top of page

ভিয়েতনামের পাহাড়-সমুদ্র

  • ..
  • Jan 15
  • 4 min read

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশের প্রকৃতির কথা উঠে এল রুদ্রজিৎ পালের কলমে-ছবিতে। বনেপাহাড়ের পাতায় নতুন ভ্রমণ -উপাখ্যান।





ভারতের পূর্বদিকে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান দেশ হল ভিয়েতনাম। ফরাসী কলোনিয়াল যুগে এটি ছিল ইন্দো চায়নার অন্তর্ভুক্ত। চীনের দক্ষিণে অবস্থিত এই দেশটি এক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক কারণে বিখ্যাত ছিল। প্রথমে ফ্রান্সের থেকে মুক্তিলাভ এবং তারপর আমেরিকার সাথে দশকব্যাপী যুদ্ধ এই দেশটিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিল। পাঠকদের মধ্যে যারা সত্তরের দশকে বামপন্থী মনোভাবাপন্ন তরুণ ছিলেন, তাদের কাছে ভিয়েতনাম ছিল বিদ্রোহের প্রতীক। তবে সেই বামপন্থী আন্দোলনের যুগ অনেকদিন অতীত। আমাদের মত পরবর্তীকালে জন্মানো মানুষদের কাছে ভিয়েতনামের সাথে সেই লাল বিদ্রোহের স্বপ্নের যোগ কোনদিনই নেই। আর ভিয়েতনামে এখনও কমিউনিস্ট পার্টির একছত্র আধিপত্য থাকলেও সেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আগুনখেকো আন্দোলন এখন আর হয় না। বরং, চীনের মত ভিয়েতনামও এখন সস্তার শ্রমিকদের দেশ এবং নানা ইলেকট্রনিক গ্যাজেট তৈরির কারখানার দেশ হিসাবে পরিচিত।

বর্তমান সময়ে ভারতের মধ্যবিত্ত পর্যটকদের কাছে খুব পরিচিত নাম ভিয়েতনাম। যারা উচ্চবিত্ত, তাদের কাছে সপ্তাহান্তে আমেরিকা-মেক্সিকো বা পুজোর ছুটিতে ল্যাপল্যান্ড-প্রাগ চিরকালই তুচ্ছ ব্যাপার ছিল। কিন্তু মধ্যবিত্ত যে শ্রেণী ১৯৯১ অবধি দীঘা-পুরী-দার্জিলিং বা বড়জোর হরিদ্বার-বেনারস অবধি যেতে পারত, তারাই এখন সদলবলে চলেছেন ব্যাঙ্কক, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা বা কাজাখাস্থান। সম্প্রতি ভিয়েতনামে গিয়ে এই লেখক ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ভিয়েতনাম যেহেতু ফ্রেঞ্চ কলোনি ছিল, তাই বিয়ার খাওয়া এবং সারা গায়ে উদ্ভট সব উল্কি করা ফরাসী পর্যটকের সংখ্যা এই দেশে চিরকালই প্রচুর। কিন্তু সেই গোষ্ঠীটা বাদ দিলে ভিয়েতনামের টুরিজম ক্ষেত্রকে বাঁচিয়ে রেখেছে ভারতীয়রাই।



তাহলে ভিয়েতনামে গিয়ে ঠিক কী কী জিনিস উপভোগ করতে পারবেন? পৃথিবীর অন্য সব দেশের মত ভিয়েতনামেও নগরায়ন চলছে। এবং সেই নগরায়নের মডেল রাজারহাটে যা, ব্যাঙ্কক বা হ্যানয়েও তাই। সেই উঁচু উঁচু তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের অফিস বিল্ডিং, শপিং মল এবং থীম রেস্তোরাঁ। সুতরাং সেসব দেখার জন্য দেশ বেড়ানোর কোনও দরকার নেই। সাউথ সিটিতে ঢুকলে যে পরিবেশ পাবেন, যে ব্র্যান্ড পাবেন, হ্যানয়ের লোটে মলেও সেটাই। আকৃতি হয়ত পৃথক, দামের ট্যাগে হয়ত দু-তিনটে শূন্য বেশি বা কম;কিন্তু বাকি সব এক। ভিয়েতনামের বৈশিষ্ট্য হল এর কিছু ইউনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যেটা অন্য কোথাও নেই।

