—বিখ্যাত ছোটি মাদা—আর তার আর এক সহোদরের সঙ্গে সে খেলতে খেলতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল বাবাঠেঙ্গা তালাওয়ের আশপাশে। সে তখন ছিল আর পাঁচটা কৌতূহলী শাবকের মতোই—প্রজাপতির পেছনে ছুটছে, শুকনো পাতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আর জঙ্গলের জীবনযাত্রা শিখছে।
তখন কে জানত, এই ছোট্ট বাঘিনিই একদিন আমার জঙ্গলের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলির একটিতে পরিণত হবে!
সেই সময় তার কোনও নাম ছিল না, ছিল না কোনও সরকারি পরিচয় নম্বরও।বছর কয়েক পর সে হয়ে উঠবে কানহার মুক্কি জোনের অন্যতম সুন্দর ও কিংবদন্তিতুল্য বাঘিনী—ধাওয়াঝান্ডি ফিমেল, যার আদরের নাম “DJ”।

এই নামটি তার পাওয়া, কারণ জীবনের বেশিরভাগ সময় সে ধাওয়াঝান্ডি পেট্রোলিং ক্যাম্পের আশপাশেই কাটিয়েছিল। সেই বনভূমিই হয়ে উঠেছিল তার নিজের রাজ্য।
২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে DJ প্রথমবার মা হয়। সে জন্ম দিয়েছিল চারটি শাবকের—DJ1, DJ2, DJ3 এবং DJ4।

দুঃখজনকভাবে, তখনও মাতৃত্ব তার কাছে ছিল একেবারেই নতুন, আর ভাগ্যও তার প্রতি সদয় ছিল না। একে একে সে প্রায় সবকটি শাবককেই হারাল। একমাত্র DJ4 বেঁচে ছিল। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেও জঙ্গলের অজানায় কোন দিকে হারিয়ে গেল। তার পথ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল, তা আর কেউ কোনওদিন নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি।
তবে প্রকৃতি DJ-কে আর একবার সুযোগ দিয়েছিল।
তার দ্বিতীয় গর্ভাবস্থা থেকে জন্ম নিল তিনটি সুস্থ শাবক—DJ5, DJ6 এবং DJ7।
এবার সে আর আগের সেই অনভিজ্ঞ মা নয়; সে তখন পরিণত, অভিজ্ঞ এবং নিবেদিতপ্রাণ এক মা।
তিনটি শাবকই ধীরে ধীরে শক্তিশালী বাঘে পরিণত হল। DJ5 পরবর্তীকালে খাটিয়া বাফার জোনের অবিসংবাদিত রাজা হয়ে উঠল। আর তার দুই ভাই পর্যটন এলাকা থেকে অনেক দূরে নিজেদের বিচরণক্ষেত্র গড়ে তুলল—মানুষের চোখের আড়ালে, অনেকটাই নিভৃতে কাটতে লাগল তাদের জীবন।
তারপরে এল সেই বাচ্চাগুলি যারা ইতিহাস তৈরি করল।
বহু বছর পর, DJ জন্ম দিল পাঁচটি শাবকের—কানহার জন্য এক অসাধারণ ঘটনা, যেন এক বিরল অলৌকিক সময়।
গোটা কানহা যেন আনন্দে মেতে উঠেছিল।বন্যপ্রাণপ্রেমী, আলোকচিত্রী, গবেষক, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক এবং বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা মানুষ—শুধু এই অসাধারণ পরিবারটিকে এক ঝলক দেখার আশায় কানহায় ছুটে এসেছিলেন। মাসের পর মাস মুক্কি জোন যেন উৎসবের রূপ নিয়েছিল। জঙ্গলের রাস্তায় সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত সাফারি গাড়ি—সবার একটাই প্রত্যাশা, যদি একবার দেখা মেলে জঙ্গলের সেই রানির, তার পাঁচ ছোট্ট শাবককে সঙ্গে নিয়ে।

সেই সৌভাগ্যবান দর্শকদের মধ্যে ছিলেন ভারতের ক্রিকেটের কিংবদন্তি শচীন তেন্ডুলকারও। DJ-কে তার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে জঙ্গলের পথে হেঁটে যেতে দেখার সেই দৃশ্য ছিল তাঁর জন্যও এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

কিন্তু জঙ্গলের জীবন কখনও সহজ নয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ বাঘদের অবিরাম চাপ এবং আক্রমণের কারণে শাবকদের বাঁচিয়ে রাখা হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত কঠিন। পাঁচটি শাবকের মধ্যে শেষ পর্যন্ত DJ বাঁচাতে পেরেছিল মাত্র দু’টিকে—DJ8, একটি পুরুষ শাবক, এবং DJ9, একটি স্ত্রী শাবক।
দু’জনেই ধীরে ধীরে অসাধারণ সুন্দর ও শক্তিশালী বাঘে পরিণত হল।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে DJ8 মায়ের এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল—দূর কোথাও নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে।
কিন্তু DJ9-এর পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম।
জঙ্গলের নিয়মেই যেমনটা প্রায়ই ঘটে, একসময় সেই মেয়েই নিজের মায়ের দখলে থাকা এলাকা নিজের করে নেওয়ার জন্য মাকে চ্যালেঞ্জ জানাল।
ততদিনে DJ-র শরীরে বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

