বড়দিনে ছোটদের গল্প
- ..
- Dec 25, 2025
- 10 min read
আজ উৎসবের দিন, ছুটির সময়। তাই বনেপাহাড়ের পাতায় ছোটদের জন্য প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা না-মানুষ ছোটদের নিয়ে অনুগল্প। আবার কলমে পশ্চিমবঙ্গের Chief Conservator of Forests লিপিকা রায়।

ভানুমতী আর মনু
দুলি ঠাকুরমা সকালের সব কাজ পাট একপ্রস্থ সেরে ঘরে এলো। নিজের চৌকিখানার উপর একটু পা মেলে বসে জিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে। ভাবছে একটু পরে বাইরে গিয়ে গাঁদা ফুলের গোড়াগুলো খুঁড়ে দেবে ।তারপর আচারের বয়াম গুলো রোদের দিকে সরিয়ে দেবে।
এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হল চৌকির নিচ থেকে একটা কুড়মুড় কুরড়মুড় আওয়াজ আসছে না? ঠাকুরমা ভারী পরিপাটি।রং ওঠা বিছানার চাদরটা টানটান করে পাতা থাকে চৌকিতে। চৌকির পায়ার নিচে ইট দিয়ে উঁচু করে চালের কৌটো মুড়ির টিন এরকম সাতসতের জিনিস থাকে সেখানে
সেগুলো যাতে বাইরে থেকে দেখা না যায় তাই পুরনো শাড়ি সেলাই করে চৌকির নিচে চারদিকে মশারির মতো ঝালর লাগানো আছে। একটুখানি নিচু হয়ে ঝালরখানা একদিক দিয়ে তুলে ঠাকুমা প্রথমে অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেল না। দুটো দড়ি মতো কি পড়ে আছে না মাটিতে? একটা লম্বা, একটা ছোট? অন্ধকারে চোখটা সয়েলেই বোঝা গেল কুড়মুড়ের আওয়াজ এর উৎস। খাটের তলায় সামনের আম গাছের মা হনুমান ভানুমতী আর তার ছানা চিনু দিব্যি গ্যাঁট হয়ে পিছন ফিরে বসে আছে। “দড়ি” দুটো আসলে তেনাদের ল্যাজ।
“হায় হায় হায়, আমার বড়ি গুলো সব গেল রে ”।
মনে সুখে ভানুমতী বড়ি চিবোচ্ছিল। বুড়ির হাতের চাল কুমড়া বড়ির যা সোয়াদ। ঠাকুমা বুড়ির চেঁচামেচি শুনে ঘুরে তাকায় ভানুমতী। তখন ও তার মুখ ভর্তি বড়ি ।চিনুও চমকে তাকায়। এক হাত তখনও তেঁতুলের আচারের বয়ামের ভিতর। সারা মুখে, পেট্ তেঁতুলের আচার মেখে চেহারাখানা হয়েছে একেবারে খোলতাই।
দুলি ঠাকুরমা চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করলো, “ওরে আমার বড়ি, আচার সব দফারফা করেছে”।
“খ্যাঁকখ্যাঁক”… ভানুমতীও বুড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খিঁচিয়ে ওঠে।
“আমি কি সব খেয়ে নিয়েছি ?চাইলে কি তুমি দাও?”
“ওরে আমার জিনিস নষ্ট করে আবার আমাকে দাঁত খিঁচোনো?”
“সেদিন পেঁপে গাছ থেকে মাত্র দুটো পাকা পেঁপে খেয়েছিলাম, তাই কত কথা শোনালে। আরো কত পেঁপে ছিল ,আমি কি সব খেয়েছি? খ্যাঁক খ্যাঁক…।”
“দাঁড়াতো!!” ঠাকুমা পাশের তাক থেকে গুলতিটা হাত বাড়িয়ে নেবে ভাবছে, ভানুমতী চিনুকে কোলে ঝুলিয়ে নিয়ে পগার পার। যাওয়ার সময় যে কাপড়ের উপর বড়ি শুকোতে দেওয়া ছিল সেটা পোঁটলা করে নিয়ে যেতে ভোলেনি।
“মা আমার আচার…? কিচমিচ…”
“শিগগিরি চল, ঠাকুমা রেগে গেছে। গুলতির দিকে হাত বাড়িয়েছে দেখলি না…”
এক লাফে সামনের আম গাছের ডালে পৌঁছে, ভানুমতী চিনুকে কোল থেকে নামালো। চিনু লেগে পড়লো গায়ে লেগে থাকা বাকি তেতুলের আচার গুলো চাটতে।
ঠাকুমার চেঁচামেচিতে ততক্ষণে পাশের বাড়ির ছোট্ট ছেলে মনু আর তার মা এসে উপস্থিত।
“কি হয়েছে গো”?
