মহানগরীর অরণ্য: বোরিভলি ন্যাশনাল পার্ক
দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বই। বাস দেশের ধনীতম মানুষদের। বসবাস টিনসেল টাউনের স্বপ্নের চিত্রতারকাদের। তবু তার মধ্যেই রয়েছে অন্য এক পৃথিবী। মুম্বইয়ের পৌর এলাকার মধ্যেই। এক ন্যাশানাল পার্ক যেখানে বাস অনেক বন্যপ্রাণীর। জনাকীর্ণ মহানগরীর বুকে তার টিকে থাকাই এক মস্ত লড়াই। আলোচনায় মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন বনকর্তা নীল মজুমদার।

শাখা প্রশাখা ছড়ান বিরাট একটি হলদু গাছের নীচে কচি বাঁশের ঝোঁপ, তার পাশ দিয়ে চলে গেছে স্থূলকায় একটি পাইপ লাইন। সকালের রোদে পাতার ইলিমিলি ছায়া এসে পড়েছে গাছের নীচে। সেই ছায়ায় প্রায় গা মিশিয়ে এসে দাঁড়ালো মাঝ বয়েসী একটি লেপার্ড। ওর বাঁদিকে রয়েছে পাইপ, ডানদিকে রাস্তা, যে রাস্তায় পেছন থেকে আসছে আমাদের গাড়ি। চকিতে একবার পেছন ফিরে গাড়ির অবস্থান বুঝে নিল প্রাণীটি। ততক্ষণে আমরাও গাড়ি থামিয়েছি। আমাদের ২৫- ৩০ ফুট সামনে দিয়ে ত্রস্ত পায়ে রাস্তা পার হয়ে ডানদিকে গাছেদের গভীর জটলায় অতঃপর সে গা ঢাকা দিল।
এই লেপার্ডটি কি মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছিল, আমাদের দেখে বিরক্ত হল? হতেই পারে। লেপার্ডদের মর্নিংওয়াকের কথা কখনও শুনিনি, তবে অসংখ্য স্বাস্থ্যকামী মানুষ এখানে প্রতিদিন মর্নিং ওয়াক করে থাকেন, অবশ্যই অন্যান্য রাস্তায়। এখানে প্রতিদিন আসা মানুষের সংখ্যা ছয় থেকে সাত হাজারের মধ্যে, যা কিনা, দেশের অনেক রাষ্ট্রীয় উদ্যানের সারা বছরের জনসমাগমের সমতুল্য। শহর মুম্বাই থেকে মাত্র ৩৬ কিলোমিটারের দূরত্বে অদ্বিতীয় এই জায়গাটি বোরিভলি ন্যাশনাল পার্ক বা, সঞ্জয় গান্ধী রাষ্ট্রীয় উদ্যান। অদ্বিতীয়, কারণ ভারতে তো নয়ই, এমনকি পৃথিবীর আর কোথাও কোনো মহানগরীর মিউনিসিপ্যাল সীমার মধ্যে এত বড় আস্ত একটি ন্যাশনাল পার্ক নেই।
পার্কের ভেতরেই আছে, ‘কানেরি’ গুহা, যার প্রাচীন নাম কৃষ্ণগিরি। এই কারণেই, একটা সময় ছিল যখন ‘কৃষ্ণগিরি বন’ নামে এই জায়গাটিকে চিনত সবাই। ‘কৃষ্ণগিরি ন্যাশনাল পার্ক’ নামে এই জায়গাটিকে সংরক্ষিত করার ব্যাবস্থা হয়েছিল ১৯৫০ সালে। তখন এর আকার আয়তন ছিল নেহাৎ কম, প্রায় ১৯ বর্গ কিলোমিটারের কাছাকাছি। ব্যবস্থাপনা ছিল তৎকালীন ‘বোম্বে স্টেট’ এর ‘পার্ক ও গার্ডেন’ বিভাগের হাতে। প্রায় ১০ বছর পর এই জায়গাটি হস্তান্তরিত হয়েছিল বন বিভাগের কাছে। সংরক্ষণ পেয়ে আবার সজীব হয়ে উঠেছিল গাছপালা। সেইসঙ্গে নির্ভয়ে বংশবিস্তার করেছিল