top of page
KANHA MAY 26.jpg

অজন্তার পাহাড়ে: প্রাচীন সৃষ্টির কাছে নতজানু

  • ..
  • 2 days ago
  • 6 min read

ভারতের এক কোণে প্রাচীন বনপাহাড়ের অন্তরালে একদিন সৃষ্টি হয়েছিল বিস্ময় তৈরি করা শিল্পকর্ম। ব্রিটিশ সেনা অফিসার জন স্মিথ শিকার করতে করতে সহসাই আবিষ্কার করেছিলেন অজন্তার প্রাচীন গুহা। তারপর থেকে তা দেশ-বিদেশের মানুষের মনে ভারতীয় শিল্প ও স্থাপত্যের যে সুমহান ঐতিহ্য তা নিয়ে বিস্ময় তৈরি করেই চলেছে। প্রকৃতির বুকে সৃষ্টির আনন্দে শিল্পীরা যে অমর ছবি এঁকে গেছেন তার কথা উঠে এল নীল মজুমদারের কলমে।



'ভিউ পয়েন্ট" থেকে দেখা বনেপাহাড়ের মাঝে অবস্থিত অজন্তার গুহার সারি। সামনে বয়ে চলেছে বাঘোরা নদী।  ছবি: wikimedia commons/ Jayesh Paranjape
'ভিউ পয়েন্ট" থেকে দেখা বনেপাহাড়ের মাঝে অবস্থিত অজন্তার গুহার সারি। সামনে বয়ে চলেছে বাঘোরা নদী। ছবি: wikimedia commons/ Jayesh Paranjape


ধূসর আকাশের পশ্চাৎপটে খর্বকায় এই পাহাড়গুলি প্রায়শঃই বৃষ্টিপাতের স্নেহ থেকে বঞ্চিত। বৃক্ষলতা অপ্রতুল। অগ্নিদর্শন সূর্যের তাপে উত্তপ্ত গৈরিক মাটি ও পাথর।

সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এদিকেই শিকার করতে বেরিয়েছিলেন বৃটিশ সেনার একজন অফিসার জন স্মিথ ।দুপুরের দিকে ঘুরে ফিরে ক্লান্ত হয়ে এইরকম একটি পাহাড়ের ওপর সমতল খানিকটা জায়গা দেখতে পেয়ে বসে পড়লেন। পাশেই অগভীর একটি খাদ। খাদের তলদেশে সুতোর মত প্রায় জলহীন বাঘোরা নদী। তার ওপাশে আবার পাহাড়, সেই একই রকম। শিকারের খোঁজে এদিক ওদিক দেখছিলেন। সেই সময় ওপাশের পাহাড়ের গায়ে একটি গহ্বর তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। খাদে নেমে, অক্লেশে নদী পার হয়ে স্মিথ দেখলেন, পাথর সরে গিয়ে বা গাছপালা ভেঙ্গে তৈরি নয়, এ বিবর একেবারেই অন্য রকম।  এর পরের কথা আজ ইতিহাস। জন স্মিথের আহ্বানে, তৎকালীন (স্থানিক) নিজাম সরকারের উদ্দ্যোগে, মাটি পাথর সরিয়ে অর্দ্ধচন্দ্রাকার পাহাড়ের গায়ে সারিবদ্ধ তিরিশটি গুহা আবিষ্কৃত হল, সারা পৃথিবী আজ যাকে অজন্তার গুহা বলে জানে। সেটা ছিল, ১৮১৯ সাল।

খ্রীস্টের জন্মের প্রায় দুই শতাব্দী আগে এই গুহাগুলির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, চলেছিল খ্রীস্টের জন্মের পরে কিছুকাল পর্যন্ত। এরপর অজ্ঞাত কোনো কারণে গুহা নির্মাণ কাজে ছিল প্রায় চার শতকের বিরতি। এরপর দ্বিতীয় পর্য্যায়ের কাজ হয়েছিল পাঁচের শতক থেকে প্রায় সাতের শতক, অর্থাৎ গুপ্ত এবং ওয়াকাটকদের রাজত্ব অবধি। সব মিলিয়ে প্রায় ন’শো বছর ধরে রচিত, চিত্রিত, অধিবাসিত হয়েও এই গুহাগুলি এবং তার অতুলনীয় শিল্পসম্ভার মাটি, পাথর, আবর্জনার নিচে সমাধিস্থ হয়ে ঠিক কবে থেকে যে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিল, নির্ভুল ভাবে জানা যায়না। যেন অপেক্ষা করছিল, জন স্মিথের হাতের ছোঁওয়ায় পুনরাবিষ্কৃত হওয়ার জন্যে।