“আর কি হয়েছে! হতচ্ছাড়া হনুমান গুলো আমার বড়ি আর আচারের সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে।“
“ঠাকুমা ওদের খিদে পেয়েছিল তো, তাই একটু খেয়েছে ।ওদের বকো না” মনু বলে।
“ না বকবে না ,আদর করবে !! গাছে কত পাতা আছে খাকনা, আমার বড়ির উপর হামলা কেন ?”
“কেন খালি পাতা খাবে কেন ?” মনু বলে।
“তুমি বুঝি খালি ভাত খাও? তুমি যে দুধ খাও? সন্দেশ খাও? তার বেলা? ওদের পাকা পেঁপে দাও না ঠাকুমা। কটা কলাও দাও ওদের। পেট ভরে গেলে আর আসবেনা। আমাদের ইস্কুলে স্যার বলেছে, ওদের খিদে পেলে ওরা বাড়িতে চলে আসে। মানুষদের সবকিছু নিজেরা না খেয়ে ওদের জন্য একটু রাখা দরকার। ”
ওদিকে গাছ থেকে ভানুমতী চিনুকে বলল, “ দেখলি কেমন বুদ্ধি ওই মনূটার? ইশকুলে কত কি শেখায়। তোকেও ভাবছি এবার মনুর ইশকুলে ভর্তি করে দেব।“
“মনুদাদা তো শুধু পেঁপে আর কলা দিতে বলল । আচার দিতে বলল না তো মা?” কিচমিচ করে ওঠে চিনু।
“উফফ, বলেছিনা আচার বেশি খেতে নেই?”
ওদিকে ঠাকুমা আর কি করে! মনু তো কথাগুলো ঠিকই বলেছে। তাই মনুকে একটু আদর করে একটা সন্দেশ দিয়ে বলল , "যা তাহলে দুটো কলা নিয়ে রেখে আয় গাছের নিচে।"
যেই না মনু দুটো কলা নিয়ে রাখল গাছের নীচে, ভানুমতী গুটি গুটি গাছ থেকে নেমে এলো ।
একখানা কলা নিয়ে টুক করে উঠে গেল গাছে, একখানা রেখে গেল। মনুর ইশকুলের স্যার বলেছেন না সবাই ভাগ করে খেতে হয়?
চিনুর ইশকুল যাত্রা
চিনু এখন একটু বড় হয়েছে। মা আর কোলে নিতে চায়না , ওর ও কোলে উঠতে একটু লজ্জা লজ্জাই লাগে। এখন ও নিজেই গাছের ডাল বেয়ে বেশ এদিক-ওদিক করতে পারে। নিচের দিকে লাফ দিতে গিয়ে মাঝে মাঝে একটু যে ভয় ভয় করে না তা নয় ।এই কথাটা একদিন মাকে বলতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়ে গেল। চিনু নিজের মনে একটা ডাল ধরে ঝুলে দোল খাচ্ছিল, হঠাৎ মা দিল একটা ধাক্কা। হকচকিয়ে গিয়ে পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ দেখল নিজেই দিব্যি আর একটা ডাল ধরে ঝুলে পড়তে পারল।
“বাহ বেশ মজা তো? কই পড়ে গেলাম না তো ?”
সামনের বাড়ির মনু ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। চিনু যেই ডালটা ধরে নিল , মনু হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠলো, “ পেরে গেছে, পেরে গেছে”।
শুনতে পেয়ে মনুর মা ঘর থেকে দিল বকুনি।
“স্কুলে যাবি না সকাল থেকে হনুমানের ছানার কান্ড দেখলেই হবে?”
