চণ্ডী মন্দিরের বাঘ: পর্ব ২
- ..
- 21 hours ago
- 13 min read
বর্ষার রাতে বনেপাহাড়ের পাতায় গা-ছমছমে বাঘের গল্প। করবেটের কুমায়নের নয়, সুন্দরবনের মানুষখেকো বাঘের। আখ্যান বর্ণনায় রুদ্রজিৎ পাল। এবারে শেষ পর্ব।

২৪শে অগাস্ট
আজকে অনেকদিন পর রোদ উঠেছে। আমি এখন আমাদের ফ্যাক্টরির ঘরে বসে আছি। বাইরে কেলম্যান নিজের নতুন রাইফেলে তেল লাগাচ্ছে। এটা নতুন মডেলের উইনচেস্টার। ও গত সপ্তাহে আনিয়েছে। ওর ঘোড়াটা কুঠির আস্তাবলে দানাপানি খাচ্ছে।
বেচারা কেলম্যান যে উৎসাহ নিয়ে এসেছিল, সেই উদ্যম এখন অনেকটাই কমে গেছে। গত তেরো
দিন ধরে একনাগাড়ে চেষ্টা করেও ও কিছুই করতে পারেনি। অদ্ভুত ব্যাপার। যেখানে ও রাতে মাচা
বেঁধে বসে, বাঘ শিকার করে ঠিক তার উল্টো দিকে। কেলম্যান অনেক ভাবে চেষ্টা করেছে। যেখানে
শেষ শিকার হয়েছে, সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করেছে। বনের মধ্যে ঢেরা পিটিয়ে অপেক্ষা করেছে।
এমনকি সন্ধ্যে বেলা পায়ে হেঁটে একা বনের মধ্যে ঢুকেছে। কিন্তু সেই বাঘের দেখা পায়নি। একদিন
ভোররাতে নাকি দূরে বাঁশবাগানে একটা প্রাণীর দেখা পেয়েছিল। বন্দুকও ছুঁড়েছিল। কিন্তু কোনও
লাভ হয়নি। অথচ ও চলে যাওয়ার একদিন কি দুদিন পরেই সেই এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপ দেখা
গেছে।

কেলম্যান বেশ কুসংস্কার মানে দেখলাম। ও বলছে আগের বন্দুকটাই নাকি অপয়া। তাই এবার এই
নতুন বন্দুক এনেছে। দেখা যাক। আমাদের ভাগ্য ফেরে কিনা। আখের মরসুম শুরু হয়ে গেছে। আমাদের চাষিরা ক্ষেত থেকে আখ তুলে এনে জমা করছে। সেই হিসাব করতেই এখন আমার দিন চলে যাচ্ছে। চিনি তৈরিও শুরু হয়েছে। এবার শুনছি কোম্পানি নাকি চিনি বিদেশে পাঠাবে। হংকংএ যাবে। রবিন আজকেই এল তাগাদা দিতে। পরের মাসেই কলকাতায় জাহাজ আসবে। সেই জাহাজে অন্তত পঞ্চাশ মণ চিনি পাঠাতেই হবে। নদীর ঘাট সারানো হচ্ছে। মালাবার টিকের বিশাল বিশাল তক্তা এসেছে। নৌকায় মাল তোলার সময় এল। নদী দিয়েই নৌকা সরাসরি যাবে কলকাতা বন্দরে। গতবার নদীতে আমাদের বেশ কয়েকটা নৌকা ডাকাতি হয়েছিল। তাই এবার প্রত্যেক নৌকার সাথে একজন বন্দুকধারী সেপাই থাকবে। তাছাড়া রবিন বলেছে ওর সাথে কমিশনার মিঃ হ্যারিসনের কথা হয়েছে। কলকাতা থেকে একটা পুলিশের লঞ্চ সেই সময়ে এইদিকে নদীতে টহল দেবে।
আমাদের হেড অফিস থেকে অর্ডার এসেছে সবাইকে কাজ চালানোর মত বাংলা শিখতে হবে। রবিন
গোটা পাঁচেক বাংলা বই দিয়ে গেছে। কিন্তু শেখাবে কে? এখানে গ্রামে বেশিরভাগ লোক লেখাপড়া শেখেই না। কিছু ব্রাহ্মণ পণ্ডিত নিজের বাড়িতে স্কুল চালান। কিন্তু তাঁরা আবার ইংরেজি জানেন না। মহা মুশকিল। তবে পড়তে না পারলেও আমি ইতিমধ্যেই কিছু বাংলা কথা শিখেছি।
প্রথম পর্ব: চণ্ডী মন্দিরের বাঘ
২৬শে অগাস্ট
দুপুরে বাঁকুলি গ্রামে গিয়েছিলাম। ওদিক থেকে আখ আসা কমে গেছে। সেটাই তদন্ত করতে যাওয়া। গিয়ে শুনি এক কুমিরের উপদ্রবে নাকি লোকে আখের ক্ষেতে যাওয়া বন্ধ করেছে। সেই গ্রামে আখের ক্ষেত নদীর পাশেই। নদী থেকে নাকি একটা কুমির কদিন হল উঠে আসছে। সে নাকি আখের ক্ষেতে লুকিয়ে বসে থাকে। তারপর চাষিরা যখন আখ কাটতে ব্যস্ত, সেই সময়ে আচমকা টেনে নিয়ে চলে যায়। গত সপ্তাহে দুটি কিশোর আর একজন মহিলাকে এইভাবে কুমিরের পেটে যেতে হয়েছে।
