বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ৫
ভারতের বাঘবনের ইতিহাস কত জানা, না-জানায় ভরা। তার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে কত রূপকথার গল্প। তাতে মিশে মানুষেরও রক্ত, ঘাম, আবেগ। সেই সব কথাই উঠে আসছে সায়ন্তন ঠাকুরের কলমে এই ধারাবাহিকে। আজ পঞ্চম পর্ব।

‘তারা’ আর ‘খৈরি’ কিন্তু একই গল্পের দুটি ভিন্ন অধ্যায় নয়, বরং বলা ভালো তারা দুটি পৃথক কাহিনি। খৈরি ছিল জঙ্গলের বাঘিনী, যে একেবারে শৈশবেই দুর্ভাগ্যবশত পড়ে মাতৃবিচ্ছিন্না এবং সরোজবাবুর কাছে পরবর্তী সময়ে বড়ো হয়ে ওঠে—সেই আখ্যান আপনাদের শুনিয়েছি। অপরদিকে তারার জন্মই হয়েছিল চিড়িয়াখানায়, তাও আবার আমাদের দেশে নয়, সুদূর ইংলন্ডের লিস্টাশায়ার অঞ্চলে ট্রাইকোস চিড়িখানায় জন্মানো এই বাঘিনীর নাম দেওয়া হয়েছিল জেন। সে কোনোদিনই জঙ্গলের পরিবেশে অভ্যস্ত ছিল না, স্বাভাবিক শিকারও শেখেনি মায়ের কাছে, ফলে জেনের পক্ষে প্রাকৃতিক নিয়মে জঙ্গলে মানিয়ে নেওয়া এককথায় অসম্ভবই শুধু নয়, কল্পকাহিনির মতনই তা ছিল অবাস্তব। কিন্তু এখানেই ঘটে গেল এক আশ্চর্য ব্যতিক্রমী ঘটনা; বিলি যখন তাকে ভারতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছিলেন তখন অনেক পরিবেশকর্মীই ভেবেছিলেন এই অবাস্তব খামখেয়ালী আচরণের ফলে ওই ক্ষুদ্র শাবকটি প্রাণেই মারা যাবে—কারণ চিড়িয়াখানায় জন্মানো বাঘ কখনও জঙ্গলের পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে না! যদিও বিলি তেমনটি মোটেই ভাবতেন না; তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আগামীকালে ভারতের অরণ্যে ঘনিয়ে আসা এক চরম সংকটের সঙ্গে লড়াইয়ের হাতিয়ার তৈরিরঃ কী সেই লড়াই? কেমনই বা সংকট?
এই কথা জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আরেকটু; ভারতে যখন প্রথমবার অভয়ারণ্য নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল তখন দুটি জঙ্গলের মধ্যে সীমারেখা তৈরীর প্রস্তাব দেওয়া হয়, আদতে এই বিচ্ছিন্ন অরণ্য যে কতটা বিপজ্জনক তা কারোও-ই মাথায় আসেনি, ভাবা হয়েছিল, সীমারেখা না থাকলে একটি অভয়ারণ্য থেকে প্রাণীরা অন্য অভয়ারণ্যে চলে যাবে আর তখন তাদের দেখাশোনা অথবা জঙ্গল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে প্রশাসনিক জটিলতা। এ যেন মানুষের তৈরি দুটি জেলা—যেখানে এক জেলাশাসকের সীমা শেষ হয়ে শুরু হয় অন্য জেলাশাসকের অঞ্চল, অথবা দুটি রাজ্য, এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যেমন অন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মানেন না, ঠিক তেমনই আর কি! ভুলে যাওয়া হয়েছিল জঙ্গল আদতে এরকম কোনো প্রশাসনিক ক্ষেত্র নয়, সেখানে দুটি পৃথক বনাঞ্চলের সংযোগ না থাকলে প্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হবে আর তখনই শুরু হবে এক ভয়াবহ বিপদ, বিপজ্জনক মহামারী, যার আঁচ তখন প্রায় কেউই বুঝতে পারেননি। আজ যা কালক্রমে ভারতীয় জঙ্গলের অন্যতম প্রধান বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে—আন্তঃপ্রজনন; বিষয়টি তেমন জটিল কিছু নয়, আমি সহজভাবে বলার চেষ্টা করছি।
