কৃষ্ণগিরি কথা
- ..
- 8 hours ago
- 9 min read

নীল মজুমদারের কলমে বনেপাহাড়ের পাতায় উন্মোচিত হচ্ছে পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় ও দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চলে প্রকৃতির মধ্যে সাজানো একের পর এক বিস্ময় সৃষ্টি করা স্থানের গাথা। আজ তেমনই এক আখ্যান।
দুর্ভেদ্য জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে কাঁকর বেছান বেশ পরিচ্ছন্ন একটি জায়গায় এসে রাস্তা শেষ হয়ে গেল। বাঁদিকে কয়েকটি গাড়ি পার্ক করা। সামনে ‘সঞ্জয় গান্ধী রাষ্ট্রীয় উদ্যানের নাম লেখা একটি অফিস ঘর। এ জায়গাটি যে রাষ্ট্রীয় উদ্যানের অংশ বিশেষ, সে কথা আবার মনে পড়ে গেল। ডানদিকে কলা, শসা, পেয়ারা ইত্যাদি বিক্রি করছেন কয়েকজন মহিলা। তাঁদের পাশ দিয়ে উঠেছে পাথরের স্ল্যাব ঢাকা সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলে ‘কানেরি’ গুহার টিকিট ঘর।
কানেরি কথাটি এসেছে ‘কৃষ্ণগিরি’ থেকে। থানে থেকে মাত্র ৮/১০ কিলোমিটারের ব্যাবধানে বোরিভিলির গভীর অরণ্য ছড়িয়ে আছে সমতল থেকে অল্প উচ্চতার পাহাড়ের গায়ে। একদা এই পাহাড়গুলিকেই বলা হত কৃষ্ণগিরি। খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় একশো বছর আগে থেকে শুরু হয়ে তাঁর জন্মের পরের ন’শো বছর পর্যন্ত এইখানে পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছিল শতাধিক গুহা। ঠিক কি উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল, কারা তৈরি করেছিলেন, কোন রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়, এই নিয়ে গভীর অনুসন্ধান হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। খুঁজে পাওয়া শিলালিপি, ভাঙ্গাচোরা মুদ্রা, ভাস্কর্য শৈলির চুলচেরা বিচার করে এবং পুরাণের মলিন পৃষ্ঠার সঙ্গে মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা যা জানিয়েছেন, তা শুধু বিস্ময়করই নয়, আমাদের অনেক প্রচলিত ধারণাও তাতে বদলে যায়।
পাথর কেটে গুহা, উপাসনা স্থল, আবাস নির্মাণের কলাকৌশলের সূত্রপাত হয়েছিল মগধে, যে জায়গাটিকে এখন আমরা বিহার বা বিহার রাজ্য বলে থাকি। সেটা ছিল খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় আড়াইশো বছর আগে সম্রাট অশোকের কাল এবং সেই কালের কলা প্রযুক্তি বিদ্যার এক অসাধারণ ফলশ্রুতি। মগধ থেকে তিনটি শাখায়, ক্রমশঃ তিন দিকে আগ্রসর হয়েছিল এই শিল্প। একটি শাখা গিয়েছিল পূর্বে, উড়িষ্যা হয়ে আন্ধ্রপ্রদেশের দিকে। একটি শাখা দক্ষিণে নেমে দেশের সীমা ছাড়িয়ে সোজা শ্রীলঙ্কায় চলে গিয়েছিল। আর তৃতীয় শাখাটি এগিয়েছিল, পশ্চিমে, ডেকানের দিকে। পশ্চিম ভারতে, সহ্যাদ্রি পর্বতের ধারে কাছে, আরব সাগরের উপকূলে এই শিল্পের আত্মপ্রকাশ আরও একশো তিরিশ বছর পরে। সাঁচি, অজন্তা, ইলোরা, ভজ, কার্লে, পিতলখোরা, এলিফ্যান্টা, এমনকি, আমাদের আলোচ্য কানেরিও এই তৃতীয় শাখাটির জয়যাত্রার ফলাফল। শুধু পশ্চিম ভারতের কথা ধরলে কানেরি, অজন্তা ও পিতলখোরার চেয়ে বয়েসে একটু ছোট। কানেরির গুহায় যেসব শিলালিপি উদ্ধার হয়েছে, তার অনেকগুলিতে পাওয়া গেছে, গৌতমিপুত্র শতকর্ণী এবং বশিষ্টপুত্র শতকর্ণীর নাম। কানেরি কি তাঁদের সময় তৈরি ?

খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ১৮৭ বছর আগে মৌর্যদের বর্ণাঢ্য সময় শেষ হয়ে যাবার পরের সময় এখনও বেশ ধূসর। এই সময়ের শিলালিপি সামান্য, মুদ্রাও পাওয়া যায়নি বিশেষ। যেটুকু পাওয়া গেছে, তাতেও সাল না লেখা থাকায় গবেষকরা রীতিমত বিভ্রান্ত। কিছু কিছু জানা যায়, বিদেশি দের লেখায়। অজ্ঞাতকুলশীল এক নাবিকের লেখা ‘পেরিপ্লাসে’, টলেমির ভূগোলে, কিংবা প্লিনীর ‘ন্যাচরাল হিস্ট্রি’ তে, নির্ভুল ভাবে না হলেও আমাদের অতীতের উল্লেখ আছে। ভারতের ইতিহাস এই সময়ের বিবরণ জানার জন্যে পুরাণের মুখ চেয়ে আছে। আর পুরাণ বলতে আমরা যা বুঝি, অর্থাৎ ব্রহ্মান্ড পুরাণ, বায়ু পুরাণ, মৎস পুরাণ ইত্যাদি, তার মধ্যেও স্ববিরোধ প্রচুর। তবু, মৌর্যদের পরবর্তী সময়ে পশ্চিম ভারতে কন্ব, সুঙ্গ ইত্যাদিদের পরে সাতবাহন দের রাজত্ব শুরু হয়েছিল, একথা মোটামুটি ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
সাতবাহন রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা সিমূক সাতবাহন। কেউ কেউ মনে করেন এঁরা ছিলেন আন্ধ্র অঞ্চলের মানুষ। নাসিক ও নানাঘাটের কাছে পাওয়া শিলালিপি থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে অন্য ইতিহাসকারদের ধারণা এঁরা ছিলেন পশ্চিম ভারতের। এঁরা যেখানেরই হোন, এঁদের রাজত্ব নিষ্কন্টক ছিলনা। ক্ষত্রপ শাসকরা এঁদের রাজ্যকাল খন্ডিত করেছিলেন। ক্ষত্রপদের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক ছিলেন নাহাপণা। সাতবাহনদের গৌতমিপুত্র শতকর্ণী নাহাপণা কে পরাজিত করে রাজত্ব ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। গৌতমিপুত্রর সময় পশ্চিম ভারতে সাতবাহনদের সর্বভৌম রাজত্ব আবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর পুলমভির হাত হয়ে রাজদন্ড এসেছিল বশিষ্টপুত্র শতকর্ণীর কাছে। গৌতমিপুত্র খ্রীষ্টের পরে ৮৬ থেকে ১১০ এবং বশিষ্টপুত্র ১৩৮ থেকে ১৪৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন, অনুমান করেছেন পন্ডিতরা। সেদিক দিয়ে হিসেব করলে কানেরি খ্রীষ্টের চেয়ে বয়েসে একটু ছোট। কিন্তু শতাধিক গুহার কয়েকটি এইসব গুহার থেকে অনেকটাই পুরোনো মনে হয়েছে বলে ধরা হয়, খ্রীষ্টের জন্মের কিছুকাল আগে থেকেই কানেরি গুহা রচনার সূত্রপাত হয়েছিল।
গুহাগুলি ওপরে নিচে, ডাইনে বাঁইয়ে ছড়ান। কোথাও ধাপ ধাপ পাথর কাটা সিঁড়ি, কোথাও তাও নেই। তাই একটি গুহা থেকে আরেকটি গুহায় যাওয়া মাঝে মাঝে বেশ পরিশ্রম সাধ্য। এখানে আছে ১০৯ টি গুহা। আরও ১৯ টি আছে কোথাও অনতিদূরে। কারণ বইপত্রে ১২৮ টি গুহার উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু এখানে টিকিট ঘরের কাছে যে বোর্ড লাগানো তাতে দেখলাম ১০৯ টি গুহার কথাই লেখা আছে। ১০৯ হলেও কম কথা নয়, স্বচ্ছন্দে, ভারতের বৃহত্তম ‘গুহা কমপ্লেক্স’।

বড় দুটি পাথরের খাঁজে একটি সালাই গাছ। পাশ দিয়ে বর্ষার জমে থাকা জল ঝির ঝির করে বয়ে যাচ্ছে। গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে একটু দম নিতে নিতে আমার মনে হল, অজন্তা থেকে শুরু করলে, নাসিক , নানাঘাট, বেডসা, জুনর, ভজ, কার্লে এবং কানেরি এই সব মিলিয়ে পশ্চিম ভারতেই বৌদ্ধ ধর্মের অন্ততঃ হাজার খানেক গুহার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। ভারতের পূর্ব প্রান্তে এই পাথর কাটা শিল্পের উধ্বাবন হলেও সেদিকে কিন্তু এত বেশি গুহা দেখা যায়না। এর একটা কারণ অবশ্যই সহ্যাদ্রি পর্বতমালা এবং তার ‘বেসাল্ট’ জাতীয় পাথর, যা এই ধরণের উৎখননের জন্যে উপযুক্ত। কানেরির আর একটি বিশেষত্ব, এখানের ভূতল জল।ক্ষীণকায় স্বচ্ছ জলের ধারা বেশ কয়েকটি গুহার সামনের ভাগ অভিষিক্ত করে নিচে নেমেছে। পশ্চিম ভারতে এত বেশি গুহা নির্মাণ কি এই কারণেই হয়েছিল?