এই আবিষ্কারের অনেক পরে, এক, দুই, তিন এইভাবে সংখ্যা দিয়ে গুহাগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল, রচনা কালের নয়, অবস্থানের বিচারে। রচনা কালের হিসেবে, ৯, ১০, বা ১২ নম্বর গুহাগুলি তৈরি হয়েছিল ১, ২, ৮, বা ১১ নম্বর গুহার অনেক আগে। বেশ কয়েকটি গুহা আবার নিয়োজিত এবং পরিকল্পিত হয়েও অসমাপ্ত রয়ে গেছে, যেমন ৩, ১৪, বা ৩০ নম্বর গুহাগুলি।

গঠন ও উপযোগিতার দৃষ্টিতে গুহাগুলিকে মোটামুটি দুভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, ‘চৈত্য’ বা বুদ্ধ মন্দির, যেমন ৯, ১০, ১৯, ২৬ বা ২৯ নম্বর গুহা। এর অভ্যন্তরীণ ভাগ স্পষ্টতই গোলাকার। দ্বিতীয় ধরণের গুহাগুলিকে বলা হয়, ‘বিহার’ যা কিনা ব্যবহৃত হত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের বসবাস, ধ্যান ও উপাসনার জন্যে। এগুলি সাধারণত, আয়তাকার বা বর্গাকার। চৈত্যের উচ্চতাও বিহারের চেয়ে বেশি। খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতকের কাছাকাছি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ‘হীনযান’ এবং ‘মহাযান’ এই দুটি দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন, সকলেই জানেন। আশ্চর্য্যের বিষয়, নীতি ও আদর্শের অমিল থাকলেও এই দুই শাখার সন্ন্যাসী ও শিল্পীরাই যগ দিয়েছিলেন গুহা নির্মাণ ও শিল্প রচনায়। পন্ডিতরা চুলচেরা বিচার করে দেখিয়েছেন ৮, ৯, ১০, ১২ ইত্যাদি গুহাগুলি হীনযান শিল্পীদের অবদান।। অন্যদিকে, ১৯, ২৬, ২৯, ১, ২, ৬, ৭ ইত্যাদি গুহার কৃতিত্ব মহাযান শিল্পীদের।



বাঘোরা নদী পার হয়ে। ছবি: Gavande
বাঘোরা নদী পার হয়ে। ছবি: Gavande


টি পয়েন্ট থেকে সি এন জি চালিত বাসে শীর্ণ বাঘোরা নদী পার হয়ে গুহার দিকে যেতেযেতে ক্রমশঃ ঘন হয়ে আসা পাহাড় দেখছিলাম। আগে গাড়িতে গুহার দোরগোড়া অবধি যাওয়া যেত। সম্পূর্ণ এই পরিসরটিকে প্রদূষণ রহিত রাখার জন্যে সাম্প্রতিক এই সরকারি ব্যবস্থা শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর হল। এখান থেকে দুই কলোমিটার দূরে ফর্দাপুর নামের একটি জায়গা থেকে নিজের বা ভাড়ার গাড়িতে টি পয়েন্ট পর্য্যন্ত আসা যায়।যাঁরা ঔরঙ্গাবাদ থেকে প্রায় শ’খানেক কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আসেন, তাঁদেরও গাড়ি রাখতে হয় এই টি পয়েন্টেই। এই ব্যবস্থা অনিবার্য। এক সময় জাপানের অর্থ সাহায্যে ‘অজন্তা- ইলোরা ডেভেলাপমেন্ট’ প্রোজেক্ট শুরু হয়েছিল। তখন অজন্তার আসেপাশে প্রায় পাঁচশো হেক্টার জায়গায় গাছ লাগিয়েছিল স্থানীয় বন বিভাগ। সেই সবুজের সূচনায় পাহাড়ের রুক্ষতা কিছুটা ঢাকা পড়েছে। কেমন লাগতো এই জায়গাটি খ্রীষ্টের জন্মের দু’শো বছর আগে !



