top of page
rules - Copy.png
KANHA MAY 26.jpg

চাপড়ামারির রাত

  • ..
  • 17 hours ago
  • 5 min read

পশ্চিমবাংলার উত্তরভাগে ডুয়ার্সের অরণ্য চাপড়ামারি। সেখানকার বনবাংলোয় থাকার আকর্ষণ বরাবরই অনন্য। সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা উঠে এল সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়ের কলমে।



মাঘের  শেষ,  পরিপূর্ণ   বসন্ত  এখনও   আসেনি।  তবে   হাওয়ায়  তার  ছোঁয়া  লেগেছে।  অনেকবছর  পর  আবার  চলেছি  চাপড়ামারি।  এখন  মধ্য  ষাট  পেরিয়ে  আবার  একবার  সেই  দুরন্ত   জঙ্গলের  হাতছানি।  সেবার  চাপড়ামারির  ওয়াচটাওয়ারে  উঠে  লোভী  দৃষ্টিতে  তাকিয়ে  ছিলাম  ঠিক  তার  বাঁদিকে  দাঁড়িয়ে  থাকা  বন বাংলোর  দিকে।   আজ  সারাটা  দিনরাত  কাটাবো  সেখানে।  উত্তরবঙ্গে  গরুমারা,  চাপড়ামারি,  খুটিমারি,  হলং  বন বাংলো  অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পথের  দুধারে  থাকা  আকাশছোঁয়া  শাল,  শিমুল,  লালি  আর  ছোট  ছোট  ঝোপঝাড়,  তারাও  রয়েছে  সঙ্গে।   চালসার  আগে  বাতাবাড়ি  বাজারে  গাড়ি  থামাতে   হল। গরুমারার  ডি এফ ও  অফিস  থেকে  বলে  দিয়েছে  চাল, ডাল, সব্জি,  রান্নার  তেল মশলা,  এমনকি  চা  চিনি  সবকিছু  সঙ্গে  করে  নিয়ে  যেতে।  বাংলোর   চৌকিদার  রান্না  করে  দেবে।  অবশ্যই  তার  জন্য  আড়াইশো  টাকা  দিতে  হবে।  তা হোক,  এই  বন বাংলোতে  দিন যাপনের   জন্য  এ  নিতান্তই  তুচ্ছ।  বাজারে  তখনও  ভালই  রয়েছে  লোকজনের  আনাগোনা।  মুদি  দোকানের  দোকানদারও  একটু  ব্যস্ত  খদ্দের  সামলাতে।  তবে  লিস্টি  মিলিয়ে  বেশ  গোছ  করেই  সব  জিনিসপত্র  দিল।  চালসা  পেরিয়ে  খুনিয়া  মোড়  হয়ে  রাস্তা  সোজা   এগিয়ে  গেছে  একেবারে  সীমান্তে  ঝালং, বিন্দুর  দিকে।  লেভেল  ক্রশিং  ফাঁকাই  ছিল।  তা  টপকে  খানিক  এগিয়ে  চাপড়ামারি  অভয়ারণ্যের  প্রবল  উপস্থিত  ঘোষণা   করছে   সবুজ  আর  সাদা  রঙের  বাঁশের  তৈরি   গেট।  তার  সামনেই  ফেলা  রয়েছে  গাছের  গুঁড়ি  কেটে  বানানো  চেক  গেট।  বিনা  অনুমতিতে  প্রবেশ  নিষেধ।  বনদপ্তর  থেকে  বলাই  ছিল,  ঢুকতে  কোনো  অসুবিধের  সম্মুখীন  হতে  হল না। 