সাতবাহনদের রাজত্ব কালের খানিকটা আগেই হিপলাস নামের এক অনুসন্ধানকারী ‘দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু’ ও তার সাহায্যে সমুদ্র যাত্রার কলাকৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। সেই সময়ের বিত্তবান রাজ্য আরব ও মিশরের মানুষ এই আবিষ্কারের সাহায্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন বিদেশে বানিজ্য করতে। সমৃদ্ধ ভারত ছিল তাঁদের লক্ষ্য। বলাবাহুল্য, আরব্ কিংবা মিশর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ুর সাহায্যে আরব সাগরে যাত্রা করলে, সবচেয়ে সুবিধাজনক ভাবে পৌঁছনো যাবে ভারতের পশ্চিম উপকূলেই। এই কারণেই পশ্চিম তট ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল তৎকালীন বড় বড় সব বন্দর, সোপারিকা বা সোপারা, কল্যাণ, চাউল, কুডা ইত্যাদি।
বন্দর তো হল। কিন্তু ভারতবর্ষের মুখ্য নগর গুলি রয়েছে এই সমুদ্র তট থেকে আরও অনেকটা দূরে। আর সমুদ্র তটের পেছনে অর্থাৎ বন্দরগুলির পেছনে শ্রেণিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে সহ্যাদ্রি পর্বতমালা। তারমানে বন্দর থেকে নগরে গিয়ে পণ্যের বেচা কেনা যদি করতেই হয় তাহলে তৈরি করতে হবে কয়েকটি বানিজ্য পথ। এবং প্রত্যাশিত ভাবেই এই পথগুলিকে অতিক্রম করতে হবে সহ্যাদ্রি।
আজকের এক্সপ্রেসওয়ে অনায়াসে পাহাড়ের শরীর ভেদ করে টানেলের অন্তর্বর্তী হয়ে চলে যায়। কিন্তু তখন তো আর সেটা সম্ভব ছিলনা। কাজেই পথগুলি তৈরি করা হল, শেরঘাট, তালঘাট, নানাঘাট, বোরঘাট ইত্যাদি সহ্যাদ্রির কয়েকটি প্রাকৃতিক ‘পাস’ এর কথা মাথায় রেখেই। এই ‘দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী হাওয়া’, বানিজ্যাকাঙ্খী কিছু মানুষের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছে যাওয়া,কিংবা সহ্যাদ্রির ফাঁক ফোকর দিয়ে বানিজ্য পথ তৈরি হওয়া, এই ঘটনা গুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঠিক এইরকমটি না হলে, ভারতবর্ষের শিল্পকলা ভাস্কর্যের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত।
সোপারা বন্দর থেকে নাসিক যাবার পথ অতিক্রম করত শেরঘাট ও তালঘাটের ‘পাস’। কল্যাণ বন্দর থেকে জুনর হয়ে সাতবাহনদের রাজধানী ‘প্রতিষ্ঠান’, যার আজকের নাম ‘পৈঠন’, যাবার রাস্তাটি যেত নানাঘাট হয়ে। কল্যাণ থেকে কার্লে যেতে হলে পার হয়ে যেতে হত বোরঘাট। হিসেব করলে দেখা যাবে পশ্চিম ভারতের প্রায় সব গুহাগুলির অবস্থান বানিজ্য পথ বা দুর্গম সেই পাসগুলির কাছাকাছি। কল্যাণ থেকে জুনর যাবার সেই প্রাচীন বানিজ্য পথটি যেত কানেরি গুহার নিচ দিয়ে।