কেলম্যান আমার সাথেই ছিল। ওর হাতে উইনচেস্টার। আমিও ম্যানলিখারটা সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম।
দুজনে মিলে সেই নদীর পাড়ে কাদায় খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। এইখানে বর্ষার শেষে নদীর পাড়ে এক
ধরণের সাদা ঘাসফুল হয়। দেখতে খুব সুন্দর লাগে। আমি ডায়েরিতে কিছু ছবি এঁকেছি, কিছু নমুনাও
সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু সেই ফুলের উজ্জ্বল সাদা রং শুকিয়ে গেলেই বিবর্ণ হয়ে যায়। ভাবছি
এই ফুলের কিছু বীজ দেশে নিয়ে যাব। আমাদের লীডসে আয়ার নদীর পাড়ে এই বীজ ছড়িয়ে দিয়ে
দেখতে হবে ফুল হয় কিনা।
যাই হোক, কুমিরের কথায় আসি। প্রথমে কিছুই পেলাম না। তারপর একটা জায়গায় দেখলাম ভিজে
মাটিতে কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগ। তার মধ্যে কাদায় কোনও পশুর লোম আর রক্ত লেগে আছে।
গ্রামের লোকেরা ভয়ে ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের মধ্যে একজনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, গতকাল বা আজকে কুমির কি কোনও গবাদি পশু শিকার করেছে?
সে মাথা নেড়ে জানাল যে, গ্রামের তিনকড়ির দুধেল গাইটা গত রাতে অদৃশ্য হয়েছে। আজ সকালে
দেখা গেছে গোয়ালের বেড়া ভাঙ্গা। কেলম্যান বলল, "ওকে জিজ্ঞাসা কর যে একটা ছাগল আমাদের ধার দিতে পারবে কিনা। তাহলে আজকেই আমরা এই শয়তানের নিকেশ করব।"
আমি ভাঙ্গা বাংলায় সেই কথা বলতেই লোকটি সোৎসাহে রাজি হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাগলটাকে একটা খুঁটিতে বেঁধে আমরা আখের ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম নদীর দিকে। ছাগলটা মহানন্দে ডাকাডাকি করতে করতে নদীর পাড়ের কচি ঘাস খেতে লাগল।
ছাগলটা মাঝে মাঝেই ডেকে উঠছিল। আমরা একদৃষ্টে তার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম আর সেই খেতের মশারা আমাদের দুজনের শরীরে জম্পেশ এক ভোজসভা বসিয়ে দিল। যখন প্রায় সূর্যাস্ত, হঠাৎ নদীর পাড়ে হোগলা বনে একটা শব্দ শুনে দেখি কুমিরটা মুখ বাড়িয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের ট্রিগার টিপতে যাচ্ছিলাম। কেলম্যান আমাকে হাতে চাপ দিয়ে বারণ করল। আমার কানে ফিসফিস করে বলল, 'কুমিরের চামড়া বুলেট আটকে দিতে পারে। আরও কাছে না এলে ঠিক জায়গায় তাক করতে পারবে না।"
আমরা দুজনে বন্দুক উঁচিয়ে সেইদিকেই তাকিয়ে রইলাম। কুমিরটা আস্তে আস্তে চারিদিক দেখে
নিয়ে, ছাগলটার দিকে এগিয়ে এল। সে যখন পুরো হোগলা বন থেকে বেরিয়ে এল, আমার মুখ থেকে
আপনা হতেই একটা বিস্ময়সূচক শব্দ বেরিয়ে এল। দানবটা লম্বায় অন্তত বারো ফুট হবে। এরপর
হঠাৎ একটা কানফাটানো শব্দে বুঝলাম কেলম্যানের উইনচেস্টার গর্জন করে উঠেছে। সেই বুলেটের ধাক্কায় দানবটা ছিটকে কাদায় পড়ে গেল। আমরা দুজনেই দৌড়ে গেলাম। তার গলার একপাশ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে; তারমধ্যেই একবার শেষবার মখ হাঁ করে সেটা আমাদের আক্রমণের চেষ্টা করল। আমি তার চোখের ঠিক নীচে আরেকটি বুলেট ফুঁড়ে দিয়ে তার ভবলীলা সাঙ্গ করলাম। কিন্তু অত কাছ থেকে তার কদাকার দাঁতের সারির যে দৃশ্য দেখলাম, সেটা অনেকদিন আমার দুঃস্বপ্নে থেকে যাবে।

