লৌহ আকরিক মাইনিং: বিপন্ন হবে তাড়োবার অরণ্য, তাড়োবার বাঘেরা?
- ..
- 3 hours ago
- 4 min read
ভারতের বিখ্যাত টাইগার রিজার্ভ তাড়োবা-আন্ধেরি। বাঘ দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে বহু মানুষ আসেন মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলের এই বনে। মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের একটা অংশেও বাঘের সংখ্যা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই অঞ্চলের অরণ্যের উপর। সেখানেই নতুন একটি লৌহ আকরিকের খনির অনুমোদন দিয়েছে মহারাষ্ট্র সরকার। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা মানুষজনের মধ্যে। আলোচনায় সুমন্ত ভট্টাচার্য্য।

মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর জেলার ব্রহ্মপুরি বিভাগের অরণ্য অঞ্চরে একটি লৌহ আকরিক খনন প্রকল্পের অনুমোদন ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে গভীর উদ্বেগ ও আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। এই অঞ্চলটি শুধুমাত্র একটি বনভূমি নয়, বরং তাড়োবা–আন্ধারি ব্যাঘ্র সংরক্ষণ অঞ্চলের সাথে গাড়চিরোলি ও তার উত্তরভাগের অরণ্য এবং ঘোড়াঝাড়ি অভয়ারণ্যের মধ্যে বিস্তৃত এক গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী করিডর—যার মধ্য দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঘ ও অন্যান্য প্রাণীরা অবাধে যাতায়াত করে আসছে। এই করিডরই তাডোবার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ব্যাঘ্রাঞ্চলকে পার্শ্ববর্তী বনভূমির সঙ্গে যুক্ত রেখে জিনগত বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মহারাষ্ট্র রাজ্য বন্যপ্রাণী বোর্ড মুখ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই খনন প্রকল্পে অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটি ব্রহ্মপুরির লোহারডোংরি গ্রামের কাছে প্রায় ছত্রিশ হেক্টর সংরক্ষিত বনভূমির উপর প্রস্তাবিত। এছাড়াও রাস্তাঘাট ও অন্যান্য পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য আরো ৮ হেক্টর বনভূমি লাগবে। এর ফলে প্রায় আঠারো হাজার গাছ কেটে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি বছর ১.১ লক্ষ টনের আশেপাশে লৌহ আকরিক উত্তোলনের পরিকল্পনা থাকলেও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত সীমিত—মাত্র কয়েক ডজন স্থায়ী চাকরি। সেটাই প্রথম প্রশ্ন তোলে যে—প্রকৃতপক্ষে উন্নয়নের মূল্য কি এত কম যার বিনিময়ে এতটা অরণ্য দিয়ে দিতে হবে?

এই অঞ্চলের পরিবেশগত গুরুত্ব অপরিসীম। তাড়োবা–আন্ধারি ব্যাঘ্র সংরক্ষণ অঞ্চল ভারতের অন্যতম সেরা বাঘেদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। এখানকার বনভূমি কেবল বাঘ নয়, চিতাবাঘ, ঢোল, ভালুক, নানা প্রজাতির হরিণ এবং অসংখ্য উদ্ভিদ ও জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ধারণ করে। খনন কার্যক্রম শুরু হলে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—বনভূমি খণ্ডিত হবে, শব্দ ও ধুলোর দূষণ বাড়বে, জলপ্রবাহ ও মাটির গুণগত মান পরিবর্তিত হবে। সবচেয়ে গুরুতর আশঙ্কা, এই ভাঙনের ফলে বাঘেরা বন ছেড়ে মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই এই মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত চন্দ্রপুর অঞ্চলে বহু প্রাণহানির কারণ হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাজ্য বন্যপ্রাণী বোর্ডের গঠিত তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি আগেই সতর্ক করেছিল যে এই খনন প্রকল্প পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য অপরিবর্তনীয় ক্ষতি ডেকে আনবে। তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল, করিডর নষ্ট হলে মানুষ–বন্যপ্রাণী সংঘাত বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠবে। তবু সেই সতর্কতা উপেক্ষিত হয়। রাজ্য বন্যপ্রাণী বোর্ডের টেকনিকাল কমিটি এই প্রস্তাবে সায় দেয় এবং তা অনুমোদনের জন্য পাঠিয়ে দেয় দিল্লীতে জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের কাছে। এখন এর ভাগ্য নির্ধারণ হবে দেশের রাজধানীতে।
আরো পড়ুন: মধ্যভারতের বাঘ ও টাইগার করিডরগুলির সংকট
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিক্রিয়াও শুরু হয় দ্রুত । মুম্বই হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি বিচারাধীন করেছে। অ্যাডভোকেট গোপাল মিশ্রকে আমিকাস কুরি নিযুক্ত করে দুই সপ্তাহের মধ্যে পিটিশান জমা দিতে বলা হয়েছে। আদালতের হস্তক্ষেপ প্রমাণ করে যে এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সংবিধান প্রদত্ত পরিবেশ সুরক্ষার অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
রাজনৈতিক মহলেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধ প্রকট। মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী আদিত্য ঠাকরে সহ একাধিক রাজনৈতিক নেতা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যাতে জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ড এই প্রকল্পে চূড়ান্ত অনুমোদন না দেয়। তাঁদের বক্তব্য, স্বল্পমেয়াদি আর্থিক লাভের জন্য এমন এক বনভূমিকে বলি দেওয়া হচ্ছে, যার বিকল্প নেই এবং যার ক্ষতি কখনোই পূরণ করা সম্ভব নয়।
মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলের চন্দ্রপুর জেলা অরণ্য বহুল। এখানে টাইগার রিজার্ভ ও অন্যান্য অরণ্যে বাঘ সহ বহু বন্যজীবের বাস। প্রায় ২৫০ টি বাঘ এই জেলায় আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মতপ্রকাশ করেছেন। এই বাঘেরা বিভিন্ন অরণ্যের মধ্যে যাতায়াত করে। যদিও সড়ক, সেচখাল , খনি সহ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য এই যাতাযতের করিডরগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাঘেরা অরণ্য থেকে অরণ্যে যেতে না পারলে মানুষের কাছাকাছি চলে আসছে গ্রামাঞ্চলে। এতে মানুষের সাথে তাদের সংঘাত ঘটছে। বিগত বছরগুলিতে বাঘের হাতে এখানে যেমন অনেক মানুষের প্রাণ গেছে তেমনই অনেক বাঘকে সরিয়ে নিযে যেতে হয়েছে বনবিভাগের তরফে।

