অসম জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের স্মৃতি
- ..
- 17 hours ago
- 7 min read
মধ্যুগের অসম রাজ্যে ভক্তি আন্দোলনের একজন শীর্ষস্থানীয় বৈষ্ণব সাধক ছিলেন শ্রীমন্ত শঙ্করদেব। আজকের অসমেও তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম ও সংস্কৃতিগত ঐতিহ্য ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র ও জনমানসে রয়েছে তার ব্যাপক প্রভাব। শঙ্করদেব তাঁর ভক্তিমার্গের বিস্তারে প্রকৃতির প্রতি যত্ন ও সচেতনতার বার্তাও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাই অসমের বৈষ্ণব সত্রগুলি যেমন ধর্ম ও সংস্কৃতির কেন্দ্র,তেমনই প্রকৃতির সাথেও সংশ্লিষ্ট। সেইসব জায়গা, সেখানকার দর্শনীয় স্থানসমূহ ও তাদের অবস্থান নিয়ে বনেপাহাড়ের পাঠকদের সাথে আলোচনা করলেন অসমের বিশিষ্ট গবেষক, অধ্যাপক ও IUCN এর সদস্য ড. সঞ্জীব কুমার বরকাকতি।

শ্রীমন্ত শঙ্করদেব (১৪৪৯–১৫৬৮) ছিলেন অসমের মহাপুরুষ, সমাজসংস্কারক ও বৈষ্ণব ধর্মপ্রচারক। তিনি অসমে একেশ্বরবাদী ভক্তিধর্ম “একশরণ নামধর্ম” প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে কৃষ্ণভক্তিকে কেন্দ্র করে জাতিভেদ ও আচারবাদের বিরোধিতা করা হয়। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে “সত্র” ও “নামঘর” প্রথা, যা আজও অসমের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
শঙ্করদেব অসংখ্য বরগীত, অঙ্কিয়া নাট ও কীর্তন রচনা করেন। তাঁর সাহিত্য ও সংগীতকীর্তি অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। সমাজে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার বাণী প্রচার করে তিনি অসমের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অন্যতম প্রধান পথিকৃত হিসেবে স্মরণীয়।
তিনি ছিলেন এক মহান পরিবেশ সচেতন মহাপুরুষ। তাঁর রচনায় অসমের নানা গাছপালা ও প্রাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের পরিচয় বহন করে। তিনি তাঁর অনুসারীদের আঙিনায় চারা গাছ রোপণের পরামর্শ দিতেন। তাঁর প্রবর্তিত উপাসনালয় ‘কীর্তনঘর’ নির্মিত হত বাঁশ, খড় ইত্যাদি পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে, যাতে প্রকৃতির ক্ষতি না হয়।
তিনি ঔষধি গাছগাছালি সম্পর্কেও সুপরিজ্ঞাত ছিলেন এবং সাধারণ মানুষকে নানা ভেষজ চিকিৎসার পরামর্শ দিতেন। জীবজন্তুর প্রতি নিষ্ঠুরতা তিনি কখনও সহ্য করতে পারতেন না। একবার তীর্থযাত্রাকালে তিনি এক শিকারির ফাঁদে আটকানো একটি হরিণ ও একটি ময়ূরকে মুক্ত করে দেন। একই সঙ্গে শিকারির ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিছু মুদ্রাও রেখে যান। পরে শিকারি বিষয়টি জানতে পেরে মহাপুরুষের সঙ্গে দেখা করতে ছুটে আসেন এবং তাঁর মহানুভবতায় অভিভূত হয়ে পরবর্তীতে তাঁর ভক্তে পরিণত হন।
তাঁর দীর্ঘ জীবনে অসমের বহু স্থানে বাস করেছেন। এই স্থানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আলিপুখুরি, বরদোয়া, রৌতা, গাংমৌ, মালুয়ালর আতি, চাংগিনি কোমরাকাটা, ধুয়াহাটা, কাপালাবাড়ি, চুনপোরা, কুমারকুচি এবং পাতবাউসি। বর্তমান অসমের বাইরেও তিনি দীর্ঘ সময় বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেছিলেন। এর মধ্যে কোচবিহার ও পুরী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে তিনি উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত করেন।
তীর্থযাত্রাকালে তিনি বহু স্থানে স্বল্পকাল অবস্থান করেছিলেন; তবে সেখানে তিনি কতদিন ছিলেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর তীর্থপরিক্রমার অন্তর্ভুক্ত ছিল বৃন্দাবন, বদরিকাশ্রম, দ্বারকা, রামেশ্বরম, গয়া, বারাণসী, প্রয়াগ, মথুরা, হস্তিনাপুর, ইন্দ্রপ্রস্থ, কুরুক্ষেত্র, অযোধ্যা, কুশাবতীপুর, প্রশ্নবতী নগর, নদীগ্রাম, সীতাকুণ্ড, ব্রহ্মকুণ্ড, বৈদ্যনাথ, চিত্রকূট, মার্গকাশী, বিন্দুকাশী, কৌশিক তীর্থ, গঙ্গাসাগর, দণ্ডকারণ্য, ছোটনাগপুর প্রভৃতি স্থান।
সম্ভবত তিনি আরও অনেক স্থান পরিদর্শন করেছিলেন, যা জীবনীগ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়নি, কারণ তাঁর যাত্রাপথে বহু স্থান পড়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, তিনি নর্মদা, গোমতী ও গোদাবরী উপত্যকার বিভিন্ন স্থানেও গিয়েছিলেন।