ছোটবড় নানারকম বন্যপ্রাণী। জঙ্গলটির গুরুত্ব বুঝতে পেরে ক্রমশঃ আরও কিছু জায়গা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যেমন, ‘আরে’ মিল্ক কলোনির জমি, অন্যান্য মালিকদের ‘ইনাম’ জমি ইত্যাদি। অতঃপর বোম্বে সাবার্বান ও থানে জেলার কিছু সংরক্ষিত বনের সঙ্গে মিলিয়ে ১৯৭২ এ পুরোপুরি একটি ডিভিশনের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।তখন নাম ছিল ‘বোরিভলি ন্যাশনাল পার্ক ডিভিশন’। নতুন নামকরণ ১৯৮১ সালে।

জঙ্গল ক্রমশঃ কমে যাওয়া তো আজকাল শিশুপাঠ্য পুস্তকের বিষয়। আশ্চর্য্য হলেও সত্যি, নানা জমি জায়গা ও সংরক্ষিত বন যোগ করার এবং সংরক্ষণ দেওয়ার ফলে বোরিভলি পার্কের কলেবর কিন্তু বেড়েছে। মুম্বাই প্রেমী জনৈক লেখক স্তম্ভিত হয়ে একবার লিখেছিলেন, ‘এরকম একটি জায়গায় বোরিভলির অরণ্য যে এখনও টিকে আছে, এটাই মিরাকল’। আমার মনে হয়, মিরাকল নয়, এটি যুক্তিগত সত্য। কারণ এই অরণ্য কে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে আছে, সর্বসাধারণ মুম্বাইবাসী মানুষের অকুন্ঠ ভালোবাসা, অনেকগুলি সংস্থার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সক্রিয় যোগদান, এমনকি, আইনগত এবং সরকারি তৎপরতা।
উত্তর দক্ষিণে প্রসারিত রাষ্ট্রীয় উদ্যানের মাঝ বরাবর ‘রিক্রিয়েশন জোন’।এই জায়গাটি পার হয়ে রেস্ট হাউসের দিকে যাওয়ার সময় চোখে পড়ল, ছাত্রছাত্রী, কচিকাচাদের ভিড় ইতিমধ্যেই জমতে শুরু করেছে। আজ ছুটির দিনে এটাই প্রত্যাশিত। এখানের মুখ্য আকর্ষণ, ‘লায়ন সাফারি’, ‘টাইগার সাফারি’, খেলনা ট্রেন এবং ‘ইনফরমেশন সেন্টার’। এখানে বলে রাখা ভালো, এখানের ‘সাফারি’ কিন্তু আর পাঁচটা রাষ্ট্রীয় উদ্যানের মত নয়। জঙ্গলের বেশ খানিকটা জায়গা ঘিরে তার ভেতর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি সিংহ কিংবা কয়েকটি বাঘ। বনবিভাগের বিশেষভাবে সুরক্ষিত গাড়িতে বসে ভেতরে গিয়ে ঘুরে আসা যায়। খুব কাছ থেকে দেখে আসা যায়, তাঁদের ‘কৃত্রিম’ বাড়িতে বনের রাজারা কিভাবে আছেন।

সবচেয়ে ভালো লাগে, কুঁড়ে ঘরের আদলে তৈরি ‘টাইগার ইনফরমেশন সেন্টার’ বা সংবাদ কেন্দ্রটি। দীর্ঘদিনের শুধু চিন্তা ও গবেষণা নয়, সৌন্দর্য্য ও পরিমিতি বোধের ফলশ্রুতি এই সংবাদ কেন্দ্রে, ছবি, কার্টুন ও ক্যাপসনের সাহায্যে বাঘের মুখ দিয়ে তার নিজের জীবনের গল্প বলা হয়েছে, খুব সহজভাবে। বোরিভলি অঞ্চলে অতীতে কখনও সিংহ ছিল বলে শোনা যায়নি। তবে বাঘ এখানে সত্যিই ছিল প্রায় ১৯৪০ অবধি একথা জানা যায় তৎকালীন বোম্বের সরকারি গেজেটিয়ার পড়ে। ১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসে যে বাঘ শিকারের শেষ ঘটনাটি ঘটে ছিল, নথিপত্রে তারও উল্লেখ আছে। এখানে লুপ্ত এই প্রাণীটির মুখে তার অবলুপ্তির চিরাচরিত কাহিনী শুনলে স্বাভাবিক ভাবেই বিষাদ ভর করে মনে।