এরপর গ্রামের লোক প্রায় আমাদের কাঁধে তুলে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। বিশাল একটা মুরগি আমাদের দেওয়া হল রাতের জন্য। ঘোড়ায় চড়ে যখন ফিরছি, তখন কেলম্যান বলল, "বন্দুকটা পয়া বুঝলে। বাঘটাও রেহাই পাবে না।" কুমিরের চামড়াটা ছাড়িয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিতে বলেছি। ওটা খাতার মলাট হিসাবে দারুণ হবে। ফেরার সময় দেখলাম গ্রামের লোক একটা বিশাল ড্রামের মত বাজনা বাজিয়ে উৎসব করছে। আক্রম বলল, ওই বাজনার নাম এদেশের ভাষায় “ঢোল”। কিছুদিন পরে এখানে হিন্দুরা এক বিশা পুজোর আয়োজন করবে। তখন নাকি এই বাজনা দিনরাত বাজবে। এই পুজোটার নাম আমি আগে শুনেছি। একে বলে দুর্গা পূজা। কলকাতায় আমাদের হেড অফিসের অনেকেই নেটিভ বাড়িতে এই পুজোয় নিমন্ত্রণ পায়।
৩০শে অগাস্ট
কয়েকদিন আবার বৃষ্টি হচ্ছে। মার্টিন আজকে ফিরেছে। অক্টোবরের আগে কলকাতা থেকে জাহাজ নেই কোনও। ওর পা এখন অনেকটা ভালো। কলকাতা থেকে কিছু বাংলা বই ও নিয়ে এসেছে। সেগুলো এখানে চার্চের স্কুলে দেবে বলল। চার্চের ফাদার এখানে একটা ফ্রী স্কুল চালু করেছেন। শুনলাম একজন ফাদার এখানের চার্চে আসছেন। উনি আসলে হিন্দু নেটিভ। খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে ফাদার হয়েছেন। এনার কাছেই আমাকে বাংলা শিখতে হবে। আমাদের চিনি উৎপাদন ভালোই চলছে। কালকে মাসের শেষ দিন। রবিন হয়ত আসবে। এবার কিছু টাকা চাইতে হবে। আমাদের রান্নাঘরটার চাল ভেঙ্গে পড়েছে। তাছাড়া ফ্যাক্টরির পাশের জঙ্গল সাফ করতে হবে। প্রায়ই সেখানে সাপ বেরোয়।আজকে ডাকবাংলোর সামনে একটা গোসাপ এসেছিল। আমি এক গুলিতে সাবাড় করলাম। আমার দেশের লোক যদি এই প্রাণীটা দেখতে পেত, তাহলে চমকে যেত। এটা যে আসলে একটা বড় টিকটিকি, সেটা জানলে আমার লীডসের বন্ধুদের চোখ কেমন কপালে উঠবে, সেটা ভেবেই আমার হাসি পাচ্ছে। এখন সেটা ঘরের বাইরে টাঙ্গিয়ে রেখেছি। আক্রম ভালো চামড়া ছাড়াতে পারে। রোদ উঠলে ও বলেছে চামড়া ছাড়িয়ে দেবে। একটা জুতো বানাতে হবে। কলকাতায় শুনেছি খিদিরপুর অঞ্চলে খুব ভালো কারিগর পাওয়া যায়। কলকাতায় গেলে চামড়াটা দিয়ে আসব। অনেক দিনের শখ এটা আমার। আরেকটা শখ একটা বেজির চামড়ার স্কার্ফ বানানোর। এদিকে মাঠে হাঁটার সময়ে প্রায়ই দেখি বেজির ছুটোছুটি। আক্রমকে বলেছি কয়েকটা বেজি ধরে দেবার জন্য। ও বলেছে এদিকে জঙ্গলের মধ্যে একটা গ্রামে “বেদে” নামে এক গোষ্ঠীর লোক বাস করে। ওরা নাকি ফাঁদ পেতে পশু ধরতে ওস্তাদ। ওদের সঙ্গে কথা বলে ও ব্যবস্থা করবে।
৫ই সেপ্টেম্বর
কাল রাতে কেলম্যান প্রায় নিজের প্রাইজ ব্যাগে পুরে নিয়েছিল। রাত্রি নটা নাগাদ ও চণ্ডীপুরের বাইরে একটা বট গাছে মাচা বেঁধে বসে ছিল। পূর্ণ চাঁদের আলো উঠল দশটা নাগাদ। হঠাৎ ও দেখে একটা কালো ছায়ার মত বাঘটা নিঃশব্দে গাছের নীচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ও সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক ছুঁড়েছিল। কিন্তু বাঘটার কিছুই নাকি হয়নি। ওর কথা অনুযায়ী, বাঘটা নাকি হঠাৎ করেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। অথচ, যেখানে সেই বটগাছটা ছিল, সেটা জঙ্গল থেকে একটু দূরে। সেখানে কাছাকাছি কোনও ঝোপঝাড় নেই। ফাঁকা মাঠ আর রাস্তা। আর একদিকে একটা পুকুর। বাঘটা দৌড়ে গেলেও চাঁদের আলোয় দেখা যাওয়ার কথা। পরে গাছ থেকে নেমে ও দেখেছে যে ওর ছোড়া গুলি মাটিতে বিঁধে আছে। পাশেই বাঘের পায়ের ছাপ। তাহলে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল কি করে? আজকে আবার ও বসবে। আমিও ওর সাথেই বসব।