“মা দেখো দেখো, চিনু কি দারুন ডাল ধরে ঝুলছে! আমিও একটু চেষ্টা করলেই পারব ।তাই না মা ?”
“হ্যাঁ তা চেষ্টা করতে পারো, স্কুল না গেলে তো ওই গাছেই থাকতে হবে!”
মায়ের কথা সুরটা খুব সুবিধার নয়। তাই ব্যাগ বই গুছিয়ে হাঁটা দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
স্কুল বেশি দূরে নয়। চত্তরের মধ্যেই মস্ত একটা তেঁতুল গাছ। মনু আর ওর বন্ধুরা পৌঁছতেই ঢং ঢং করে ঘন্টা দিয়ে দিল দারোয়ান কাকু। তার মানে হল এবার সবাইকে প্রার্থনার লাইনে দাঁড়িয়ে হাত জোর করে গাইতে হবে। “হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর্, হও উন্নত শির নাহি ভয়।“
গান টান সেরে ক্লাসে ঢুকে গেল সব। প্রথমেই অংক ক্লাস। ক্লাস করতে করতে হঠাৎ একটা খ্যাঁক খ্যাঁক আর কিচমচ আওয়াজ শুনতে পেল মনু।
পাশেই বসে বাবলু । মনুর কানে কানে বলল, “তেঁতুল গাছের দিকে দেখ একবার”
মনু ব্ল্যাকবোর্ড থেকে চোখ তুলে দেখে , ভানুমতী না ?
ভানুমতী নিচু ডালটা থেকে মাথা ঢুকিয়ে ঝুঁকিয়ে কি যেন দেখছে আর চিনু কে কি বলছে। আর চিনু কিচকিচ করে উঠছে আর মার লেজ ধরে টানছে।

“অ্যাই কোন দিকে মন তোদের? জানালা দিয়ে কি দেখছিস ?কানমলা খাওয়ার শখ হয়েছে?”
“ না স্যার… চিনু……”
“ চিনু মানে?”
“ না…. মানে কিছু না…”
“ শিগগির বোর্ডের দিকে তাকা। না হলে তেঁতুল গাছের নিচে কান ধরে দাঁড় করিয়ে দেবো।“
ঢং ঢং করে ঘন্টা পড়তেই স্যার চকটা রেখে,” সবাই চুপ করে বসবি, পরের ক্লাসের স্যার আসার আগে চেঁচামেচি করবি না” এই বলে বেরোতেই ধুপ করে তেঁতুল গাছের ডাল থেকে স্যারের সামনে নামলো ভানুমতী। নেমেই স্যারের জামা ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল। পিছনে মায়ের লেজ ধরে চিনু।
স্যার প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও সামলে নিলেন। ছেলের দল এসে ঘিরে ধরেছে ।
“কি চাই তোদের?” স্যার ভানুমতি কে জিজ্ঞেস করলেন।
খ্যাঁক খ্যাঁক স্যার, চিনু…” বলেই ভানুমতী চিনুর হাত ধরে সোজা ক্লাস ঘরের দিকে চলল ।
চিনু বেঞ্চের উপর উঠে বসতেই ভানুমতি সোজা খোলা জানালা দিয়ে বেরিয়ে তেঁতুল গাছে।
“স্যার, চিনু ক্লাস করবে আমাদের সাথে?”
“ দ্যাখ ,দেখে শেখ তোরা। তোদের পড়াশুনা করাতে আমি বকে বকে অস্থির হয়ে গেলাম। চিনুকে দেখ। ওকেই পড়াবো এখন থেকে আমি। আর তোরা গাছের ডালে বসে থাকবি।“
“স্যার গাছে ওঠা শেখাবেন?”
“গাছে ওঠা কি কেউ শেখাতে পারে? । উঠে উঠে প্র্যাকটিস করতে হয়। উঠে পড় আমার পিছন পিছন।“ স্যার প্যান্ট গুটিয়ে গাছে ওঠার তোড়জোড় শুরু করেন ।
“আর পড়ে যাই যদি?”
