বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ২
- ..
- 2 hours ago
- 4 min read
শুরু হল বনেপাহাড়ের পাতায় নতুন ধারাবাহিক আখ্যান। কেন্দ্রবিন্দুতে বাঘ। ভারতের জাতীয় পশু। ভারতের অরণ্যের রাজা। পৃথিবীতে অল্পই বাঘ রয়েছে বন্য পরিবেশে। আর তার ৭০% রয়েছে ভারতে। বাঘ আছে মানে সেই অরণ্য সুরক্ষিত, তার বাস্তুতন্ত্র সজীব। অথচ তাকে বাঁচাতে যে লড়াই তার কথা ক'জন জানি! বনের অন্তরমহলে তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে যে পৃথিবী তার কত না-জানা রহস্য। সেইসব কথা উঠে আসবে সায়ন্তন ঠাকুরের লেখা এই আখ্যানে। আজ দ্বিতীয় পর্ব।

.....…যে গন্ধ বয় এই সমীরে
গন্ধ বা সুবাস আমাদের খুব পরিচিত একটি অনুষঙ্গ; প্রিয় মানুষ, প্রিয় স্থান এমনকি প্রিয় ঋতুর উপস্থিতিও সে নির্ভুল বয়ে নিয়ে আসে। যেমন, এই শরতে রাতের দিকে ঝমক ঝমক বাতাসে ভেসে আসা মাধবীলতার আশ্চর্য মিষ্টি সুবাস আমাদের আসন্ন দুর্গাপুজোর কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার আপনার প্রিয় ভালোবাসার জন যখন আসেন তখন কি তাঁর সঙ্গে ভেসে আসে না একটি নির্দিষ্ট গন্ধ? যা দিয়ে আপনার মন তাঁর একটি অস্ফুট আদল তৈরী করে। অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে তবে বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বলেই হয়তো কেউ কেউ খেয়াল করেন না।
আপনি শুনলে আশ্চর্য হবেন, বাঘও কিন্তু এর ব্যতিক্রম নয়! বস্তুত ওই রাজকীয় প্রাণীটি গন্ধ দিয়েই তার প্রজাতির বিভিন্ন বাঘের উপস্থিতিই শুধু নয়, আচার-আচরণ, স্বভাব, ঠিকানা, নারী-পুরুষ ইত্যকার পার্থক্যের সঙ্গে প্রেমের বার্তাও বুঝতে পারে। অবাক হয়ে নিশ্চয় ভাবছেন, বাঘের গায়ের গন্ধ তো সবার ক্ষেত্রেই এক, তাহলে বোঝে কী করে? অথবা প্রেম-সংবাদ পাঠানো! তাও কি সম্ভব?
উত্তরটি হল, হ্যাঁ; সম্ভবই শুধু নয়, বরং বলা ভালো এটিই তাদের একমাত্র কার্যকরী পদ্ধতি।
আসুন, আজকের পর্বে চিনে নেওয়া যাক ওই আশ্চর্য সুবাস-বিলাসের রীতিনীতি, যাকে বাঘ-বিশেষজ্ঞরা বলেন ‘সেন্ট মার্কিং’।
প্রথমে এই ছবিটি দেখুন।

আপনি ভাবছেন, ও হরি, আমার বাড়ির ধবধপে সাদা লক্ষ্মীকান্ত নামের আদুরে বেড়ালটি তো প্রায়শই এমন করে! এভাবেই তো ওরা হিসু করে! এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে।
কথাটি ভুল নয়, ওরা মানে বেড়াল-পরিবারের সবাই এভাবেই মূত্র ত্যাগ করে, কিন্তু মূত্রের সঙ্গে অতিরিক্ত আরও অনেক কিছুই উপাদান থাকে, যাকে কিনা আমি ‘সুবাস-বার্তা’র মূল কাণ্ডারী বলছি।
অতিরিক্ত কী থাকে—এই কৌতুহল স্বাভাবিক, খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু রাসায়নিক জটিলতার জন্য সম্পূর্ণ বিষয়টি এখানে আলোচনা করা সম্ভব নয়। আমি শুধুমাত্র হদিশটুকুই দিচ্ছি।

উপরের টেবিলটি দেখে কিছুমাত্র ভয় পাবেন না, রসায়ন অনেকের কাছেই অতি বিষম বস্তু! এই ডেটা-চার্ট সবার জন্য নয়, আপনি শুধু প্রথম আর শেষ কলাম দেখুন। তাও সবগুলি নয়, যেগুলি কালো মোটা হরফে লেখা সেগুলিই শুধু—প্রথমে চোখে পড়ছে ইউরিয়া। হ্যাঁ, এটিই তো মূত্রের স্বাভাবিক উপাদান। অতএব লক্ষ্মীকান্তদের বিষয়ে জানা আপনার তথ্য মোটেই ভুল নয়। এবার ওই ইউরিয়া যেখানে লেখা রয়েছে সেই পঙক্তির একেবারে শেষে ‘ওডার’ বা গন্ধের তালিকায় চলে যান। স্বাভাবিকভাবেই ইউরিয়ার গন্ধ ঝাঁঝালো, তীব্র, আমাদের খুবই পরিচিত।
এবারে আসুন আঠারো নং পঙক্তি—Furfural, এক প্রকারের জৈব যৌগ। এর গন্ধের বিবরণ খেয়াল করুন, মোটেও কিন্তু মূত্রের মতন নয়, বরং অনেকটা বাদাম-ভেজা কাঠ মেশানো মিষ্টি সুগন্ধ। অবাক করা বিষয় নয় কি?
বাকি উপাদানগুলির গন্ধ-বিবরণী তালিকা খেয়াল করুন; কী আশ্চর্য এক তালিকা! সব মিলিয়ে গন্ধটি তীব্র মৃগনাভির মতন, কোনো কোনো প্রকৃতিবিদ ও বাঘ-বিশেষজ্ঞরা আবার বলেন বুনো লেবুঘাসের মতন; তবে সেটি যে সুগন্ধী তা নিয়ে কারও কোনো সন্ধেহ-ই নাই।
এখন প্রশ্ন হল সুগন্ধী তো বুঝলাম, কিন্তু তা বার্তা বহন কী ভাবে করে? কী ভাবেই বা প্রেম-বার্তা পাঠায়। বাঘ তো আর রামগিরি পর্বতে নির্বাসিত সেই বিরহী যক্ষ নয় যে উতলা গর্ভিণী মেঘে মেঘে প্রেয়সীকে মনে পড়ার কথা লিখে রাখবে! তাহলে উপায়?
প্রথম পর্ব: বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ১
উপায় রয়েছে, এই ‘সুবাস-পত্র’ই তার একমাত্র অবলম্বন। সাধারণত বাঘ তার যাতায়াতের পথে বড়ো গাছের নীচে ছায়াচ্ছন্ন ঝোপে এই সুগন্ধী ত্যাগ করে, কখনও গাছের শরীরেও রেখে যায় ‘সুবাস-বার্তা’।