কুমিরের চামড়া এসে গেছে। দারুণ দেখতে লাগছে। আক্রম নাকি কিছুটা চামড়ার কাজ জানে। ওকেই ওটা দিয়ে বলেছি আমার সব ব্যক্তিগত বই আর খাতায় মলাট করে দিতে। আমাদের শহরে আমার ছোটবেলায় একজন ভদ্রলোক ছিলেন, নাম বোধহয় মিঃ কুইন। উনি আফ্রিকা এক্সপ্লোরার ছিলেন। ওনার বাড়িতে ছোটবেলায় গিয়ে দেখেছিলাম এরকম কুমিরের চামড়ার বাঁধানো বই। এবার আমার বাড়িতেও সেই জিনিস শোভা পাবে।
৭ই সেপ্টেম্বর
৫ তারিখ যে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল, সেটা লিখে রাখতেই হবে। সেদিন রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে বন্দুক, কার্তুজ, চায়ের ফ্লাস্ক ইত্যাদি নিয়ে আমরা দুজনে সেই মাচায় উঠে বসলাম। এটা বেশ শক্ত বাদাম গাছ। অল্প বৃষ্টি পড়ছিল। দুজনের গায়েই বর্ষাতি ছিল। রাত্রি এগারোটা নাগাদ আকাশের মেঘ কেটে গিয়ে পরিষ্কার চাঁদের আলো বেরিয়ে পড়ল। গাছের নীচে, সামনেই সেই ডাকাতিয়া মাঠ। তার সীমানাতেই একটা বাছুর বেঁধে রেখেছি। বাছুরটা বেশ কয়েকবার ডাকাডাকি করে পা ভেঙ্গে শুয়ে পড়ল। আমরা দুজনে বন্দুকের ক্যাচ খুলেই তাক করে বসে আছি। উইঞ্চেস্টার আর ম্যানলিখার—দুটোই সিঙ্গল ব্যারেল। টোটা ভরে আমরা রেডি। আমাদের গাছের ওপর থেকে হঠাৎ একটা পেঁচা সজোরে ডেকে উড়ে গেল। আমি প্রায় চিৎকার করে উঠছিলাম ভয়ে, কেলম্যান আমার হাত চেপে ধরে আমাকে থামাল। ছোট ছোট পিঁপড়ে আমাদের পোশাকের মধ্যে ঢুকে কুট কুট করে কামড়াচ্ছে। আমরা কোনরকমে সহ্য করে বসে আছি।
এই সময়ে হঠাৎ মনে হল চারিদিকে সব স্তব্ধ। আকাশে তাকিয়ে দেখলাম, সব পরিষ্কার; কোথাও মেঘ নেই। একটা বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া এতক্ষণ বইছিল। সেটাও থেমে গেছে। কিন্তু আসল ব্যাপার হল, রাতের জঙ্গলে যে নানারকম শব্দ থাকে, যেমন---- সরীসৃপের গাছের পাতার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, রাতপাখির শিকার ধরা, ঝরা পাতার ভেতর দিয়ে সাপের চলাচল, গাছের ডালে বানরের ওঠানামা, এবং অবশ্যই নানা পোকার বিচিত্র ডাক—সমস্ত শব্দ যেন আচমকা থেমে গেল। আমি আর কেলম্যান একে অন্যের দিকে তাকালাম। তারপর দুজনেই সেই সামনের বাছুরটার দিকে তাকালাম। সেটা এখন উঠে দাঁড়িয়েছে। তাকিয়ে আছে আমাদের ডান পাশে। আমি ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে সেইদিকে তাকিয়ে দেখলাম। ডানপাশে দূরে আমাদের কুঠি। তারপর মাঠ আর জঙ্গল। সেই সাদা ঘাস্ফুলে চারিদিক ভরে আছে। চাঁদের আলোয় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। কিন্তু কোনও প্রাণী আসতে দেখলাম না। প্রায় আধ ঘণ্টা এইভাবে থাকার পর আমার একটু ঘুম এসে গিয়েছিল। বন্দুকটা কোলের ওপর রেখে আমি একটু ঝিমিয়ে পড়েছি, হঠাৎ ঊরুতে একটা চিমটির জ্বালায় ঘুমটা ভাঙল। কেলম্যান ডাকছে। আমি চোখ মেলতেই ও আঙ্গুলের ইশারায় সামনের দিকে দেখাল। আমি তাকিয়ে দেখি সেই বাছুরটা মাটিতে শুয়ে আছে। আর তার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো প্রাণী। চাঁদের আলোয় বুঝতে ভুল হল না। একটা পূর্ণবয়স্ক বাঘ। সেটা মাথা নিচু করে বাছুরের দেহ থেকে খাচ্ছে।