শ্রীমন্ত শঙ্করদেব যে সব স্থানে বাস করেছিলেন, তাদের সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা কিছু ক্ষেত্রে কঠিন। কারণ তিনি যে সব স্থানে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর বিভিন্ন কারণে—যেমন জাতিগত সংঘাত, নদীভাঙন ইত্যাদি—সেগুলি স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়। ফলে অনেক স্থানের পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনও স্থানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও মতভেদ রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কটি আলিপুখুরির পরিচয় নিয়ে, যেখানে তাঁর জন্ম হয়েছিল, এবং বরদোয়া নিয়ে, যেখানে তিনি মধ্যবয়স পর্যন্ত জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন। জীবনীগ্রন্থে আলিপুখুরি ও বরদোয়াকে পৃথক কিন্তু সংলগ্ন দুটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; তবে অনেকে এই দুই স্থানকে একই বলে দাবি করেন। বরদোয়ার অবস্থান সুপরিচিত এবং তা নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই, কিন্তু আলিপুখুরির সঠিক অবস্থান আজও আলোচনার বিষয়। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে আলিপুখুরি বৃহত্তর বরদোয়ার অন্তর্গত ছিল, যা তাঁর পরিবারের শাসিত রাজ্যের রাজধানী ছিল।
এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে আমি অসমের সেই চারটি পবিত্র স্থানের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব, যেখানে শ্রীমন্ত শঙ্করদেব জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেছিলেন। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে এই স্থানগুলির যোগাযোগব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হবে।
বড়দোয়া:
শ্রীমন্ত শঙ্করদেব ১৪৪৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণের পর থেকে ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জীবনের অধিকাংশ সময় বৃহত্তর বড়দোয়ায় অতিবাহিত করেন। এই স্থানটি মধ্য অসমের নগাঁও শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এটি নগাঁও জেলায় অবস্থিত।
বড়দোয়া থান এখানকার প্রধান আকর্ষণ বড়দোয়া থান। নিকটতম বিমানবন্দর গুয়াহাটি এবং নিকটতম রেলস্টেশন হাইবর্গাঁও।
শঙ্করদেব প্রতিষ্ঠিত বড়দোয়া থান-এ তাঁর স্মৃতিবিজড়িত নানা ঐতিহ্য আজও সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে কীর্তনঘর, চারি-হাটি, হাতি-পুখুরি এবং তাঁর ব্যবহৃত একটি কূপ রয়েছে। তাঁর জীবদ্দশায় সৃষ্ট বিশাল পুকুর ‘আকাশী গঙ্গা’ বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। এই পুকুরের তীরে একটি জাদুঘর রয়েছে, যেখানে প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।
বড়দোয়া থান বর্তমানে দুটি সত্র দ্বারা পরিচালিত হয়— নরোয়া সত্র এবং সালগুড়ি সত্র। বড়দোয়ায় একটি দোল মন্দিরও রয়েছে, যেখানে শঙ্করদেব প্রথমবারের মতো দোল উৎসব (হোলি) উদ্যাপন করেন। তিনিই অসমে এই উৎসবের প্রবর্তন করেন।
বর্তমানে বড়দোয়া একটি ব্যস্ত তীর্থস্থান, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত সমবেত হন। এখানে একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি মহাবিদ্যালয় রয়েছে। সম্প্রতি আকাশী গঙ্গা পুকুরের নিকটে পর্যটকদের সুবিধার্থে একটি নতুন সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মিত হয়েছে।
বড়দোয়ার আশেপাশে আরও কয়েকটি সত্র রয়েছে, যেগুলি মহাপুরুষ শঙ্করদেবের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে আসছে। এগুলি পরবর্তীকালে তাঁর অনুগামীরা প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বালি সত্র, না-সত্র, কোৰচুঙ সত্র, আইভেটি থান, পাতেকিবাড়ি থান, কোবাইকাটা সত্র, রামপুর সত্র প্রভৃতি।
এদের মধ্যে কয়েকটি সত্র আজও সক্রিয় ও প্রাণবন্ত অবস্থায় রয়েছে, আবার কিছু সত্র জীর্ণদশায় পতিত হয়েছে। বিখ্যাত অলংকৃত পাণ্ডুলিপি ‘চিত্র-ভাগবত’ বালি সত্রেই সংরক্ষিত আছে।
প্রকৃতিপ্রেমীরা বড়দোয়ার নিকটবর্তী লাওখোরা ও বুরাচাপরি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য পরিদর্শন করতে পারেন, যা বড়দোয়া থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান কাজিরাঙ্গা বড়দোয়া থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে।

