top of page
KANHA MAY 26.jpg

বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ৪

19 minutes ago
7 min read

ভারতের বাঘেদের ইতিহাস, তাদের ঘিরে থাকা ঘটনাপ্রবাহ বাঘেদের মতই চমকপ্রদ। ডোরাকাটায় যেমন চকিতে খেলে যায় বিদ্যুৎ তেমনই ভারতের বাঘেদের নিয়ে কথকতা শুরু হলে পরতে পরতে খেলে যায় তেমন চমক। সায়ন্তন ঠাকুরের কলমে প্রতিটি পর্বে উঠে আসছে তেমন সব চমকপ্রদ কাহিনী। আজ চতুর্থ পর্ব


দুধওয়ার বনে।  ছবি:  উপমন্যু রায়।
দুধওয়ার বনে। ছবি: উপমন্যু রায়।

আপনারা দুধওয়া ন্যাশানাল পার্ক গেছেন কখনও? যাঁরা যাননি তাঁদের বলি আমাদের দেশের অতিখ্যাত কয়েকটি টাইগার রিজার্ভের পাশে প্রচারের নিরিখে দুধওয়া হয়তো বা কিছুটা ম্লান, কিন্তু তার রূপভাষা অপ্রতিম—প্রথম দর্শনেই উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরি জেলায় হিমালয়ের পাদদেশ অর্থাৎ তরাই অঞ্চলে অবস্থিত এই বাঘবন অবারিত ঘাসি জমি, ছোট ছোট জলাশয়, যুবতীর নির্মেদ দেহবল্লরীর মতন শালবন দিয়ে সাজানো এক অরণ্যকথা বলেই মনে হয়; অনেকটা


যেন আমাদের ঘরের কাছে ডুয়ার্স, যদিও দুধওয়া অরণ্যের ছমছমে গল্প সেখানে নেই। নিজঝুম আলো পড়ে-আসা হেমন্ত দিনে বিবাগী বাতাসের দোলায় ঝরে পড়া হলদে শাল পাতায় সুরে সুরে এখানে ঘন হয়ে ওঠে অতীত সব কিংবদন্তী; আবছায়া গাঢ় হয় দরিদ্র অপরাহ্নে, পশ্চিমগামিনী পলাতকা ছায়ার আড়ালে ফিসফিসিয়ে মর্মরধ্বনি বলে যায় সেইসব প্রাচীন কাহিনি, ক্রমে মলিন আলো বনবাংলোর হাতায় মুছে গিয়ে জেগে ওঠে শ্বাপদ-রাত্রি, অদূরে কুটুরে প্যাঁচার তীক্ষ্ণ স্বরে সূচিত হয় বাঘবনের কিস্‌সা—মিজঝুম হ্যারিকেনের চারপাশে আলোর সহোদরা ছায়াবৃত্তে আমাদের গল্প শোনাতে এগিয়ে আসেন এক দীর্ঘকায় পুরুষ, এদিগরের মানুষজন তাঁকে বিলি সাহিব নামেই চেনে।


আপনারা চেনেন নাকি তাঁকে?


আসল নাম কুঁয়ার অর্জন সিং, পঞ্জাবের কাপুরথালা রাজপরিবারে উনিশশো সতেরো সালে পনেরোই অগাস্ট জন্মেছিলেন। জন্ম অবশ্য হয়েছিল উত্তরপ্রদেশের গোরখপুরে, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ায় সে- সময় কাপুরথালা পরিবারের রবরবা কিছু কম ছিল না—যেমনটিই কিনা স্বাভাবিক ছোট বড়ো মহারাজদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে ধরা হত। ওই পরিবারে আরও এমন একজন নারী রয়েছেন যাঁকে ভারতীয় চিকিৎসা পরিকাঠামোয় অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়—রাজকুমারী অমৃত কউর; অক্সফোর্ড-স্কলার এই বিদূষী মাত্র ষোলো বছর বয়সেই মহাত্মা গাঁধীর সেক্রেটারি হন, পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পর নেহেরুর মন্ত্রীসভায় ভারতের প্রথম মহিলা স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য, মূলত ওঁরই উদ্যোগে তৈরি হয় অল-ইন্ডিয়া- ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস বা এম্‌স। অমৃতাদেবীই তাঁর ভাইপো কুঁয়ার অর্জনের নাম দেন বিলি; অক্সফোর্ডের মেধাবিনী পিসির কাছে এমন নামই হয়তো প্রত্যাশিত! সবাই তো আমাদের ‘পিসি-ভাইপোর’ মতন নন!


