বেঁচেছিলাম রাজার মতো
- ..
- 2 days ago
- 7 min read
অরুণাচল প্রদেশে কিছুদিন আগে মায়োদিয়া পাসের কাছে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবিভার্ব ঘটে। অনেকের ভিডিওতে ধরে পড়ে সে। হঠাৎ শোনা যায় বাঘটি নাকি একজন বাইক আরোহী পুলিশ কর্মীকে আক্রমণ করে মেরে ফেলে। স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে বাঘটিকে নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। এবং দুইদিন আগে বাঘটির মৃতদেহ পাওয়া যায়। শরীরে একটি গুলির চিহ্ন। কে মারল তা এখনও অজানা! কিন্তু চেষ্টা থাকলে বাঘটিকে হয়ত বাঁচানো যেত, ফিরিয়ে দেওয়া যেত কোন বনের গহীনে। বাঘটির এই জনরোষের ফলে হত্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বেশ কিছু বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের লালগড়ে হঠাৎ আগন্তুক বাঘটির কথা, তাকে মেরে ফেলার কথা। সেই সূত্রেই যেন ওদের হয়ে কলম ধরলেন সমুদ্র মিত্র।
পাঠকদের জন্য প্রসঙ্গত উল্লেখ করি যে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘ তার নিজের স্বাভাবিক বাসস্থান (Natural Habitat) ছেড়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড়ের জঙ্গলে চলে আসে । জীবন ধারণের জন্য তার স্বাভাবিক শিকার (Natural Prey) না পেয়ে সে কাছের গ্রামের গৃহপালিত পশু শিকার শুরু করে । নরখাদক না হওয়ায় সে কখনই কোন মানুষ শিকার করেনি । তার অবস্থানে ভয় পেয়ে গ্রামের অধিবাসীরা বনাধিকারিকের (Forest Officer)কাছে আবেদন জানায় । উপযুক্ত শিকারির অভাবে তাকে খাঁচাবন্দি করা বা ঘুমপাড়ানি (Tranculizer) গুলিতে বন্দি করা যায়নি । ইতিমধ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসে এবং বিরোধী দলগুলি এই ব্যর্থতাকে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারের কাজে লাগায় । অগত্যা বাঘটিকে সেই বছর মার্চ মাসে পরিকল্পিত ভাবে কানের পাশে বল্লমের আঘাত করে মারা হয়। অজুহাত দেওয়া হয় যে এটি আদিবাসীদের বাৎসরিক শিকার উৎসবের ফল ।

আমি মনে করতে পারছিনা কোথায় কোন পাহাড়ের গুহায় আমার জন্ম হয়েছিল। সেটা উড়িষ্যার সিমলিপাল কি যোশীপুর না ঝাড়খণ্ডের দলমার জঙ্গলে না মধ্যপ্রদেশের বনে জানিনা । শুধু এইটুকু মনে আছে যে আমার একটা ভাই আর একটা বোন ছিল। আমরা দু ভাই একই রকম দেখতে ছিলাম শরীরের গঠনও ছিল একই রকম । অন্য কেউ আমাদের আলাদা করে চিনতে পারত না শুধু মা ছাড়া । মা বলত আমাদের দু ভাইয়ের নাকি গায়ের ডোরা ডোরা দাগ গুলো আলাদা । বোন আমাদের থেকে গঠনে ছোট ছিল। আমরা একসঙ্গে বড় হচ্ছিলাম। আমরা তিন জন গুহার সামনে ঝরনার ধারে খেলা করতাম। মায়ের দুধ খাওয়া ছাড়ার পর মা সপ্তাহে দু দিন কচি মাংস এনে আমাদের খাওয়াত । আমরা বাবাকে কখনও দেখিনি । মাঝে মাঝে রাত্তিরে কে যেন একটা খুব গম্ভীর স্বরে মা'কে