“আবার উঠবি। শিখিয়েছি না…হও উন্নত শির নাহি ভয়।“
হেডস্যার স্কুলে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। স্যারের পেছন পেছন তিন চারটে ছেলে গাছে উঠছে দেখে প্রথমে অভ্যাসবশে একটা হুংকার দেবেন ভাবছিলেন, নিজের ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে যাওয়ায় হাসি চেপে তাড়াতাড়ি অন্য দিকে দেখতে চললেন।
এদিকে ভানুমতি উপরের ডালে বসে মহা চিন্তায় পড়ে গেল। “চিনুটাকে স্কুলে ভর্তি করলাম এদিকে স্কুলের স্যারই ছেলেপিলেদের নিয়ে গাছে উঠে পড়ছে। কি কাণ্ড রে বাবা”
আস্তে আস্তে ভানুমতী আরো উপরের ডালে উঠে, পাকা তেঁতুল দেখে দুটো মুখে পুরে দিল। আর দুটো ফেলে দিল নিচে। স্যার চিনুটাকে মনুদের ক্লাসে ভর্তি করে নিল, তাকে তো কিছু উপহার দেওয়া উচিত তাই না?

বলটু আর ভূতের ছানারা
গত ক'দিন ধরে বকুনি খেতে খেতে বলটুর প্রাণটা অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।
“ বল্টু টিফিনে কলা দেবো বলে বের করে রেখেছিলাম, আগেই খেয়ে নিয়েছিস না বলে? “
“আমি না মা ।“
“ বল্টু পড়ার জায়গাটায় ধুলোবালি কি সব ছড়িয়ে রেখেছিস, দিন দিন যেন একটা ভূত হচ্ছিস।“
“ আমি না মা ।“
“তুই না তো কে? “
“আমি না গো মা।“
গত কয়েকদিন ধরে সারাদিন বিশেষত: সকালে এই চলছে বাড়িতে।
বল্টু বিরক্ত হয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাবে কিনা চিন্তা ভাবনা করছিল । কিন্তু সন্ন্যাসী হলে নাকি ফলমূল খেয়ে থাকতে হয় , তাই আপাতত ভাবছে বাজারে সবজি ওয়ালা কাকুর হেলপার হয়ে যাবে। কাকু সেদিন কানা তোলা টিনের থালায় কি সুন্দর লাল লাল ঘুগনিমুড়ি আর কাঁচা লঙ্কা খাচ্ছিল। আবার পাশে একটা অমলেট ও রাখা ছিল। আর মায়ের খালি সারাদিন দুধ খাও, ফল খাও, সবজি খাও, যত সব আজেবাজে খাবার।
টেবিলের ওপরে তাকে রাখা সরস্বতী ঠাকুরের ছবিটাকে নমো করে বল্টু সবে বইপত্র খুলে পড়তে বসবে ভাবছিল। হঠাৎ দেখে বইয়ের টেবিলের উপরে খুদে খুদে বিন্দুর মতো ধুলো মাখা পায়ের ছাপ।
“মা যে কেন বুঝতে পারছে না ধুলোবালি গুলো আমি ছড়াইনি”।
“ কি বিড়বিড় করছিস? জোরে জোরে পড়বি”।
“ দেখ না মা কে যেন হেঁটে গেছে পড়ার টেবিল দিয়ে। আচ্ছা মা, সরস্বতী ঠাকুর এসেছিলেন বোধ হয়।“
“ হ্যাঁ তোমার লেখাপড়ার বহর থেকে হাঁসটাকে পাঠিয়েছিলেন বোধহয় দেখতে, তুমি পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছ না পড়ছো ।এখন বইপত্র খুলে পড়াগুলো ঝালিয়ে নিয়ে স্কুলে গিয়ে আমায় উদ্ধার করবে” ?মা গজগজ করতে করতে গলা চড়ান।
তাড়াতাড়ি রুটিন খুলে পড়াশোনা গুলো একটু ঝালিয়ে নেয় বল্টু। তারপর এক দৌড়ে চান করে স্কুল ড্রেস পড়ে বেল্ট লাগাতে গিয়ে দেখে বেল্টটা যেন ছোট ছোট দাঁত দিয়ে কেউ কেটে রেখেছে।
“মা আমার বেল্টটা কামড়ে খেল কে?”
