গ্রেট নিকোবার প্রকল্পের জন্য আদিবাসী জমি জোর করে নিতে চাপ দেবার অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে
- ..
- 4 days ago
- 4 min read
গ্রেট নিকোবার দ্বীপে যে ব্যাপক 'উন্নয়ণ' পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার তা নিয়ে বিতর্ক চলছেই। আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে উঠছে প্রশ্ন, পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে আদালতে চলছে মামলা। তা সত্ত্বেও প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর কেন্দ্র। এবার স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী অভিযোগ করল যে সরকার তাদের থেকে জমি নিতে চাপ দিচ্ছে । লিখছেন সিমরন সিরুর।

গ্রেট নিকোবরের আদিবাসী কাউন্সিলের প্রধানরা অভিযোগ করেছেন যে দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে তাঁদের পৈতৃক জমি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ছেড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁদের দিয়ে নাকি সই করাতে চাওয়া হয়েছিল।
২২ জানুয়ারি এক সাংবাদিক সম্মেলনে দ্বীপের বিভিন্ন আদিবাসী কমিটির প্রধানরা জানান, ৭ জানুয়ারি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের একটি বৈঠকে ডাকা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে তাঁদের এমন কিছু সনদে সই করতে বলা হয়, যাতে দেখানো যায় যে তাঁরা দ্বীপের উন্নয়ন প্রকল্পকে সমর্থন করছেন—যে প্রকল্পের বিরোধিতা তাঁরা ২০২২ সাল থেকেই করে আসছেন।
গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড প্রকল্পের আওতায় একটি ট্রান্সশিপমেন্ট কনটেনার বন্দর, একটি বড় টাউনশিপ, একটি গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর এবং গ্যাস ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ₹৮১,০০০ কোটি (₹৮১০ বিলিয়ন) টাকা।
এই জমিগুলো আগে নিকোবরি জনগোষ্ঠীর ২৭টি গ্রামের বসবাসের এলাকা ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালের সুনামির পর তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে ক্যাম্পবেল বে সংলগ্ন দ্বীপের উপরের পূর্ব উপকূলে রাজীব নগর ও নিউ চিংনেহ এলাকায় পুনর্বাসিত করা হয়।
“আমাদের যখন পুনর্বাসিত করা হয়েছিল, তখন বলা হয়েছিল কিছুদিন পর আমরা আবার আমাদের জমিতে ফিরে যেতে পারব। কিন্তু সেটা আর কখনও হয়নি। আমাদের যেসব জায়গায় এখন রাখা হয়েছে, সেগুলো এতটাই ছোট যে সেখানে মাছ ধরা, চাষবাস করা বা ঠিকভাবে আমাদের উৎসবও পালন করা যায় না,” বলেন পুলো ভাবি গ্রামের প্রথম ক্যাপ্টেন টাইটাস পিটার। তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই আমাদের জমি আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হোক, আমাদের দিয়ে যেন জমি ছেড়ে দেওয়ার সই করানো না হয়। যদি আমরা এমন কোনো সনদে সই করি, তাহলে চিরতরে আমাদের জমি হারিয়ে ফেলব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আর কিছুই থাকবে না।”