দহিসর থেকে থেকে আর একটু এগিয়ে আরব সাগরের জল ভাসির খাল হয়ে ঢুকে পড়েছে জঙ্গলের উত্তর দিকে। ভাসির খালের দুপাশে গজিয়ে উঠেছে ‘লোনা জলের গাছপালা’ ইংরিজিতে যাকে বলে ম্যানগ্রোভ ভেজিটেশন (Mangrove Vegetation)। বায়েন, হারগোজা, কুলসী, কেওড়া এই সব গাছ যা দেখা যায় সুন্দরবনেও। সেখানের তুলনায় এখানের গাছপালার আকার আয়তন কম হলেও, ম্যানগ্রোভের কিছু প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট থেকে এরাও বঞ্চিত নয়। লোনা জল ঢোকা মাটিতে নিঃশ্বাস নেবার অসুবিধা বলে এই গাছের শেকড় থেকে কাঁটার মত শাখা মাটির বাইরে, যাকে বনস্পতিবিদরা বলেন নিউম্যাটোফোর (Pneumatophore)। এই নিউম্যাটোফোরে থাকা অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে এই গাছরা নিঃশ্বাস নেয়। শুধু তাই নয়, পাকা ফল গাছে থাকতেই তার ভেতরে বীজের অঙ্কুরণ হয়ে যায় (যাকে বলা হয় vivipary)। ফল যখন নিচের কর্দমাক্ত মাটিতে পড়ে তখন বীজ থেকে ছোটখাটো চারা প্রায় তৈরি হয়ে গেছে। বলাবাহুল্য, নিচের লোনাজলে ভেজা মাটিতে যাতে বীজ অঙ্কুরণের অসুবিধা না হয় তার জন্যে এই এই প্রাকৃতিক ব্যাবস্থা। দেখলে মনে হয়, যেন নিপুণ এক প্রযুক্তিবিদ আপন খেয়ালে কাজ করে চলেছেন, অরণ্য তাঁর ছোটোখাটো একটি ল্যাবরেটরি।

আরো পড়ুন: কৃষ্ণগিরি কথা
খালের উত্তরে নাগলার দিকে পার্কের খুব বেশি অংশ নেই। নাগলার জঙ্গল ক্রমশঃ থানের জঙ্গলে গিয়ে মিশেছে। বেশির ভাগ পার্ক খালের দক্ষিণে। সমতল থেকে শুরু হয়ে ঢেউ খেলানো পাহাড়ের ওপর ছড়িয়ে আছে ঘন সবুজ বন। এই পাহাড় দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে উত্তাল তরঙ্গের মত বিলীন হয়ে গেছে সহ্যাদ্রির সঙ্গে।
বোরিভলি অরণ্যের অবস্থান সহ্যাদ্রি আর পশ্চিম সমুদ্রতটের মাঝখানে। তাই বৃষ্টিপাত অকৃপণ। গাছের ঘন বুনোটে, পাতার রঙে, ঘাসের উচ্চতায়, লতার বাহুল্যে তার ছাপ দেখা যায় পরিষ্কার। উত্তরের ক্রীকের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই যেন দক্ষিণে আছে আশ্চর্য্য দুটি জলাশয়, তুলসী এবং বিহার লেক। দক্ষিণ দিকে আরও এগিয়ে গেলে পাওয়া যাবে ‘পাবই লেক’ও, তবে সেটা পার্কের সীমার বাইরে। পাহাড় আর অরণ্যই হল, এই লেক দুটির জলধারণ এলাকা বা ‘ক্যাচমেন্ট’ (Catchment)।