কিন্তু কখন এল এটা? কোন পথ দিয়ে এল? আমরা দুজনেই তো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছিলাম। এই ফাঁকা মাঠে লুকিয়ে লুকিয়ে আসাও তো সম্ভব নয়। আর বাছুরটাকে মারল কখন? কোনও শব্দ পেলাম না তো! কেলম্যানের দিকে তাকিয়ে দেখি ও উইনচেস্টার তাক করছে। দুরত্ব বড়জোর পঞ্চাশ গজ। উইনচেস্টার রাইফেলের কাছে এটা কিছুই নয়। কেলম্যান এটা দিয়ে আমার সামনেই ছুটন্ত বুনো শুয়োর মেরেছে একশো গজ দূর থেকে।
কেলম্যানের বন্দুক পর পর দুবার শব্দ করে উঠল।
কিন্তু আশ্চর্য। সেই বাঘ নিজের জায়গা থেকে নড়ল না। কেলম্যান দ্রুতহাতে লিভারটা একবার নীচে, আর একবার ওপরে করে আবার লোড করে আবার একবার ফায়ার করল। এবার বাঘটা বাছুরের থেকে মুখ তুলে আমাদের দিকে তাকাল। তারপর এক পা এক পা করে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। আমি আমার ম্যানলিখার থেকে ফায়ার করলাম। বাঘটা দুলকি চালে কয়েক পা এগিয়ে পাশের জঙ্গলে ঢুকে চলে গেল। এরপর সারা রাত আমরা দুজন ওইভাবেই মাচায় বসে রইলাম। বাছুরের মৃতদেহ ওভাবেই পড়ে রইল। সকালে দেখি আক্রম কয়েকজন লোক নিয়ে পা টিপে টিপে আসছে। আমরা মাচা থেকে নেমে আসার পর ও জানাল যে, রাতেই কুঠি থেকে ওরা বন্দুকের শব্দ শুনেছে। কিন্তু রাতে আর আসার সাহস পায়নি। সকালে উঠে লোক জোগাড় করে ওরা সবাই এসেছে। ওরা প্রায় দশজন এসেছিল। সঙ্গে একটা বিশাল লম্বা বাঁশ আর দড়ি। আমি বুঝলাম যে, যদি বাঘটা মারা পড়ে থাকে, তাহলে সেটাকে বেঁধে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওই আয়োজন। দলের মধ্যে সেই সাধুও ছিল। বামদেব। সে দেখি বাছুরের মৃতদেহটার কাছে গিয়ে কি যেন দেখছে।
আমি বললাম, “কী দেখছ?”
"সাহেব, এটা সেই হরিয়া বাঘ। সন্দেহ নেই।"
“কী করে বুঝলে?”
"ওর ওপরের একটা দাঁত ভাঙ্গা। বাছুরের গায়ে যে দাঁতের দাগ আছে, সেটা দেখুন।"
আমি গিয়ে দেখলাম। সত্যি, একদিকে দাঁতের দাগ নেই।
বামদেব বললেন, "সাহেব, হরিয়া ডাকাতেরও একটা দাঁত ভাঙ্গা ছিল। একবার নরবলি দেওয়ার
সময়ে কোনোভাবে সেই বলি দেওয়ার জন্য নিয়ে আসা ব্যক্তি হাতের দড়ি খুলে পালাতে গিয়েছিল।
হরিয়ার সঙ্গে হাতাহাতি হয়। সেই সময়ে ওর একটা দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল।"
আমি আর কথা বাড়ালাম না। কুসংস্কার যাদের থাকে, তাদের সাথে তর্ক করলে বিপদের সম্ভাবনা।
যখন চলে যাচ্ছি, তখন দেখি পাশের বটগাছটায় দুটো শকুন বসে আছে। কিভাবে যে এরা খবর পায়,
কে জানে!
৮ই সেপ্টেম্বর
আক্রম চমৎকার মলাট বানিয়ে দিয়েছে। আমার এই ডায়েরিটা দারুণ লাগছে দেখতে। এটা নিয়ে লীডসে আমার বসার ঘরের শোকেসে রাখলে দারুণ লাগবে। কিন্তু কাজের কথায় আসি। আজকে খবর পেলাম। পরশু রাতেই মৌখালি নামে একটা গ্রামে একজন বাঘের শিকার হয়েছে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, এই গ্রামটা আমাদের সেই মাচার থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূরে। পথে দুটো খাল পেরোতে হয়। যদি সেদিন মাঝরাতে আমরা বাঘটাকে দেখে থাকি এখানে, তাহলে সেই বাঘ ভোরের মধ্যে অতদূরে গিয়ে শিকার করল কি করে?
আমি কথায় কথায় বললাম, একাধিক মানুষখেকো নেই তো?
মার্টিন জানাল যে, সেটা সম্ভব নয়। নেকড়ে বা বুনো কুকুর দল বেঁধে শিকার করে। সিংহও করে। কিন্তু বাঘ শিকার করে একা। এরা প্যাক হান্টার নয়। আর একটা বাঘের গণ্ডীর মধ্যে আরেকটা কখনই আসবে না। তাহলে দুটোর মধ্যে মারামারি হবে আর যে কোনও একটার দেহ জঙ্গলে পাওয়া যাবে।
বামদেবের কথা মনে পড়ল। ভূতুড়ে বাঘ!