যাকগে, সেসব কথা থাক, আমরা বরং বিলির গল্পে ফিরি। ভারতের বাঘ সংরক্ষণে অর্জন সিংয়ের নাম সোনার জলেই লেখা আছে, অবশ্য অনেকেই হয়তো তাঁর কথা জানেন না, কিন্তু ভারতের বাঘবনে, বিশেষত দুধওয়ায় কান পাতলেই শোনা যায় বিলি সাহিবের কিস্‌সা, শোনা যায় তারার কাহিনি।


দুধওয়া বাঘবনের প্রাণস্বরূপা সুহেলি নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রায় তেরোশো বর্গ-কিলোমিটার বিস্তৃত এই অরণ্য; চারশো নব্বই বর্গ-কিলোমিটার ‘কোর’ এলাকা আর বাকি অংশে মিলেমিশে রয়েছে কিষানপুর ও কাটারনিঘাট অভয়ারণ্য। বাঘবন হলেও আরও একটি আকর্ষণ এখানে আছে—ভারতীয় একশৃঙ্গ গণ্ডার, যা মূলত কাজিরাঙা ছাড়া আর অন্য কোনো বাঘের জঙ্গলেই দেখা যায় না। রয়েছে বাঘের স্বাভাবিক খাদ্য নানান প্রজাতির হরিণ, তাদের মধ্যে বারশিঙা দেখতে পাওয়ায় জন্য পর্যটকদের মধ্যে উৎসাহ সবথেকে বেশি; আর আছে রাজকীয় গজদল ও লেপার্ড—সব মিলিয়ে দুধওয়া অরণ্যপ্রেমীদের কাছে জংলা সুবাতাস বয়ে আনা অনতিক্রমণীয় হাতছানির মতন, আর এখানেই আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগে শুরু হয়েছিল এক গা-ছমছমে কাহিনি, যার নায়ক ছিলেন অর্জন সিং ‘বিলি’।


উনিশশো ষাট সালের প্রথমদিকে খেরি জেলার এই ঘন জঙ্গলে বিলি বেশ কিছুটা জমি একলপ্তে কিনে বসবাস করতে শুরু করেন, এর পেছনে অবশ্য অন্য একটি ঘটনা ছিল, যা বিলির মনোজগতে অকস্মাৎ হাজির হয়ে তাঁর আগামী জীবনের রূপরেখাই বদলে দিয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে স্বাধীনতার আগে অন্য আর পাঁচটা রাজপরিবারের মতন অর্জন সিংয়ের পরিবারেও শিকার-খেলা ছিল একটি রাজকীয় অভিজ্ঞান, যেটি ছাড়া আভিজাত্যের মুকুট বর্ণহীন। শিকার- খেলায় কিশোর বয়সেই হাতেখড়ি হয়েছিল বিলির, মাত্র বারো বছর বয়সে একটি অতিকায় বাঘ শিকার করে সকলের কাছেই বিস্ময়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। হাতের নিশানা ছিল নিঁখুত, সেই সঙ্গে একজন দক্ষ শিকারির মতনই অরণ্য সম্পর্কে ছিল অসীম কৌতুহল—যখন ঝিমিঝিম বাতাসে ভেসে আসে পুটুস ফুল-ঝোপ-বুনো ঘাস-শালকুসুমের সুবাস, ধুলাপথে আনমনে পড়ে থাকে বনফুল, যুবতির নিবিড় সিঁথির মতন গহিন নিঃসঙ্গ সুঁড়িপথের দুপাশে জেগে ওঠে আলো-ছায়ার ইকড়িমিকড়ি, বাদুলে মেঘে ছায়া ঘনিয়ে আসে বনে বনে তখন কিশোর বিলির চোখে চিরকালের মায়াকাজল হয়তো পরিয়ে দিয়েছিলেন বনদেবী স্বয়ং, সেই রূপসাজ আজীবন চেষ্টা করলেও মুছে ফেলা যায় না, বিলিও পারেননি। তবে ওই যে একটি ঘটনার কথা বললাম, সেটির ভূমিকাও কিছু কম ছিল না।

সেবার খেরির জঙ্গলে বিলি এসেছিলেন শিকার-খেলায়, উনিশশো একষট্টি সাল, অর্থাৎ ভারতে শিকার নিষিদ্ধ হতে তখনও প্রায় একযুগ দেরী। এখানে বলে রাখা ভালো, স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে শিকার করার এক বিচিত্র প্রতিযোগীতা শুরু হয় আর সেই কাজে মদত দিতেন স্বয়ং ভারত সরকারের পর্যটন দপ্তর ও বনবিভাগ! শুনতে আশ্চর্য লাগছে তো? কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাস্তবচিত্রটি এমনই ছিল! বিদেশিদের জন্য ভারত সরকারের পর্যটন দপ্তর বিজ্ঞাপন দিতেন—“Thrill to the excitement of a tiger ‘Shikar’, found only in the lush jungles of India. Fishing and small game hunting, too, await the adventurous sportsman!”