কেন এই পথগুলির কাছেই থাকত গুহা? এই পথ গুলি দিয়ে যে শুধু বণিকরাই যাতায়াত করতেন তাই নয়, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাও এক মঠ থেকে আর এক মঠে যাত্রা করার জন্যে ব্যাবহার করতেন এই পথ। যাত্রা বলতে অবশ্যই পদযাত্রা। রাস্তার কাছাকাছি এইসব গুহাগুলি তাঁদের রাত্রিবাসের আশ্রয়স্থল হত তখন। শুধু তাই নয় বর্ষার দুই তিন মাসও তাঁরা কাটিয়ে দিতেন এইখানে। এই সব রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করার সময় বণিকরা মুক্তহস্তে দান করতেন গুহা নির্মাণের কাজে। শিল্পী কারিগররাও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছতে পারতেন সহজে। কানেরির ১০৯টি গুহার অধিকাংশই যে আবাসিক ‘বিহার’ এবং চৈত্যের সংখ্যা যে নেহাত কম, এটাই হল তার সবচেয়ে বড় কারণ। এই বিহারে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কারণে বসবাস করেছেন। ধ্যান উপাসনা থেকে শুরু করে, আবাস, লোকসেবা, ধর্ম প্রচার, শিক্ষা প্রসার এই রকম নানা কাজে ব্যাবহৃত হয়েছে কানেরি।

কানেরির সব গুহাই বৌদ্ধ ধর্মে নিবেদিত। অজন্তা ইলোরার তুলনায় ভাস্কর্য অনেক কম, যা আছে তারও আধার বৌদ্ধধর্মেই নিহিত। কিন্তু যাঁরা এই গুহাগুলি রচনা করেছিলেন, পঞ্চাশ ষাট কিংবা তার অনেক বেশি বছর লাগবে যে গুহার কাজ শেষ হতে তার যোজনা তৈরি করেছিলেন, শাবল, ছেনি, হাতুড়ি দিয়ে কঠিন পাথরের গায়ে যাঁরা বুদ্ধ ও তাঁর অনুগামীদের জীবন রূপায়িত করেছিলেন, তাঁরা সকলেই যে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন একথা জোর দিয়ে বলা যায়না, জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বস্তুতঃ আজকের যুগে শিল্পী বা ভাস্কর বলতে আমরা যেমন একজন বা কয়েকজন বিশিষ্ট প্রতিভা সম্পন্ন মানুষ বুঝি, তখন এই চিন্তাধারা ছিলনা। শিল্পী ভাস্কররা ছিলেন, এক একটি সামাজিক শ্রেণি। এঁদের মধ্যে যেমন বৌদ্ধরা ছিলেন, তেমনিই ছিলেন হিন্দু ও জৈনরা। শুধু তাই নয়, এইসব গোষ্ঠির মানুষরা ছিলেন ভ্রাম্যমান। যেখানে এই রকম খননের কাজ হচ্ছে খবর পেয়ে তাঁরা সেখানে উপস্থিত হতেন। প্রকারান্তরে, এও ভাবা যেতে পারে, এঁরা নিমন্ত্রিত হতেন। এক জায়গার কাজ শেষ হলে এঁরা বা এঁদের বংশধররা চলে যেতেন অন্য কাজের জায়গায়। এক ধর্মের শিল্পী বা মানুষদের সঙ্গে অন্য ধর্মের শিল্পীদের কোনো মত বিরোধ ছিলনা মোটেই। কানেরির স্থাপত্য শৈলি কে অনেকে যে কার্লের অনুকরণ বলে মনে করেছেন, ইদানিং কালের গবেষকরা দেখিয়েছেন তাতে অনৈতিকতার কিছুই নেই। হতেই পারে কার্লের গুহাগুলিও ঐ গোষ্ঠির শিল্পীরা বা তাদের পূর্বপুরুষরা তৈরি করেছিলেন। তফাৎ যেটুকু আছে তা অনায়াসেই শিল্পীর ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার হতে পারে।
