top of page
KANHA MAY 26.jpg

চণ্ডী মন্দিরের বাঘ

  • ..
  • Jul 16
  • 13 min read

বর্ষার রাতে বনেপাহাড়ের পাতায় গা-ছমছমে বাঘের গল্প। করবেটের কুমায়নের নয়, সুন্দরবনের মানুষখেকো বাঘের। আখ্যান বর্ণনায় রুদ্রজিৎ পাল





কলেজ স্ট্রিটে সেদিন গিয়েছিলাম একটা বই কিনতে। বহুদিন এখন আর যাওয়ার দরকার পড়ে

না। আগে কিছু স্টেশনারি জিনিসপত্র অনেকটা ছাড়ে পাওয়া যেত বলে তাও যেতাম মাঝে

মাঝে। এখন অ্যামাজনে বছরের কিছু কিছু সময়ে যে ছাড় দেয়, সেটা কলেজ স্ট্রিটের দুগুণ।

একটু খবর রেখে অনলাইনে কিনতে পারলে অনেক কিছুই বেশ সস্তা পড়ে। ফলে শুধুমাত্র

কমদামে স্টেশনারি কেনার জন্য কলেজ স্ট্রিটে যাওয়া এখন বোকামো। বই যে কিনতে

গিয়েছিলাম, তার কারণ এই বিশেষ বইটা অনলাইনে ছিল না।

বইটা কিনে দুপাশের হকারের দোকানের মাঝে সরু নোংরা ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছি, এই সময়ে মনে

হল কলকাতা ইউনিভার্সিটির গায়ের ফুটপাথে সেই পুরনো বইয়ের দোকানগুলোয় একবার ঢুঁ

মারি। সূর্য সেন স্ট্রিটের মোড় থেকে যে রাস্তাটা অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ হাইজিনের পাশ

দিয়ে গিয়ে বেরিয়েছে, সেই রাস্তার ডান দিকের ফুটপাথে কিছু এরকম বইয়ের দোকান আছে।

ইউনিভার্সিটি বিল্ডিংএর গায়ে কিছু বড় বড় বন্ধ দরজার সামনের সিঁড়িতে খোলা আকাশের

নিচেই প্লাস্টিক পেতে বই রাখা থাকে। বৃষ্টি হলেও ভিজছে, রোদ হলেও পুড়ছে। আমার মতন

কিছু বইপোকা সেই সব বইয়ের মধ্যেই রত্ন সন্ধান করে।

বইওয়ালা প্রদীপকে দেখলাম মুখ ভার করে রোদের মধ্যে বসে আছে। ওর দোকানের ঠিক

সামনেই একটা আখওয়ালা নিজের গাড়িটা রেখে রস বিক্রি করছে। রোদের দিন। লোকে ভিড়

করে নোংরা গ্লাসে আখের রস খাচ্ছে। ফুটপাথে হাঁটার জায়গা নেই। লোকের ভিড়ে বইয়ের

দোকান প্রায় হারিয়েই গেছে। কোনরকমে ঠেলেঠুলে সেই পুরনো বইয়ের স্তূপের এক পাশে

দাঁড়ালাম।

“কী হয়েছে প্রদীপ?”

" আর কি দাদা? ব্যবসাই তো শেষ। গত বছর পুজোর আগেই বন্যা হল না? তাতে তো

অর্ধেক বই নষ্ট। তারপর কেনাকাটাও এখন অনেক কম।"

“কোথায় বই রাখো তুমি?”

"ওই কফি হাউসের গলিতে একটা দোকানে। রাতে বস্তা করে গিয়ে রেখে আসতাম তখন।

সেদিন রাত্রে দোকানে জল উঠে গেল। মাঝরাতে; কিছু করারও ছিল না। সাতদিন তো এদিকে

আসতেই পারিনি। তারপর দোকানের মালিক হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠিয়ে একদিন ডাকল। বইয়ের

বস্তা পুরো পচে কালো হয়ে ছিল। করপোরেশানের গাড়ি এসেছিল। তুলে নিয়ে গেল।"

“এখন কোথায় রাখো সব বই?”

“ওই যে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে বর্ণপরিচয় বলে একটা বিল্ডিং আছে না? অর্ধেক তৈরি হয়ে

ভূতের বাড়ির মত পড়ে আছে আজ কুড়ি বছর? সেখানে। ওর মধ্যে বেশিরভাগ ঘর

বেওয়ারিশ হয়ে পড়ে আছে।“


আমি চুপ করে রইলাম। কলেজ স্ট্রিটে বন্যায় যে গত বছর এরকম অনেকের সাথেই হয়েছে,

সেটা শুনেছিলাম।

প্রদীপ বলল, “কি নেবেন দেখুন। খুব বেশি বই নেই।“

আমার চোখ ওর বইয়ের স্তূপের ওপরেই ঘুরছিল। হঠাৎ দেখি একটা চামড়ায় বাঁধানো বেশ

মোটা বই। বই না বলে ডায়েরি বললেই ভালো। হাতে তুলে নিলাম। আমার অনুমান ভুল ছিল

না। এটা বই নয়। ডায়েরি। মলাটের চামড়াটা খসখসে; কিন্তু মজবুত। কিন্তু কেমন ডায়েরি?