বড়দোয়ার পূর্ব দিকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গাতাংগা বিল নামে একটি মনোরম জলাশয় অবস্থিত এবং উত্তরে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে প্রবাহিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ। কাঠালগুড়িতে অবস্থিত সুন্দর ‘প্যারাডাইস লেক’ বড়দোয়া থেকে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার দূরে। কার্বি আংলং-এর পাদদেশে অবস্থিত চাপনালা জলপ্রপাত বড়দোয়া থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত।
এছাড়া শান্তি-জন নামে একটি ছোট নদী, যা পূর্বে টেম্পোরানি-জন নামে পরিচিত ছিল, বড়দোয়ার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

গাংমৌ:
শ্রীমন্ত শংকরদেব ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গাংমৌয়ে বসবাস করেছিলেন। এটি অসমের বিশ্বনাথ চড়িয়ালি থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। গাংমৌ বর্তমানে বিশ্বনাথ জেলার অন্তর্গত। রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২২৮ কিলোমিটার পূর্বে।
গাংমৌয়ের প্রধান আকর্ষণ হল গাংমৌ থান। নিকটতম বিমানবন্দর তেজপুর এবং নিকটতম রেলস্টেশন মোনাবাড়ি।
যে নির্দিষ্ট স্থানে শ্রীমন্ত শঙ্করদেব বসবাস করতেন, তা বর্তমানে Brahmaputra নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে বর্তমান গাংমৌ থান-এ শ্রীমন্ত শঙ্করদেব-সংক্রান্ত ঐতিহ্যের প্রত্যক্ষ নিদর্শন সংরক্ষিত আছে—এমন দাবি করা যায় না। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে এলাকার বিভিন্ন জাতির বাসিন্দারা মিলে এই মহান মনীষীর পবিত্র স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে বর্তমান থান প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে একটি ছোট উপাসনাগৃহ রয়েছে, তবে উল্লেখযোগ্য অন্য কোনো স্থাপনা নেই।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অসম–অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তে অবস্থিত Behali Wildlife Sanctuary একটি বিশেষ আকর্ষণ। এই অভয়ারণ্য অসংখ্য প্রজাতির প্রজাপতির জন্য সুপরিচিত। এখানে বহু বিরল উদ্ভিদ প্রজাতিও দেখা যায়।
ধুবাহাটা ও মাজুলি:
শঙ্করদেব ১৫২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ধুবাহাটায় বসবাস করেছিলেন এবং সেখানে বেলাগুড়ি থান প্রতিষ্ঠা করেন। শঙ্করদেবের সময়কার ধুবাহাটা পরবর্তীকালে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়, যখন অষ্টাদশ শতকে মাজুলি দ্বীপের সৃষ্টি হয়। তবে মহামনীষীর পরলোকগমনের পর বেলাগুড়ি থান পুনরুজ্জীবিত হয়। কিন্তু নদীভাঙনের কারণে ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে সেটিকে নারায়ণপুরে স্থানান্তরিত করা হয়। সাম্প্রতিক কালে ধুবাহাটার মূল স্থানে পুনরায় একটি থান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই স্থানটি অহাতগুড়ি অঞ্চলের সিকালি চাপরি দ্বীপে অবস্থিত। বড় সত্র, কালাকাটা নদীখাত, ফাকুবা দৌল প্রভৃতি স্থানের অবস্থান বিচার করে এই স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। সিকালি চাপরি দেরগাঁও থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে এবং সিকারিঘাট হয়ে সেখানে পৌঁছানো যায়।

