top of page

ছোটদের জন্য ছোটদের গল্প

  • ..
  • Nov 7
  • 8 min read

Updated: Nov 23

আসছে শিশুদিবস। তাই বনেপাহাড়ের পাতায় ওদের জন্য প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা না-মানুষ ছোটদের নিয়ে অনুগল্প। কলমে পশ্চিমবঙ্গের Chief Conservator of Forests লিপিকা রায়।


ree



                 ডোরা ডোরা দাগ



“বনে থাকে বাঘ, গায়ে ডোরা ডোরা দাগ”

 পল্টু জানালার ধারে বসে জোরে জোরে পড়া মুখস্ত করছিল। বাবা গেছেন নৌকো নিয়ে মানিক কাকার সঙ্গে মাছ আর কাঁকড়া ধরতে জামাইমারি খালে।

“ এই দিদি, জামাইকে কে মারল রে? জামাইমারি নাম কেন খালের ?”

পাশে পল্টুর দিদি সুকু দুলে দুলে পড়া মুখস্ত করছিল। প্রশ্ন শুনে খিচিয়ে ওঠে ,”তোকে না মা চোদ্দবার বলেছে যে বাবা যখন নৌকো নিয়ে বের হবে ওই কে মারল, কাকে মারল এসব কথা বলতে নেই?”

পল্টুদের গ্রামের পাশেই মাটির বাঁধ ।তারপরে বাদা বন। জানালা দিয়ে কাছেই দেখা যায় একটা মিষ্টি জলের পুকুর ।ফরেস্টের বাবুরা কেটে দিয়ে গেছে।

ওদিকে পল্টু আর সুকুর মতোই জঙ্গলের ভেতরে থাকে দুই ভাই বোন ,শেরু আর সুন্দরী ।ওরা ছোটো বটে কিন্তু ওদেরও সকাল থেকে অনেক কাজকর্ম। মা বলেছেন আগে সাঁতারটা ভালো করে শিখতে হবে আর সাঁতার কাটতে কাটতে নজরও রাখতে হবে নদীর দিকে। মোটামুটি বড় মাছ চোখে পড়লেই খপ করে ধরতে হবে। বাবার সঙ্গে ওদের দেখা-সাক্ষাৎ খুব কমই হয়। বাবার  কাজ গভীর জঙ্গলের মধ্যে। সেখানে শেরু আর সুন্দরীর যাওয়া বারণ। দু একবার বাঁধের দিকে বেড়াতে আসার চেষ্টা করে করে বকুনি খেতে হয়েছে। আজ মা একটু ব্যস্ত। একটা মস্ত চিতল হরিণ শিকার করেছে কাল রাতে। মন দিয়ে খাচ্ছে এখন। সারাদিন মায়ের মেলা পরিশ্রম।

শেরু বলে, "চল দিদি, একটুখানি বেরিয়ে আসি, মা মনে হয় খেয়েদেয়ে একটু বিশ্রাম করছে"।

 দুজনে মিলে এদিক ওদিক করতে করতে এসে উপস্থিত মিষ্টি জলের পুকুরে। আর ঠিক তখনি মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে  আরও জোরে জোরে পড়ছিল পল্টু। “বনে থাকে বাঘ, গায়ে ডোরা ডোরা দাগ”

 শেরু কান খাড়া করে, “হ্যাঁ রে দিদি ওটা কিরে ? “বাঘ”, “বাঘ” কি বলছে রে? মা তো বলেছে আমরা বাঘ, মানে আমরা এখন বাঘের ছানা। আমাদের কিছু বলছে নাকি রে ?ডাকছে ?”

“বুদ্ধির ঢেঁকি কি তোকে মা সাধে বলে? বলেছে না ওগুলো দুপেয়ে? হরিণের থেকেও দুবলা। মা একবার ঘ্যাঁও করলেই অজ্ঞান হয়ে যায় ।আর ওগুলো লোক ভালো নয়, ডাকলেও যেতে হয় না।“

এত সুন্দর টল টলে জল, শেরুর তেষ্টা পেয়ে গেল খুব। জলের দিকে মাথাটা নামিয়ে শেরু চেঁচিয়েওঠে।“ওরে দিদি রে, জলে ওটা কে রে? গায়ে ডোরা ডোরা দাগ ।ওরে বাবারে, মারে, কেন এলাম রে?"