ধরা যাক, আমাদের পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডে পালামৌর বাঘবন—একদিকে ছত্তিশগড় আর অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডের চাইবাসা অরণ্য, এটি আবার মিলেমিশে গেছে আমাদের রাজ্যে পুরুলিয়ার জঙ্গলে, মাঝে আছে আন্তঃরাজ্য সীমানা, এমনকি একই রাজ্যের দুটি ভিন্ন জঙ্গলের মধ্যে সীমারেখা। এখন এই সীমারেখা বা বর্ডার তো মানুষের তৈরি, যারা আদতে বিভেদকামী, যারা দুটি দেশের মাঝে-মানুষের মাঝে-ভিন্ন ভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মাঝে-নারী ও পুরুষের মাঝে সর্বদা অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর সৃষ্টি করে পৃথক পৃথক চৌখুপি নির্মাণ করতেই বেশি উৎসাহী, সর্বদা; মাঝে মধ্যে গান্ধী, ম্যান্ডেলা, রবীন্দ্রনাথের মতন কেউ কেউ অবশ্য বলেন বিপরীত কথা কিন্তু সেসব কথা কানে আর কে তোলে, ওসব বইয়ে থাকাই ভালো, আমরা বেশ চৌখুপিগুলির মধ্যে লড়াই করব, ওতেই অনাবিল আনন্দ!
মজার কথা হল, মনুষ্যেতর, প্রকৃত প্রস্তাবে অবশ্য আমাদের থেকে বেশি ভদ্র, প্রাণীরা এমন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত নয়। তারা বিশদ আকাশ, অবারিত বন্যপ্রান্তর, আগলভাঙা জোসনায় বাতাসে বাতাসে ভেসে থাকা এই চমৎকার ভুবনডাঙার বাসিন্দা, ফলে ছত্তিশগড়ের কোনো বাঘিনীর সঙ্গে যদি ঝাড়খণ্ডের কোনো বাঘের প্রণয় হয় তাহলে ‘দলিত-ব্রাহ্মণ’ অথবা ‘লাভ-জিহাদ’ বলে তাদের কেউ কখনও মারামারি করে না!
তারা মারামারি করে না বটে কিন্তু আমরা তো করি, ফলে চোখ রাঙিয়ে বলি, কেন, আমার রাজ্যের বাঘ তোমার রাজ্যের বাঘিনীর সঙ্গে প্রেম করবে কেন? ওদের বাচ্চা হলে কোন রাজ্য পাবে?
আপনাদের নিশ্চয় মনে থাকবে, বছর দুই আগে ঝাড়গ্রাম-বেলপাহাড়ি-কাকড়াঝোরের দিকে চলে আসা সেই হতভাগ্যা বাঘিনী জিনাতের কথা; সীমানা লঙ্ঘনের দায়ে কী দুর্ভোগই না তাকে পোহাতে হয়েছিল!
সাধারণত:, ভারতের কোনো বাঘবনই তাঁদের নিজেদের বাঘকে অন্য অভয়ারণ্যে যেতে দিতে চান না, কারণ বাঘ চলে গেলে পর্যটকদের সংখ্যাও কমবে, ফলত উপার্জন হ্রাস পাবে। এই নিয়ে একটি অলিখিত প্রতিযোগিতা বিভিন্ন রাজ্যের বাঘবনের সদর দপ্তরগুলিতে চলতেই থাকে। প্রতিটি রাজ্যের বাঘবনের কর্মকর্তা দাবী করেন, টাইগার টুরিজমে তাঁদের রাজ্যই সেরা! এর ফল কিন্তু খুব একটা সুখকর হয় না, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, করবেট বাঘবনের বর্তমান বাঘের সংখ্যা সেই জঙ্গলের অনুপাতানুযায়ী অনেকটাই বেশি; একটি পুরুষ বাঘ প্রায় কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার জুড়ে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করে, সেখানে থাকতে পারে সর্বাধিক তিনটি বাঘিনী কিন্তু অন্য পুরুষ বাঘ প্রবেশ করলেই শুরু হয় সম্মুখ সমর—সেই পুরাতন কিস্সা, নারীর অধিকার নিয়ে লড়াই, ট্রয় অথবা লঙ্কার কথা আমাদের নিশ্চয় মনে পড়বে।
