পশ্চিমঘাট পর্বতমালাকে বাঁচাতে ঘোষিত ইকো-সেন্সটিভ জোন নিয়ে আপত্তি রাজ্যগুলির
বিশিষ্ট পরিবেশবিদ মাধব গাডগিল ভারতের জীববৈচিত্রপূর্ণ পশ্চিমঘাট পর্বতমালাকে বাঁচাতে গোটা অঞ্চলটিকেই ইকো-সেন্সিটিভ জোনের আওতায় আনার সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু গোটা পর্তমালাকে তো দূরের কথা, অবশিষ্ট প্রাকৃতিক অঞ্চলগুলি বাঁচাতে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক গত এক দশক ধরে বারবার বিজ্ঞপ্তি জারি করলেও বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলির আপত্তির জন্য তা বাস্তবায়িত করা যাচ্ছে না। আলোচনায় সিমরন সিরুর।

গত ২৭ জুলাই, কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অন্তর্গত পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলিকে (Ecologically Sensitive Areas বা ESA) চিহ্নিত করে সপ্তম খসড়া বিজ্ঞপ্তি জারি করলো। মানব সমাজের বেড়ে চলা কার্যকলাপের ফলে পশ্চিমঘাটের জীববৈচিত্র্য ও ভূতাত্ত্বিক অখণ্ডতা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে এই পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলিতে বিভিন্ন কার্যকলাপের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে Ecologically Sensitive Areas ঘোষনা হলে । তবে বিশেষজ্ঞরা যখন এই অঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে দ্রুত চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি জারির প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন, তখনও বিজ্ঞপ্তির আওতায় কোন কোন এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সেই বিষয়ে রাজ্যগুলির মধ্যে ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
পশ্চিমঘাট পর্বতমালা গুজরাট ও মহারাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী তাপ্তি নদীর উপত্যকা থেকে শুরু হয়ে প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দক্ষিণে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পথে পর্বতমালাটি গোয়া, কর্ণাটক, কেরল ও তামিলনাড়ুর মত রাজ্যের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। এই অঞ্চলকে বিশ্বের আটটি ‘অত্যন্ত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের হটস্পটের’ (biodiversity hotspots) অন্যতম বলে বিবেচনা করা হয়। এখানে উদ্ভিদ ও প্রাণীর ৭,০০০-এরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। এই অঞ্চলটি ভূমিধসের প্রবণতাও অত্যন্ত বেশি। সেকারণে এখানে ‘বিশেষ সুরক্ষা ও ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনের ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা দ্রুত প্রয়োজন বলে খসড়া বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে কেরল, কর্ণাটক ও গোয়ার প্রতিনিধিরা ESA-র অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে এর সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। ESA-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রণয়নের প্রক্রিয়াকে দিশা দেখানোর জন্য গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির কার্যকালের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যাতে এই সমস্যাগুলির সমাধান করা যায় এবং পরিবেশ সংবেদনশীল অঞ্চলের চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
সর্বশেষ ESA-র খসড়া বিজ্ঞপ্তিতে ৫৬,৮২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মূলত পূর্ববর্তী বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত এলাকারই অনুরূপ। খননকার্য, বালি উত্তোলন, পাথর খাদান, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ‘লাল তালিকাভুক্ত’ (Red Category) দূষণকারী শিল্পের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পাশাপাশি, এই বিজ্ঞপ্তিতে নির্মাণ এলাকার পরিমাণও সীমিত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কোনও নির্মান এলাকার আয়তন ২০,০০০ বর্গমিটারের বেশি হতে পারবে না। একইভাবে, টাউনশিপ বা নগর বসতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ হেক্টর জমি ব্যবহার করা যাবে এবং সেখানে মোট এলাকার পরিমাণ ১,৫০,০০০ বর্গমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