নিজের মেয়ের সঙ্গে দীর্ঘ ও বিপজ্জনক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার বদলে, DJ নীরবে সেই ভূখণ্ড ছেড়ে দিল—যে এলাকা এত বছর ধরে তার রাজ্য ছিল।
সে সরে গেল কিসলি ও কানহার মাঝের জঙ্গলের দিকে, সংঘাতের বদলে শান্তিকেই বেছে নিল।
মাঝেমধ্যে ভাগ্যবান কয়েকজন পর্যটকের চোখে পড়ত সে।
কিন্তু একসময়ের সেই বিখ্যাত রানি তখন অনেকটাই বদলে গিয়েছিল।
সে পছন্দ করত একাকীত্ব।সাফারি রুট থেকে দূরে, মানুষের ভিড় থেকে দূরে থাকত সে। এক বৃদ্ধা বাঘিনির মতো নিভৃতে, নীরবতায় কাটছিল তার দিনগুলি।
তারপর এল এমন কিছু ঘটনা, যা সবকিছু বদলে দিল।
কয়েক দিন আগে, এক বনকর্মী মর্মান্তিকভাবে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। সন্দেহ করা হয়েছিল, এই ঘটনায় DJ-এর হয়তো ভূমিকা থাকতে পারে। যদিও তার জড়িত থাকার বিষয়টি কোনওভাবেই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
এরপর ঘটল আরও এক মর্মান্তিক ঘটনা।
কানহার সীমানা লাগোয়া একটি গ্রামে বাঘের আক্রমণে এক মহিলা নিহত হলেন। বন দফতরের টহলদারি দল ওই এলাকায় DJ-এর উপস্থিতির কিছু চিহ্ন খুঁজে পায়। গ্রামের মানুষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকল, ক্ষোভও ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত বন দফতরকে নিতে হল এক অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত।
৩ আগস্ট ২০২৬, ১৪ বছর বয়সে, ধাওয়াঝান্ডি ফিমেল—DJ-কে ধরে নিয়ে গিয়ে ভোপালের বন বিহার ন্যাশনাল পার্ক জু-তে স্থানান্তরিত করা হল।
সেখানেই যেন শেষ হল এক যুগের।
সারা জীবন DJ কানহার জঙ্গলে রাজত্ব করেছে কয়েকটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী পুরুষ বাঘের সঙ্গে—যাদের মধ্যে ছিল উমরপানি মেল, ছোটা মুন্না এবং DB3।
তার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে বাবাঠেঙ্গা তালাও, ছাতা পাথরা রোড এবং ধাওয়াঝান্ডি হ্যান্ডপাম্পের আশপাশে—এই জায়গাগুলিই ধীরে ধীরে তার নামের সঙ্গে চিরদিনের জন্য জড়িয়ে গেছে।
অসংখ্য আলোকচিত্রী, প্রকৃতিবিদ, গাইড এবং বন্যপ্রাণপ্রেমীর কাছে এই জায়গাগুলি আর কোনওদিনই হয়তো আগের মতো মনে হবে না।
দুঃখজনকভাবে, এই পৃথিবীতে ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে বনভূমি, আর প্রকৃতির ওপর মানুষের দখল ক্রমেই বাড়ছে।
যখন মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত তৈরি হয়, শেষ পর্যন্ত প্রায় সবসময়ই চরম মূল্য দিতে হয় শুধু বাঘকেই।
আমি শুধু প্রার্থনা করি, DJ যেন তার জীবনের বাকি বছরগুলি শান্তি, স্বস্তি ও মর্যাদার সঙ্গে কাটাতে পারবে।
হয়তো আর কোনওদিন সে কানহার শালবনের মধ্য দিয়ে হেঁটে বেড়াবে না।
হয়তো আর কোনওদিন মুক্কির ধুলোমাখা পথে তার পায়ের তাজা ছাপ পড়বে না।
কিন্তু কিংবদন্তিরা কখনও সত্যিই হারিয়ে যায় না।
তারা বেঁচে থাকে সেই বনভূমির বুকেই, যে বনে একদিন তারা রাজত্ব করেছিল...
...বেঁচে থাকে তাদের সৃষ্ট গল্পগুলোর মধ্যে...
...সেইসব ছবির মধ্যে, যেগুলি তাদের স্মৃতি ধরে রেখেছে...
...আর বেঁচে থাকে সেইসব মানুষের হৃদয়ে, যারা সৌভাগ্যবান তার জীবনযাত্রার সাক্ষী হতে পেরে।
বিদায়, ডিজে।

ছবি: লেখক, বনেপাহাড়ে
লেখক পরিচিতি: লেখক একজন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার ও wildlifeholidays ট্যুর কোম্পানির পরিচালক।