যে ছ’টি জলাশয় থেকে মুম্বাই ও থানে শহরে প্রতিদিন কয়েকশো মিলিয়ান গ্যালন জল সরবরাহ করা হয়, এই তিনটি লেক তার মধ্যে অন্যতম। সাতশো তিরিশ হেক্টারের বিহার লেক তৈরি করে মুম্বাই অবধি পাইপ লাইন আনা হয়েছিল, ১৮৬০ সালে। তখনকার দিনে খরচ পড়েছিল প্রায় সাঁইত্রিশ লক্ষ টাকা। তাতেও জলের অভাব মেটেনি বলে, বিহারের চেয়ে আকারে ছোট তুলসী লেক তৈরি করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে। এই দুটি লেক পার্কের সীমার ভেতরে হলেও এর দেখাশোনা ও জল বন্টনের দায়িত্ব মুম্বাই নগর পালিকার। কিন্তু যে অরণ্য লেকের জন্যে জল সঞ্চয় করে তা বন বিভাগের হাতে। মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃতির ওপর যথেচ্ছাচার করে তার সৌন্দর্য্য এবং উপযোগিতা দুইই নষ্ট করেছে। কিন্তু যেখানে তা করেনি, যেখানে তার কল্পনা, উদ্ভাবনী শক্তি, বুদ্ধি, প্রতিভা ও কার্যক্ষমতা প্রকৃতি কে সমৃদ্ধতর করেছে, সেখানে মানুষ তুলনাহীন। তুলসী ও বিহার লেক দেখে একথা বার বার মনে পড়ে। মনে রাখতে হবে, এই লেকগুলি কিন্তু প্রাকৃতিক নয়, মানুষের তৈরি।

প্রায় এক’শো বর্গ কিলোমিটারে, সমতলে পাহাড়ে, খালের ধারে, লেকের আশেপাশে ছড়িয়ে আছে যে অবারিত অরণ্য বিভিন্ন জায়গায় তার কুশীলবরা কিন্তু একে অন্যের থেকে আলাদা। সেই পার্থক্য অনুযায়ী আলাদা আলাদা নামও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নাম যাই হোক, এই অরণ্য অসাধারণ। এলোমেলো ঘুরতে ঘুরতে একটি অশোক গাছ দেখে আমি থমকে দাঁড়াই। রাবণের অশোক বনে বন্দী দুঃখিনী সীতার ছবিটি যে কোনো ভারতীয়র মর্মস্থলে এমনভাবে গাঁথা যে অশোক গাছ দেখে সীতার কথা মনে পড়বে না এ প্রায় অসম্ভব। এটি হল সেই গাছ যার ছাল দিয়ে বিখ্যাত ‘অশোকারিষ্ট’ আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি হয়। দুঃখের বিষয়, ভারী বর্ষণের জায়গায় এবং একা একা থাকতে পছন্দ করা এই গাছটি দেশে ক্রমশঃ বিরল হয়ে আসছে। আর একটু এগিয়ে দেখি একটি বয়োবৃদ্ধ শমী গাছ। এবং অবধারিত ভাবেই, এবার মনে পড়ে গেল, রামায়ণ নয়, মহাভারতের কথা। অজ্ঞাতবাসের সময়, বৃহন্নলা বেশী অর্জুনকে সারথি করে যুদ্ধে এসে কৌরবদের সৈন্যসজ্জা দেখে রাজকুমার উত্তরের যখন মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়, সে সময়ের সেই থমথমে নাটকীয়তা। একটি গাছের নীচে রথ থামিয়ে বৃহন্নলা উত্তর কে বললেন, ‘গাছে উঠে দেখো, একটি কোটরে নানাবিধ অস্ত্রশস্ত্র রাখা আছে। তার মধ্যে চিহ্নিত কয়েক'টি নিয়ে এসো’। মহাভারত খ্যাত সেই শমী গাছ ! অজ্ঞাতবাসে যাওয়ার আগে, এইরকমই একটি শমী গাছে পান্ডবরা তাঁদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন।