ভারতের সমস্ত জঙ্গলে এই শিকার-খেলা ছিল উৎসবের মতন, ব্রিটিশদের তৈরি বনবাংলো শিকার-পারমিট নিয়ে আসা মানুষদের রাত্রিবাসের জন্য বরাদ্দ হত—খানসামা, বাবুর্চি, বেয়ারা, গান-বেয়ারার নিয়ে সে এক হইহই কাণ্ড। কম বাঘ তো ছিল না, পালামৌর রূপবতী অরণ্যেই বাঘ ছিল অনেক, সেখানে রুদ কি বাঁড়েষার বনবাংলোয় প্রতি শীতে, বিশেষত ক্রিসমাসের সময়ে বিদেশি সাহেব-মেমসাহেব আসতেন, তাঁদের শিকারের পারমিটে লেখা থাকতঃ একটি বড়ো বাঘ, দুটি লেপার্ড, একটি ভালুক কি বাইসন মারা যাবে! আর হরিণ, ময়ূর, বুনো-শুয়োর ইত্যাদির কথা লেখার প্রয়োজনই ছিল না, কারণ তাদের ইচ্ছামতন, খেয়ালখুশি অনুযায়ী মারা যাবে! সাহেব-মেমসাহেব তাঁদের পুরাতন উপনিবেশে এমন সুযোগ পেয়ে নিশ্চয়ই খুব আহ্লাদিত হতেন, অবশ্য শিকার অনেকেই নিজেরা করতেন না, মানে পারতেন না আর কি! বড়ো বাঘ কি লেপার্ড মারার জন্য ছিল হতদরিদ্র, দু-বেলা খেতে না পাওয়া গিরধর তিরকে অথবা কাঁকসা ওঁরাওদের মতন কালোকুলো নেটিভ, যাদের নিয়ে ভারত সরকার অথবা বিদেশি শিকারিদের বিন্দুমাত্র চিন্তা ছিল না, ঠিক আজকের মতনই, ওরা তো ফালতু—জঙ্গলে বড়ো হয়ে একদিন প্রবল শীতের রাতে অথবা বাদলি দুপুরে কোয়েল কিংবা বুরহা নদীর তীরে নিঝুম শ্মশানে একাকী মহুয়া গাছের তলায়, নিঃসীম আকাশে ছড়িয়ে পড়া অস্ত-আলোর রেণুর সঙ্গে হারিয়ে যাবে, তেমনই তো নিয়ম। শুধুমাত্র দিশি গাদা বন্দুক নিয়ে তারাই মেরে দিত বাঘ, কয়েকটি টাকার বিনিময়ে, আর সেই অতিকায় রাজকীয় মৃত বাঘের গায়ের উপর গর্বিত ও উদ্ধত ডান পা’খানি তুলে বক্স-ক্যামেরায় ছবি তুলিয়ে রাখতেন প্যাটারসন অথবা স্মিথ সাহেব! তারপর দেশে ফিরে লানডানের ঝলমলে বৈঠকখানায় ওই ছবি দেখিয়ে অতিথিদের শোনাতেন মহাবিষধর ভুজঙ্গ-হিংস্র শ্বাপদ-ফকির-উপকথা-কালা জাদুর দেশ ভারতবর্ষের অরণ্যের চিত্তাকর্ষক কাহিনি; অত দূরে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে কাঁকসাদের গল্প সেই সাগরপারে রাণীর দেশে কি কখনও পৌঁছাতে পারে? পারেনি, আজও পারে না! যেমন এই মুহূর্তে গড়চিরোলি অথবা নিকোবরের অরণ্য ধ্বংসযজ্ঞের কথা ‘বিকশিত’ ভারতবর্ষ পার হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঝলমলে গ্লো-সাইনবোর্ডে পথ হারিয়ে নিঝুম আঁধারে মিলিয়ে যায়।