দূর থেকে ডাকত, কিন্তু মা আমাদের ছেড়ে কক্ষনো যেত না । আমরা মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। ছয় মাস বয়সের পর থেকে আমরা মা'কে খাবার সংগ্রহে সাহায্য করতাম। মা আমাদের খাবার সংগ্রহের নানা রকম তালিম দিত – কী করে নিজেকে ছায়ার সাথে , গাছের আলোছায়ায় লুকিয়ে (Camouflaging ) রেখে অতর্কিতে হামলা (Ambush) চালিয়ে প্রতিপক্ষকে থাবার এক ঘায়ে ধরাশায়ী করতে হয়, কী কোরে মারণ আঘাতের ঠিক আগের মুহূর্তে গর্জন করে প্রতিপক্ষের হৃদপিণ্ড থামিয়ে দিতে হয়। সব শেষে ঘাড়ের ঠিক কোন জায়গায় কামড় দিলে প্রধান স্নায়ু শরীরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তৎক্ষণাৎ শত্রুর মৃত্যু হয় – সব শিখিয়ে ছিল । জানিনা কেন আমাদের দেড় বছর বয়সের পর মা আমাদের দুই ভাই কে বোনের কাছে যেতে দিত না। এর পর একদিন সকালে দেখি বোন নেই, মা বলল যে মা তাকে অন্য জঙ্গলে ছেড়ে এসেছে – এখন থেকে সে সেখানেই থাকবে। এর পর বোন কে আর কখনও দেখিনি। মা প্রায়ই বলত আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে, নিজের নিজের জমিদারি বুঝে নিতে আর নিজের খাবার নিজে জোগাড় করতে। আমরা তাও মা কে ছেড়ে যেতে চাইতাম না । এরই মধ্যে মায়ের এক নতুন বন্ধু হল । সে এসেই আমাদের দেখে খুব রেগে গেল আর সেই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলল । আমরা রাজী ছিলাম না তাই আমাদের মারতে এলো। আমি একটু শান্তিপ্রিয় ছিলাম তাই পালিয়ে বাঁচলাম । ভাই মারা গেল মায়ের নতুন বন্ধুর হাতে। আমি আমার নিজের ২৫ বর্গ কিমি জমিদারি বুঝে নিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করলাম । মাঝে কয়েক বছরে আমার অনেক বান্ধবী হয়েছিল – অবশ্যই প্রত্যেকে অল্প সময়ের জন্য। আমি একা থাকতে ভালোবাসতাম । আমার এলাকায় বছরের কিছু সময়ের জন্য আমার বান্ধবীদের ছাড়া কাউকে ঢুকতে দিতাম না । সেই কয়েক মাস খুব আনন্দে কাটত । আমিই ছিলাম সেই জঙ্গলের রাজা ।
খুব আনন্দ হয়েছিল সেদিন যেদিন একা একটা বড় বাইসন (Indian Bison/Gaur) শিকার করেছিলাম । আমার গুহা ডেরার সামনে ঝড়ে উপড়ে পরা শাল গাছটার মোটা গুঁড়ির ওপর শুয়ে শীতের রোদ পোহাচ্ছিলাম আর পাহাড়ের ঢালের নীচে দূরের সবুজ উপত্যকার দিকে তাকিয়ে ছিলাম । একটা বড় দলে বাইসন চড়ে বেড়াচ্ছিল । মনে পড়ল আজ আমার শিকার করার দিন, পরশু দিনের শিকার করা শম্বরটার মাংস শেষ হয়ে গেছে । আমার ডেরা থেকেই দলের সবথেকে বড়টাকে নিশানা করে ঝোপের আড়াল নিয়ে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে চললাম । হঠাৎ হাওয়াটা আমার দিক থেকে বইতে শুরু করল আর বাইসনের দল আমার গন্ধ পেয়ে লেজ তুলে পড়ি কি মরি করে ছুট লাগাল । আমারও তখন জেদ চেপে গেছে, আমিও হাওয়ার গতিপথ কে কেটে অনেকটা ঘুরে তাদের দৌরে যাওয়ার পথের ধারে অপেক্ষায় নিজেকে