মায়াজড়ানো   এই  বনপথই   এগিয়ে  গেছে  ওয়াচ টাওয়ার  আর  তার  পাশে  বন বাংলোর  দিকে।  দুদিকের  গাছেরা  যেন  অনিচ্ছাতে  পথ  ছেড়ে  দিয়েছে।  পথের  ধারে  কয়েকটা  হরিণের   অনুসন্ধিৎসু  চোখ।  কয়েকটা  গউরের  অনিমেষ  দৃষ্টি  আমাদের  দিকে।  জঙ্গল  সাফারির  জিপসিও  এখান  দিয়েই  প্রবেশ  করে। মোরামের  রাস্তা  দিয়ে  গাড়ি  চলে  এল  একেবারে  বাংলোর  হাতায়।  কেয়ারটেকার  বিশুবাবুই  অভ্যর্থনা  করে  নিয়ে  গেলেন  ভেতরে।  তার  হাতেই  তুলে  দিলাম  রান্নার  সবকিছু।  ব্রিটিশ  আমলে  নির্মিত  বাংলোটি  সম্পূর্ণ  কাঠের।  একতলা,  দোতলায়   প্রশস্ত  বারান্দা,   সামনে  জন্তদের  চরে  বেড়ানোর  ঘাসজমি,  নুন  চাটার  জায়গা  আর  গোলাকৃতি  জলা।  গন্ডার, হাতি, হরিন, বুনো  শুয়োর   অহরহ  ঘুরে  বেড়ায়  এখানে।  এই অভয়ারণ্যের  আয়তন  দশ  স্কোয়ার  কিলোমিটারের  মত।   কাঠের  সিঁড়ি  উঠে  গেছে  দোতলায়। আমাদের  থাকার  ঘরের  নাম  বসন্তবৌরি।  নির্জনতা  দুহাতে  ধরেছে  এই  বন বাংলোকে।  বারান্দায়  বেতের  চেয়ার টেবিল  পাতা। সেখানে  পড়ে  আছে  অনেক  চাওয়া পাওয়া।  প্রকৃতি  তখনও  দুরন্ত  ফাল্গুন  গায়ে  মাখে নি  তবে  বারান্দার   ঠিক  সামনে  রুদ্রপলাশের  গাছে  বসন্তের  ছোঁয়া। তার  পুনর্জন্ম  হয়েছে।  কোনো  এক  ঝড়ের  রাতে  ভূপতিত   হয়েছিল  সে।  সেই  আসন্ন  মৃত্যুকে  অবজ্ঞা  করে  দুদুটো  গাছ  জেগে  উঠেছে  সেই  ঝড়ে  পড়ে  যাওয়া  গাছের  গুঁড়ি  থেকে।  তার  শাখায়  এখন  অনেক  রুদ্রপলাশ। এ সবই  প্রকৃতির  খেলা।


চমৎকার  ফুলকপির  ডানলা,  মুসুর  ডাল , আলুভাজা  আর  তার  সঙ্গে  স্যালাড  দিয়ে   দুপুরের  খাওয়া  হল।  বিশুবাবুর  রান্নার  হাত  সত্যিই   ভাল।  ইতিমধ্যে  কিছু  হঠকারী  মেঘ  এসে  আচ্ছন্ন করেছে   সূর্যকে।   ঘাসজমিতে  বেশ  কিছু  চিতল  হরিণ  বুনো  শুয়োর।  একদল  হাতির  উপস্থিতি  টের  পাওয়া  গেল  ঘন  হয়ে  থাকা  মহীরুহর  মধ্যে।  একবার  দর্শন  দিয়েই  আবার  ঢুকে  গেল।  অবসর  এখানে  গাছপালা  আর  আকাশ। বারান্দায়  বসেই  চা  খাওয়া  হল। সন্ধ্যে  এল  তার  নিজস্ব  ছন্দে।  চরাচর  জুড়ে  যেন  হটাত  কোথা   থেকে  নেমে  এল  জমাট  অন্ধকার  আর  তার  সঙ্গে  যোগ  হল  অবিরাম  ঝিঁঝিঁর  ডাক।  সমস্ত  বন বাংলো  ডুবে  গেল  সেই  অন্ধকারে।  শুধু  টিমটিম  করে  জ্বলতে  লাগলো   একচিলতে  সোলার  আলো।   সমস্ত  নিস্তব্ধতাকে  দূরে  ঠেলে  খুব   কাছ  থেকে  প্রবলভাবে  ডেকে  উঠল  একটা  বারকিং  ডিয়ার।  সে  আওয়াজ  ছড়িয়ে  গেল  জঙ্গলময়। রাত  যখন  একটু  গড়িয়েছে,  দরজায়  টোকা।  খুলে  দেখি  বিশুবাবু  হাতে  সার্চ লাইট  নিয়ে  দাঁড়িয়ে।  বলল  বাইরে  আসুন  সামনে  গন্ডার। সার্চ  লাইটের  আলোয়  দেখা  গেল  তাকে।  বললাম  লাইট  বন্ধ  করে  দিতে  কারণ  এতে  জন্তুদের  অসুবিধে  হয়।