সুন্দরী ঘ্যাঁক করে দেয় ভাইকে একটা গাট্টা।

“চোবাবো তোকে জলে ?বোকার ডিম ।জলে নিজের ছবি দেখে চেঁচাচ্ছিস? জানিস না আমাদের গায়ে ডোরা ডোরা দাগ থাকে?”

 সুকুর হঠাৎ মনে হল ও যেন একটা ঘ্যাঁও শুনতে পেল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে চক্ষু স্থির। পল্টুর হাত ধরে হেঁচকা টান দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে।

"ও মাগো, দুখানা বাঘ গো, শিগগির এসো গো, আমাদের খেয়ে ফেলল গো ।"

এদিকে সুন্দরী দাঁত কিরমিড় করে বলল- "দেখলি দু'পেয়েগুলো কি রকম মিথ্যাবাদী? বলছে আমরা নাকি খেয়ে ফেলছি ওদের? শেরু কোন দিকে না তাকিয়ে দৌড়াবি সোজা। না হলে কিন্তু পড়ে থাকবি, ধরে ওদের ইস্কুলে দিয়ে দেবে।"

পল্টু সুকুর মা  রান্না ফেলে খুন্তি হাতে দৌড়ে এসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন দূরে সরষে ক্ষেতের হলুদে দোলা লেগেছে ।হাওয়া দিচ্ছে বেশ জোরে। ভাবলেন, এইবার ওদের বাবা ফিরবেন, ফিরেই খেতে চাইবেন।ছেলেমেয়ে দুটো ভারি দুষ্টু হয়েছে, কড়া একজন মাষ্টারমশায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

"পড়তে পড়তে কি ঘুমিয়ে পড়ে স্বপ্ন দেখছিলি? এবার নম্বর কম হলে দুটোকেই হোস্টেলে যেতে হবে এই কথাটা মনে রাখিস।"



ree


গোসু আর কাটুস



যেই না ভোর হলো  সূয্যিমামা ঝিলমিলিয়ে উঁকি মারল গাছের ফাঁক দিয়ে। ছোট্ট ধূসর খরগোশ ছানা গোসু ও টুক করে লাফিয়ে বেরিয়ে পড়ল গর্ত থেকে। মা দেখতে পাবার আগেই লাফাতে লাফাতে চলল।

একটা মস্ত বড় গাছ আছে সামনের দিকে ।ওর ইচ্ছে ওখানে একটু খোঁজাখুঁজি করে দেখে খেলার সঙ্গী কাউকে পাওয়া যায় কিনা। মা দেখতে পেলেই দেবে বকুনি।

কালকেই তো ,আর একটু হলেই হয়েছিল আর কি !কচি কচি ঘাস খেতে খেতে আরামে চোখটা বুজে এসেছিল। হঠাৎ মা ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর কান ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে চলল। কিছু বোঝার আগেই ঢুকিয়ে দিল গর্তে। সামনের মস্ত গাছের মাথায় থাকে এক বাজপাখি, নাম তার বজ্রমানিক। তার ডানার ছায়া টা একটু হলেও দেখতে পেয়েছিল গোসু। কিছুক্ষণের জন্য ঘাবড়ে টাবড়ে একাকার । মা আসতে আর এক সেকেন্ড দেরি হলে বজ্রমানিক ওকে দিয়েই ভোজ সারতো ।

আজকে তাই গোসু একটু বেশি সতর্ক।এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখতে পেল কাটুসকে।।কাটুসের লেজখানা মোটেও গোসুর মত ছোট্ট না। কি সুন্দর বাদামি, লম্বা, রোমশ, ঠিক যেন একটা মাফলার।  আগে এদিন কাটুসের লেজখানা দেখে গোসু মাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে বড় হলে অর লেজখানা ওমনি সুন্দর হবে কিনা। মা ভুরু কুঁচকে বলেছিল- "তা তোমার লেজ কাটুসের মত হবে কেন? তোমার লেজ হবে আমার মত, ছোট্ট, নরম, গোল, যেন একটা উলের বল।" কাটুস বুঝল মা একটু রেগে গেছে, কারণ রেগে গেলেই মা গম্ভীর ভাবে “তুমি” করে বলে।

ভাবতে ভাবতে এগোচ্ছিল গোসু।কাটুস দুহাত দিয়ে ধরে কি একটা খাচ্ছে না? বাদাম মনে হচ্ছে! আর একটু এগিয়ে দেখে, ঠিক, মনের সুখে বাদাম খাচ্ছে কাটুসটা।

“খেলবি একটু আমার সঙ্গে”?