ঘুরে ফিরে দেখি। আমলকী, হরিতকী, আম, জাম, কাজু নিজের নিজের জায়গায় সবাই আছে। য়েরুরের দিকে মহামূল্য সেগুন, বট, অশ্বত্থ, নানারকম ডুমুর। আবার শুকনো দিকে বাবুল, খয়ের , শিরীষ। এক জায়গায় দেখি প্রায় পাশাপাশি সিবান (গামারি) ও শিসম গাছ দাঁড়িয়ে আছে। এই দুটি গাছের রং এ তেমন তফাৎ না থাকলেও, কাঠের রং এ কিন্তু বিস্তর তফাৎ। শিসম ( Dalbergia latifolia) কে কালচে খৈরি রং এর জন্যে অনায়াসেই ‘কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ’ বলা চলে। অন্যদিকে সিবান (Gmelina arborea) কাঠের রং মেমেসাহেব দের মত ফুটফুটে। ভাগ্যিস গাছেদের মধ্যে ‘এপারথেইড’ নেই। বেশি বৃষ্টির জায়গায়, বড় বড় গাছে পাক দিয়ে উঠেছে, উচ্ছে, অনন্তমূল, পলাশের জাতভাই ‘লতা পলাশ’। নিচে চাপচাপ বনতুলসী, বাসক, করন্দ, শতমূলী, শিকাকাই। কোথাও বুনো কুল আর আমাদের অতি পরিচিত, ঢ্যাঁড়সের পূর্বপুরুষ জংলী ঢ্যাঁড়স। সবমিলিয়ে আসর জমজমাট। এই রকম বনে দলছুট দু একটা নারকেল কি তাল গাছে দেখতে পেলে আমার বেশ অবাক লাগে, গান মনে পড়ে যায়, ‘পথ ভোলা এক পথিক এসেছি’।
গাছপালার বাজার যখন এতোই গরম তখন বন্যপ্রাণীরাই বা পিছিয়ে থাকবে কেন! প্রায় ২৪ রকম পিঁপড়ে, ১৫০ রকম প্রজাপতি, ৩৮ রকমের সরীসৃপ, সামুদ্রিক এবং লোনা জলের মোট ৪৩ রকমের মাছ, ২৫০ এর বেশি পক্ষী প্রজাতি, সবমিলিয়ে জৈব বিবিধতার ধারাটি এখানে অব্যাহত। বিশেষজ্ঞরা আঁতিপাঁতি করে খুঁজে নাম গোত্র ঠিক করে রেখেছেন, যা মনে রাখার চেষ্টা করাও বাতুলতা। তবে নাম মনে না রাখলেও পোকা মাকড় বা ছোট প্রাণী বলে এরা কিন্তু অবহেলা করার মত নয়। মনে রাখতে হবে, এরা সকলেই কিন্তু আমাদের চেয়ে মানে মানুষদের চেয়ে অনেক 'সিনিয়ার'। পৃথিবী নামক গ্রহটিকে এরা দেখছে আমাদের চেয়ে হাজার এমনকি লক্ষ বছর আগে থেকে। তখন থেকেই প্রকৃতির চিরকালীন নাটকে নিজের নিজের ভূমিকায় অভিনয় করে চলেছে এরা। যেমন, গর্ত খোঁড়ার সময় নীচের মাটি ওপরে এনে লাঙ্গল চষার কাজটি নিঃশব্দে সেরে দিয়ে যাচ্ছে পিঁপড়ে, কেঁচো। মৃত সরীসৃপের শব খেয়ে নিশ্চিহ্ন করে বেশ কিছু পোকা। আবার নিচু গাছের ডালে উড়ন্ত পোকা ধরার জন্যে মরণ ফাঁদ পেতে রেখেছে অতিকায় সব মাকড়সা। আবার তাদের খাবার জন্যে ওঁত পেতে আছে পোকা খোর কিছু পাখি। খাদ্য ও খাদকের দীর্ঘদিনের অদ্ভুত সহাবস্থান। এরা যদি মানুষের ভাষায় কথা বলতো, কি বলতো তাহলে ? ‘দেখা হল ভালোবাসা বেদনায়’?