কানেরির প্রথম পর্য্যায়ের গুহাগুলি হীনযান সম্প্রদায় ভুক্ত বৌদ্ধদের তৈরি। এঁরা বুদ্ধ কে কখনই মুর্তিতে বা চিত্রে প্রকাশ করেননি, স্তুপ বা অন্য কোন প্রতীক ব্যাবহার করেছেন। পরবর্তীকালে মহাযান বৌদ্ধরাও এখানে দীর্ঘদিন এখানে উপাসনা ও বসবাস করেছেন এবং রচনা করেছেন, ভূমিস্পর্শী বুদ্ধ, পদ্মপাণি বুদ্ধ, একাদশ মুখ অবলোকিতেশ্বরের মূর্তি। ৩ নম্বর গুহাটি একটি বিরাট চৈত্য যা ব্যাবহৃত হত সমবেত ধ্যান ও উপাসনার জন্যে। ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালে চোখে পড়ে, আয়তাকার বিরাট একটি হলের একদিকে বড় একটি স্তুপ। স্তুপের চারিপাশে ও পেছনে পরিক্রমা করার জায়গাটি নির্জন, আধ অন্ধকারে ঢাকা।হলের দুপাশে ১৩টি করে স্তম্ভ। হলে ঢোকার মুখেই কয়েকটি স্তম্ভ কারুকার্যখচিত হলেও, পরের দিকে স্তম্ভ গুলি একেবারে সাদামাটা চৌকো পাথর। এটাকি শুধুই রুচির হাত বদল নাকি পৃষ্ঠপোষকতার তরতম এই প্রশ্ন রয়েই যায়।
কানেরির গুহাগুলি থেকে যে সব শিলালিপি পাওয়া গেছে তা অনুধাবন করলে আর একটি চমকপ্রদ ব্যাপার জানা যায়। শুধু যে রাজাদের অর্থ সাহায্যে সম্পূর্ণ গুহার কাজ সম্পন্ন হত এমন নয়। রাজা সিংহভাগ ব্যায়ভার বহন করতেন ঠিকই। জমি দান করতেন, শিল্পী কারিগরদের অন্ন সংস্থান করতেন। দান কিন্তু আসত, ছোট বড় বণিকদের কাছ থেকে, আসেপাশের জনপদের সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও। কানেরি গুহা তৈরি করার কাজে কল্যাণ, সোপারা, ধেনুকাকতা ইত্যাদির মানুষরা, কর্মকার সম্প্রদায়ের মানুষরা, যবন (গ্রীক) দেশীয় মানুষরা অর্থসাহায্য করেছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে যে বিষয়টি গবেষকদের সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করেছে তা হল, গুহা নির্মাণ ও ভাস্কর্যের কাজে ভিক্ষু ভিক্ষুনীদের অর্থ সাহায্য। সাহায্য করার মত অর্থ তাঁরা পেলেন কি করে?
শ্রীমতী বিদ্যা দহেজা, তাঁর Early Buddhist Rock cut Temples গ্রন্থে এই বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। ঐ সময় রাজা বা শাসক গোষ্ঠি অনেক ক্ষেত্রেই জমিজমা গুহাবাসী ভিক্ষুদের পাকাপাকি ভাবে দান করতেন। এই ক্ষেত খামার থেকে অন্ন ধান্য যা উৎপন্ন হত ভিক্ষুদের উদর নির্বাহ করার পরও তা অবশিষ্ট থাকত যথেষ্ট পরিমাণে। এই অবশিষ্ট অংশ বণিকদের বা অন্যান্য গ্রামের লোকদের দিয়ে বিনিময়ে যে অর্থ তাঁরা পেতেন, অনুমান করা হয় সেই অর্থ তাঁরা দান করতেন গুহা নির্মাণের কাজে। কানেরিতে সম্পূর্ণ একটি বিহার এবং জলাধার ভিক্ষুনীদের দানে তৈরি। দান, বিশেষতঃ উপাসনা স্থলের জন্যে দান ছিল একটি স্বীকৃত ‘সুকর্ম’। রাজা প্রজা নির্বিশেষে এই সুকর্মে বিশ্বাস করতেন। মনে রাখতে হবে, সাতবাহন রাজারা, যাঁদের রাজত্বকালে কানেরি গুহার সূত্রপাত হয়েছিল, নিজেরা ছিলেন হিন্দু ব্রাহ্মণ। তাসত্বেও বৌদ্ধগুহার পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁদের এই নিবেদন, ধর্মীয় সদভাবের উদাহরণ হিসেবে আমাদের চমৎকৃত করে।