“দাঁড়া, দাঁড়া, একটু খেয়ে আগে গায়ে জোর করে নিই। এখনো ওই গাছের কুটুসের দলবল তো আসেনি। এসে হাজির হলে আর একটাও বাদাম পাবো নাকি ?বাদাম খাবি গোসু?”

"নারে।মা বলেছে বাবা আজ আমাদের গাজর ক্ষেতে নিয়ে যাবে। আজ আমাদের জলখাবারে গাজর"।

বলল বটে , কিন্তু একটু লোভ লোভ ও  লাগছে । বলা যায় না,  বাদাম খেলে ওর লেজটাও যদি ওরকম বাদামি মাফলারের মত হয়?

"আচ্ছা দে একটা খাই।"

একটা খেতেই মনে হল আর দু একটা খাই , তারপর না হয় এক দৌড়ে বাড়ি।এদিকে কাটুস গোটা দশেক বাদাম পেটে চালান করে দৌড় লাগালো গাছের ওপরের ডালে ওর বাড়িতে। আর দেরি হলে ওর কপালে নাকি দুঃখ আছে।

এদিকে ডজন খানেক বাদাম পেটে চালান করে গোসুর লেজটা একটুও লম্বা তো হলোই না ,পেটটা বরং কিরকম ব্যথা ব্যথা করতে লাগলো। ফেরার পথে দেখল লাফাতেই পারছে  না । লাফালেই মনে হচ্ছে পেটের ভেতর এক ডজন বাদাম ঝমঝম করে বাজছে। এদিকে গোসুর মা তো চিন্তা ভাবনায় অস্থির। বড় বড় লাফ দিয়ে এগোতে এগোতে দেখে ছানা কাহিল শরীরে কোন রকমে টলতে টলতে এদিকেই আসছে।

"কি হল তোর দেখি,দাঁড়া তো? পেট খানা তো ফুলে ঢোল ! দাঁড়া আজ তোর বাবা আসুক, দেখাচ্ছি তোকে মজা"।

“ ও মা বাদাম খেয়ে লেজটা তো একটুও বাদামি হলো না, লম্বাও হলো না? খালি পেট ব্যথা করছে। আর কাটুসটা কি দুষ্টু ।যেই না খাওয়া হলো লাফিয়ে গাছের ডালের উপর চলে গেল। আমাকে ডাকলো ও না”।

"এই জন্যই বলেছি না অন্য কারুর কিছুতে লোভ করতে নেই । ও হল কাঠবিড়ালি।ওরা থাকে গাছের ডালের কোটরে । আর আমরা হলাম গিয়ে খরগোশ, আমরা থাকি মাটির মধ্যে গর্তে। ও তোকে কি করে নিয়ে যাবে? আমরা কি গাছে চড়তে পারি? বন্ধুকে ওরকম দোষ দিতে নেই।ও তোকে কত ভালোবাসে"।

“ মা গো আমার লেজ……”  বলার আগেই সব মায়েদের মতই গোসুর মা ও  বুঝতে পারল কান্ডখানা। বন্ধুর মত লেজের লোভেই এই কান্ড।


 "তোমার লেজটা খুব মিষ্টি গোসু । তোমার লেজটা হবে তোমার মত। খুব সুন্দর।এখন শিগগির চলো” ওই দেখো বাবা গাজর খেতে ঢুকছে ।"