প্রার্থনা ঘর।  ছবি: wikimedia commons/vashukrishnan
প্রার্থনা ঘর। ছবি: wikimedia commons/vashukrishnan


তখন ছিল বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপ্তির কাল। শুধু ভারতবর্ষে নয় আসেপাশের কয়েকটি দেশেও তখন বৌদ্ধ ধর্ম স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। বুদ্ধের আদর্শে নিবেদিত প্রাণ কয়েক’শো সন্ন্যাসী এই নিরিবিলি পর্বতের একটি জায়গায় এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। অজন্তার ভিত্তিচিত্র এবং ভাস্কর্য্য তাঁদেরই রচনা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই শিল্পের বিষয় বস্তুর ওপর তার প্রভাব পড়েছে। বুদ্ধ, তাঁর জীবন, তাঁর বিবিধ অবতার, জাতকের বিভিন্ন উপাখ্যান এই হল শিল্প রচনার মূল উপাদান। সেইসূত্রে এসেছে, রাজা, সৈন্য, যুদ্ধ, মৃগয়া। এসেছে রাজ্যশাসন, মন্ত্রণা, বিজয় যাত্রা। জীবনের শাশ্বত কিছু ঘটনা, জন্ম, মৃত্যু, জ্বরা। কিংবা জীবনের কোমল কিছু দিক, প্রেম পরিণয়, নৃত্যগীত, মান অভিমান, চপলতা। বিরাট একটি যুগের ধারাবাহিকতায় রচিত এই রকম একটি শিল্পসৃষ্টির মধ্যে একমুখী বিশুদ্ধতা আশা করা যায়না, তা কাম্যও নয়।  প্রথম দিকের গুহাগুলিতে চিত্রশিল্পই প্রধান।  পরের দিকের গুহা গুলিতে চিত্রশিল্পের সঙ্গে অসাধারণ শৈলির কিছু ভাস্কর্য্যও আছে। আবার প্রথম দিকের কিছু  চৈত্যে কয়েকটি মূর্তিও দেখা যায়, উত্তরকালের শিল্পীদের সংযোজন হিসেবে।তবু অজন্তার বৈশিষ্ট যে তার অনিন্দ্যসুন্দর ভিত্তিচিত্র তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাবে ও ভাষ্যে এর সমতুল্য কীর্তি  সারা বিশ্বে আর কোথাও খুঁজে পাননি বিশেষজ্ঞরা। 



ধর্মপ্রধান শিল্পকর্ম হলেও যে ব্যাপারে অজন্তার শিল্পীরা সমকালীনের সীমা ভেঙ্গে চিরকালীন হয়ে গেছেন, তা হল বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা। চিত্রে কিংবা ভাস্কর্য্যে ধর্মের নীতি কঠোর উপদেশ, রক্তচক্ষু শাসন, বাধানিষেধ, বা কটাক্ষ কোনোটাই নেই। অঙ্কিত চরিত্ররা কেউই ঈশ্বরীয় বা অতিমানবীয় নন, সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ। আনন্দে উচ্ছসিত, দুঃখে ব্যথিত, জটিলতায় পীড়িত, ধনী দরিদ্র, স্ত্রী পুরুষ, উৎসাহী, কৌতুহলী সব রকম মানুষের এক বর্ণাঢ্য সমারোহ, এক নাটকীয় উপস্থিতি।

চিত্রশিল্পের গোত্র এবং আঙ্গিক বিচার নিয়ে চিত্র সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে, চিত্ররচনার পদ্ধতি হিসেবে সর্বসাধারণ ভাবে যা গ্রাহ্য তা হল, গুহার আভ্যন্তরীণ দেওয়াল যথাসম্ভব সমতল করে তার ওপর মাটি, গোবর এবং ধানের ভুসির প্রায় এক ইঞ্চির প্রলেপ লাগাতেন তাঁরা। তার ওপর চূণ লাগিয়ে এবং শুকিয়ে তৈরি হত ছবির জমি। পুরোনো দিনের গবেষকরা এই ছবিকে ইউরোপীয় মত অনুযায়ী, ফ্রেস্কো বলতেন। কিন্তু ফ্রেস্কো আঁকা হয়, ছবির জমি ভিজে থাকতেই। তাই আধুনিক কলারসিকরা পারিভাষিক ভাবে এই ছবিগুলিকে টেম্পেরার সমগোত্রীয় বলে মনে করেন। ব্যবহৃত রং সবই প্রাকৃতিক তার ব্যাপ্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, লাল, হলুদ, খয়েরি, সাদা ও কালোয় সীমিত। প্রথম দিকের ছবিগুলিতে নীলের আশ্চর্য্য অনুপস্থিতি এবং পরবর্তী কালের কয়েকটি ছবিতে উজ্জল নীল রং এর ব্যবহার, দুইই আলাদা ভাবে চোখে পড়ে।