গোয়ায় কৃষিজমি ও বনভূমির বিস্তীর্ণ অংশকে বসতি স্থাপনের জন্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ তাহির নোরোনহার মতে, ESA বিজ্ঞপ্তির ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলিতে রাজ্য সরকারের আইনকে অতিক্রম করে বৃহৎ আবাসন প্রকল্প ও শিল্পপ্রকল্পের কাজ বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে।
গোয়ার ১০৮টি গ্রাম ESA বিজ্ঞপ্তির আওতায় পড়েছে। তাহির নোরোনহা বলেন, “বিধিনিষেধের প্রকৃতি সম্পর্কে গ্রামবাসীদের মধ্যে ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলির উন্নয়নমূলক কাজে ব্যক্তিগত স্বার্থ রয়েছে, এমন মন্ত্রীরা অনেক মানুষকে এই বিশ্বাস করিয়ে ছেড়েছেন যে, তারা এমনকি তাদের পরিবারের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করার অধিকার হারাবেন।”
তিনি আরও বলেন, “যদিও ESA তে প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্মাণ এলাকার আয়তন নির্ধারিত, তবুও এর ফলে সংরক্ষিত এলাকায় ছোট ছোট জমিতে ধাপে ধাপে বসতি স্থাপনের কাজ বন্ধ করা সম্ভব নয়। ফলে সংরক্ষিত অঞ্চলগুলির খণ্ডীকরণ অব্যাহত থাকতে পারে।”
গোয়া সরকার সাত্তারি তালুকের কয়েকটি গ্রামকে ESA-র আওতা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে। সাত্তারি এমন একটি অঞ্চল, যেখানে প্রচুর পরিমাণে লৌহ আকরিকের ভাণ্ডার রয়েছে।
পোরিয়েমের বিধায়ক এবং গোয়া ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের চেয়ারপার্সন দেবিয়া রানে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সাত্তারির মানুষের প্রতি অবিচার হয়, এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হবে না। রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জনগণের উদ্বেগের বিষয়গুলি জোরালোভাবে তুলে ধরবেন।”
কেরলে, কেরল কংগ্রেসের সাংসদ ফ্রান্সিস জর্জ ESA-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিটিকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই বিজ্ঞপ্তিতে কেরলের দীর্ঘদিনের দাবিকে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। কেরলের দাবি হল, প্রস্তাবিত ESA-র আওতা থেকে জনবসতিপূর্ণ এলাকা, চা-কফি বাগিচা এবং কৃষিজমিকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দিতে হবে।
কেরল ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এবং ESA-র একজন কঠোর সমালোচক অ্যালেক্স ওঝুকায়িল বলেন, এই বিধিনিষেধের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ হল পর্যটন শিল্পের উপর এর প্রভাব। ওয়ানাড় ও ইদুক্কি অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দাদের আয়ের একটি বড় উৎস হল পর্যটন।
তিনি বলেন, “১০টি শোবার ঘরবিশিষ্ট একটি তিনতারা হোটেলকেও ‘লাল তালিকাভুক্ত শিল্প’ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। একইভাবে, ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতালও এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই বিধিনিষেধ আমাদের জমির মূল্যকে প্রভাবিত করবে। আর কৃষকদের কাছে জমিই হল সম্পদ।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বুঝি যে এই অঞ্চলগুলি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল। কিন্তু বিধিনিষেধ আরোপের আগে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”
ESA-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ সরকারি আধিকারিক, যিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমোদনপ্রাপ্ত নন, জানান যে কেরলে বিজ্ঞাপিত ৯,৯৯৩.৭ বর্গকিলোমিটার ESA এলাকা রাজ্য সরকারের নিজস্ব প্রস্তাবের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়েছিল।
ওই আধিকারিক বলেন, “বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে জনসাধারণের ভুল ধারণা কিছু কিছু অঞ্চলে ESA-র বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোর করে তুলেছে। তবে অন্য কয়েকটি অঞ্চলে আমরা পরিস্থিতির উন্নতিও লক্ষ করেছি।” তাঁর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও তামিলনাড়ুতে ESA-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিটি অনেকটাই গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে।
এক জটিল ও বিতর্কপূর্ণ প্রক্রিয়া