মাজুলি দ্বীপ, যা ব্রহ্মপুত্র নদীর বুকে অবস্থিত, মধ্যযুগীয় ধুবাহাটার ঐতিহ্য আজও সংরক্ষণ করে চলেছে। এর ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা মধ্যযুগীয় সংস্কৃতি রক্ষায় বিশেষ সহায়ক হয়েছে। বর্তমানে এটি অসমের একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা এবং ভারতের একমাত্র দ্বীপ-জেলা। দ্বীপটির ভৌগোলিক বিস্তৃতি ২৬°৫০′ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৭°১০′ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯৩°৩০′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯৪°৩৫′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত; এর কেন্দ্রীয় স্থানাঙ্ক প্রায় ২৬.৯৭° উত্তর অক্ষাংশ ও ৯৪.২৩° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩৪৩ কিলোমিটার পূর্বে। নিকটতম বিমানবন্দর এবং রেলস্টেশন উভয়ই যোরহাটে অবস্থিত। দ্বীপটি ব্রহ্মপুত্র নদ পারাপারের ফেরি পরিষেবার মাধ্যমে দক্ষিণ তীরের সঙ্গে যুক্ত এবং উত্তরের একটি ছোট নদীর উপর সেতু নির্মিত হওয়ায় সড়কপথেও উত্তর তীরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে।

এই নদীদ্বীপে মহাপুরুষের প্রচারিত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আদর্শে মহান সত্র-প্রতিষ্ঠান বিকশিত হয়েছিল। মোট ৬৪টি সত্র মাজুলি দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বহু সত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে ৩২টি সত্র টিকে আছে, আর বাকিগুলি মাজুলির বাইরে স্থানান্তরিত হয়েছে। উত্তর কমলাবাড়ি সত্র, গরমূর সত্র, দক্ষিণপাত সত্র এবং আউনিয়াতি সত্র মাজুলির উল্লেখযোগ্য সত্রগুলির মধ্যে অন্যতম। নতুন সমাগুড়ি সত্র মুখোশ নির্মাণশিল্পের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। এই সমস্ত সত্রেই নিজস্ব সংগ্রহশালা রয়েছে, যেখানে মধ্যযুগীয় নানা সামগ্রী সংরক্ষিত আছে।

মাজুলি শুধু শংকরী সংস্কৃতির জন্যই নয়, বর্ণিল আদিবাসী ঐতিহ্যের জন্যও সুপরিচিত। মিশিং, দেওরি এবং সোনোয়াল কাছারি জনগোষ্ঠী এই দ্বীপের প্রধান বাসিন্দা। তাঁরা তাঁদের স্বতন্ত্র বস্ত্রশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির জন্য পরিচিত।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য মাজুলির দক্ষিণাংশ পক্ষীনিরীক্ষণের উপযুক্ত স্থান। এখানে শাকুলি বিল, ভেরকি বিল এবং মাগুরমারি বিলের মতো মনোরম জলাশয় রয়েছে। মাজুলিতে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপ বা চাপরি রয়েছে। এরই একটিতে জাধব পায়াং এর উদ্যোগে গড়ে উঠেছে মানবসৃষ্ট অরণ্য ‘মোলাই কথনি’।