মা এখন “তুমি” করে বললেও  রাগ রাগ ভাবটা নেই মোটেই। এমন আদর করে গায়ে হাত বুলিয়ে দিল যে গোসুর পেট ব্যথা টপ করে কমে গেল, আর তুড়ুক তুড়ুক লাফ দিতে দিতে চলল মায়ের পেছন পেছন।



ree


মুকুটি আর কুকুটি



ঘন জঙ্গলের মধ্যে সবে ভোর হব হব করছে। দু একটা নিভু নিভু তারা জ্বলে রয়েছে এখনো । মুকুটি গলা তুলে একবার দেখে নিল আকাশের দিকে। তারপর এমন জোরে ঝুঁটি দুলিয়ে আর গলা ফুলিয়ে  কোঁকর কোঁ ডাক  ছাড়লো যে বাকি ভোরের তারা গুলো ভয় পেয়ে টুপটাপ লুকিয়ে পড়ল। সেই জোরালো  হাঁক ডাকে সূর্য কি আর ঘুমিয়ে  থাকতে  পারে? কোনো রকমে চোখ খুললো।

“উঠছি উঠছি দাঁড়া, এত জোরে চেঁচিয়ে মাথা ধরিয়ে দিলি যে”

“ওঠো  ও ও,  কোঁকোর  কোঁ কোঁ… তাড়াতাড়ি সকাল করে দাও । খিদে পেয়ে গেছে এ এ এ”।

সেই ডাক  শুনে রাতচরা বাদুড়ের ঝাঁক তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে শুরু করল ।সকাল হতেই মাথা নিচে করে ঝুলে পড়তে হবে গাছের ডালে। প্যাঁচাও তাড়াতাড়ি আধ খাওয়া জংলি ইঁদুর মুখে নিয়ে উড়তে শুরু করল। ভোর হয়ে গেলে মহা মুশকিল। চোখে দেখতে পাবে না ওরা।

ওদিকে ভবানী ঠাকুমার মাটির বাড়ির ঘরের এক কোণে ঝুড়ি চাপা ছিল কুকুটি। সেও ওই চিৎকারে ছানাপোনা নিয়ে তড়বড় করে, খচ মচ করে ঝুড়ি থেকে বেরতে গিয়ে এমন কাণ্ড বাধালো যে , ভুলেই গেল তারও এখন গলা ফুলিয়ে ডেকে ঠাকুমাকে জাগানোর কথা।

কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে সরু গলায় কুকুটিও চেঁচিয়ে ওঠে, কোঁক কোঁক কোঁ ও ও…

ভবানী ঠাকুমা খ্যানখ্যান করে ওঠে,   “ভালো করে ডাকতে পারিস না? খেতে দিই  না নাকি তোকে?  শুনলি মুকুটির ডাক? ওকে বলে গলা”।

“হুঁঃ , খেতে দাও তো চারটে ভাত আর কটা দানা ।ওই খেয়ে গলার জোর হয়? চলে যাব আমি জঙ্গলে”।

 “তা যা না। কে বারণ করেছে? ছানাগুলোকে এখানে রেখে যেখানে ইচ্ছে যা ।“

সকালে উঠেই বুড়ির দাঁত খিচুনি খেয়ে মেজাজটা বিগড়ে গেল কুকুটির ।

"ধুত্তোরি। থাকল সব পড়ে। চললাম আমি।"

"হ্যাঁ যা, মু্রোদ জানা আছে ।"

কুকুটি লাফ দিয়ে উঠল ঠাকুমার বাড়ির নীচু দেয়ালে। তারপর ডানাটা একটু ছড়িয়ে ধপাস করে বাইরে নেমে ব্যাজার মূখে হাঁটা লাগালো জংগলের দিকে। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বুড়ি ডাকে কিনা। মোটেও ঠাকুমা ডাকলো না দেখে আর কি করে? হাঁটতে থাকল।

ওদিকে সূর্য তখন ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছে। মুকুটি জঙ্গলের মাটিতে পাতার মধ্যে খুঁজে খুঁজে ঠিক পেয়ে গেছে একটা মোটকা কেঁচো। ওটাকে  পেটে চালান দিয়েই গেল সামনে উইঢিপিটায়। দুটো উইপোকা, চারটে কাঠপিঁপড়ে খেয়ে  পেটটা একটু ঠান্ডা হলো। হেলতে দুলতে  এগোতে এগোতে দেখল দূরে একটা রোগাপটকা মুরগি হাঁটতে হাঁটতে আসছে।

 এটা আবার এখানে আসছে কেন? ভাবলো মুকুটি।

“ তুই কে রে”?