মূর্তিশিল্প যে চিত্রশিল্প কে প্রভাবিত করেছে, এমন ধারণাও পোষণ করেছেন কয়েকজন চিত্র সমালোচক। মূর্তির মতই চিত্রশিল্পেও মানব শরীরের গঠন, পেলবতা, ছন্দ, ভঙ্গি ও গতি বিশেষ ভাবে প্রদর্শিত। মানুষের অবয়ব রচনায় অগ্রজ শিল্পীদের আস্থা ছিল বলিষ্ঠ রেখার অমোঘ প্রয়োগের ওপর। অনুজরা দেহের অংশ বিশেষ ভরাট করেছেন একটি রং দিয়ে যা কিনা নিজেই একটি বিশিষ্ট আঙ্গিক। ভাব প্রকাশ, বেশভূষা ও অলঙ্কারে একধরণের ‘স্টাইলাইজড’ ডিটেলের প্রয়োগ দর্শনীয়। শরীরের রং দিয়ে রাজা ও প্রজার স্তরভেদ কিংবা চীন পারস্য ও আফ্রিকার মানুষদের উপস্থিতি বুঝিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে, শুধু যে ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায় তাই নয়, বেশ বোঝা যায় গুহাবাসী এই শিল্পীরা দেশ, কাল, সমাজ ও তার নানা বিধ পরিবর্তনের ব্যাপারেও যথেষট সচেতন ছিলেন।

ফ্ল্যাশের আলোয় গুহা চিত্রের ছবি তোলা মানা।  ফ্ল্যাশ না জ্বালিয়ে ছবি তোলার প্রশ্নই ওঠেনা। তাই এই ছবি গুলি যে ঠিক কেমন তা বোঝানো বড় কঠিন। রয়্যাল এসিয়াটিক সোসাইটির অনুরোধে তৎকালীন কোর্ট অফ ডাইরেক্টার্স ১৮৪৪ সালে মাদ্রাজ সরকারকে গুহাগুলি সংরক্ষিত করে ছবি গুলির ‘কপি’ তৈরি করার আদেশ দিয়েছিলেন। মাদ্রাজ আর্মির ক্যাপ্টেন গিল দীর্ঘ ছ’ বছরের পরিশ্রমে অনেকগুলি ছবির নকল তৈরিও করেছিলেন। দুঃখের বিষয় গিলের সেই সব ছবির আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ১৮৬৬ সালের এক বিধ্বংসী অগ্নিকান্ডে সব ভস্মীভূত হয়ে গেছে। ১৮৭২ সালে বোম্বে স্কুল অফ আর্ট’ এর তৎকালীন প্রধান গ্রিফিথ সাহেব তাঁর কয়েকজন ছাত্রের সাহায্যে মুখ্য কয়েকটি ছবির নকল তৈরি করে সংরক্ষিত করেছিলেন। আজ আমরা ‘অজন্তার ছবি’ নামে বাজারে যে সব ছবি দেখি, তা গ্রিফিথ কৃত ছবির নকল বা তস্য নকল। আসল যে কি বস্তু, তা অনুভব করার জন্যে, কম পাওয়ারের বৈদ্যুতিক আলো জ্বালা প্রায়ান্ধকার এই গুহাগুলির ভেতরে আপনাকে আসতেই হবে।

অবলোকিতেশ্বর।  ছবি: wikimedia commons/ কুনাল মুখার্জী
অবলোকিতেশ্বর। ছবি: wikimedia commons/ কুনাল মুখার্জী