পাতাগুলো হলুদ। কালিটাও কেমন একটা সবুজ আর কালো মেশানো রং। ইংরেজিতে লেখা।

অদ্ভুত টানা টানা হাতের লেখায় ভর্তি। এরকম হাতের লেখা এখনকার দিনে আমি কারুর কাছে

দেখিনি।

বেশ পুরনো ডায়েরি মনে হচ্ছে। উল্টে পাল্টে দেখছি। মাঝে মাঝে আখের দোকানের কোনও

ক্রেতার কনুইয়ের গুঁতোও খাচ্ছি। কলেজ স্ট্রিটে গেলে হকারের দোকানের সামনে এই অভিজ্ঞতা

অবধারিত। এই অসভ্যতাটা বেশি করে কাছাকাছি কলেজ থেকে ক্লাস কেটে আসা, মোবাইলে

চোখ রাখা তরুণ তরুণীর দল। কিন্তু হঠাৎ একটা জিনিস দেখে আমি এই ভিড়ের কথা ভুলেই

গেলাম।

ডায়েরিটা কত পুরনো, সেটাই খুঁজছিলাম। মাসের তারিখ—যেমন ৫ই জুলাই, ১১ই অক্টোবর

ইত্যাদি দেওয়া আছে। সালটা পাচ্ছিনা। হঠাৎ এক জায়গায় দেখি—১৮৮৬। মানে প্রায় দেড়শো

বছরের পুরনো এই ডায়েরি! পড়ে আছে এই ফুটপাথে, পরের বন্যায় পচে যাওয়ার অপেক্ষায়?

এটা যে এতদিন ওই লুচি ভাজা হকারের দোকানে উনুনের জ্বালানি হয়নি, সেটাই আশ্চর্যের।

আমি আর কোনও কথা না বলে দরদাম করে ওটা কিনে বাড়ির পথ ধরলাম। দোকান থেকে

বেরিয়ে আসার আগে একবার জিজ্ঞাসা করলাম, “প্রদীপ, এই ডায়েরিটা কোথা থেকে পেয়েছ?”

প্রদীপ ঠোঁট উল্টে জানাল যে, তার মনে নেই। কেউ একটা এসে বিক্রি করে গেছে কয়েক মাস

আগে।


।।


বাড়ি এসে রাত জেগে এই ডায়েরি পড়ছি। কী আশ্চর্য মনিমুক্তো যে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে

গড়াগড়ি খাচ্ছিল, সেটা বলে বোঝানো যাবে না।

খুব সম্ভবত কোনও এক ইংরেজ কোম্পানি কর্মচারীর ব্যক্তিগত ডায়েরি এটি। লেখকের নাম

কোথাও নেই। এর কারণ ডায়েরির প্রথম কয়েকটা পাতা নেই। প্রথম যে এন্ট্রি পাচ্ছি, সেটা ৭ই

মার্চ। সাল নেই। এরপরেও খুব ধারাবাহিকভাবে এন্ট্রি নেই। ৪র্থ এপ্রিল, ১৭ই জুন, ৫ই

জুলাই—এভাবে লেখা। ডায়েরির মাঝখানে একটা জায়গায় ১লা জানুয়ারি, ১৮৮৬—এভাবে লেখা

আছে। নববর্ষের দিন লেখক পাখি শিকারে কলকাতার কাছে একটা জলায় গিয়েছিলেন, সেই এন্ট্রি

আছে। এর আগের তারিখগুলো এর এক-দু বছর আগের হবে। সুতরাং মোটামুটি ১৮৮৪-৫

সালের পর থেকে কাহিনী রয়েছে এখানে। ১৮৮৬ সালের সেই তারিখের পর আরও গোটা চল্লিশ


পাতা রয়েছে। মানে হয়ত ১৮৮৭ বা ৮৮ সালে ডায়েরি শেষ হয়েছে। অনেকরকম ঘটনার

কথা আছে এই ডায়েরিতে। কিছু জায়গায় লেখা পড়া যায় না। জলে ভিজে গেছে বা পাতা

ছিঁড়ে গেছে।

এই ডায়েরি থেকেই এক অদ্ভুত জঙ্গলের ঘটনার বর্ণনা এখানে আমি দিলাম। লেখকের নিজের

হাতের লেখা থেকে অনুবাদ করে তুলে দিলাম। বিশ্বাস করবেন কিনা, আপনাদের ব্যাপার। তবে,

একটা জিনিস বলতে পারি যে, সেই সময়কার ইংরেজ কর্মচারীরা কিন্তু খুব বেশি ভারতপ্রেমিক

ছিলেন না। বরং, এখানকার আচার-বিচার নিয়ে ওনাদের বেশ একটা অবজ্ঞামিশ্রিত উন্নাসিকতাই

ছিল। এবং এখানকার লোকেদের ওনারা অর্ধসভ্য ভাবতেই অভ্যস্ত ছিলেন। সেই সময়কার

একজন ইংরেজের নিজের হাতে লেখা এই কাহিনী আপনারা কিভাবে নেবেন, আপনাদের ব্যাপার।

এরপর আমি, অর্থাৎ এই ডায়েরির ক্রেতা এবং অনুবাদক আর উত্তম পুরুষে আপনাদের সামনে

থাকছি না। এরপর উত্তম পুরুষে যে লেখা আপনারা পড়বেন, সেটা সরাসরি সেই ডায়েরির

লেখকের জবানি। আমি এখানেই বিদায় নিলাম।


।।

৫ জুলাই


কী বৃষ্টি রে বাবা! লীডসে বৃষ্টি হয়। বরফপাতও হয়। ছোট থেকেই দেখছি। কিন্তু এই ভারতের