এই তরল গাছের গায়ে বিয়াল্লিশ সেন্টিমিটার থেকে প্রায় এক দশমিক সাত মিটার পর্যন্ত উঁচুওতেও যেতে পারে। উপরের ছবিটি একবার দেখুন, গাছের পাতায় পড়ে রয়েছে ওই সুবাসিত তরল। এর সুগন্ধ তিন-চার সপ্তাহ অবধি অবিকৃত থাকতে পারে আর তার জন্যই বাঘ মূলত ছায়াচ্ছন্ন ঝোপে বা গাছের নীচে এই তরল ত্যাগ করে, যেন বৃষ্টির জলে তা নষ্ট না হয়ে যায়। এটিই যে তার প্রিয়াকে লেখা গোপন পত্র!
বিশিষ্ট পরিবেশবিদ শ্রী রতনলাল ব্রহ্মচারী উনিশশো ছিয়াশি সালে একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে এই যুক্তি দেখিয়ে বলেছিলেন, তীব্র ওই বার্তা বাঘের ‘সেক্সুয়াল স্ট্যাটাস’এর অতি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত নির্দেশক; অর্থাৎ বাঘ কি তার সঙ্গিনী খুঁজছে, বাঘিনী কি ঋতুমতী—এমন সব প্রশ্ন। ঠিক যেন আমাদের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম, যেখানে আমরা লিখে রাখি ‘সিঙ্গল’ অথবা ‘ইন-আ-রিলেশনশিপ’!
দেখা গেছে ঋতুমতী বাঘিনী যখনই কোনো সুবাসিত তরলের খোঁজ পায় ওমনি সেখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটায়। চারপাশে পাক খায়, বারংবার কাছে মুখ নিয়ে যায়, কখনও কখনও জিভ দিয়েও স্পর্শ করে। তার অতি জাগ্রত স্মৃতি ভাণ্ডার থেকে চিনে নিতে চায় বাঘটির সম্পর্কে নানা কথা।
এখান থেকেই সম্প্রতি কিছুকাল একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আগে আমাদের ধারণা ছিল, এখনও আছে, যে বাঘ এই সুবাসিত তরল দিয়ে তার এলাকা চিহ্নিত করে। কিন্তু সেক্ষেত্রে যে অমোঘ প্রশ্নটি উঠে আসে, তা হল, সুন্দরবনের বাঘেদের কথা। সেখানে তো দিনে দু’বার নোনা জলের জোয়ার-ভাঁটা হয়, তরল ধুয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ারই কথা, তখন এলাকা চিহ্নিতকরণের কী হয়?
সেই মুহূর্তেই উঠে আসে আমাদের গর্ব বাঙালি শ্রী ব্রহ্মচারীর ওই পর্যবেক্ষণ। অর্থাৎ এলাকা চিহ্নিতকরণ নয়, বরং বাঘ তার যৌন আবেদন হিসাবেই এটি ব্যবহার করে। জটিল তর্ক; স্বভাবতই অমীমাংসিত।
এই প্রসঙ্গে শ্রী রায়চৌধুরির কথাও মনে পড়ে। তাঁর কথা আপনারা শুনেছেন? একটি গল্পে সে-কথা লিখেছিলাম। যাঁরা পড়েননি তাঁদের বলি, সরোজ রায়চৌধুরি ছিলেন উড়িষ্যা রাজ্যে অবস্থিত সিমলিপাল বাঘবনের অধিকর্তা আর তাঁর অতি প্রিয় পোষা বাঘিনীর নাম ছিল খৈরি। খৈরির জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখার ফলে ‘সুবাস-বার্তা’ নিয়ে শ্রী রায়চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য।

আগামী পর্বে শোনাব সেই আখ্যান, বলব বিষ্ঠার থেকেও আধুনিক গবেষণায় কেন এই ‘সুবাস-বার্তা’কে ইদানীং বেশি বা সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ; আসবে এই বছর শুরু হওয়া ভারতের বাঘ-গণনায় এর ভূমিকার কথা।
লেখক পরিচিতি: শ্রী সায়ন্তন ঠাকুর, বাংলা ভাষার একজন কথাকার ও ঔপন্যাসিক। এখনও অবধি বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে গল্প-উপন্যাস-রম্য রচনা নিয়ে বাইশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ধানসিড়ি প্রকাশন থেকে 'অরণ্যকথা' সিরিজের বইগুলি অন্যতম।







Comments