তাড়োবাতে কোর ও বাফার জোন মিলিয়ে যেখানে ৯০ টি'র মত বাঘ রয়েছে, সেখানে ব্রহ্মপুরীর বনবিভাগে আছে ৬৫ টি'র মত বাঘ। আর যেখান খনি তৈরি করার কথা হচ্ছে সেই লোহারডোংরিতেই ছয়টি বাঘ রয়েছে। এই খনি নির্মান হলে এই ছয়টি বাঘ তাদের আবাস তো হারাবেই, প্রভাব পড়বে পুরো এলাকার সব বাঘেদের জীবনচক্রে। যে তাড়োবা আন্ধেরি টাইগার রিজার্ভ টুরিজমের জন্য বিখ্যাত ও অনেক টাকা আসে যেখানে টুরিজমের জন্য যার ফলে সরাসরি উপকৃত হয় স্থানীয় মানুষ- তার উপরেও এর প্রভাব আসবে। বিপন্ন হতে পারে তাড়োবা টাইগার রিজার্ভের ভবিষ্যৎ ও তার অর্থনীতি। এছাড়াও এখানে যে অনেক জলাভূমি ও নদী আছে যাদের উপর স্থানীয় মানুষ, পশু ও বন্যপ্রাণীরা নির্ভর করে তারাও দূষণের কবলে পড়বে। যেখানে বিদর্ভ অঞ্চলে অনেক বড় বড় লৌহ আকরিকের খনি বিদ্যমান রয়েছে, সেখানে নতুন এই খনি- যেটা আকারে ও বাণিজ্যিক বা কর্মসংস্থানের দিক থেকে অত বড় নয় অথচ যার পরিবেশগত প্রভাব বেশ বড়, তা আদৌ কতটা দরকারি তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
এই বিতর্ক আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়—উন্নয়ন বলতে আমরা কী বুঝি? প্রকৃত উন্নয়ন কি শুধুই খনিজ উত্তোলন ও পরিসংখ্যানগত কর্মসংস্থান, নাকি সেই উন্নয়ন যেখানে বন, নদী ও বন্যপ্রাণী মানুষের সহাবস্থানে টিকে থাকে? বাঘেরা কি দ্রুত এই উন্নয়ণের পাকেচক্রে টিকে থাকতে পারবে প্রকৃতিতে না তাদের ঠাই হবে ক্রমশ ভনতারার মত চিড়িয়াখানায়!
আজ এই বনভূমির ভাগ্য জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ড ও আদালতের হাতে। কিন্তু সিদ্ধান্ত যাই হোক, এই বিতর্ক ইতিমধ্যেই একটি গভীর সত্য উন্মোচিত করেছে—যদি করিডর ভেঙে যায়, তবে শুধু বাঘ নয়, আমাদের পরিবেশগত সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র বিপন্ন হবে।
লেখক পরিচিতি: লেখক পেশায় চিকিৎসক। প্রকৃতি ও অরণ্যপ্রেমী। 'বনেপাহাড়ে' ওয়েবজিনের সম্পাদনার দায়িত্বে।








Comments