ESA-র সীমানা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে ঝামেলা ২০১১ সাল থেকেই অব্যাহত রয়েছে। ওই বছর পরিবেশবিদ মাধব গাডগিলের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি প্রথম এই সীমানা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল।

গাডগিল কমিটির রিপোর্টটি পশ্চিমঘাট অঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণের পক্ষে একটি যুগান্তকারী প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রতিবেদনে পশ্চিমঘাটের সমগ্র ১,২৯,০৩৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ESA-র আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছিল। পাশাপাশি, বিভিন্ন ESA অঞ্চলকে পরিবেশ সংরক্ষণের ভিন্ন ভিন্ন স্তর অনুযায়ী ভাগ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।
পশ্চিমঘাটের পরিবেশগত বৈচিত্র্যের অন্যতম কারণ হল এর ভূপ্রকৃতিগত বৈচিত্র্য। এই পার্বত্য অঞ্চলে ক্রান্তীয় চিরহরিৎ আর্দ্র বন, পার্বত্য অঞ্চলের খর্বাকৃতির চিরহরিৎ বন (শোলা বন), ল্যাটেরাইট শিলাগঠিত মালভূমি, তৃণভূমি এবং আর্দ্র ও শুষ্ক পর্ণমোচী বন দেখা যায়।
এ ছাড়াও, পশ্চিমঘাট থেকেই তিনটি প্রধান নদী—গোদাবরী, কাবেরী ও কৃষ্ণা নদীর উৎপত্তি হয়েছে।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের প্রাক্তন বিজ্ঞানী এবং পশ্চিমঘাটের পরিবেশগত গুরুত্ব নিয়ে গবেষণা করা টি ভি রামচন্দ্র বলেন," নদীর অববাহিকা অঞ্চল প্রাকৃতিক অরণ্যে আচ্ছাদিত থাকলে নদীগুলিতে সারা বছর জলপ্রবাহ বজায় থাকে। এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জলসংকটের কথা বিবেচনা করলে, জলের এই উৎস সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ"।

তিনি আরও বলেন, “আমরা দেখেছি, প্রাকৃতিক অরণ্যের আশপাশের গ্রামগুলিতে কৃষিজ ফসলের উৎপাদন অন্যান্য এলাকার তুলনায় দ্বিগুণ ছিল। সুতরাং, পরিবেশ সংরক্ষণের একটি অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।”
গাডগিল কমিটি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে পশ্চিমঘাটের সমগ্র অঞ্চলে পরিবেশগত সংবেদনশীলতার মাত্রা একরকম নয়। তাই কমিটি প্রস্তাব করেছিল, বিভিন্ন পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল (ESA) নির্ধারণের ক্ষেত্রে একাধিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রাপ্ত সম্মিলিত স্কোর বিবেচনা করা হোক। এই মানদণ্ডগুলির মধ্যে ছিল সংশ্লিষ্ট প্রজাতির স্থানিক উপস্থিতি বা endemicity, তাদের সংরক্ষণের অবস্থা, ভূতাত্ত্বিক ভঙ্গুরতা প্রভৃতি।
এ ছাড়া, ESA-র অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলিতে বিভিন্ন কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা ও পরিকল্পনার জন্য পশ্চিমঘাট পরিবেশবিদ্যা কর্তৃপক্ষ (Western Ghats Ecology Authority বা WGEA) গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।
কমিটির সুপারিশ ছিল, WGEA যেন “এই অঞ্চলগুলির আওতায় থাকা গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিকে চিহ্নিত করে এবং প্রতিটি সংবেদনশীল অঞ্চলের নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণের জন্য জনতার সাথে ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া শুরু করে।”
যদিও কমিটি তার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল, তবুও রাজ্য সরকারগুলি তার সুপারিশগুলির বিরোধিতা করে। বিশেষত, জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলিতে নির্দিষ্ট ধরনের শিল্প ও পরিকাঠামোগত উন্নয়নের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করার যে প্রস্তাব কমিটি দিয়েছিল, তা রাজ্য সরকারগুলি মেনে নিতে পারেনি।
এই উদ্বেগগুলি প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে, কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক ২০১২ সালে বিজ্ঞানী কে. কস্তুরীরঙ্গনের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কর্মগোষ্ঠী (High Level Working Group) গঠন করে। গাডগিল কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা এবং সেই সঙ্গে রাজ্য সরকারগুলির উত্থাপিত আপত্তিগুলি খতিয়ে দেখাই ছিল এই কর্মগোষ্ঠীর প্রধান দায়িত্ব।