প্রথম পর্ব: বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ১
পুরুষ বাঘের এমন লড়াই প্রায়শই রক্তক্ষয়ী, মারাও যায় কেউ একজন, নাহলেও প্রবল আহত হয়। কিন্তু এহ বাহ্য; বিভিন্ন জঙ্গলে বাঘদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার ফল সুদূরপ্রসারী, শুরু হয় একই জঙ্গলের বাঘ-বাঘিনীর আন্তঃপ্রজনন আর তারই হাত ধরে আসে বিভিন্ন জিনগত অসুখ, দেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়া ও শিশুশাবক মৃত্যুর মতন মারাত্মক ঘটনা। সম্প্রতি উড়িষ্যার সিমলিপাল বাঘবনে যে ‘কালো বাঘ’ বা ‘মেলানিন স্পটেড’ টাইগার দেখা যাচ্ছে তা এই আন্তঃপ্রজননেরই ফল; পর্যটকরা তাতে উৎসাহিত হলেও বাঘ-সংরক্ষক ও পরিবেশবিদরা এই ঘটনায় যার-পর-নাই উদ্বিগ্ন।

এমন সমস্যা এড়ানোর কথা কিন্তু ভেবেছিলেন বিলি, আজ নয়, ভারতের বাঘ সংরক্ষণের সেই আদি যুগে; তাঁর মনে হয়েছিল ‘টাইগার করিডরের’ কথা—যা কিনা বিভিন্ন বাঘবনের মধ্যে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলবে। হায়! বিলি ভেবেছিলেন দরদী পরিবেশবিদ হিসাবে, বিভিন্ন বাঘবনের ‘কোথায় বাঘ বেশি’র অশ্লীল প্রতিযোগিতা ও ভারতীয় আমলাতন্ত্রের কুখ্যাত ‘লাল ফিতের জট’ তাঁর অজানাই ছিল!
তাঁর কথা স্বাভাবিকভাবেই কোনো বনদপ্তর কানেই তোলেননি, এখনও যে বাইরের কারও কথা শোনেন এমন নয়। ওঁদের বদ্ধমূল ধারণা দেরাদুনের ওই বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বাইরে কোনো লেখক, পরিবেশবিদ, সমাজকর্মী অথবা প্রাক্তন শিকারি—কেউই বাঘ সংরক্ষণের কিছুই বোঝেন না! এই নিয়ে প্রয়াত সাহিত্যিক শ্রী বুদ্ধদেব গুহ নিজে আমার কাছে আক্ষেপ করেছিলেন, তাঁর কথাগুলি এখনও কানে বাজে।
দ্বিতীয় পর্ব: বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ২
তৃতীয় পর্ব: বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ৩
চতুর্থ পর্ব:
তারার আখ্যানে যাওয়ার আগে ওঁর কথাগুলি বলে আজকের পর্ব এখানেই শেষ করব।
সেদিন দিনটি ছিল মেঘ ঝলোমলো, ওঁর ‘সানি টাওয়ার্সে’র অতিকায় ঘরে কাচের জানলার বাইরে দুপুর না গড়াতেই কলকাতা জুড়ে নেমে এসেছিল ঝুম আবছায়া, দূরে ভিক্টোরিয়ার প্রাচীনা পরীর ডানায় বারংবার আহত হয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছিল ক্ষ্যাপাটে বেপথু হাওয়া-বাতাস।
রূপবান বৃদ্ধ মানুষটি বসে ছিলেন খাটে, মুখে পান থাকায় বেশ রসস্থ দেখাচ্ছিল, ফিনফিনে ওষ্ঠে লেগে ছিল মৃদু হাসি। তখন মধুমেহর কারণে চোখ দুটি প্রায় অকেজো, বললেন, ‘তোমায় পালামৌর কুয়াশামোছা জঙ্গলের মতনই আবছা দেখছি!’