পাটবাউসি:
শ্রীমন্ত শঙ্করদেব ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাটবাউসিতে বসবাস করেছিলেন। এই স্থানটি অসমের বরপেটা জেলার অন্তর্গত এবং বরপেটা শহর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। পাটবাউসির প্রধান আকর্ষণ হল পাটবাউসি থান। রাজ্যের রাজধানী থেকে এটি প্রায় ৮৭ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। নিকটতম বিমানবন্দর গুয়াহাটি এবং নিকটতম রেলস্টেশন বরপেটা রোড।

শ্রীমন্ত শঙ্করদেব দীর্ঘকাল পাটবাউসি থানেই বাস করেছিলেন। তাই এখানে তাঁর লেখার টেবিল, স্নানশিলা, তাঁর পত্নী কালিন্দীর খাট, জলকূপ প্রভৃতি বহু স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত আছে। তাঁর রচিত পাণ্ডুলিপিও এখানে বিপুল সংখ্যায় রক্ষিত রয়েছে। এছাড়াও অত্যন্ত প্রাচীন কিছু কাঠের শিল্পবস্তু আজও এখানে বিদ্যমান।

পাটবৌসী থানকে ঘিরে বহু থান ও সত্র গড়ে উঠেছে, যেগুলি এই মহামানবের ঐতিহ্য আজও সংরক্ষণ করে চলেছে। এর মধ্যে কয়েকটি পরবর্তীকালে তাঁর শিষ্যদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এগুলি হল— চুনপোরা থান, সুন্দরীদিয়া সত্র, বরপেটা থান, বারাদি থান, কুমারকুচি থান, পাটবৌসী সত্র, গণককুচি থান, জানিয়া সত্র, সত্র কানাড়া প্রভৃতি। এ সকল স্থান আজও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখর।
বরপেটা থান ও সুন্দরীদিয়া সত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মাধবদেব। পাটবৌসী সত্র প্রতিষ্ঠা করেন দামোদরদেব। বারাদি থান ও গণককুচি থানও মাধবদেবের স্মৃতিবিজড়িত, কারণ তিনি এই স্থানগুলিতে বাস করেছিলেন। চুনপোরা থান ও কুমারকুচি থান হল সেই স্থান, যেখানে শ্রীমন্ত শঙ্করদেব বাস করেছিলেন। সত্র কানাড়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নারায়ণদাস ঠাকুর।
প্রসিদ্ধ পরিহারেশ্বর দেবালয়, এক ঐতিহাসিক শিবমন্দির, পাটবৌসী থেকে ৩৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। একসময় এটি দেবদাসী নৃত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হল ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান মানস জাতীয় উদ্যান, যা পাটবৌসী থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। মনোরম জলাশয় তামরাঙা বিল পাটবৌসী থেকে ৫৭ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।

লেখক পরিচিতি: অর্থশাস্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. সঞ্জীব কুমার বরকাকতি শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়নমূলক বিষয়, সাহিত্য সমালোচনা, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় পঁয়ষট্টিটি বই রচনা করেছেন। তিনি ‘সোসাইটি ফর শ্রীমন্ত শঙ্করদেব’ নামক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সভাপতি, যা মধ্যযুগের বহুমুখী প্রতিভা শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের আদর্শ প্রচারের জন্য কাজ করে।
তিনি আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা IUCN-এর কমিশন অন এডুকেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন-এর সদস্য। এছাড়াও, তিনি ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস (ICOMOS)-এর সঙ্গে যুক্ত এবং এর আন্তর্জাতিক অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কমিটি ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পর্যটন কমিটি-র একজন বিশেষজ্ঞ সদস্য।








Comments