“তোকে স্কুলে পাঠানো বল্টু আমার কাজ নয়।” মা হাল ছেড়ে দেওয়া গলায় বলেন, “ হেড স্যারকে বলে দেখতে হবে হোস্টেলে নেন কিনা ।”
সুবিচার পাবার কোন সম্ভাবনা নেই দেখে, বল্টু চললো স্কুলে।
সন্ধ্যেবেলা যখন পরের দিনের পড়া গুলো ঝালিয়ে নিচ্ছিল ,হঠাৎ সরু গলার একটা কিচকিচ আওয়াজ কানে এল।
মাকে বললে সমস্যা তো মিটবেই না ,উল্টে পড়াশোনায় মনোযোগ নেই বলে খেতে হবে বকুনি। বাবা বলেছেন সব সময় সমস্যায় পড়লে ভেবে দেখতে হবে সমস্যাটা কি।
সমস্যার উৎস সন্ধানে আওয়াজটা কোন দিক থেকে আসছে দেখতে গিয়ে বল্টুর হঠাৎ ঘুলঘুলির দিকে চোখ পড়ে গেল। আবছা অন্ধকারে মনে হলো কি যেন একটা নড়ে উঠল! এদিকে আবার কি রকম একটা ভেজানো আতপ চালের গন্ধের মত গন্ধও আসছে। সব মিলিয়ে বল্টুর যাকে বলে, হাড় হিম হওয়ার মতন অবস্থা। কান খাড়া করে বল্টু শুনলো বাবা মাকে বলছেন , “একটু পরে খেতে দিয়ে দিও , ছেলেমেয়েগুলো মনে হয় ঘুমিয়ে পড়ছে। ”
হঠাৎ পড়ার ঘরের আলোটা দপদপ করে নিভে গেল।
বল্টু কয়েক সেকেন্ড চোখ, কা্ন, দম, সব বন্ধ করে থাকতে থাকতে বুঝতে পারল সরসর করে কারা যেন সব ওপর থেকে নেমে আসছে। মাকে ডাকতে গিয়ে দেখল গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরোচ্ছে না। এর মধ্যে টর্চ লাইট নিয়ে বাবা উপস্থিত হতে বল্টু কোন রকমে আঙুল দিয়ে খালি উপরে দেখাল।
বাবা বললেন, “ওদিকে কি? দাঁড়া, লাইটটা ফিউজ হয়ে গেছে। এদিকে তো বসে বসে পড়ার নামে ঘুমোচ্ছিস সব । চল খাবি চল।কালকে টিউবলাইট টা বদলাবো। ”
“ বাবা ! ভূত !”
“ভূত কি টিকটিকি যে দেওয়াল বেয়ে নামবে?”
টর্চটা ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে বাবা দেখেন টেবিলের তলায়, কালো গুলি গুলি মার্বেলের সাইজের এরা সব কে? আর সবার পেছনে সূচালো মুখো পুঁতির মতো চোখ, তিনি কি এই মার্বেলদের মা নাকি?
“এই যে রমা, এদিকে এসো শিগগির, বল্টুর পড়ার টেবিলের তলায় ভূত, এক আধটা নয় গোটা চারেক ”।

ভূতকে তাড়াতে হবে ভেবে কিনা কে জানে, মা রুটি বেলুন টা নিয়ে দৌড়ে আসছিলেন।
“এই যে দেখো কে কলা খেয়ে যায় রোজ”
“ আচ্ছা এই তাহলে সরস্বতী ঠাকরুণ ,বল্টু পড়ছে কিনা দেখতে আসেন?”