কিন্তু না। এইসব চিন্তাকে মনে প্রশ্রয় দেব না। পরম করুণাময় যীশু আমার সহায়।
কেলম্যান আজকেই সেই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল ঘোড়ায় চেপে। আক্রমও সঙ্গে গেল।
আমার যাওয়া সম্ভব নয়। রোজকার ফ্যাক্টরির হিসাব দেখতেই হবে। পাওনাগণ্ডা একবার ভুল হলে খুব মুশকিল।
নতুন ফাদার এসেছেন। এনার নাম মাইকেল মহাদেব রায়। বেশ ভালো লোক।
১২ই সেপ্টেম্বর
আর লিখতে ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে সব কাজ ছেড়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যাই। একটা রামের বোতল শেষ। আরেকটা খুলে লিখছি। হাত কেঁপে যাচ্ছে। যতক্ষণ মোমবাতি জ্বলছে, ততক্ষণ লিখব।
আগের দিন কেলম্যান আর আক্রম তো মৌখালি চলে গেল। ১০ তারিখ কোনও খবর পেলাম না। সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি। কুঠির সামনে হাঁটুজল। আমি আর মার্টিন ঘরেই আটকে ছিলাম। ভাবলাম, বৃষ্টির জন্য ওরা ফিরতে পারেনি। তারপর গতকাল দুপুরে দেখি আক্রম পালকি করে ফিরছে। আমরা ছুটে গিয়ে দেখি পাল্কির ভেতরে বেচারা শুয়ে আছে; ওর একটা পায়ে গাছের ডাল বুনো লতা দিয়ে বাঁধা। এটার মানে আমি জানতাম। এইসব দিকে পা ভেঙ্গে গেলে এইভাবে বেঁধে দেয়। কিন্তু আক্রমের পা ভাঙল কী করে? আর কেলম্যানই বা কোথায়? আমি কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই আক্রম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। যাই হোক, ওকে তুলে ঘরে এনে বিছানায় শোয়ানোর পর আগে একটু ব্র্যান্ডি দিলাম। তারপর আস্তে আস্তে ও মুখ খুলল। সাহেব, আমরা সেদিন রাত্রেই মৌখালি পৌঁছে গেলাম। গ্রামের একজন নিচু জাতির মহিলা বাঘের শিকার হয়েছিল। তার দেহটা তখনও গ্রামের বাইরে পড়ে ছিল। নিচু জাতি বলে, কে ওই মৃতদেহ সৎকার করবে, সেটা কেউ ঠিক করতে পারেনি। কেলম্যান সাহেব সেটা দেখে বলল, " আজকে কাউকে কিছু করতে হবে না। আজ রাতে ওখানেই থাক। কালকে আমি সৎকারের ব্যবস্থা করব।"
গ্রামের লোক চলে যাওয়ার পর কেলম্যান সাহেব আমাকে বলল, "ওই আম গাছে একটা মাচা বাঁধার ব্যবস্থা কর। আজকে রাতেই শয়তানটাকে সাবাড় করছি।"
আমি বুঝলাম সাহেবের মতলব কী। মানুষখেকো বাঘ শুনেছি শিকারের মড়ির কাছে ফিরে আসে। সেই সুযোগ ব্যবহার করে কেলম্যান সাহেব ওকে মারবেন।
আমি আর গ্রামের কয়েকজন বাঁশ আর তক্তা জোগাড় করে মাচা বাঁধলাম। সাহেব কিছু না খেয়ে শুধু একটা হুইস্কির বোতল নিয়ে গাছে উঠলেন। বললেন, "আজকে পুরো জেগে থাকতে হবে। ঘুম নয়।"
আমি উঠলাম পাশের একটা বট গাছে। চাঁদ অনেক দেরিতে উঠল সেদিন। আমরা দুজনেই দুই গাছ থেকে সেই মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে আছি। কেলম্যান সাহেবের একটা চুলও নড়ছে না। উনি বন্দুক তাক করে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। কয়েকবার একটা দুটো শেয়াল দেহটার কাছে এসে শুঁকে চলে গেল। আর কিছুই নেই। রাত্রি তখন অনেক। হঠাৎ আমরা দেখি সেই দেহের ওপর বাঘটা দাঁড়িয়ে আছে। আমি সাহেবের গাছের দিকে তাকিয়ে দেখি সাহেব আমার দিকে তাকিয়েই মুখে আঙুল দিয়ে আমাকে চুপ করে থাকতে বলছেন। আমার তো তখন ভয়ে প্রাণ ধুকপুক করছে। না বললেও গলা দিয়ে শব্দ আমার বেরতো না। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার এটাই সাহেব যে, বাঘটা যে কোথা দিয়ে এল, সেটা আমরা কেউ দেখতে পেলাম না। চারিদিকে মাঠ আর পুকুর। বাঘটা গা ঢাকা দিয়ে এল কি করে?