“মনসুন” একদম পৃথিবীকাঁপানো। একবার শুরু হলে পুরো দিন মাটি। আজকে আমি কুঠিতেই

বসে রইলাম। এত বৃষ্টিতে ছাতাও কাজে লাগে না। দিনের বেলা তাও কেটে যায়। রাত্রি হলে

আর কিছু ভালো লাগে না।

একটা লোক নেই যার সাথে কথা বলা যায়। কলকাতায় থাকলে তাও আমাদের সমাজের কিছু

ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা আছেন। এখানে শুধুই নেটিভ। তারা ওই গুড মর্নিং আর ইয়েস স্যার

ছাড়া কিছুই বলতে পারে না। আর সন্ধ্যে হলেই আফিং বা তালগাছের রস খেয়ে ঘুমায়। মার্টিন

আছে। কিন্তু সে ব্যাটা রাত হলেই হুইস্কির বোতল নিয়ে ঘরে দরজা বন্ধ করে দেয়।

বাইরে বেরোলেই কাদা আর জল। কেভিন কালকে এর মধ্যেই এসেছিল। যখন আমার ঘরে পা

দিল, পুরো আমার মেঝেটা কাদায় মাখামাখি। আক্রম তারপর এক ঘণ্টা ধরে সেই কাদা

পরিষ্কার করল। তারপর কেভিন যখন চেয়ারে বসে আছে, আমি দেখি ওর হাঁটুর কাছে একটা

বিশাল জোঁক! তাড়াতাড়ি এক ছিটে নুন দিতেই জোঁক বাবাধন টুপ করে পড়ে গেলেন। কেভিন

আঁতকে উঠে সেটাকে জুতোর তলায় ঘষতেই পুরো মেঝে রক্তে ভরে গেল।

আর ভালো লাগছে না। হুইস্কি শেষ। দেখি আক্রম কী রান্না করেছে। শুয়ে পড়ব। যত

মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখব, ততই পোকার উৎপাত বাড়বে।



৮ই জুলাই


আজকে বাঁকুলি বলে একটা গ্রামে গিয়েছিলাম। ওখানে আমাদের কয়েকজন কর্মচারীর বাড়ি।

ওদের একজনের ছেলেকে পরশু রাতে বাঘে টেনে নিয়ে গেছে।

ভাগ্যে আজকে বৃষ্টি ছিল না। নইলে গ্রামের রাস্তার যা অবস্থা দেখলাম, তাতে কাদা থাকলে আর

যাওয়া হত না। গ্রামের দুই পাশে ঘন জঙ্গল। আমি রঘু নামে একজনের কাঁধে ভর করে সেই

এবড়ো খেবড়ো রাস্তা পেরোলাম।

কিন্তু সেই বাড়িতে গিয়ে আমি চমকে উঠলাম। ভেবেছিলাম একজন বাঘের শিকার হয়েছে বলে

সবাই কান্নাকাটি করবে। কিন্তু গিয়ে দেখি বাড়ির সবাই পুজোর আয়োজনে ব্যস্ত।

আমি জিজ্ঞাসা করায় বলল যে, মন্দিরের দেবী প্রসাদ নিয়েছেন, সেইজন্য দেবীকে ধন্যবাদ দিতে

এই পুজো।

আমি কিছুই বুঝলাম না। বাঘের মানুষ শিকারের সাথে দেবীর প্রসাদের কী সম্পর্ক? কিন্তু

আমাদের অফিসের কর্তা বলে দিয়েছেন যে, নেটিভদের ধর্ম বা লোকাচার সম্পর্কে কোনও মন্তব্য

করা এইসব জায়গায় নিরাপদ নয়। তাই বেশি কথা না বলে চুপ করে রইলাম।

রঘু আমাদের কুঠির ঝাড়ুদার। ওর ভাই কাজ করত আমাদের ফ্যাক্টরিতে। তারই ছেলে বাঘের

শিকার হয়েছে। ছেলেটির বয়স ১৪ বছর। কাল রাতে বাড়ির কাজ করে বারান্দায় বসে ছিল।

হঠাৎ একটা কিছু পতনের শব্দ শুনে বাড়ির লোক আলো নিয়ে ছুটে এসে দেখে সে আর নেই।

বারান্দার সামনে বাঘের থাবার দাগ আর কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগ।

ছেলেটির সবে বিয়ে হয়েছিল। তার বৌ, বয়স বড়জোর নয় কি দশ, দেখলাম সাদা একটা

কাপড় পরে ঘরে বসে আছে। শুনেছি এর পর থেকে নাকি এদের কঠোর বিধবার জীবন শুরু

হবে। আমার গলা ঠেলে কান্না উঠে আসছিল। কিছু আর না বলে তাড়াতাড়ি চলে এলাম।

পথে শুনলাম ছেলেটির একটা পা আর একদিকের বুকের কিছুটা অংশ কাছেই একটা কাঁটাঝোপের

ভিতর পাওয়া গেছে। বাকিটা বাঘের পেটে।


১৪ই জুলাই


আমাদের কুঠি আর আমাদের ফ্যাক্টরির মাঝখানে একটা বিশাল মাঠ। স্থানীয়রা বলে “ডাকাতিয়া