আদিবাসী প্রধানদের কতটা জমি নেওয়া হবে সে সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য না দিয়েই তাঁদের কাছে জমি হস্তান্তরের (সারেন্ডার) সনদে সই চাওয়া হয়েছিল। ৭ জানুয়ারির ওই বৈঠক প্রসঙ্গে আমরা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ইমেলের মাধ্যমে যোগাযোগ করলেও, প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
২০২২ সালে সরকার আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকার অন্তর্ভুক্ত ১৩০.৭৫ বর্গকিলোমিটার জমিকে ডি-নোটিফাই করে, ট্রাইবাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (এনওসি) নেওয়ার পর। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই ট্রাইবাল কাউন্সিল সেই সম্মতি প্রত্যাহার করে নেয়।
সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাইবাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বার্নাবাস মানজু বলেন, “আমাদের এত তাড়াহুড়োর মধ্যে এনওসি-তে সই করানো হয়েছিল যে আমরা ঠিকভাবে পড়ে দেখারও সুযোগ পাইনি। পরে জানতে পারি, তারা কতটা জমি নিতে চায় এবং কী উদ্দেশ্যে। তখন আমরা প্রশাসনকে চিঠি লিখে আমাদের সম্মতি প্রত্যাহার করি, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো জবাব পাইনি।”
সংসদে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ প্রশাসন কেন্দ্রকে জানিয়েছে যে গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার আগে বনাধিকার আইন (Forest Rights Act – FRA) সহ সব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। তবে আদিবাসী কমিটির প্রধানরা এই দাবি অস্বীকার করেছেন।
পিটার বলেন, “এফআরএ আদৌ কার্যকরই করা হয়নি। আমাদের কারও কাছেই এফআরএ অনুযায়ী অধিকার স্বীকৃতির কোনো সার্টিফিকেট নেই।”
উল্লেখ্য, বনাধিকার আইন অনুযায়ী বনভূমিতে বসবাসকারী আদিবাসী ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অধিকার স্বীকৃত হয় এবং সেই জমি অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের আগে গ্রামসভার সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।
আদিবাসী কাউন্সিলের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক, কেন্দ্রীয় আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রক এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ প্রশাসনের কাছে একাধিক লিখিত আপত্তি জানানো হলেও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি—এ কথাও পুনরায় জানান আদিবাসী প্রধানরা।
নিকোবরিদের পাশাপাশি এই দ্বীপে বসবাস করেন শোম্পেনরা—যাঁরা একটি সংকটাপন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী এবং যাঁদের সঙ্গে বহির্জগতের যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। সংসদে আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রক জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে “পরামর্শ” করেই এই প্রকল্পের জন্য তাঁদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেস দলের বিরোধী নেতারা, যার মধ্যে রাহুল গান্ধী ও প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশ উল্লেখযোগ্য, এই প্রকল্পে আদিবাসী সম্প্রদায়ের সম্মতি না নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২০২২ সালে ভারতের শীর্ষস্থানীয় নৃতত্ত্ববিদদের লেখা এক চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, দ্বীপে এইসব পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হলে শোম্পেনদের অচেনা রোগের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বাড়বে এবং অন্য উপ-গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
কেন্দ্র সরকার একাধিকবার জানিয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং বনাধিকার স্বীকৃতি সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে মামলা চললেও তারা গ্রেট নিকোবর প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাবে। অথচ প্রকল্পের একটি বড় অংশ এমন এলাকায় পড়ছে, যেগুলি কঠোরভাবে সংরক্ষিত অঞ্চল—যেখানে লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপ, মেগাপোড পাখি, লোনা জলের কুমিরসহ অসংখ্য প্রজাতির আবাসস্থল রয়েছে। এই প্রকল্পের ফলে প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হবে, প্রায় ১৩০ বর্গকিলোমিটার অক্ষত বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহার করা হবে এবং প্রায় ১০ লক্ষ গাছ কাটা পড়বে।

ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরটি এই প্রকল্পগুলির মধ্যে প্রথম, যা গালাথিয়া উপসাগরে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে—এটি লেদারব্যাক কচ্ছপের ডিম পাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। কেন্দ্রীয় নৌপরিবহণ মন্ত্রকের প্রকাশিত যে চিঠিটি আমরা পর্যালোচনা করেছি, তাতে তাদের তরফে জানানো হয়েছে যে যুগ্মসচিব আর. লক্ষ্মণনের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি দ্বীপটি পরিদর্শনে যাবে, যাতে “আইসিটিপি প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও পরিচালনাগত দিকগুলি সামগ্রিকভাবে খতিয়ে দেখা যায়।”
ট্রাইবাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মঞ্জু বলেন, “এই প্রকল্পের জন্য বন ধ্বংসের আমরা বিরোধী। আমরা আমাদের জমি ফেরত চাই।”
মূল প্রবন্ধটি Mongabayপত্রিকায় প্রকাশিত। ইংলিশ প্রবন্ধটির অনুমতিক্রমে অনুবাদ করা হল বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য। মূল প্রবন্ধটির লিঙ্ক: https://india.mongabay.com/2026/01/asked-to-surrender-land-for-the-great-nicobar-project-tribal-leaders-say-no/








Comments