এছাড়াও এখানে আছে প্রায় ৪০ রকমের স্তন্যপায়ী। জঙ্গলের ফাঁকা দিকটায় এলে চোখে পড়ে ছোটবেলায় গল্পের বইয়ে পড়া দু'টি প্রাণীর অদ্ভুত সখ্যতার ছবি। গাছের ওপর বসে কচি ডাল পাতা ভেঙ্গে নিচে ফেলে দিচ্ছে কালোমুখ বাঁদর। আর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গবগব করে সেসব খাচ্ছে কৃতজ্ঞ একদল চিতল হরিণ। এই বাঁদররা যে সবসময় শুধু খেলায় মেতে থাকে তা নয়। গাছের ওপর বসে এই অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণীরা যদি কোনোরকমে টের পায় এদিকে লেপার্ড আসছে, তাহলেই কিন্তু চড়া গলায় ডাক দেবে, হুপ হুপ করে। এই ডাক হরিণদের চেনা। বিপদের সংকেত বুঝতে পেরে ওরা তখন ছুটবে ঊর্ধশ্বাসে। কানেরির দিকটায় আমি একবার প্রায় বেড়ালের সাইজের একরকম হরিণ দেখেছিলাম, রসিকতা করে যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাউস ডিয়ার’। সিংহীন, জলপাই রঙের এই ভীষণ লাজুক প্রাণীটির অবশ্য দেখা পাওয়া যায়না বিশেষ। আজ আমার সামনে দিয়ে এক লাফে রাস্তা পার হল, বেশ বড় সাইজের বিরাট লেজ ওয়ালা, কালো কুচকুচে একটা গন্ধগোকুল, ইংরিজিতে যাকে বলে সিভেট বা সিভেট ক্যাট (Civet/ Civet-cat)। তাকিয়ে দেখি ওপাশের একটা তাল গাছে চড়ছে একেবারে চ্যাম্পিয়ানের মত। এরা আবার তাড়ি খেতে খুব ভালোবাসে। এখানে থাকে আর এক দুষ্প্রাপ্য প্রাণি, চৌশিঙা। ছোটছোট চারটি শিং এর বেঁটেখাটো একধরণের হরিণ।

তবে যে প্রাণীটি একদা এখানের এমনকি আশেপাশের শহর ও শহরতলীর মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, তার নাম লেপার্ড। বড়দা বাঘের অনুপস্থিতিতে মেজদা লেপার্ডই এখানের রাজা। বোরিভিলিতে লেপার্ডের উপদ্রব নিয়ে লেখালেখি এবং আলোচনা হয়েছে বিস্তর, শুধু রাজ্যের নয় রাষ্ট্রীয় স্তরের কাগজপত্রেও। সরকারী গণনা অনুযায়ী এখানে লেপার্ডের সংখ্যা চল্লিশ- পঁয়তাল্লিশ। একটি লেপার্ডের প্রায় আড়াই-তিন বর্গকিলোমিটার জায়গা লাগে, স্বাধীন ভাবে থাকার জন্যে। সে হিসাবে, ১০০ বর্গকিলোমিটারের এই রাষ্ট্রীয় উদ্যান বেশ খানিকটা ছোট। কিংবা বলা যায়, এই অরণ্যের তুলনায় লেপার্ডের সংখ্যা খানিকটা বেশি।