মাঠ”। এখানে নাকি আগে ডাকাতি হত। আমার চাকর আক্রম বলেছে, হুজুর, ওই মাঠ খুঁড়লে

কত যে লাশ পাওয়া যাবে, কোনও ঠিক নেই। রাতের বেলা রাস্তার পথিকদের সব ডাকাতি

করে, তারপর হত্যা করে নাকি ওখানে পুঁতে দেওয়া হত।

এই মাঠে পারতপক্ষে স্থানীয় কেউ যায় না ভূতের ভয়ে। আমি আজকে সেখানেই ঘুরতে

গেছিলাম। নতুন বন্দুকটা পরীক্ষা করারও ইচ্ছা ছিল।

আমি যখন সেই মাঠে পায়চারি করছি আর পাইপ খাচ্ছি, দেখলাম আমাদের কয়েকজন কর্মচারী

চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। কিন্তু কেউ সেই মাঠে পা রাখল না।


আমি লক্ষ্য করেছি যে, এখানকার লোকেদের কুসংস্কার খুব বেশি। আর এদের যুক্তি দিয়ে

বোঝালেও লাভ হয় না। মাথা নেড়ে চলে যাবে, কিন্তু সেই পুরনো রীতিনীতি কিছুতেই ছাড়বে

না।


যাই হোক, সেই মাঠে বন্দুক দিয়ে কয়েকটা পাখি শিকার করলাম। বক, শামুকখোল ইত্যাদি।

আক্রম রান্না করছে সেই পাখি এখন। কুঠির সব কর্মচারী ভাগ পাবে। সুস্বাদু মাংস দিয়ে

রাম—আজ রাতটা জমে যাবে। ওরাও খুব খুশি। মাংস তো ওদের ভাগ্যে বেশি জোটে না। কিন্তু

যদি স্টিভ বা কেভিন থাকত, আমার ভালো হত। একা একা আনন্দ করে মজা নেই। ধুর!



২২শে জুলাই


কাল রাতে আবার সেই ঘটনা।

আমাদের ফ্যাক্টরির হেড মিস্ত্রির বৌকে বাঘে নিয়ে গেছে। এটা বাঁকুলি গ্রাম নয়, তার পাশে

চণ্ডীপুর। এবার নাকি ঘরের মধ্যে ঢুকে শিকার করেছে। বাড়ির কেউ টের পায়নি। আজকে

সকাল থেকে এখানে পুরো পরিবেশটাই গোমড়া। কেউ কাজ করছে না। এরকম হলে তো

কাজকর্ম লাটে উঠবে।

মার্টিন অনেক বুঝিয়েও কাউকে কাজ করাতে পারছে না। এমনকি, ও এরকম প্রস্তাবও দিল যে,

আজকেই ও বন্দুক নিয়ে সেই বাঘ শিকার করতে যাবে। এই মানুষখেকোটা আজ তিন মাস হল

বড্ড জ্বালাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। শেষে বলা হল যে এবার যারা মাল বহন করে

ঘাটের নৌকায় তুলে দেবে, সবার মজুরি ডবল।

আমি ভাবছি কলকাতায় অফিসে একটা তার পাঠাবো। একজন ভালো শিকারি পাঠাক। এই

জ্বালাতনের শেষ করতেই হবে। দুমাস পরেই ফসলের মরসুম আসছে। রায়তরা তখন দিন রাত

জেগে কাজ করে। তখন যদি এই ঝামেলা থাকে, তাহলে ফ্যাক্টরি লাটে উঠবে। গত বছর

এমনিতেই প্রায় একশো মন চিনি কম উৎপাদন হয়েছিল। এবার যদি আবার কম হয়, তাহলে

কিন্তু হেড অফিসে হইচই শুরু হবে।


৩১শে জুলাই


আজকে কলকাতা থেকে রবিন এসেছিল। মাসের শেষ। হিসাব বুঝে নিয়ে আজকেই চলে গেল।

ওর ঘোড়ার গাড়ি। সন্ধ্যের আগেই ডাকাতের মাঠ পেরিয়ে যাবে। চারপাশের গ্রামের লোক সব

ভিড় করে ঘোড়ার গাড়ি দেখতে এসেছিল।

মার্টিন রবিনের সাথে কলকাতা চলে গেল। ওর পায়ের সেই ঘা কিছুতেই সারছে না। মেডিক্যাল

কলেজে দেখাতে হবে। তাছাড়া ওর বছরের শেষে বাড়ি যাওয়ার ব্যাপার আছে। জাহাজের

টিকিটের খোঁজ করবে। আমিও বলেছি আমার জন্য টিকিট দেখতে। দু'বছর হল লীডসে যাইনি।

আমাদের চার্চের সেই বেল শুনিনি। এবার পাওনা ছুটি নিয়ে যেতে হবে।


রবিনের সাথে কাল রাতে বেশ পার্টি হল; ওকে এই বাঘের ব্যাপারে বলেছি। কয়েকদিন বৃষ্টিতে

বাঘটা আর এদিকে আসেনি। কিন্তু যে কোনদিন আবার হানা দেবে। রবিন বলেছে কালকেই ও

কর্তাদের বলবে। একজন নতুন শিকারি ইংল্যান্ড থেকে এসেছে নাকি। তাকেই অবিলম্বে পাঠানোর