“আমি কুকুটি। আমি এখন থেকে এখানে জঙ্গলেই থাকবো”।

“ ইঃ এখানে থাকবে! কেন রে এখানে থাকবি কেন? এখানে আমি কাউকে থাকতে থাকতে দিতে পারব না। এখানকার সব পোকা আমার প্রজা, আমি ওদের ধরে খাই” ।

“ আমাকেও একটু  ভাগ দেবে? আমি তোমায় পোকা ধরে দিতে পারি।“

“হুঁঃ ভাগ দেবে!ওগুলো তোর মত ওই পেটরোগা ঘরের মুরগির  হজম হবে? দানা খে গে  যা ঠাকুরমার বাড়িতে”। গলা ফুলিয়ে চেঁচিয়ে  উঠে মুকুটি। কোঁকোঁকোঁ ও ও ও। ওই বাজখাঁই আওয়াজে চমকে গিয়ে পিছিয়ে যেতে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ে কুকুটি ।দু পা পিছিয়ে গিয়েও আবার একটু বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।

“এত বকছো কেন ?আমরা কি বন্ধু হতে পারি না”?

 “না পারি না।  ভাগ তুই ।শিগগির বাড়ি  যা। ছানাদের রেখে উনি এলেন জঙ্গলে থাকতে। যা বাড়ি যা আ আ…। গেলি ই ই …” ।মুকুটি সারা গায়ের পালকের রঙ ঝলমলিয়ে শক্ত পোক্ত দুখানা ঠ্যাং এর উপর দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে একখানা চিৎকার ছাড়লো ।

কুকুটি আর দাঁড়ায়? একদৌড়ে সোজা থামলো গিয়ে একেবারে ঠাকুমার বাড়ির উঠোনে ঢুকে। ছানাগুলো চিক চিক করতে করতে দৌড়ে এলো।

“ওমা কোথায় গেছিলে? কোথায় গেছিলে? ভয় লাগছিল তো”

“না না সোনা, এইতো এসে গেছি”।

ঠাকুমা খ্যাংরাঝাঁটা দিয়ে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিল। নড়বড় করতে করতে এগিয়েএল ।

“এই যে এসেছিস তো ফেরত? শিক্ষে হয়েছে তো ?একটু বকলাম , তো উনি বাড়ি ছেড়ে অমনি চললেন ।গ্রামে গিয়ে পৌঁছলে আর কিছুক্ষণ বাদে তো ওদের কড়াইয়ে ঝোল হয়ে ফুটতিস। নেহাত মুকুটি বুদ্ধিমান , তাই ভাগিয়ে দিয়েছে তোকে। মনে রাখবি যে তুই হলি ঘর কা মুরগি। বুঝলি”?

“আর যাব না ঠাকুমা। কোঁ কোঁ । দাঁড়া দাঁড়া খেতে দেব ।একটু অপেক্ষা করতে শিখবি তো”


বকবক করতে করতে দানা আনতে বলল  ঠাকুমা। আর অপেক্ষা! কুকুটি আর  ছানারা মিছিল করে  চলল ঠাকুমার পিছন পিছন।



ree

তিতলি আর চাঁদনরী



ওই দূরে, রেলের প্লাটফর্ম ছেড়ে  রেললাইন যেখানে শহরের দিকে চলে গেছে , ওখানে পুটুস গাছের ঝোপে থাকে তিতলি আর ওর বন্ধু চাঁদনরী। থাকে মানে কি আর বসে থাকে ? বসার সময় নেই ওদের । এদিক ওদিক উড়ে উড়ে দেখতে হয় কোথায় ফুল ফুটেছে ,মধু পাওয়া যায় কিনা। কোন ফুলের পরাগকে  নিয়ে কোথায় যেতে হবে… তবে না ফুল থেকে ফল হবে ? আবার সূর্যের তাপের ডানা গুলোকে মাঝে মাঝে  শুকিয়ে নিতে হয়। ভেজা ডানায় ভালো ওড়া যায় না। বিপদ আপদ ও তো কম নয় ?পাখিগুলোর ডানা ওদের থেকেও শক্তপোক্ত, ওদের মতো ফিন ফিনে নয়, আর ভারি পেটুক ওরা ।দেখতে পেলে প্রাণটা যাবে । ওদের থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা, সে কি একটা কম বড় কাজ?