তার ওপর এই বোরিভিলি পার্ক একদিকে ভাসির খাল আর অন্য তিন দিকে ঘন জনবসতি দিয়ে একেবারে নিশ্ছিদ্র ভাবে ঘেরা। অন্ততঃ ভারতবর্ষে আর কোন রাষ্ট্রীয় উদ্যানের অবস্থান এরকম নয়। লেপার্ডরা বনশুয়োর, চিতল হরিণ খায় ঠিকই কিন্তু তাদের প্রিয় খাবার কুকুর এবং মুর্গি, বলে থাকেন বিশেষজ্ঞরা। এই কারণে এবং স্বভাবগত ভাবে বাঘের মত অত লাজুক প্রাণী নয় বলেও দেখা গেছে লেপার্ডরা জঙ্গলের সীমার কাছেই ঘোরাফেরা করে বেশি। দুঃখের বিষয়, বোরিভিলিতে জঙ্গলের সীমার পাশ থেকে, শুধু পাশ থেকে নয়, সীমার ভেতর থেকেই গড়ে উঠেছে ঠাস বুনোট জন বসতি। তাই মানুষের সঙ্গে এদের দেখা হয়ে যাবার এবং সংঘাতের সম্ভাবনা এখানে অনেক বেশি।
এই ‘সীমার ভেতর জনবসতি’ ব্যাপারটি যে আসলে কি, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয়না। পার্কের পূর্বদিকে ‘ইয়েরুর’ নামে একটি গ্রাম আছে। তাছাড়াও ‘নাগালা’ ও ‘চেনা’ অঞ্চলের যে আদিবাসী জনবসতি তারা আদিম বাসিন্দা, চিরদিনই সেখানে ছিল। আর আছে ‘কৃষ্ণগিরি উপবন’ নামে পরিচিত এবং আসেপাশের জায়গায় ১১ টি ছোট ছোট লোকালয়, যাকে বলা হয় পাড়া। বনবিভাগের নথিপত্রে বলা হয়েছে এরা ১৯৪০ এর আগে ছিলনা। তবু এদের থাকাটা কে আজকাল আর ‘জবর দখল’ বলেনা কেউ। এই রকম আরও কয়েকটি পাড়া আছে পার্কের পূর্ব সীমান্তের গা ঘেঁষে, সেখানে তৈরি হয় চোলাই মদ। পার্কের উত্তরে আছে অনেকগুলি ‘মাইন’। কয়েক বছর আগেও ওরা যথেচ্ছ ব্লাস্ট করে, পাথর ভেঙ্গে নির্যাতন করত। সম্প্রতি কোর্টের আদেশে এবং প্রশাসনিক চাপে সেটা বন্ধ হয়েছে। বোরিভলি রেল স্টেশনের দিকটায় আছে ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের হাই পাওয়ার লাইন। কিন্তু এসবই নগণ্য। ১৯৭০ এর পর শুরু হয়েছিল দলেদলে অসংখ্য মানুষের ঢুকে পড়া, টিনের চালা বেঁধে বসবাস, ছোটখাটো ক্ষেতখামার, এখানের ম্যনেজমেন্ট প্ল্যান এ তার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। ক্রমশঃ গজিয়ে উঠেছিল দোকান পাট, স্কুল, শুরু হয়েছিল বাসের যাতায়াত, টেলিফোন, টিভি। কোর্টের একটি আদেশ অনুযায়ী এই অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা, চোখের অনুমানে, প্রায় ৮৫০০০ এর কাছাকাছি। অরণ্যের সীমার ভেতর এরা পাকাপাকি ভাবে বসবাস করতে শুরু করেছিল।