লুকিয়ে বসলাম - সবই মায়ের শিক্ষা । মা আর একটা শিক্ষা দিয়েছিল যে কখনই কোন প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভাবতে নেই আর খুব প্রয়োজন না হলে শিকারের সময় প্রতিপক্ষের সামনের দিক এবং পিছন দিক থেকে কখনই আক্রমণে যেতে নেই । যখন বাইসনের দল আমার নাগালের মধ্যে এলো আমি উসাইন বোল্টের ক্ষিপ্রতায় আড়াআড়ি দৌড়ে গিয়ে আমার পছন্দের শিকারের কাঁধের উপর লাফিয়ে উঠে একটা মরণ কামড় বসিয়ে আমার পুরো ওজন নিয়ে ঝুলে পরলাম । অত বড় জানোয়ারটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল । আমি সময় নষ্ট না করে কামড় না ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গে আমার থাবা দিয়ে তার নাকটা ধরে ঘাড়টা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলাম । বাইসনটার চারটে পা একবার খুব জোরে কেঁপে উঠে থেমে গেল । আমি একটু বিশ্রাম নিলাম আর তখনই লক্ষ করলাম যে নিজের অজান্তে অন্য বাঘের জমিদারি তে ঢুকে পরেছি। নিজেকে আর নিজের শিকার বাঁচানোর তাগিদে বাইসনটার পিঠে শিরদাঁড়ার মাঝামাঝি কামড়ে এক ঝটকায় স্নাচ লিফটিঙের মত তুলে নিলাম আর অনায়াসে চার কিমি দূরে আমার ডেরায় ফিরে এলাম। খুব আনন্দ হোল –যাক মায়ের শিক্ষা ভুলিনি তাহলে ।
এরপর কি হল জানিনা লোকে জঙ্গল কাটতে শুরু করল কারখানা বসানোর জন্য। কোথাও নীল কোথাও সাদা কোথাও বা বিচ্ছিরি লাল কি কমলা-হলুদ রং করা কারখানা হোল। এর ওপর গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতন এল জঙ্গল সম্বন্ধে অজ্ঞ এমন কিছু সংখ্যক টুরিস্টের দল যারা গাড়ি নিয়ে সকাল ছয়টা থেকে বিকেল ছয়টা পর্যন্ত চিৎকার করে ঘুরে জঙ্গলে অজস্র কুরকুরে আর পোটাটো চিপস এর প্যাকেট ছড়িয়ে সন্ধ্যে বেলায় কাছের রিসোর্টে গিয়ে ডিজে বাজিয়ে মত্ত অবস্থায় নেচে কুঁদে পরের দিন ভালো মানুষের মতো শহরে ফিরে যাবে। ফল টা কি দাঁড়ালো ?- আমরা দিনের বেলায় না পেলাম নাইতে, পিপাসা মেটাতে না পেলাম রাত্রে খাবার জোটাতে। জঙ্গলটা আমাদের কাছে ছোট লাগতে শুরু করল। আমার জঙ্গলে অন্য দাবিদার এল। তার সঙ্গে আমার রাতভর লড়াই হোল। তার হঠাৎ চালানো একটা বাঁ হাতের হুক আমার ডান কানের পাশে লাগে আর আমি জ্ঞান হারাই। তারপর জানিনা আমি কি করে ঘুরতে ঘুরতে এই শান্তির জঙ্গলটাতে পৌঁছে গেলাম । সবই ঠিক ছিল শুধু অভ্যাসের খাবারের একটু অভাব।
মেদিনীপুর জেলার লালগড়ের জঙ্গলটা বেশ নিরিবিলি লাগলো আমার, ভাবলাম বাকি জীবন টা এখানেই কাটাব শান্তিতে কারণ এখানে এখনও তেমন ভাবে কল কারখানা হয় নি। হঠাৎ জানলাম আমার অবস্থিতির খবর নাকি দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে । জঙ্গলে বসানো ক্যামেরায় নাকি আমার ছবি ধরা পড়েছে। আমি নাকি এখন সেলেব্রিটি । আমাকে ধরার নানা ফন্দি ফিকির কাজে লাগান হবে, ধরা পরলে আমার স্থান কোথায় হবে তা অজানা। আর যদি ধরা না পড়ি ? – তাহলে আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমি হব বিরোধিদের হাতিয়ার । অর্থাৎ কিনা আমি একটা ইস্যু (Issue) হব।