কানেরির ১১ নম্বর গুহা একটি আশ্চর্য রচনা। পরবর্তী কালে এর নাম দেওয়া হয়েছে ’দরবার’। আয়তাকার বিরাট একটি হলের মাঝ বরাবর সমান্তরাল দুটি লম্বা টানা পাথরের বেদী বা বেঞ্চ। এই বেঞ্চগুলি যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে ছোট একটি বেদী , তার পেছনে দেওয়ালে ভাস্কর্য। সমবেত প্রার্থনা স্থল ‘চৈত্য’ নয়। ধ্যান , অধ্যয়ন ও আবাসের জন্যেনির্মিত ‘বিহার’ও নয়। এই দরবার গুহাটিকে অনায়াসে তুলনা করা যায়, আধুনিক যুগের একটি ‘কনফারেন্স’ হলের সঙ্গে।

দেশ বিদেশ থেকে আসা জ্ঞানী ভিক্ষুরা এইখানে আধ্যাত্ম দর্শনের গভীর আলোচনায় ব্যাপৃত থাকতেন বলে মনে করা হয়। ১৮৯২ সালের জুলাই আগষ্ট মাসে স্বামী বিবেকানন্দ এসেছিলেন কানেরিতে। অরণ্যের পটভূমিতে, উত্তাল পাহাড়ের গায়ে নিরিবিলি, নির্জন এই গুহা, এই ধ্যানমগ্ন পরিবেশ তাঁকে গভীর ভাবে আকৃষ্ট করেছিল, জানিয়েছেন স্বামীজীর জীবনীকাররা। ১৯৭৪ সালে পূণের অধ্যাপিকা শ্রীমতী গোখলে এবং কানেরির সরকারি আধিকারিক শ্রীবানী এখানের ৮৪, ৮৫, ৮৬ এবং ৮৭ নম্বর গুহায় খুঁজে বার করেছিলেন একটি সমাধিস্থল। অন্বেষণ চালিয়ে এখানে পাওয়া কয়েকটি ‘এপিটাফ’ বা নির্বান লিপির পাঠোদ্ধার করে ওঁরা দেখিয়েছেন, এই সমাধিগুলি তৎকালীন ভারতের বিদগ্ধ পন্ডিত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের। কানেরি যে এক সময় দেশের একটি স্বীকৃত এবং উন্নত শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, তাতে আর কোন সন্দেহ থাকেনা।

এখানের বিহার গুলির স্থাপত্য সহজ, সরল অনাড়ম্বর। সংসার ত্যাগী সন্নাসীদের জন্যেই যার রচনা, তাতে বিলাসিতার স্থান কোথায়! লম্বা বারান্দায় লাগান ছোট ছোট ঘর। ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে দেড় দুই ফুট উঁচু পাথরের বেদী। বলা বাহুল্য এই বেদী ব্যাবহার করা হত সন্নাসীদের শয্যা হিসেবে।শয্যার পাশে দেওয়ালে ছোট একটি প্রকোষ্ঠ। সম্ভবত রাত্রে পড়াশোনা করার সময় দীপ রাখা হত এইখানে। এই পাথরের শয্যাবেদী, নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ছাত্রাবাসের কথা মনে পড়ায়। কানেরির আর একটি বিশেষত্ব এখানের জলাধার। পাথর কেটে তৈরি জলাধারে ঝর্ণার স্বচ্ছ জল জমা হত। অনেকগুলি ছোট বিহার তো শুধু জলাধারের জন্যেই তৈরি। কানেরিতে অসমাপ্ত গুহার সংখ্যাও প্রচুর। একটি মাত্র কক্ষ নির্মাণ করে, প্রবেশ দ্বারের আভাস মাত্র দিয়ে কিংবা একটি বেদীর সূচনাটুকু করেই কেন যে শিল্পীরা আর অগ্রসর হননি, একথা জানার আজ আর কোনো উপায়ই নেই। অসংখ্য দেওয়াল ভাস্কর্য্যহীন, নিরাভরণ। ৩৪ নম্বর গুহার ওপরের দিকে চোখে পড়েছিল মলিন একটি ভিত্তিচিত্র যা নির্ভুল ভাবে অজন্তা শৈলির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। এইরকম ভিত্তিচিত্র কি আরও ছিল, আজ আর নেই নষ্ট হয়ে গেছে? কে দেবে এই প্রশ্নের উত্তর?