একদিন হয়ে গেল এক মস্ত গোলমাল। চাঁদনরী উড়তে উড়তে চলে এসেছে স্টেশন মাস্টার মশাইয়ের কোয়ার্টারের বাগানে । সেখানে খেলে বেড়াচ্ছে পুতুল পুতুল একটা মেয়ে ।চাঁদনরী সবে গিয়ে বসেছে একটা রঙ্গন ফুলের ঝোপে। শোনে ঘরের ভেতর থেকে কে ডাকছে। “তিতলি ই ই,  তিতলি ই, ই…”

চাঁদনরী চটপট উড়ে গিয়ে জানালায় বসে বলে দিল  “তিতলি তো এখানে নেই”

আবার শোনে “ তিতলি ই ই …”

“এ তো মহা মুশকিল।  বলছি যে শুনলে না নাকি? তিতলি গেছে পাশের পাড়ায় দোপাটি বাগানে…”

“আরে ওটা কি ?ওমা কি দারুন একটা প্রজাপতি ! তিতলি এদিকে আয়… ধরবো দাঁড়া।“

 ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চাঁদননরী ফুরুত। আর ওদিকে তিতলির দিদি মিতালি , যে নাকি সুযোগ পেলেই ভ্যাঁ করে এক্টু কেঁদে নেয় সে সুযোগ না হারিয়ে…"এ মা  উড়ে গেল"  করে কাঁদতে শুরু করল।


কোনোক্রমে ওখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে দেখে পুটুশের ঝোপে তিতলি বসে আরাম করছে। কিছুদিন বাদে ছোট্ট ছোট্ট পুঁতির মত ডিম পাড়ল তিতলি। ডিম ফুটে ছানা বেরোতে দুজনের তো চোখ ছানাবড়া। ছানারা তো ওদের মত সুন্দর দেখতে নয়। ডানাও নেই। কুচ্ছিত একটা রেল গাড়ির মতো দেখতে।রেলগাড়ি ওরা বেশ চেনে। রেললাইনের পাশেই থাকে কিনা ! ছানাদের গায়ে আবার কালো কালো রোঁয়া।

 তিতলি আর চাঁদনরী গলা জড়াজড়ি করে কাঁদতে বসলো। “এগুলো আমাদের ছানাই নয়। ওই কয়লা নিয়ে যায় যে মালগাড়ি সে নির্ঘাত আমাদের ছানা চুরি করে নিয়ে গেছে আর  ওর বিচ্ছিরি ছানাগুলোকে এখানে দিয়ে গেছে!”

 এত কান্নাকাটি,হইচই ,ছানাদের চ্যাঁভ্যাঁ, সব শুনে চাঁদনরীর মা আলতা কুসুম দৌড়ে এলো অন্যদিকের  ঝোপ থেকে।তবে কিনা সে এখন বুড়ি হয়েছে। অত দৌড়ে দৌড়ে উড়তে পারে না,ডানায় বাতের ব্যথা।

“হ্যাঁরে চাঁদ, তোদের বুদ্ধিশুদ্ধি আর কবে হবে? ভুলে গেলি? বলেছিলাম যে যখন জন্মালি তোরা কেমন কুচ্ছিত ছিলি? তোরা এখন কাঁদতে বসেছিস… আর পিলু সোনামনিদের যে খিদে পেয়েছে?”


 ততক্ষণে পিলু নাম্বার এক, পিলু নাম্বার দুই, পিলু নাম্বার তিন…যত শুঁয়োপোকারা ছিল,  সবাই পিল পিল করে যেখানে যত কচি পাতা ছিল কচমচ করে খেতে শুরু করে দিয়েছে। আর কদিন পরেই ওরা ঢুকে যাবে খোলোসে… আর বেরোবে যখন, ডানার রঙের ছটায় চাঁদনরীর ও চোখ ধাঁধিয়ে যাবে।



লেখক পরিচিতি: লেখক পশ্চিমবঙ্গের বনবিভাগের Chief Conservator of Forests পদে কর্মরত।





Comments


86060474-00b1-415d-8c11-9c4471c9c5e7.png
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
Co-editor: Dr. Oishimaya Sen Nag

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page