যাই হোক, কেলম্যান সাহেব বন্দুক ছুঁড়লেন।
একবার—দুবার—তিনবার।
বাঘটা জায়গা থেকে নড়ল না। অথচ, সাহেবের গাছ থেকে বাঘটার দুরত্ব খুব বেশি হলে কুড়ি গজ।লক্ষ্য মিস করার ব্যাপার নেই। বাঘটা দেহটা থেকে মাংস ছিঁড়ে খেতেই থাকল। কিন্তু এই সময়ে একটা ব্যাপার হল। কেলম্যান সাহেবের ঘোড়াটা বাঁধা ছিল গ্রামের একদম সীমানায় একটা গোয়ালে। বন্দুকের শব্দে হোক, বা অন্য যে কোনও কারণেই হোক, ঘোড়াটা এই সময়ে ডেকে উঠল কয়েকবার।বাঘটা সেই ডাকটা শুনেই একবার কান খাড়া করে ফিরে তাকাল। তারপর দেহটা ছেড়ে পা বাড়াল সেই গোয়ালের দিকে।
কেলম্যান সাহেব আরেকবার বন্দুক ছুঁড়লেন। কিছুই হল না। বাঘটা গোয়ালের দিকেই হাঁটতে লাগল। এইসময়ে সাহেব হঠাৎ একটা চিৎকার করে উঠলেন। আমি ফিরে দেখি—সর্বনাশ। সাহেব বন্দুক নিয়ে গাছ থেকে লাফিয়ে নামছেন। আমি বারণ করলাম। সাহেব শুনলেন না। ঘোড়াটা ওনার প্রাণের চেয়েও প্রিয়। সেই ঘোড়া বাঘের পেটে যাবে, উনি যে সহ্য করবেন না, সেটা আমি জানতাম। কেলম্যান সাহেব মাটিতে লাফ দিয়ে নেমেই বাঘের পেছনে দৌড়তে শুরু করলেন। একবার থেমে গুলি ছুঁড়লেন। আবার দৌড়তে শুরু করলেন। এরপর বাঘ আর সাহেব—দুজনেই গাছের ছায়ার আড়ালে চলে গেলেন।

আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছি, এই সময়ে হঠাৎ শুনি বন্দুকের শব্দ, আর তারপরেই বাঘের গর্জন। সে কী গর্জন সাহেব। আমার তো পুরো আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেল। সেই গর্জনে হাতের বাঁধন আলগা হয়ে আমি গাছ থেকে পড়েই গেলাম।
উঠতে গিয়েই দেখি ডান পায়ে অসহ্য ব্যথা। আর মট করে একটা শব্দ। বুঝলাম যে পা ভেঙ্গেছে।
আর কিছু করার ছিল না। সারা রাত সেইভাবেই পড়ে রইলাম। সেই গর্জনের পর বাঘের ডাক আর
শুনিনি। সাহেবকেও আর দেখিনি। আমি শুধু সারারাত আল্লার নাম জপ করে কাটিয়েছি।
পরদিন সকালে গ্রামের লোক সেদিকে এসে আমাকে উদ্ধার করল। তারপর গ্রামের বৈদ্য আমার পা বেঁধে দিল।
গ্রামের লোক জানাল যে, সেই আম গাছ থেকে গ্রামের গোয়ালের রাস্তায় মাঝপথ অবধি বাঘের পায়ের ছাপ ছিল। তারপর আর কোনও দিকে কোনও ছাপ নেই। সাহেবেরও পাত্তা নেই। তারও পায়ের ছাপ সেই জায়গায় এসেই থেমে গেছে। কোনও রক্তের দাগ নেই—না বাঘের, না সাহেবের। সন্ধ্যের দিকে গ্রামের পুকুরের পাশে সাহেবের শোলা হ্যাট আর বন্দুক পাওয়া গেল। কিন্তু আর কিছুই নেই। কিন্তু গ্রামের কয়েকজন শপথ করে বলেছে যে, আমাকে উদ্ধারের পর ওরা বেশ কয়েকবার সেই পুকুরের পাশ দিয়ে যাতায়াত করেছে। বিকেল অবধি ওখানে এইসব জিনিস ছিল না। আরেকটা ব্যাপার
সাহেব। বন্দুকটা আমি নিয়ে এসেছি। আপনি দেখুন, টোটা ভরাই আছে। তাহলে আমি যে বন্দুকের শব্দ শুনলাম, সেটা কি ছিল?