দেখুন দিকি, কথায় কথায় কতদূর চলে এলাম! তা এলেই বা ক্ষতি কী, আমি তো মজলিশি ঢঙে বাঘবনের কিস্‌সা শোনাতেই বসেছি, এ তো আর ঠাণ্ডা ঘরের বাঘ-সংরক্ষণ নিয়ে লেকচার নয়, এ হল গে আমাদের জংলা-পিরিতের আখ্যান; আপনারা যাঁরা বনমায়ায় পথ হারিয়েছেন, যাঁরা নতুন করে হারিয়ে যেতে চান, তাঁদের জন্যই লিখে রাখছি এই প্রেম-অরণ্যকথা।

চলুন, এবার বিলির কথায় ফিরি।

উনিশশো একষট্টি সাল থেকেই বিলি খেরি জঙ্গলে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন, তাঁর খামার বাড়িটি বেশ বড়োই ছিল; তরাইয়ের গহিন জঙ্গলে সুহেলি নদীর তীরে এই অপরূপ বনাবাস দেখলেই তার প্রেমে পড়ে যেতে ইচ্ছা হয়। আরেকটি ছোট নদীও আছে ওই অঞ্চলেঃ নেওড়া, তার দুই তীরে ঘাসিজমি আর ওই ঘাসবন শেষ হলেই শুরু হয় দ্রিমি দ্রিমি অরণ্য—শ্বাসরোধী, ছমছমে ও প্রেমিকার বন্য সোহাগের মতনই তীব্র। আপনার মনে প্রশ্ন উঠছে নিশ্চয়, যে রাজকীয় বিলাস-বৈভবের জীবন ছেড়ে কাপুরথালার রাজকুমার হঠাৎ এমত বন্য জীবন বেছে নিলেনই বা কেন? এই ঘটনা তো খুব স্বাভাবিক নয়।


সত্যিই স্বাভাবিক নয়, অন্তত সেই সময় ভারতে ছোট ছোট করদ রাজ্যের রাজাদের প্রায় প্রত্যেকেরই ছিল নিজস্ব জঙ্গলমহাল ও সেখানকার নিঝুম কোরকে এক বা একাধিক শিকার-বাড়ি অর্থাৎ হান্টিং লজ—যেখানে প্রায়শই বন্ধু-বান্ধব, বিদেশি অতিথিদের নিয়ে মহারাজা শিকার খেলায় আসতেন, পৌরাণিক আমলের মৃগয়ার আধুনিক সংস্করণ বলা যেতে পারে। সিমলিপালে ময়ূরভঞ্জের রাজাদের এমনই এক বিখ্যাত শিকার-বাড়ি ছিল চহ্বালা লজ, সেখানে কিছু আধিদৈবিক ঘটনাও ঘটেছিল; সে-গপ্পো পরে একদিন বলব’খন। আজ আমাদের গন্তব্য খেরি বা দুধওয়ার অরণ্য, যেখানে বিলি হঠাৎ এসে স্থায়ী আস্তানা গড়ে তুললেন।

এই ঘটনার অন্তরালে যে কাহিনি ছিল তা অত্যন্ত মর্মদন্তু, চিত্তাকর্ষকও বটে। খেরিরে জঙ্গলে বিলি সাধারণ শিকারেই এসেছিলেন, ওটি ছিল তাঁর তীব্র নেশা, যা সুরারও অধিক। সাধারণত অবশ্য তাই হয়; অরণ্যপ্রেমে পুরুষ উন্মাদ হয়ে উঠলে রূপবতীর অধরোষ্ঠ, সুরাপাত্র, অর্থ—সবকিছুই পানসে লাগতে শুরু করে, তার রক্তে মিশে যায় বনদেবীর ইশারা ও কুহকিনী বনকৌমুদি; মানুষের আবাদে কখনও আর তার ফেরা হয় না।