কস্তুরীরঙ্গন কমিটির প্রতিবেদনে পশ্চিমঘাটের শুধুমাত্র অবশিষ্ট প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি ও বনভূমি এলাকাকে ESA-র আওতায় রাখা হয়। বিভিন্ন স্থানের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে, পশ্চিমঘাটের সম্পূর্ণ এলাকার মাত্র ৩৭ শতাংশ এলাকাকে ESA-র আওতায় রাখার সুপারিশ করা হয়। এই এলাকার পরিমাণ ছিল ৫৯,৯৪০ বর্গকিলোমিটার।

এই রিপোর্টে ESA-র অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার পথও খুলে দেয়। অথচ গাডগিল কমিটি এই ধরনের প্রকল্পের বিরুদ্ধে কঠোর সুপারিশ করেছিল।
এরপর থেকে জারি হওয়া ESA-সংক্রান্ত সমস্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তিই কস্তুরীরঙ্গন কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখিত এলাকাগুলির ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছে। তবে এই বিজ্ঞপ্তিগুলি নিয়ে রাজ্যগুলির আপত্তি ও বিরোধ এখনও অব্যাহত রয়েছে।
পশ্চিমঘাটের সংরক্ষণ
২০২২ সালে কেন্দ্রীয় সরকার আরও একটি কমিটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন বন বিভাগের প্রাক্তন মহাপরিচালক সঞ্জয় কুমার। কমিটিকে “ছয়টি রাজ্য সরকারের সুপারিশগুলি সামগ্রিকভাবে পুনর্বিবেচনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাতে বিপর্যয়প্রবণ এই আদিম প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণের দিকগুলি এবং সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা, প্রয়োজন ও উন্নয়নমূলক আকাঙ্ক্ষাগুলি বিবেচনায় রাখা যায়।”
২০২৪ সালে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে কেরলের ওয়ানাড়ে এক ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এই বিপর্যয়ের পর ESA-র সীমানা চূড়ান্ত করার গুরুত্ব আরও বেশি করে সামনে আসে।
এর আগে জারি করা খসড়া বিজ্ঞপ্তিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পর ষষ্ঠ ESA-র খসড়া বিজ্ঞপ্তিটি পুনরায় জারি করা হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, ওয়ানাড়ে ভূমিধসের ঘটনা ঘটার ঠিক পরের দিনই এই বিজ্ঞপ্তি পুনরায় জারি করা হয়েছিল।
রামচন্দ্রের মতে, পশ্চিমঘাটের বনভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের খণ্ডীকরণ এবং নিয়ন্ত্রণহীন উন্নয়নের ফলে বিভিন্ন রকমের ঝুঁকি বাড়ছে। যার মধ্যে আরও ঘন ঘন ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে। এই ঝুঁকিগুলির কারণেই ESA-র সীমানা চূড়ান্ত করা জরুরি।
তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৫ সালে পশ্চিমঘাটের চিরহরিৎ বনভূমি মোট এলাকার ১৬ শতাংশ জুড়ে ছিল, যা ২০১৮ সালে কমে ১১ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, একই সময়ে নির্মাণ এলাকা ৪.৫ শতাংশ এবং কৃষিজমির ৯ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, “প্রাকৃতিক পরিবেশের খণ্ডীকরণের ফলে জীববৈচিত্র্যের উপর যে প্রভাবগুলি পড়ে, তার মধ্যে রয়েছে বেঁচে থাকার রসদের অভাব বা খাদ্যের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রজাতির বৃদ্ধির হার হ্রাস, বন্যপ্রাণীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনগত আদান-প্রদানে বিঘ্ন এবং মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া।”
তিনি বলেন, “জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি দুর্ভাগ্যজনক। কারণ, পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ইতিমধ্যেই এই ধরনের প্রকল্পের ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। এর পরেও নতুন প্রকল্প গড়ে উঠলে বনভূমির বিস্তীর্ণ অংশ জলের তলায় ডুবে যাবে এবং নীচের দিকে জলের যোগানের উপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “পশ্চিমঘাট সংরক্ষণ করা না হলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাত, বাহকবাহিত রোগ (vector-borne diseases) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সবকিছুরই অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।”
মূল প্রবন্ধটি Mongabayপত্রিকায় প্রকাশিত। ইংলিশ প্রবন্ধটির অনুমতিক্রমে অনুবাদ করা হল বনেপাহাড়ের পাঠকদের জন্য। মূল প্রবন্ধটির লিঙ্ক: https://india.mongabay.com/2026/08/why-western-ghats-states-cant-agree-on-eco-sensitive-areas/