অজন্তার সব ক’টি গুহা দেখেও কিন্তু মনে কিছু ধন্ধ রয়েই যায়। ভিত্তিচিত্রে ব্যাবহৃত রং গুলিতে ঠিক কিরকম রসায়নিক প্রতিক্রিয়া করিয়েছিলেন তাঁরা, যা দু’হাজার বছরের কটাক্ষ সহ্য করেও আজও সম্পূর্ণ মুছে যায়নি? খৃষ্টের জন্মের দু’শো বছর আগে ও পরে, অর্থাৎ বিদ্যুৎপ্রবাহ, টর্চ, ব্যাটারি ইত্যাদি আবিষ্কৃত হওয়ার অনেক আগে, দিনদুপুরেও ঘুটঘুটে অন্ধকার এই গুহার ভেতর তাঁরা ছবি আঁকতেন কি ভাবে? মশাল জাতীয় কিছু জ্বালিয়ে?  দেওয়ালে এমনকি সিলিং এর অসংখ্য ছবিতে সুক্ষ্ম রেখার অমোঘ প্রয়োগ এবং তার জ্যামিতিক পরিপাটি কি সম্ভব হয়েছিল ঐ ভাবেই? এতো প্রায় দৈবী কিংবা আসুরিক ক্ষমতা! খ্রীষ্টের জন্মের পাঁচ শো, সাতশো বছর পরে এখান থেকে মাত্র সত্তর কিলোমিটার দূরে ইলোরায় আর একদল শিল্পী যখন তৈরি করছেন আর এক কালজয়ী মহৎ শিল্প, অজন্তার শিল্পীরা তখনও তাঁদের চিত্র সাধনায় নিরত। জানতে ইচ্ছে করে, তাঁদের মধ্যে কি কোনো ভাব বিনিময় ছিল ? ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে কি আশ্চর্য্য এক শিল্প সম্ভার রেখে যাচ্ছেন তাঁরা, এই নিয়ে কোনো আদান প্রদান? তারপর সাতের শতকে সহসা অজন্তার শিল্পীরা তাঁদের কাজ অসমাপ্ত রেখে এই সব কিছুর ওপর যবনিকাই বা টেনে দিলেন কেন?  

‘অজন্তা’ নামের যে গন্ডগ্রাম আজও মহারাষ্ট্রের মানচিত্রে রয়ে গেছে, গুহাগুলি তার থেকে অন্ততঃ পনেরো-কুড়ি কিলোমিটার দূরে। সে তুলনায় অপেক্ষাকৃত অনেক কাছে,‘ফর্দাপুর’। তাহলে এই গুহাগুলির নাম ‘ফর্দাপুরের গুহা’ না হয়ে অজন্তার গুহাই বা হল কেন?

ফেরার সময়, অজন্তা গ্রামে গাড়ি থামিয়ে চা খাচ্ছিলাম যখন, আমার গুরুজন স্থানীয় এক বন্ধু এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বললেন, ‘অজন্তার গুহা’ নাম হল তার কারণ, জন স্মিথ যেখান থেকে এই গুহাগুলি প্রথম দেখতে পেয়েছিলেন, যে জায়গাটিকে আজকাল ‘ভিউ পয়েন্ট’ বলা হয়, সেখান থেকে ফর্দাপুর নয়, অজন্তাই সবচেয়ে কাছে’। তাঁর কথায় যুক্তি আছে, মানতেই হবে। তবু মনের ধন্ধ যায়না। শুধু কি তাই! 

গোলাপের উদাহরণ টেনে সেক্সপীয়ার বলেছিলেন, নামে আর কি আসে যায়! এই ব্যাপারে কিন্তু তাঁর সঙ্গে সহমত হতে পারলাম না। নামেও আসে যায় বৈকি! একবার ভেবে দেখুন, অজন্তার গুহার বদলে যদি নাম হত, ‘ফর্দাপুরের গুহা’, অজন্তার ভিত্তিচিত্রের জায়গায় যদি বলা হত, ‘ফর্দাপুরের ভিত্তিচিত্র’ কিংবা কোনো সুন্দরী রমণীর বর্ণনা করতে গিয়ে, কবি লেখকরা ‘অজন্তার মত মুখচ্ছবি’ না লিখে যদি লিখতেন, ‘ফর্দাপুরের মত স্ফূরিত অধর’, সম্পূর্ণ রোমান্সটাই ফর্দফাঁই হয়ে যেত না কি?


লেখক পরিচিতি: লেখক অবসরপ্রাপ্ত আই এফ এস আধিকারিক এবং ঔপন্যাসিক।


পাঠকদের মতামত জানাবার জন্য রয়েছে কমেন্ট বক্স এই পাতার নীচে। রচনাটি সম্বন্ধে আপনার মতামত জানাতে পারেন সেখানে।


1 Comment


Guest
8 hours ago

এক নি:শ্বাসে পড়ে নিলাম।বেশ কয়েক বছর আগে অজন্তার গুহাগুলো দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল।লেখাটির সংগে মনের ক্যানভাসে এঁকে রাখা ছবির সংগে তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটি জুড়ে দিলাম।

Like
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
 

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page