ব্যবস্থা করবে।


২য় অগাস্ট


আজকে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। এখন এদের স্থানীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী “শ্রাবণ” বলে

একটা মাস চলছে। এদের ক্যালেন্ডার আমাদের মত নয়। এপ্রিলে এদের বছর শুরু। আর কোন

মাসে কটা দিন, এদের কিছু ঠিক থাকে না। আশাকরি আমাদের স্কুলগুলো চালু হলে এইসব

ব্যাপার ঠিক হবে। এখানে চার্চের ফাদার চেষ্টা করছেন ব্রিটিশ ক্যালেন্ডার চালু করার।

কলকাতায় শুনেছি নেটিভরাও ব্রিটিশ ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে এখন।

এই শ্রাবণ মাসে এখানে একটা মন্দিরে বিশাল মেলা হয়। এটা নাকি কালী মন্দির। কলকাতায়

যখন গিয়েছিলাম, একটা কালী মন্দির দেখেছিলাম। কালীঘাট। সেটা নাকি এক সময়ে

ডাকাতদের আস্তানা ছিল। এই স্থানীয় কালী মন্দিরও নাকি এখানকার সেই ডাকাতিয়া মাঠের

হরিয়া ডাকাতের তৈরি করা। এখানে অবশ্য কালী বলে দেবীকে এরা ডাকে না। এখানে বলে

চণ্ডী। স্থানীয় একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন। আমাকে এসে নানারকম কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা

করছিলেন যা কালী আর চণ্ডীর মধ্যে পার্থক্য কী। আমি হু হাঁ করে মাথা নেড়ে চলে এলাম।

কী অদ্ভুত এই দেশ। যে ডাকাত কয়েকশো লোককে হত্যা করেছে, সেই ডাকাতের স্থাপিত কালী

মন্দিরে সবাই এসে মাথা ঠুকছে!

সেই ডাকাতিয়া মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলের ধারে এই মন্দির। ভক্তরা সব ঘুরে যায়। মাঠে কেউ যায়

না। আমি মাঠের ওপর দিয়েই গেলাম। সঙ্গে বন্দুকটা ছিল। দুটো শেয়াল শিকার করলাম। আর

একটা বক।

মন্দিরে কয়েকশো ছাগল আর মোষ বলি দিয়ে তার রক্ত এই মাঠে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মাঠের

মাটির নীচে থাকা মৃতদের আত্মা নাকি তাতে শান্ত থাকে। নইলেই নাকি তারা রাতের বেলায়

উঠে এসে চারপাশের গ্রামের কারুর না কারুর ক্ষতি করে।

এবার মানুষখেকো বাঘের জন্যই বোধহয় পুজো আরও বেশি শুনলাম।

মন্দিরে গিয়ে দেখি চারিদিক রক্তে লাল হয়ে আছে। তার মধ্যেই নেটিভরা মাথা ঠুকছে। আমার

তো গা গুলিয়ে উঠল। পরের বার একটা ক্যামেরা নিয়ে আসব। এই দৃশ্যের ছবি তুলে ইংল্যান্ডে

দেখালে ওরা অবাক হয়ে যাবেই।





৯ই আগস্ট


কেলম্যান নামে একজন শিকারি এসেছে। একদম বাচ্চা। বয়স বড়জোর বাইশ বা তেইশ।

শুনলাম কুমায়ুনে ছিল। সেখান থেকে সরাসরি আমাদের এই দরিয়াগঞ্জ কুঠিতে এসেছে। ছোকরা

বয়স কম হলে কী হবে, শিকারে নাকি খুব ওস্তাদ।

নিজেই বলল, ভারতে আসার পথে জাহাজ কিছুদিন পূর্ব আফ্রিকায় থেমেছিল। তখন নাকি নিজের

হাতে গণ্ডার, সিংহ, লেপার্ড ইত্যাদি সব মেরেছে। এমনকি একটা জিরাফও। কুমায়ুনে এসেও

নাকি সেখানকার একটা মানুষখেকো লেপার্ড মেরেছে গত মাসেই।

কেলম্যান উঠেছে আমাদের কুঠির পাশে ডাকবাংলোয়। কাল থেকেই নাকি বাঘের সন্ধানে

বেরোবে। আমি ভাবছি একবার বলে দেব সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার কিন্তু তোমার

আফ্রিকার ঘাসজঙ্গলের সিংহ নয়। এরা অনেক বেশি ধূর্ত। আফ্রিকার সিংহ কিন্তু নেড়া

ঘাসজমিতে বসে থাকে। আর এই ভারতের বাঘ থাকে ঘন জঙ্গলে, কাদাজমিতে।

তবে ছোকরার টিপ ভালো। আজ বিকালে আমার সামনেই প্রায় দেড়শো গজ দূর থেকে একটা

চিল গুলি করে নামাল।

কেলম্যান একটা ঘোড়া নিয়ে এসেছে। সেটাতে চড়েই কুঠির বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।