আমার নতুন নাম হল লালগড়ের বাঘ। এটা অবশ্য তোমাদের দেওয়া । আসলে আমাদের বাবা-মা রা তো আলাদা করে কোন নাম রাখে না কারণ দরকার হয় না। ওটা তোমাদের জন্মের পর তোমাদের দরকার হয় একটা শংসা পত্রের জন্য যাতে প্রমাণ হয় যে তোমাদের বাবা-মার বৈধ সন্তান হয়ে কবে কোথায় জন্মেছ। এটা না থাকলে তোমরা আগামী দিনে এই পৃথিবীর কোন সুযোগ সুবিধা পাবে না। আর তাছাড়া নামই যদি না থাকে তো নামের বড়াই করবে কি করে ? আমাদের বড়াই করে ঢাক পেটাবার দরকার হয় না, স্কুলে যাওয়ার দরকারও পড়ে না, রেশন তুলতে হয় না। তাই নামের প্রয়োজনও হয় না। আমরাও অবশ্য স্কুলে যাই , তবে সেটা প্রকৃতির স্কুলে, যেখানে শিক্ষিকা মা। আর পে-ডিগ্রি , ওটা তো তোমাদের আর কুকুরদের দরকার। আমাদের কোনও পে-ডিগ্রির দরকার হয়না - আমরা যে বাঘ , বাঘ বাঘিনীর বাচ্চা , আমরা সব সময়ই বৈধ এবং বনেদি । পরবর্তী কালে তোমরা যেখানে আমাদের কীর্তিকলাপ প্রথম নজর কর , সেই জায়গার সাথে আমাদের নাম জুড়ে দাও। এটা আমার এক্কেবারে পছন্দ নয়। আমরা সবাই বাঘ – আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে।
আমাকে ধরার জন্য সুন্দরবন থেকে লোক এলো,খাঁচা এলো , এলো পাঁঠার টোপ যেটা আমি একদমই খেতে পারিনা কারণ ঐ জন্তু টাকে আমি সহ্য করতে পারি না । এক বেলার ও খাবার হয় না , এক নম্বরের ভীতু শুধু ব্যা ব্যা কোরে ডাকে। আরে আমি কি আর ঐ চিতাবাঘ যে ছাগল খাব! গৃহপালিত পশুর মধ্যে আমি পছন্দ করি মাঝারি গঠনের মোষ, তাতে আমার দু'দিন চলে। তাই আমি খিদে সত্ত্বেও ছাগল ধরলাম না আর ওদের ফাঁদ পাতা বিফল হোল। এরা কেন যে কোন বিশেষজ্ঞ আনায় না আমার কি পছন্দ তা জানার জন্য বুঝিনা। আমি লালগড় থেকে ঠিকানা পাল্টাতে থাকলাম। এক জায়গায় ঘাঁটি গাড়লাম না যাতে ওরা আমার নাগাল না পায়। শুনলাম আমার অবস্থান জানার জন্য নাকি ড্রোন উড়িয়েছে !হাসি পায়, যত লোক কে বোকা বানানোর ফন্দি। আরে আমিতো ঝোপ ঝাড়ের নীচে আড়াল নিয়ে চলি নিজেকে লুকিয়ে রেখে যেমন মা শিখিয়ে ছিল ,আর ড্রোন তো তোমরা ওড়াও খোলা আকাশের নীচে গাছের চাঁদোয়ার উপর দিয়ে । মনে পড়ে গেল- মা একবার আমাদের তিন ভাই বোন কে ফার্স্ট ব্লাড সিনেমার গল্প টা বলেছিল। আমরা তিনজন চোখ বড় বড় কোরে র্যাম্বর গল্প গিলেছিলাম আর নিজেদের সিল্ভেস্টার স্টালন ভাবতাম। মা বলত ভাবা নয়, ঐ রকম বীর কমান্ডো হতে হবে – বিনা যুদ্ধে হার মানবি না । কখনও ধরা দিবি না । দু একবার এমনও হয়েছে যে লালগড়ের জঙ্গলে আমাকে ধরার দল আমার পাশ দিয়ে চলে গেছে কিন্তু আমাকে দেখতে পায়নি । আমি ঝোপের আড়াল থেকে মুচকি হেসেছি আর গোঁফে তা দিয়েছি। আসলে এই লোকগুলো তো অহংকারী আর