১৯৯৭ সালের ‘মে মাসে, ‘বোম্বে এনভিরনমেন্ট এ্যাকশন গ্রূপ’ এর দায়ের করা একটি কেসে বোম্বে হাইকোর্টের একটি নজিরবিহীন রায় বেড়িয়েছিল এর বিরুদ্ধে। তাতে বলা হয়েছিল, ১৯৯৫ সালের নির্বাচনী তালিকায় যাদের নাম নেই, তারা সকলেই বেআইনি ভাবে আছে। সেই আদেশেই , ‘BEST’ কে বলা হয়েছিল, কানেরির ট্যুরিস্ট এবং শিবরাত্রির তীর্থযাত্রীদের বাস ছাড়া আর কোন বাস যেন পার্কের ভেতর না যায়। এম টি এন এল কে বলা হয়েছিল সরকারি ছাড়া আর অন্য সব টেলিফোন লাইন যেন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, এবং মহানগরপালিকা কে বলা হয়েছিল যেন কোন দোকানকেই লাইসেন্স না দেওয়া হয়, ইত্যাদি। অতঃপর পুলিশের সাহায্যে এবং বনবিভাগের তৎপরতায়, প্রায় ৫০,০০০ ঘরবাড়ি অপসারিত করে তাদের পুনর্বসিত করা হয়েছিল এবং হচ্ছে। তবু, মুম্বাই শহরে প্রতিদিন ধেয়ে আসা অগণিত মানুষ, তীব্র স্থানাভাব, অর্থাভাব, থেকে শুরু করে, জায়গার লোভ, অন্যায়ভাবে পাওয়া সুযোগ সুবিধার লোভ জাতীয় নানা সমস্যায় জড়িত ‘বোরিভলি জবর দখল’ নামক জটিল সমস্যাটির সম্পূর্ণ সমাধান আজও হয়নি।

তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল কী? একদিকে রিক্রিয়েশন জোনের টাইগার সাফারি, লায়ন সাফারি। সেখানে শহরের ভদ্র শিক্ষিত শৌখিন মানুষরা বন বিভাগের গাড়িতে চড়ে কাছ থেকে বাঘ, সিংহ দেখে আসবেন। অন্যদিকে সরকারের খাতায় বেআইনি বলে চিহ্নিত একদল মানুষ, তাদের তথাকথিত ‘আস্তানা’ থেকে বেরিয়ে একটু এদিক ওদিক গেলেই সামনে যমদূতের মত লেপার্ড দেখতে পাবেন। আর এই দুই সত্যকে দুপাশে নিয়ে আমাদের সমাজের সঠিক প্রতিমার মত, ‘একটুকরো ভারতবর্ষ’ হয়ে বেঁচে থাকবে এই মহামহিম অরণ্য ?

সন্ধ্যার দিকে, রেস্টহাউস থেকে বেরিয়ে তুলসী লেকের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে এইসব এলোমেলো ভাবছিলাম। আকাশ আলো করে চাঁদ উঠলো এইসময়। চাঁদ নিজেই এতো সুন্দর, তার ওপর যদি সামনে থাকে তুলসী লেকের নিস্তরঙ্গ জলে তার মায়াবী প্রতিবিম্ব, তবে বোধহয় শুধু চোখ দিয়ে নয়, সারা শরীর দিয়ে অনুভব করতে হয় সেই সৌন্দর্য্য। এইসময় তীক্ষ্ণ স্বরে প্যাঁচা ডাকল, একবার, দু’বার, বেশ কয়েকবার।
ঠাহর করে শুনলে বোঝা যায় একটি নয় অন্ততঃ দুটি পাখি ডাকছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এদের মধ্যে কে প্যাঁচা আর কে প্যাঁচানি বুঝতে না পারায়, এও বোঝা হলনা, কে কার চ্যাঁচানির প্রশংসা করছে।
লেখক পরিচিতি: লেখক অবসরপ্রাপ্ত আই এফ এস আধিকারিক এবং ঔপন্যাসিক।