বাবা, মা দুজনেই দেখলেন এক মা গন্ধগোকুল ছানা নিয়ে টেবিলের তলা থেকে তাকিয়ে রয়েছে ।
এতক্ষণে বল্টুর ধরে প্রাণ এসেছে ।
“তাহলে খালি যে আমায় বকুনি দাও সারাদিন ?মা আমি ছোট বাচ্চাগুলোকে পুষবো। ”
“না বাবা, বনের প্রাণী কে খাঁচায় পুষতে নেই।ওরা গন্ধগোকুল। মানুষের ক্ষতি করে না।তুমি যেমন আমার বাচ্চা, আমার কাছে থাকো,ওরাও ওদের মায়ের সঙ্গে আছে। ওদের ঘরবাড়ি ঝোপে ঝাড়ে। মানুষের কাছাকাছি চলে এলে ওদের বিরক্ত করতে নেই।চলো ,আমরা সবাই পাশের ঘরে যাই, ওরা সবাই মিলে ঠিক ফিরে যাবে। ”
বাইরে যেতে যেতে ও বল্টুর প্রশ্ন শেষ হয় না।
“ পুষলে কি হয় মা”?
“ পুষলে ওদের মনে কষ্ট হয়। তোমায় যদি সামনে আম গাছ থেকে মা হনুমান নিয়ে গিয়ে গাছের ওপর রেখে পুষতে চায় , গাছের ওপর থাকতে পারবে? তোমার ভালো লাগবে? আমাদের দেখতে না পেলে কষ্ট হবে না? ”
“হবে তো। তাহলে বকছিলে কেন? যদি আবার অকারণে বকো তাহলে আমি সবজিওয়ালা কাকুর হেল্পার ই হয়ে যাবো। ”
“মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসলে ওদের ও কষ্ট হবে। চলো এখন খাবে চলো। ”
আর কি করে বল্টু, চললো মায়ের পিছু পিছু। রাত্রে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একবার বাবার সঙ্গে এসে উঁকি মেরে দেখে গেছে ছানা গন্ধগোকুলরা ও ওদের মায়ের সঙ্গে ফিরে চলে গেছে ওদের নিজের বাড়ি।
আরো পড়ুন: ছোট গল্প: ভালো থেকো ইসমাইল ভাই
এলু আর পান্তু

গোল্লু সেই সন্ধ্যা রাত্তির থেকে হেঁটে চলেছে হেঁটেই চলেছে। চারটে পা ই ব্যথা করছে। একটুখানি দাঁড়ালেই মা গুঁতো মারছে শুঁড় দিয়ে।
গোল্লুর পাশে পাশে হাঁটছে ওর একটু বড় মাসতুতো দাদা এলু। ছোট্ট শুঁড়টা দিয়ে দাদাকে একটা ছোট্ট ধাক্কা দিল গোল্লু। ওরা এই ভাবেই একে অপরের সঙ্গে কথাবার্তা বলে কিনা ,তাই। আমরা যেমন চুপিচুপি কথা বলার থাকলে ফিসফিস করি সেরকম।
যা বোঝার বুঝে গেল এলু। সেও তার ছোট্ট মাথাটা দিয়ে গোল্লুকে একটা গুঁতো দিয়ে বোঝালো,” চল চল এখন দাঁড়ালে দিদা আর মাসি মিলে ঘা কতক শুঁড়ের বাড়ি দেবে।
পিছন থেকে দিদুন হাতি কি যেন বলল ।ফিশফাশ, কান নাড়ানাড়ি, গা ঘষাঘষি …দাঁড়িয়ে পড়ল সবাই… দূরে একটা হইচই শোনা যাচ্ছে না?