প্রথমেই বলতে হবে হালং সৈকতের কথা। ভিয়েতনামের রাজধানী, হ্যানয় থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে এই সৈকত। এই প্রসঙ্গে বলে নিই যে, কলকাতা থেকে হ্যানয়ের বেশি ফ্লাইট নেই। ইন্ডিগোর একটি ফ্লাইট আছে সরাসরি কলকাতা টু হ্যানয়। সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা। অর্থাৎ, কলকাতা থেকে দিল্লির ফ্লাইটের যা সময়, তার থেকেও কম। এছাড়া ব্যাঙ্ককে ভেঙ্গেও যাওয়া যায়। হ্যানয় দিয়ে ভিয়েতনামে ঢোকাই সুবিধাজনক। এছাড়া ঢোকার আরেকটা দরজা হল হো চি মিন সিটি। কিন্তু সেই ফ্লাইট দিল্লি বা হায়দ্রাবাদ থেকে। কলকাতা থেকে সরাসরি হো চি মিন সিটির ফ্লাইট নেই।

আবার ফিরে আসি হালং সৈকতের প্রসঙ্গে। এই সৈকতের বৈশিষ্ট্য হল সমুদ্রের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়ানো কিছু লাইমস্টোন পাহাড়। অর্থাৎ, আপনি জাহাজ বা নৌকায় করে সেইসব পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে জল্ভ্রমণ করবেন। এইসব জলের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ডুবোপাহাড় দেখেই “অবতার” সিনেমায় জেমস ক্যামেরন সেই প্যান্ডোরার ভাসমান পাহাড়ের কল্পনা করেছিলেন। নীচের ছবি দেখলেই বুঝতে পারবেন যে, কতটা অসামান্য এই ল্যান্ডস্কেপ।




এখানে সমুদ্রের মধ্যে কিছুটা ভ্রমণের পর আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে টি-টপ দ্বীপে। সেখানে সৈকত রয়েছে। সমুদ্রস্নান করতে পারেন। এছাড়া সেই দ্বীপে হাইকিং করে উচ্চতম ভিউপয়েন্টেও যেতে পারেন। নীচে রইল সেই দ্বীপের সৈকতের ছবি।





এরপর আরেকটি দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে বাঁশের তৈরি নৌকা চড়ার সুযোগ রয়েছে। সেই নৌকা করে আপনি যেতে পারবেন এইসব পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে, একদম পাহাড়ের কাছাকাছি। অনেক জায়গায় দুটি পাহাড়ের মধ্যে গুহা রয়েছে। নৌকা সেই গুহার মধ্যে এক প্রান্ত দিয়ে ঢুকে অপর প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে আসবে। গুহার ছাদ খুবই নিচু। নৌকা যখন গুহার একদম মাঝখানে, তখন মাথা নিচু করেই থাকতে হয় কিছুক্ষণ।





 সবশেষে আপনি যেতে পারবেন সুং সট গুহায়। এই গুহা হল সমুদ্রের মাঝখানে থাকা একটি এরকম লাইমস্টোন পাহাড়ের গহ্বরে প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট স্ট্যালাকটাইট এবং স্ট্যালাগমাইটের জাদুঘর। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জল এবং হাওয়ায় ক্ষয় হয়ে হয়ে সৃষ্টি হয়েছে এই আশ্চর্য গুহার। ভেতরে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ পথ প্রবেশ থেকে প্রস্থানের দ্বার অবধি। অবশ্যই সমান পথ নয়, উঁচু-নিচু হয়েই গুহার গোলকধাঁধার মধ্যে দিয়ে এই পথ রয়েছে।