সাতবাহন থেকে রাষ্ট্রকূট, শিলাহার এমনকি শোনা যায় ওয়াকাটকদের হরিসেনার কানেরি জয়ের অনেক পরেও এখানে বসবাস করেছে মানুষ। সেদিক থেকে বিচার করে কানেরির এই গুহা গুলিকে ‘আধুনিকতম’ বলেছেন কয়েকজন ইতিহাসকার। মুম্বাইয়ের এত কাছের এই আধুনিকতম গুহা কমপ্লেক্স কিন্তু তবু, সাধারন মানুষের মনোযোগের বাইরেই থেকেছে চিরকাল। দুঃখের বিষয় কয়েকজন বিদেশী বোদ্ধাও কানেরিতে কি নেই তার হিসেব নিয়েই ব্যাস্ত থেকেছেন, অন্তর্নিহিত মূল সুরটি বুঝে, কি আছে তার খোঁজ করেননি।
এইসব ভাবতে ভাবতে, গুহাগুলি ঘুরে ফিরে দেখতে দেখতে, দুপুরের রোদে ও পরিশ্রমে অবসন্ন হয়ে ১০১ নম্বর গুহার কাছে পৌঁছে আমার দুচোখ জুড়িয়ে গেল। এই গুহাটিই সম্ভবত কানেরির উচ্চতম জায়গা। চারিপাশে ঢেউ খেলানো পাহাড়ে ছড়িয়ে আছে অরণ্য, গভীর, নিস্তব্ধ, সমাহিত। হাওয়ার ছাড়া আর অন্য কোনো শব্দ নেই। দূরে অনেক দূরে রূপোর থালার মত আরব সাগরে ঠিকরে পড়ছে আলো।
এই সমুদ্র পথেই একদা যাতায়াত করতেন বণিকরা। পণ্য বেচা কেনা হত বন্দরে, সরবরাহ হত নগরে নগরে। সেদিন হয়তো কেঊ ভাবেনি, এই প্রয়োজনে তৈরি হবে যে পথ, সেই পথে একদা আসবেন, রাজা প্রজা, দাতা ত্রাতা, ধ্যানী তপস্বী, শিক্ষক ছাত্র, কৃষক কর্মকার, মৃৎশিল্পী, শৈলশিল্পীরা। আসবেন তথাগত বুদ্ধে নিবেদিত প্রাণ অসংখ্য মানুষ। আধ্যাত্মে, দর্শনে, শিল্পজ্ঞানে, শ্রমদানে, ও অধ্যাবসায়ে মহিমাময় কালোত্তীর্ণ করে দিয়ে যাবেন দুর্গম এই পর্বত মালা।
প্রায় এক হাজার বছর এইখানে থেকেছেন তাঁরা। তাঁদের চিন্তন মননের কিছুটা আমরা জানতে পেরেছি, তাঁদের রচিত গ্রন্থাদি পড়ে। যে কথা জানতে পারিনি তা হল, তাঁদের দিনযাপনের কথা। রাষ্ট্র ও কালের উত্থান পতনে আন্দোলিত তাঁদের রোজদিনের বেঁচে থাকার কথা। ধ্যানে অধ্যয়নে, হর্ষে বিষাদে, স্নেহে মমতায়, মৃত্যুতে জ্বরায়, চলমান তাঁদের সময়ের কথা। কেমন হত যদি কেউ, ধূসর ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে, শিলালিপি উদ্ধার করে, তার সুঙ্গে কল্পনা ও অনুভুতির রসায়ন মিলিয়ে লিখতেন দীর্ঘ একটি ধ্রূপদী উপন্যাস, লিখতেন সেই জীবনের কথা যা কানেরিতে শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে? খুব কষ্টকল্পিত হয়ে যেত? কে জানে! তবে সাহিত্য কি চিরদিন স্রষ্টার কাছে, এমনকি উপভোক্তার কাছেও, বস্তুনিষ্ঠ কল্পনার দাবী করেনি?
লেখক পরিচিতি: লেখক অবসরপ্রাপ্ত আই এফ এস আধিকারিক এবং ঔপন্যাসিক।
পাঠকদের মতামত জানাবার জন্য রয়েছে কমেন্ট বক্স এই পাতার নীচে। রচনাটি সম্বন্ধে আপনার মতামত জানাতে পারেন সেখানে।







Comments