কথায় কথায় উঠে এল পুরনো সব কথা—ডালটনগঞ্জের মোহন বিশ্বাস, বাবুর্চি জুম্মান, রুদ-কেঁড়-মুণ্ডু বনবাংলো, চান্দোয়া বস্তি, টোরির ঘাট অর্থাৎ যুবতির বেণীর মতন পিচ্ছিল আকাবাঁকা পথে ওঠার আগে আমঝারিয়া বাংলোর রূপ, ‘হ্যাপি হান্টিং গ্রাউন্ডসে’ চলে যাওয়া তাঁর বনসখাদের স্মৃতি…টুটু ইমাম, আবু সাত্তার…গরীব দেহাতি হাটে বসে থাকা ওঁরাও যুবতিদের করৌঞ্জ-মহুয়া তেলে টান করে বাঁধা রূপবতী খোঁপা, মহুয়ামিলন ইস্টিশান, কত শত ঠুঠা বাইগা, বাঁশবাবু, ভয়ঙ্কর, এই দেশের দুবেলা খেতে না-পাওয়া সৎ সহজ কর্মঠ প্রেমিক বনবাসী মানুষ…তিনি বলছিলেন কথা অবিরল আর আমি দেখছিলাম সানি টাওয়ার্সের মহার্ঘ ফ্ল্যাটবাড়ি মুছে জেগে উঠছে ক্রমশ আমার ভারতবর্ষ, উজ্জ্বল, দরিদ্র অথচ স্বাভিমানী…ভেসে আসছিল বনবিহারীর আবেগ-জর্জর কণ্ঠ… ‘জঙ্গল মানে শুধুই তোমার ওই বইয়ে লেখা মায়া মধু মধু প্রেম নয়! শুধু প্রকৃতিও নয়। জঙ্গল মানে কী জানো? খাদ্য আর খাদকের এক চেইন, আলো ঝলমল এক সকালে শ্বাপদ কোটরা বা শিঙাল মারবে, তার দুদিনের খাবার,ওই শিঙাল খায় মহুয়া ফল বা ঘাসপাতা, জঙ্গল থাকে পরিষ্কার। আবার সন্ধে হলে প্যাঁচা খাবে ইঁদুর, নরম তুলতুলে ইঁদুর, আর সেই ইঁদুর খায় সারাদিন ধরে মাঠের শষ্য—এই হল ফুড চেইন। বুঝেছ?’
অর্বাচীন প্রগলভতার সুরে বলেছিলাম, ‘সে তো ওরা বন্যপ্রাণী, ওদের এটাই নিয়ম কিন্তু মানুষ যে নির্বিচারে সবাইকে মেরে এই ফুড চেইনের উপরে রাজা হয়ে বসল, তখন? আপনার শিকারের যুক্তি তো সেখানে খাটে না! তাহলে?’

প্রাচীন অভিজ্ঞানের মতন শোনাল কণ্ঠস্বর, ‘শিকার? নিজেরা তো শহরে ফার্মের গোরু, শুয়োর, মুরগি খাও, আর ওখানে, ওই দরিদ্র বনপাহাড়ে, তোমার দরিদ্র দেশে ওই হতদরিদ্র মানুষরা সারাবছর কোন্ প্রোটিন পায়, তার হিসাব রাখো? শোনো, এই দেশের অরণ্য চষে বেরিয়ে দেখেছি, এদের দুবেলার খাবার মকাই দানা সেদ্ধ অথবা খুদের ভাত, সেই ভাতে মহুয়া কি সলপ অথবা আফিম মিশিয়ে খায়, যাতে খিদে আর না পায়! পিলে পেটে হাড় জিরজিরে সেইসব শিশুদের খোঁজ রাখো? তাদের জন্য একটা শম্বর কি চিতল মারলে কোনও পাপ হয় না, অরণ্যও ধ্বংস হয় না, শালপাতার একটা দোনায় শিকারের মাংস নিয়ে গরীব বাপ এই বনপাহাড়ে রাংচিতার বেড়া দেওয়া তার রোগজর্জর বাড়ি ফিরলে শিশু কন্যার মুখে যে হাসি ফুটে ওঠে, তাকেই আমি আমার দেশ বলে জানি।’
(ক্রমশ)
লেখক পরিচিতি: শ্রী সায়ন্তন ঠাকুর, বাংলা ভাষার একজন কথাকার ও ঔপন্যাসিক। এখনও অবধি বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে গল্প-উপন্যাস-রম্য রচনা নিয়ে বাইশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ধানসিড়ি প্রকাশন থেকে 'অরণ্যকথা' সিরিজের বইগুলি অন্যতম।