তবে ভেতরে যথেষ্ট আলো রয়েছে এবং পথের বেশিরভাগ অংশ বাঁধানো এবং রেলিং দেওয়া। ফলে কিছু সংকীর্ণ অংশ বাদ দিলে সবাই নিশ্চিন্তে এইসব পথে চলাচল করতে পারে। এই লেখক সেই গুহার ভেতরে অনেক পরিবারকে দেখেছিলেন, যারা দুই বা তিন বছরের শিশু নিয়েই এই গুহায় হাইকিং করছে। গুহার মধ্যযুগীয় ক্যাথিড্রালের মত উঁচু ছাদ থেকে শুরু করে মেঝে অবধি কোটি বছরের জলের স্রোতের ফলে সৃষ্ট নানা চিহ্ন রয়েছে। ছবি দেখলেই বুঝতে পারবেন। নানা স্থানে সৃষ্টি হয়েছে অদ্ভুত সব প্রাকৃতিক ভাস্কর্যের। তার ওপর লেড আলো পড়ে মায়াবী রঙের ঝলকানি দেখা যায়।


সব শেষে, প্রস্থানের দ্বারে এসে, একদম ওপর থেকে দেখা যায় হালং সৈকতের সেই সমুদ্র এবং পাহাড় নিয়ে এক দুর্ধর্ষ প্যানোরামা। তার মধ্যেই বন্দরের জাহাজ দেখা যায়, পর্যটকদের ইয়টও দেখা যায়। সূর্যাস্তের সময়ে সেই দৃশ্য একদম মনোমুগ্ধকর।



 সব শেষে, সেই ডুবোপাহাড়ের মাঝখানে থাকা জেটি থেকে নৌকায় উঠে ডাঙ্গায় প্রত্যাবর্তন।

এরপর ভিয়েতনামের দ্বিতীয় যে স্থানের বর্ণনা দেব, তার নাম হল নিং বিং।


এটি ছিল হাজার বছর আগে ভিয়েতনামের রাজধানী। এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, এবং তার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া এক শান্ত নদী। আর সেই নদীর দুপাশে নানা জায়গায় রয়েছে লাইমস্টোনের পাহাড়। অনেকটা যেন হালং বে, কিন্তু স্থলভূমিতে। এই নদীর ওপর নৌকা বিহার হয়।



এবং সেই সময়ে দুদিকে দেখা যায় অজস্র পাহাড়, জঙ্গল এবং কাশফুলের বন। নদীর মাঝে কিছু ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। সেখানে নানা প্যাগোডা আছে। বাইনোকুলার এবং টেলিলেন্সের ক্যামেরা নিয়ে গেলে এইসব পাহাড় এবং জঙ্গলে প্রচুর পাখি দেখতে পাওয়া সম্ভব। এই নদীর জলে তীরের কাছে পদ্মফুল ফুটে থাকে। এখানেও এই নদীপথে মাঝে মাঝে পাহাড়ি গুহা রয়েছে। সেই গুহার মধ্যে দিয়েই নৌকাবিহার হয়।

এখানকার গুহা হালং বে-র গুহার থেকে আয়তনে অনেকটাই লম্বা। ফলে গুহার মধ্যে নৌকা ঢুকে যাওয়ার পর এক-একটা বাঁক আসবে, যেখানে সামনে পেছনে- দুদিকেই শুধু পাথরের দেওয়াল দেখা যাবে, আর চারপাশে কালো কালো জল।


 সবশেষে বলি, ভিয়েতনামের অর্কিড খুব বিখ্যাত। পাহাড়ের জঙ্গলে গিয়ে তো সেই অর্কিড দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ভ্যান ফুকের এক নার্সারিতে দেখা কিছু অর্কিডের ছবি দিয়েই এই গল্পের আসর শেষ করলাম।






লেখক পরিচিতি: ডা: রুদ্রজিৎ পাল একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও লেখক।

Comments


86060474-00b1-415d-8c11-9c4471c9c5e7.png
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
 

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page