হামবাগ, নিজেদের খুব পণ্ডিত মনে করে কিন্তু ট্রেক করে বাঘ খোঁজা কী তা এরা জানে না। শুনেছি মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ডে কিছু ভালো শিকারি বা ট্রেকার এখনো আছেন যারা আমাকে খুঁজে বের করতে পারতেন। ঋজু বাবু এখন আর নেই আর হাজারীবাগের বদি বাবু (যার কাতরাসে কলিয়ারি ছিল) তিনি তো অনেক দিন আগেই মারা গেছেন , না হলে ওঁরাই আমাকে খুঁজে দিতেন ।
এরই মধ্যে শুনলাম আমায় নিয়ে নাকি চাপ বাড়ছে তাই আমাকে খুঁজে বার করতেই হবে। তত দিনে আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম, ভাবলাম ধরা দিই- কিন্তু মায়ের উপদেশ মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল মা এও বলত যে ধরা পরলে কোন চিড়িয়াখানায় বন্দি হয়ে স্থান হবে , ছুটির দিন লোকে নেকুপুষুমুনু বান্ধবীদের সঙ্গে আমার খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে নিজস্বী (selfie) তুলবে। ভাবতেই ঘেন্না লাগে - কিসে আর কিসে, কোথায় আমার জঙ্গলের তেজী বান্ধবীরা আর কোথায় এরা। তাই ধরা দিলাম না, শুধু এ জঙ্গল থেকে সে জঙ্গলে পালিয়ে বেড়ালাম।
বিশ্বাস করুন আমি সেরকম কিছু খাইনি শুধু বন-শুয়োরের মাংস আর পুকুরের জল। সেই খেয়েই একদিন কিন্তু আমি গভীর ঘুমচ্ছিলাম। হঠাৎ দূর থেকে কিছু লোকের গলার আওয়াজ পেলাম। স্বাভাবিক অভ্যাসে উঠতে চাইলাম - পারলাম না, বড় ক্লান্ত লাগছিল, বড় ঘুম পাচ্ছিল। গলার আওয়াজ আরও কাছে এলো, তারপর – একটা তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম বাঁ কানের পিছনে ঘাড়ের কাছে – আর কিছু মনে নেই ।
আমি আমার প্রিয় ও সুখের মৃগয়া কাননে (Happy hunting ground) আমার ভাইয়ের সাথে বসে দেখলাম আমার দেহটা শুধু নিয়ম রক্ষা করার জন্য ময়না (Post Mortem) কোরে রাতারাতি আড়াবারি বনবাংলো তে ১২ কুইন্টাল শালকাঠ দিয়ে চার ঘণ্টা ধরে দাহ করা হল। একটা আফসোস থেকে গেলো - মায়ের দেওয়া কমান্ডো ট্রেনিং টা কোন কাজে লাগলো না – যদি সুযোগ পেতাম তাহলে দেখাতাম আমি কোন মায়ের দুধ খেয়েছি। কিছু দুঃখও থেকে গেল । এক - নামই যদি দিয়েছিলে তবে আমাকে মারলে কেন ? দুই- আমার জন্য কতগুলো শাল গাছকে মরতে হল বলতো ? আর তিন - আমি এক আকাশ তারা মাথায় করে আমার জঙ্গল থেকে চলে এলাম কিন্তু আমাকে ভালোবাসার লোকেরা কেউ জানলো না আমার চলে যাবার কারণ ।

লেখক পেশায় ভূ-পদার্থবিদ । কর্মসূত্রে খনিজের খোঁজে দেশের বিভিন্ন বন জঙ্গল ও পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন জীবনের ৩৫ টা বছর।








অসাধারণ লিখেছেন দাদা! হৃদয়ের ভালোবাসা ও কলমের কালি একাকার হয়ে গেছে! মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তি মনুষ্যেতর প্রাণীর প্রতি তার ভালোবাসা! সার্থক আপনি আপনার সেই মর্মে! 🙏
মর্মস্পর্শী সুন্দর লেখা। অন্তর্মন থেকে লেখক কে সাধুবাদ জানাই।