১০ই অগাস্ট


আজকে সারাদিন কেলম্যান মাচা বাঁধল আর শিকারের জন্য সঠিক জায়গা খুঁজে বেড়ালো।

আশেপাশের গ্রামের লোক মজা দেখতে ভিড় করেছে। আবার অনেকে ভিড় করেছে ঘোড়া

দেখতে।

কেলম্যান নিজের কাজ করছে আর সেই লোকেরা নিজেদের মধ্যে উত্তেজিত ভাবে কথা বলেই

চলেছে। কেলম্যান এখানকার বাজার থেকে একটা বড় ছাগল কিনেছে। সেটা নাকি নীচে বেঁধে

গাছের ওপর উঠে বসবে কাল থেকে।

দেখা যাক। আজকে ফ্যাক্টরি থেকে বাড়ি ফেরার সময় দেখি একটা কালো রঙের ছোট সাপ

ঘাসের মধ্যে শুয়ে আছে। হাতের কাছে একটা বড় পাথর ছিল। সেটা দিয়ে সাপটাকে মেরে নিয়ে

এসেছি। স্পিরিটের শিশিতে রাখব। এটা আমার সপ্তম স্পেসিমেন। কলকাতায় গেলে এগুলো

মিউজিয়ামে দিয়ে আসব। ওরা এগুলো খুব পছন্দ করে। আর কয়েকটা নিয়ে যাব ইংল্যান্ডে।

আমার বসার ঘরে সাজিয়ে রাখব।


১৪ই অগাস্ট


আজ আবার পাশের বকুলপুর গ্রামে বাঘের শিকার। একজন বৃদ্ধ মহিলা দুপুরে পুকুরে বাসন

মাজতে গিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ বাড়ি না ফেরায় তার ছেলে পুকুরপারে খুঁজতে গিয়ে দেখে ঘাটে

চাপ চাপ রক্ত। শাড়ির ছেঁড়া টুকরো জলে ভাসছে।


আমার আবার বিকেল থেকে জ্বর এসেছে। ম্যালেরিয়া মনে হয়। কেভিন এসেছিল। জ্বর দেখে

একটা ওষুধ দিয়ে গেছে। রাতে সেটাই খেয়ে নেব।


১৫ই অগাস্ট


জ্বর ক্রমশ বাড়ছে। কেভিন এসে দেখে একজন ডাক্তারকে খবর দিয়েছিল।

আমাদের ব্রিটিশ ডাক্তার এখানে নেই। কোম্পানির ডাক্তার আছে একজন কুড়ি মাইল দূরে একটা

কুঠিতে, কিন্তু শুনলাম গাউটের ব্যাথায় তিনি এতটাই কাতর যে হাঁটার ক্ষমতা নেই। বাঘের

ভয়ে পালকিবাহক সব পালিয়ে গেছে।

অগত্যা একজন স্থানীয় নেটিভ ডাক্তার নিয়ে আসা হল। এদের এখানে “কবিরাজ” বলে ডাকা

হয়। গলায় দশ বারোটা নানা গাছের শেকড়ের মালা। সেই ব্যক্তি এসে নিজের ঝোলা থেকে

কয়েকটা কালো, লাল, সবুজ—ইত্যাদি নানারকম বড়ি বার করে আমার লোকেদের কী সব

বুঝিয়ে দিলেন। তারপর অনেকক্ষণ আমার হাত ধরে চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন।

পরে আক্রম বলল যে, "সাহেব, উনি নাড়ি দেখেই অসুখ ধরে ফেলেন।" এটাই তার মানে নাড়ি

দেখা? আমাদের দেশে তো আরও কত কিছু করে ডাক্তাররা। ইনি তো দেখলাম শুধুই হাতের

নাড়ি দেখলেন। যাই হোক, আর লেখার শক্তি নেই। ওই রঙিন বড়ি খেয়ে দেখি। সেরে গেলে

ভালো; নইলে অবধারিত মৃত্যু।


১৯শে অগাস্ট


আজকে কিছুটা ভালো।

জ্বর আর আসেনি। দুদিন তো বেহুঁশের মত নাকি পড়ে ছিলাম। আক্রম আজকে খাবার দিতে

এসে জানাল যে, বাঘের আরও একটা শিকার নাকি বেড়েছে।

কেভিন একটু আগেই এসেছিল। ওর কাছে শুনলাম যে এই বাঘটার মোট শিকার সংখ্যা এখন

অবধি তেইশ। অবশ্য আমরা এটুকু খবর পেয়েছি। অন্য দিকে আরও শিকার করেছে কিনা,

খবর নিয়ে দেখতে হবে।

কেলম্যান নাকি রোজ রাতেই মাচায় উঠে বসছে। কিন্তু কিছুই করতে পারছে না।

আক্রম জানাল একজন সাধু নাকি আমার সাথে দেখা করতে চান। আমি সোজা বলেছি দূর দূর

করে তাড়িয়ে দিতে।

এদেশে এসে এরকম ভণ্ড সাধুর সাথে মোলাকাত আগেও হয়েছে। এরা হয় ভিক্ষা চায় আর নইলে

কিছু সস্তা ম্যাজিক দেখিয়ে টাকা চায়। আমি একদম সহ্য করতে পারি না। কিন্তু দেখেছি এরা

গ্রামের ভেতর ঢুকে সব বাড়ি থেকেই কিছু না কিছু আদায় করে।

আর লেখার শক্তি নেই। প্রচণ্ড মশা। মশারির ভিতর ঢুকে পড়লাম।


২১শে অগাস্ট



আজকে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। এইবেলা লিখে রাখি।

আজকেই প্রথম সকালে উঠে ঘরের বাইরে পা দিলাম। মাথাটা একটু ঘুরছিল। কিন্তু তাও বাইরে

রোদে একটু না বসলে আর ভালো লাগছে না। বৃষ্টিতে কুঠির পেছন দিকটা পুরো জঙ্গল হয়ে

গেছে। ভাবছি এবার শীতকালে পরিষ্কার করে ওখানে সবজি বাগান করব।

আমি আমার কুঠিবাড়ির বাইরে বাগানে একটা চেয়ারে বসে ব্রাণ্ডি দিয়ে চা খাচ্ছিলাম। এই সময়ে

ডানদিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখি সেই বিশাল আমগাছটার নীচে কে একজন বসে আছে। আমাকে

মাথা ঘোরাতে দেখে সে মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম করল।

আমি হাত নেড়ে ডাকলাম।

সে এসে বলল, "সাহেব, আমার নাম বামদেব। আমি আপনার সাথে দেখা করার জন্য তিনদিন

অপেক্ষা করছি।"

মানে এই সেই সাধু? আমি ভালো করে দেখলাম। সাজপোশাক ঠিক হিন্দু সাধুদের মত নয়।

খালি পা, খাটো ধুতি আর একটা মলিন জামা। জামার বোতাম খোলা। একটা পৈতে দেখা

যাচ্ছে। কাঁধে একটা ঝোলা। কপালে লাল টিপ।

আমি বিরক্ত হয়েই বললাম, “কী চাই? ভিক্ষা?”

"না সাহেব। আমি এই মানুষখেকোটার ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলতে চাই।"

“কী বলবে?”

“অনুমতি পেলে এইখানে বসে বলি সাহেব?”

এই দেশে এসেই দেখেছি এখানকার লোক আমাদের বড্ড শ্রদ্ধা করে। কারণ ছাড়াই উঠতে

বসতে, চলতে অনুমতি নেয়। আমার ভেতর ভেতর হাসি পেলেও কিছু বলি না। আমি তাকে

মাটিতে বসতে ইশারা করলাম। এদেশের লোক, অন্তত এই গ্রামে, কিছুতেই সাহেবদের সামনে

চেয়ারে বসবে না। মাটিতেই বসবে।




এরপর সে যে বিচিত্র কাহিনী বলল, সেটা আমার নিজের ভাষায় এখানে তুলে দিলাম।

সাহেব এই যে মানুষখেকোটাকে আপনারা মারার চেষ্টা করছেন, সেটায় কোনও লাভ হবে না।

আপনি মুচকি হাসছেন সাহেব। কিন্তু এটাই সত্যি। এই জঙ্গলের মধ্যে এমন অনেক জিনিস আছে

সাহেব, যেটা আপনারা বাইরে থেকে এসে জানতেও পারেন না। এই জঙ্গলের আইন আপনাদের

দেশের নিয়মে চলে না।

ওটা বাঘ নয় সাহেব। ওটা শয়তানের আত্মা। হরিয়ার নাম শুনেছেন তো সাহেব? এই অঞ্চলের

ডাকাত ছিল। এই যে রাস্তাটা এখান থেকে শহরে চলে গেছে, সেই রাস্তার ত্রাস ছিল এই হরিয়া।

দিন হোক বা রাত, এই রাস্তা দিয়ে যদি কোনও গাড়ি যেত, বা টাকাপয়সা নিয়ে কোনও

বণিক যেত, তাহলে আর রক্ষা ছিল না। হরিয়ার হাতে পড়লেই শেষ। শুধু যে পুরুষদের খুন

করত তা নয়। সঙ্গের মহিলা, শিশু—কাউকেই ও ছাড়ত না।

প্রতি অমাবস্যায় হরিয়া ওই চণ্ডী মন্দিরে নরবলি দিত। স্বয়ং মা কালী নাকি ওকে দর্শন

দিতেন। ওর দলের লোকেরাই বলত সাহেব, ও নাকি মানুষ নয়। কালী মন্দিরে যখন পুজো

করত, তখন নাকি ওকে দেখেই সবাই ভয় পেত। এমনকি অনেকে নাকি নিজের চোখে দেখেছে

হরিয়া পুজো করতে করতে মাটি থেকে তিন হাত শূন্যে উঠে যেত!

আপনাদের সাহেবরা অনেকবার চেষ্টা করেছেন ওকে মারার। অনেকবার বণিকদলের ছদ্মবেশে

ইংরেজ পুলিশ বন্দুক নিয়ে এই রাস্তায় যাতায়াত করেছে। কিন্তু কোনবার হরিয়ার মুখোমুখি

হয়নি। অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল ওর সাহেব। পুলিশ, মিলিটারি বা পেয়াদা রাস্তায় এলে ও কোনদিন

সেখানে আসত না। কিভাবে যে ও খবর পেত, সেটাও কেউ জানে না। সবাই বলত, ও নাকি

তন্ত্রসিদ্ধ। এমনকি একবার হয়েছিল যে, সরাসরি কলকাতা থেকে আপনাদের পুলিশ এসেছিল,

স্থানীয় থানায় খবর অবধি ছিল না। পথিকের ছদ্মবেশে পুলিশের দল এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে

গিয়েছিল। কিন্তু তাও হরিয়া ধরা পড়েনি।

এই যে মাঠ দেখছেন, সেখানে অনেক লোকের লাশ ও পুঁতে রেখেছে। সেই সব লাশের প্রেতরা

নাকি ওর চেলা। তারাই হাওয়ায় হাওয়ায় ওকে খবর দিত।

তবে সাহেব, ওর মৃত্যুটাও অদ্ভুত। প্রতি বছর, এই শ্রাবণ মাসে একটা বিশেষ পুজো হরিয়া

করত। ওর নাকি এক তান্ত্রিক গুরু ওকে শিখিয়েছিল। মহাকালী পুজো। সেইদিন ও একা

সারারাত ওই মন্দিরে থাকত। ভয়ে কেউ সেদিকে যেত না। শোনা যায়, ও নাকি সেদিন

নিজের হাতে একাধিক নরবলি দিত।

সেবারও সেই রাতে হরিয়া একা সেই মন্দিরে গিয়েছিল। সেই বিশেষ পুজোর পরেই ওদের ডাকাত

দলের অভিযানে বেরোনোর কথা। কিন্তু তিনদিন পরেও ও আস্তানায় না ফেরায় দলের কয়েকজন

সেই মন্দিরে খোঁজ নিতে যায়।

গিয়ে তারা দেখে এক অদ্ভুত দৃশ্য। মন্দিরে চণ্ডী মায়ের মূর্তির সামনে হরিয়ার দেহ পড়ে আছে।

চারিদিকে রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে আছে। আর সেই দেহের প্রায় অর্ধেক নেই। দাঁতের দাগ থেকে

বোঝা যায় যে, বাঘেই সেই দেহ খেয়ে গেছে।

এই অবধি শুনে আমি বললাম, "তাহলে তো ভালো। মানুষখেকো বাঘটা অন্তত এই একটা ভালো

কাজ করেছে।"

লোকটি বলল, “না সাহেব। এই ঘটনার আগে নদীর এই পারে দশ বিশটা গ্রামে কেউ বাঘের

নাম শোনেনি। সেই বংশীগঞ্জের দক্ষিণে যে জঙ্গল, সেখানে বাঘের উৎপাত ছিল। তার এপারে

বাঘ আসত না। মানুষখেকো বাঘ তো ছিলই না। কিন্তু হরিয়ার মৃত্যুর পরেই শুরু হল এই

বাঘের উপদ্রব। প্রতি বছর এই শ্রাবণ মাসে এই বাঘের শিকার শুরু হয়। এবার একটু বেশি।

আপনি এখানে আসার আগেও কয়েক বছর হয়েছে।

আপনার আগে যিনি কুঠির কর্তা ছিলেন, সেই মাইকেল সাহেব নিজেই ছিলেন বড় শিকারি।

রাজস্থানে অনেক বাঘ শিকার করেছিলেন। উনি টানা দু বছর চেষ্টা করেও বাঘটাকে মারতে

পারেন নি। শেষে একদিন বাঘ শিকারের জন্য গাছে উঠতে গিয়ে পড়ে গেলেন। কোমর ভেঙ্গে

গেল।"

আমি বললাম, "এবার দেখছি আমরা। অত সহজে এবার ছাড়ব না। ওই বাঘ তন্ত্রসিন্ধ হোক

আর যাই হোক। বন্দুকের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। আর এবার আসল শিকারি এসেছে।"

লোকটি বলল, "সাহেব, আমি কিছুটা তন্ত্র সাধনা করি বলেই বলছি। ওটা বাঘ নয়। ওটা ওই

হরিয়ার আত্মা। মায়ের সামনে প্রাণত্যাগ করে হরিয়া এখন বাঘের রূপ নিয়েছে। বেঁচে থাকতে

স্বয়ং মা কালী ওকে রক্ষা করতেন। এখন এই বাঘটাকেও রক্ষা করেন স্বয়ং মা। আপনাদের

সাধ্য নেই ওকে কিছু করার। মায়ের রক্ত পিপাসা না মিটলে এই বাঘ এখান থেকে যাবে না।

আর যখন চলে যাবে, তখন পাঁচ ছয় মাস আপনারা ওর দেখাই পাবেন না।"

আমি আর কিছু বললাম না।

লোকটি উঠে পড়ল। যাওয়ার আগে নিজের ঝোলা থেকে একটা কালো মত তরল বার করে

আমার কপালে লাগিয়ে বলল, "সাহেব, হরিয়া ছিল উচ্চ মার্গের তন্ত্র সাধক। ওর আত্মাকে

আটকানোর ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু এই দিব্যজল আমি আপনার কপালে লাগিয়ে দিলাম। খুব

সহজে আপনার ক্ষতি ও করতে পারবে না। শুধু অমাবস্যার রাতে সাবধান। ওইদিন জঙ্গলে

যাবেন না। বিশেষ করে আগামী অমাবস্যা। ওইটাই সেই তিথি যেদিন হরিয়া পুজো করতে

করতে বাঘের পেটে গিয়েছিল। ওইদিন ওর রক্তপিপাসা সবচেয়ে বেশি থাকবে।"



( আগামী পর্বে সমাপ্ত)



লেখক পরিচিতি: ডা: রুদ্রজিৎ পাল একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও লেখক।



5 Comments


Guest
Jul 25

Wow . Egarly waiting for the nxt part

Like

Guest
Jul 25

দারুন লিখেছেন,

গা ছমছম আরো দিন।

Like

Guest
Jul 23

আগামী পর্ব কবে আসবে? অপেক্ষায় থাকলাম।

Like

Guest
Jul 19

দারুণ

Like

Guest
Jul 18

fantastic

Like
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
 

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page