“যাক বাবা একটু দাঁড়ানো গেছে”, ভাবলো গোল্লু।
দাঁড়াতে গিয়ে পায়ে একটা কিছু লাগলো দেখে নিচে তাকিয়ে গোল্লু দেখে মাঠের মধ্যে গোল গোল কি যেন সব পড়ে রয়েছে।
শুঁড় দিয়ে তুলে ছুঁড়ে দিলো এলুর দিকে। এলু ধরতে না পারায় গড়িয়ে গেল মায়ের দিকে। দেখল মা ওটাকে একবার ঠুকে শুঁড় দিয়ে চালান করল মুখে ।
“আহ বাঁচা গেল”, মিষ্টি কুমড়োর স্বাদে বলে উঠল গোল্লুর মা।
“ এবার আস্তে করে চলো সব ,সামনেই তালপুকুরিয়ার জঙ্গল ।একটু পরেই সূর্য উঠবে। দিনে আজ আমাদের ওখানেই বিশ্রাম।“ দিদুন হাতি নির্দেশ দিলো পিছন থেকে।
জঙ্গলের পাশেই যে ছোট ছোট ঘর গুলো দেখা যাচ্ছে , তার একটায় থাকে পান্তু ,মিনু আর ওদের বাবা মা। পান্তুর বাবা-মার সারাদিন অনেক খাটনি।কুমড়ো ক্ষেতে কাজ। তারপরে উচ্ছের মাচা বাঁধা হচ্ছে। তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে রাতে সবাইকে শুয়ে পড়তে হয়। আবার ভোর থাকতে ওঠা।
পান্তুর কিন্তু রাত্রে ঘুমোতে একটুও ভালো লাগে না। রাতে জানালা খুললে কেমন চাঁদ দেখা যায় , দূরে বড় পাকুড় গাছটার মাথায় শকুনের বাসা থেকে শকুন বাচ্চাদের চেঁচানি শোনা যায়। সামনে যে ছোট পুকুরটা আছে ওখানে হাঁসের ছানাদের চলাফেরার সড়সড় আওয়াজ পাওয়া যায়। মোটকা একটা গেছো ইঁদুর হঠাৎ হঠাৎ বেড়াতে বের হয়। বন্ধ দরজা আর জালনার বাইরে এত হাজার মজা ছেড়ে বোকার মত ঘুমানোর কোন মানে আছে? জানালা খুলে বসে পান্তু এটাই ভাবছিল।
আর এদিকে হয়েছে কি , গোল্লুদের দিদুনের কথায় পুরো পরিবার তো আজকের মত জঙ্গলে দাঁড়িয়ে গেছে। কেউ হাত পা ছড়িয়ে বসে ,কেউ দাঁড়িয়ে্ গায়ের ব্যথা কমিয়ে নিচ্ছে। গোল্লু ঘুমিয়ে কাদা।
এলু মায়ের ঘরঘর নাক ডাকার আওয়াজ পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ভাবল, “যাই ওই দিকটা একটু ঘুরে দেখি। মাসি গোল গোল কি একটা কপ করে খেয়ে নিয়ে ভারি খুশি হয়েছিল। ওরকম যদি দু একটা পাওয়া যায় তাহলে আরো এনে দেবো”।
আরো পড়ুন: ছোটদের জন্য ছোটদের গল্প
একটু এগিয়ে এসেই এলু পৌঁছে গেল কুমড়ো ক্ষেতে। একটা কুমড়ো খেয়ে খুব মজা লাগলো। দিব্যি মিষ্টি মিষ্টি । পা দিয়ে ঠেললে গড়িয়ে গেল।
দুটো কুমড়ো নিয়ে গেলে মা আর মাসি নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে, এই ভেবে পা দিয়ে কুমড়ো দুটো গড়াতে গড়াতে অন্ধকারে দিক গুলিয়ে গেল।
এলু এসে পড়ল ঠিক পান্তুদের বাড়ি জালনার নিচে।
পান্তু তখন বাবার নাসিকা গর্জনে সন্তুষ্ট হয়ে জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল, “ইস আমি মানুষ না হয়ে শকুন হলে কেমন ঐ বড় গাছটার মাথায় থাকতে পারতাম”। ভাবতে ভাবতে জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে দুখানা কুমড়ো নিয়ে এলু হাজির।
“এই তুমি কে? সকালবেলা বাবা হাটে যাবে তো? বাবার খেত থেকে কুমড়ো নিয়ে নিয়েছো কেন?”
“ আমি এলু, তুমি কে? আমায় বকছো কেন ?আমি মাকে দেখতে পাচ্ছি না, আমার ভয় লাগছে।”
“ আমি পান্তু ।তোমার মা কোথায়? আমার মা তো ঘরে ঘুমোচ্ছে। খুব রাগী কিন্তু।”
হঠাৎ ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে এলু কেঁদে ওঠে।
পান্তুর মা সারাদিন কাজের পর ঘুমোতে ঘুমোতে নানান রকম কথাবার্তার আওয়াজ পেয়ে বলে উ্ঠলেন, “এই পান্তু, এই ঠান্ডায় আবার জানলা খুলেছিস ,আর বকবকটা কার সাথে করছিস ?”