  পাখিরাই  বলতে  গেলে  ঘুম  ভাঙাল  সকালে। সাতটার  আগেই   চা  এল। কাপ  হাতে  বসলাম  বারান্দার  চেয়ারে।  নরম  আলোয়  সমস্ত  বনভূমি  মুখরিত  পাখিদের  অবিশ্রাম  ডাকাডাকিতে।  পাশেই  বিশাল  ময়নাগাছটায়  একটা  কাঠঠোকরা  সমানে  ডেকে  চলেছে  আর  ঠক  ঠক  করে  গাছের  ডালে  ঠোকরাতে  ঠোকরাতে  ওপরে  উঠছে।

 

কোনো  এক  গাছের   ডালের  আড়ালে  বসন্তবৌরি  একমনে  ডেকে  চলেছে  পুপ পুপ  করে। দেখা   যাচ্ছে  না  তবে  তার  উপস্থিতি  যে  কাছের  একটা  গাছে  তা  বেশ  বোঝা  যাচ্ছে।  আজ  তো  মন খারাপের  সকাল। একটা  দিনের  ওপারেও  আর  একটা  দিন  থাকে।  চলে  যেতেই  হয়।  চলে  যাওয়ার  বিরহের  দিগন্ত  পেরিয়ে  এক  বন  থেকে  চলে  এলেও  বন  কিন্ত  মনের  গভীরে  থেকে  যায়।  বনের  সঙ্গে  খেলা  চলে  অহরহ। তাই  চাপড়ামারি  থেকে  এবার  গরুমারার  দিকে।  আগে  থাকার  সুযোগ  হয়েছে  গরুমারার  চমৎকার  বন  বাংলোয়  কিন্ত  এ  যাত্রায়  তা  অধরা।  তাই  এবারের  ঠিকানা  নেওড়া  জাঙ্গল  ক্যাম্প। এটাও  গরুমারার   চৌহদ্দির  মধ্যে।  রাস্তার  ওপরেই  রয়েছে  জাঙ্গল ক্যাম্পের   গেট। সেখান  থেকেই্  একফালি  সরু  পথ  জঙ্গলের  বুক  চিরে  এগিয়ে  গেছে  সামনে।  হাতিদেরও  আসাযাওয়া  আছে  এ  পথে। প্রায় দু কিলোমিটার  পথের  শেষে  বন  উন্নয়ন  নিগমের  কটেজ । সুসজ্জিত  অভ্যর্থনা  কক্ষ  বলে  কিছু  নেই। ওয়াচটাওয়ারের  নীচে  অতি  সাধারণ  রান্নাঘর।  সেখানেই  দেখালাম  দুদিনের    ঘর  সংরক্ষণের  কাগজ।  একটি  ছেলে,  পরে  জেনেছিলাম  তার  নাম  লাকনা,  এগিয়ে  দিল  একটা  জাবদা  খাতা  নামধাম  লিখে  সই  করার  জন্য। তারপর  প্রবেশ  আমাদের  জন্য  নির্দিষ্ট   ডিলাক্স  কটেজে। সাধারণ  মানের  মাঝারি  সাইজের  ঘর। খাট  ছাড়া  ঘরে   আছে  একটা  আনলা  আর  একটা  ছোট  ড্রেসিংটেবিল।  সামনে, পেছনে  বারান্দা। দুদিক   দিয়েই  দৃশ্যমান  জঙ্গল।  ঘরের  সঙ্গেই  আছে  প্রসাধন।   একটু  তফাতে  নেওড়া  নদী। দুপুরে  খাওয়ার  পর  হাঁটতে  হাঁটতে  গেলাম  তার  কাছে।  জল  বিশেষ নেই।  সাদা  বালির  ওপর  হাতির  পায়ের  ছাপ  আর  বিষ্ঠা। দুপুরের  নির্জনতা  ভেঙে  একটা  বসন্তবৌরি  সমানে  ডেকে  চলেছে।  মাঝে  মাঝে  দুএকটা  জঙ্গল  সাফারির  গাড়ি  ছাড়া  বাইরের  মানুষজন  তেমন  নেই। একটু  পরে  মায়াবী  আলো  ছড়িয়ে  সূর্যদেব  টুপ  করে  লুকিয়ে  পড়লেন  দূরে  গাছের  আড়ালে।  এল  সন্ধ্যা  বুনো গন্ধ  আর অদ্ভুত   সব  আওয়াজ  নিয়ে  যা  শুধমাত্র  জঙ্গলেরই  নিজস্ব।  অন্ধকার  আর  নৈঃশব্দ  ভেদ করে  শুরু  হল  একটানা  ঝিঁঝিঁর  কনসার্ট,  রাত  পাখির  ডাক।  একফালি  চাঁদ  ঝুলে  রইল  গাছের  মাথায়।