১৪ই সেপ্টেম্বর
এখনও লেখার শক্তি নেই। তরতাজা যুবক কেলম্যান। এই বিদেশে এসে এভাবে চলে গেল বেচারা। দেহটা অবধি পাওয়া গেল না! মার্টিন কলকাতায় খবর দিয়েছে। কেলম্যানের বাড়িতে চিঠি পাঠাতে হবে। ওর জিনিসপত্র ফেরত পাঠাতে হবে। কিছুই ভালো লাগছে না। বামদেব আজকে একবার এসেছিলেন। উনি বললেন, "সাহেব, বলেছিলাম এই অমাবস্যার কয়েকটা দিন সাবধানে থাকবেন। শুনলে ওই নতুন সাহেবকে এভাবে চলে যেতে হত না। যাই হোক, আমি গুণে দেখেছি যে, মায়ের রক্ত পিপাসা পূর্ণ হয়েছে। আর আপনারা এই উপদ্রব দেখবেন না।"
।।
এই ঘটনার বর্ণনা এখানেই শেষ। ডায়েরিতে এরপর অন্যান্য অনেক ঘটনার কথা আছে। সেসব অন্য কোনও দিন বলব। কিন্তু এই নিয়ে আর কিছু লেখা নেই। অবশ্য এই তারিখের পর প্রায় দুমাস সেই ডায়েরিতে কোনও লেখা নেই। অনুমান করা যেতেই পারে যে, বন্ধুর মৃত্যুতে লেখক মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। কিন্তু শেষ একটা এন্ট্রি না দিলে কাহিনী অপূর্ণ থেকে যাবে।
।।
১১ই ফেব্রুয়ারি
আজকে আমাদের কুঠি থেকে অনেক দূরে একটা জলায় বালিহাঁস শিকারে এসেছিলাম। সঙ্গে ছিলেন মিঃ জিমারম্যান। নৌকায় করে জলায় ঢুকে প্রচুর হাঁস শিকার হল। নৌকা বোঝাই হয়ে গেল। শীতের শেষে বালিহাঁসের ঝাঁক জলার চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। ছররা বন্দুক একবার ফায়ার করলেই আকাশ থেকে বৃষ্টির মত হাঁসের দেহ খসে পড়ছে। আজ রাতে মহাভোজ হবে। কিন্তু এখানে একটা আশ্চর্য ঘটনা দেখলাম। জলার মাঝে একটা ছোট দ্বীপ আছে। সেই দ্বীপে নাকি এককালে একজন তান্ত্রিক মন্দির বানিয়েছিলেন। সেই মন্দির আর নেই। বন্যায় ভেসে গেছে অনেক আগেই। আমরা নৌকা নিয়ে সেই দ্বীপের কাছে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মাঝি বৈঠা দিয়ে কিছু একটা ঠেলে দেখাল। এক পাটি জুতো। এই জলায় অনেকেই শীতকালে পাখি শিকারে আসে। সুতরাং তাদের কারুর জুতো পড়ে যাওয়া বিচিত্র নয়।
কিন্তু জুতোটা দেখে আমি চমকে গেলাম। এই হলুদ আর কালো ডিজাইন তো আমি দেখেছি! প্রথমে মনে পড়ল না। তারপরেই বিদ্যুৎচমকের মত মনে পড়ল---এটা সেই কেলম্যান পরত। কিন্তু ওর জুতো এখানে এল কি করে। এই জলা আমাদের এলাকা থেকে অন্তত পঞ্চাশ মাইল। কেলম্যানের জুতো এখানে এল কী করে?

বাঘটা কি ওকে মেরে, দেহটা মুখে করে এখানে এসেছিল?
আমরা নৌকা নিয়ে পুরো দ্বীপটাই প্রদক্ষিণ করলাম। কিন্তু আর কিছু পেলাম না। সন্ধ্যে হয়ে আসছিল। সঙ্গের লোকেরা আর কেউ সেই জলায় থাকতে রাজি হল না।
২৭শে ফেব্রুয়ারি
বামদেব আজকে এসেছিল। লোকটা বুজরুকি দেখিয়ে টাকা রোজগার করলেও এমনিতে খারাপ না। ওরওইসব ব্ল্যাক ম্যাজিক বাদ দিলে ওর সাথে কথা বলতে ভালোই লাগে। এখন আমি বাংলাতেই কথা বলি।
ওকে কথায় কথায় এই দ্বীপের কথা বললাম।
ও উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কোথায় শিকার করতে গিয়েছিলেন আপনারা?”
আমি জায়গার নাম বলতেই ও বলল, "সাহেব, ওই বিলের আসল নাম জানেন? চণ্ডীমাতার বিল। হরিয়া ডাকাতের যিনি তান্ত্রিক গুরু, তিনি ওই বিলের পাশেই থাকতেন। ওই দ্বীপের মন্দির ওনারই
স্থাপিত।" বলে মাথায় হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করল। যাওয়ার সময়ে বলে গেল যে ও ডাকাতিয়া চণ্ডী মন্দিরে কেলম্যানের নামে একটা পুজো দেবে পরের অমাবস্যায়।
আমি আর কিছু কথা বাড়ালাম না।
আজকে একটু আগে চার্চে গিয়েছিলাম। কেলম্যানের নামে আমরা একটা পাথর স্থাপন করেছি চার্চের বাইরে। সেখানে গিয়ে আমি একবার প্রার্থনা করে এলাম।।
(সমাপ্ত)
লেখক পরিচিতি: ডা: রুদ্রজিৎ পাল একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও লেখক।







Comments