“মা গো, ছোট্ট হাতি্র ছানা।বাবার কুমড়ো ক্ষেত থেকে কুমড়ো নিয়ে এসেছে, এখন বকা খাওয়ার ভয়ে কাঁদছে।”
“উফ সারাদিন আমার হাড় জ্বালিয়ে এখন রাত্রেও ঘুমাতে দিবি না ?বোন কেমন লক্ষী হয়ে ঘুমোচ্ছে দেখেছিস?”
“হ্যাঁ লক্ষ্মী না ছাই, লক্ষী পেঁচা একটা।”
ওদিকে এলুর ভ্যাঁ ভ্যাঁ চলেছে সমান তালে।
কিছু একটা গন্ডগোলের ব্যাপার বুঝে জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে মা 'থ' হয়ে গেলেন।

“ওরে এ যে হাতির বাচ্চা”
কথাবার্তার আওয়াজে বাবার ঘুম ভেঙ্গে গেছে , “ কি হয়েছে বল দেখি, কী করছ সবাই জানালা খুলে?”
মা ফিসফিস করে বললেন ,“ মাঠে হাতি নেমেছে গো। একটা বাচ্চা চলে এসেছে আমাদের উঠোনে।”
বাবা খাট থেকে নামতে না নামতেই আওয়াজ পেলেন বাইরে ভারী কিছু নড়াচড়ার ।জঙ্গলের পাশে ঘর, সতর্ক কান।
পান্তুকে বললেন , “একদম চুপ করে থাক। ওর বাড়ির লোকরা আসছে, ওকে নিতে।”
ওদিকে এলুর মা যতই ঘুমোক, তাকে সতর্ক থাকতে হয় বাচ্চাগুলোকে নিয়ে। তারপর পাশেই গ্রাম ।আসার সময় কুমড়ো ক্ষেত দেখেই বোঝা গেছে সেটা।
এলু নেই দেখেই বিপদ আঁচ করে এলুর মা বেরিয়ে পড়েছিল খুঁজতে। গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারছিল বেশিদূর যায়নি, কাছেই আছে ।
এদিকে জানালা শক্ত করে বন্ধ করে বাবা পান্তুকে কোলে নিয়ে মায়ের হাত ধরে খাটের উপর বসলেন। বাইরে যে মিহি সুরে যে ভ্যাঁ ভ্যাঁ শোনা যাচ্ছিল একটু পরেই আর শোনা গেল না ।হালকা আওয়াজে বোঝা গেল এলুকে দেখতে পেয়েছে ওর মা।
পান্তুর মা বললেন, “তোমার এত খাটনি জলে গেল বোধ হয়। কুমড়ো ক্ষেত মনে হয় শেষ ।
“না বাবা , এলু দুটো মাত্র এনেছিল।”
“এলু মানে? ”
“ও তো বলল , ওর নামে এলু। তোমরা এসে না পড়লে ওর সঙ্গে আমার দিব্যি ভাব হয়ে যেত। সকালবেলা ওকে নিয়ে গদাইদের বাড়ি খেলতে যেতাম ।”
“হায় ভগবান এই ছেলেকে নিয়ে আমি কি করবো ? আজ আর ঘুম হবে না ভোর হয়ে গেছে উঠে পড়ো সব।”
বাবা ঘর থেকে বেরোতেই দেখেন চারটে বড় বড় আর চারটে ছোট ছোট পায়ের ছাপ জঙ্গল থেকে এসে আবার জঙ্গলের দিকে চলে গেছে। উঠোনের কাছে পড়ে আছে দুটো মিষ্টি কুমড়ো। বাবা হাঁটা লাগালেন ক্ষেতের দিকে। দূর থেকেই দেখতে পেলেন প্রতিবেশীরাও একে একে বেরিয়ে জড়ো হচ্ছে। ততক্ষণে এলু মায়ের পেটের নিচে ঢুকে ভোঁসভোঁস করে ঘুমিয়ে কাদা।
লেখক পরিচিতি: লেখক পশ্চিমবঙ্গের বনবিভাগের Chief Conservator of Forests পদে কর্মরত।







Comments