 

ঠিক  কটেজের  পাশেই  সমস্ত  নিস্তব্ধতাকে  উপেক্ষা  করে  বনবাদাড়  কাঁপিয়ে  একটা  ময়ূর  ডেকে  উঠল। যারা  জঙ্গলকে  ভালবাসেন,  জঙ্গলের  এই  আওয়াজ  শুনতে  চান   তারা  আসতে  পারেন  এখানে।  বাহুল্য  নেই,  থাকা খাওয়া  সবকিছু  খুব  সাধারণ  মানের  হলেও  এই  জায়গা  নিরাশ  করবে  না।  রাতের  খাবারে  পাওয়া  যাবে  দেশী  মুরগির  মাংস  যার  স্বাদ  মুখে  লেগে  থাকবে।  দুপুরে  মাছ  খেতে  হলে  আগে  থেকে  বলে  রাখতে  হবে।  না হলে  ডিমের  ঝোল। সকালের  চা  পাওয়া  যাবে  তবে  তা  আসতে  প্রায়  আটটা  বেজে  যেতে  পারে।  যাদের  খুব  সকালে  চা  খাওয়ার  অভ্যাস  আছে  তাদের  একটু  অসুবিধে  হবে। এখানে  থাকার  কটেজগুলো  একদিকে  আর  খাওয়ার  ঘর,  ওয়াচটাওয়ার  একটু  তফাতে  উল্টোদিকে। এর  আর  একটা  বৈশিষ্ট  হল  এই  স্থান  কোলাহল বর্জিত।  জঙ্গলকে  উপভোগ  করার  পক্ষে  আদর্শ ।   রাতে  বন্য  জন্তুর  প্রবেশ  আটকাতে  এর  চারিদিকে  তার  লাগিয়ে  দেওয়া  আছে  বৈদ্যুতিক  বেড়া।



সন্ধ্যের  পর   এখানে  ঢোকা  বারণ।  পশ্চিমবঙ্গ  বন  উন্নয়ন  নিগমের  ওয়েবসাইট  থেকে  এর  বুকিং  হয়। এখানে  এলে  লাটাগুড়ি  থেকে  জঙ্গল  সাফারিও  করা  যায়। ফেব্রুয়ারির  দ্বিতীয়  সপ্তাহে  এসেছিলাম,  সন্ধ্যের   পর  ঠাণ্ডায়  কটেজের  বারান্দায়  বেশীক্ষণ বসে  থাকা  অসুবিধে  ছিল।  তবে  গরমের  দিনে  এলে  অবশ্যই  বসা  যাবে  বারান্দায়  বা  বাইরে  যেখানে  বসার  জায়গা  করা  আছে। সন্ধ্যের  পরেই  তো  প্রকাশ  পায়  জঙ্গলের  এক  অন্য  রূপ, গন্ধ।  একটু  সকালে  হেঁটে  বেশ   কিছুটা  ঘুরে  আসা  যায়।  যারা  পাখি  দেখতে  ভালবাসেন  তারা  সকাল  সকাল  এদিকওদিক  ঘুরতে  ঘুরতে  গাছে  চোখ  রাখুন।  ওরিওল,  বুশ  রবিন,  ক্রেস্টেড  বুলবুল,  বারবেট  এই  ধরনের  নানান  পাখি  দেখার  সুযোগ  আছে।  আর  ময়ুর  তো  আছেই।  ট্রেনে  এলে  নিউ  মাল  জংশন  স্টেশনে  নামাই  সুবিধেজনক।



চাপড়ামারির ছবি: বনেপাহাড়ে

নেওড়া জাঙ্গল ক্যাম্পের ছবি: লেখক


লেখক পরিচিতি: লেখক পেশায় সাংবাদিক। PTI এর ইস্টার্ন জোনের ব্যুরো চিফের দায়িত্ব পালন করেছেন।



1 Comment


Guest
16 hours ago

আপনার লেখা পরে চোখের সামনে ভেসে উঠলো,, আমাদের ওখানে থাকার স্মৃতি,,, অসাধারণ বর্ণনা।

Like
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
 

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page