বিলিরও তাই হয়েছিল; সেদিন কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে হুড-খোলা লেফট-হ্যান্ড ড্রাইভ জিপ চড়ে সন্ধ্যার ঝুঁঝকি আঁধারে শিকারে বেরিয়েছিলেন। হেমন্তের কৃষ্ণপক্ষে মিজমিজে কুয়াশায় তরাই উপত্যকা, সুহেলি নদীর দুপাশে ঘাসি জমি, অদূরে আঁধার-কায় সারি সারি নিঝুম শালবন, স্মৃতিকথার মতন সুঁড়িপথ সবাই কেমন যেন রহস্যময়ীর বিস্রস্ত আঁচলে সেদিন তন্দ্রাচ্ছন্ন। বিলির আমেরিকান ফোর্ড জিপে লাগানো সার্চ লাইটের তীব্র আলো ওই কুয়াশা-মগ্না অরণ্যের নেশাতুর বিভ্রম একমুহূর্তে লম্পটের মতন নষ্ট করল; সাদা অশ্লীল আলোয় ভেসে যাওয়া চরাচরে বিলির চোখে পড়ল পুটুস-ঝোপের আড়ালে একটি লেপার্ড, কালবিলম্ব না-করে রিগবি পয়েন্ট টু-নট-সিক্স রাইফেলে নিশানা নিলেন আর পরমুহূর্তেই আর্তনাদে সচকিত হয়ে উঠল অরণ্য চরাচর। জিপ পশুটির কাছে এগোতেই বিল দেখলেন, প্রাণীটির মখমলি শরীর বেয়ে নেমে আসছে কালচে রুধির স্রোত; রাইফেলের সফট-নোজড গুলি সম্ভবত ফুসফুস ফুটো করে দিয়েছে। অন্যদিন এইসব মুহূর্তে বিলি কিশোর বয়সের মতন উচ্ছ্বল হয়ে ওঠেন, মনে মনে হিসাব করেন ক’টি ট্রফি হল কিন্তু সেদিন অজানা কী এক কারণে যুবক বিলির মন আর্দ্র ও করুণ হয়ে উঠল; অকস্মাৎ মনে হল, এই শিকার খেলায় বাহাদুরির কিছুই নাই! একটি নিরীহ প্রাণী বিনা কারণে সময়ের অনেক আগেই মারা পড়ল, তার দোষ এইমাত্র যে মানুষের জিপের শব্দ শুনেও সে পালাতে পারেনি।


খেয়াল করলে দেখা যায়, আমাদের প্রায় সবার জীবনেই এমন একটি ক্ষণ আসে যার পর থেকে অনেকক্ষেত্রেই পূর্বতন জীবনরেখা চঞ্চলা নদীর মতনই গতিপথ বদলে নেয়। সবসময় কারণ স্পষ্ট বোঝা যায় না, হয়তো কখনই যায় না, শুধু মনে থেকে যায় ওই বিশেষ মুহূর্তটি; বিলির জীবনেও তেমনই হল, অলক্ষ্যে ম্লান হাসলেন হয়তো কোনো শুচিস্মিতা, যাঁর সামান্য ইচ্ছার মৃদুতম হিল্লোলেই নশ্বর মানুষের জীবন আমূল বদলে যায়।

সেই কুয়াশা-জর্জর হেমন্ত রাত্রে তারাভরা আকাশের নীচে, কুহেলিকাচ্ছন্ন তরাইয়ের জঙ্গলে আবাল্য শিকারি অর্জন সিংয়ের মন-অন্তরমহলে হয়তো জন্ম নিল অন্য এক বিলি, সেই মুহূর্তেই; যিনি নিজের বাকি জীবন শুধু বন্যপ্রাণীকে ভালোবেসে, তাদের সংরক্ষণের কথা ভেবেই কাটিয়ে দেবেন।

আমি বিশ্বাস করি, এমনই হয়, দক্ষ হৃদয়বান শিকারির তুল্য অরণ্যকে কে-ই বা চেনে, কে-ই বা


তার প্রেমে টলোমলো হয়ে বেঁচে থাকে! এই কথায় অনেকে, হয়তো, বিশেষত বন সংরক্ষণের কথা শুধুমাত্র মুখে বলা শৌখিন বাবু-বিবিরা রাগ করতে পারেন, কিন্তু আমি নাচার। ডুয়ার্সের টুটা পান্ডে, ঝাড়খণ্ডের আধীশ সিং, উত্তরাখণ্ডের ছোটা-করবেট—যাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, তাঁরা সবাই অতিদক্ষ শিকারি, কিন্তু তাঁদের তুল্য অরণ্যের মহৎ প্রেমিক আমি অন্য কাউকে দেখিনি। এমনই একজন ছিলেন সুধীররঞ্জন, যিনি আমায় অনেকদিন আগে বলেছিলেন, ‘সংরক্ষণ কী জানো বাবা, বৃহৎ দাঁতাল থেকে ক্ষুদ্র গঙ্গাফড়িং—বনজঙ্গলে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বেঁচে থাকার নামই সংরক্ষণ। তার জন্য হৃদয়ে থাকতে হবে জংলা-প্রেমের স্বতোৎসারিত শতদল ঝর্ণামুখ, ওটিই সার কথা, নাহলে সবই ফক্কা!’

সত্যিই তাই; শুধুমাত্র একটি অতীব কঠিন সর্বভারতীয় পরীক্ষায় পাশ করে, দেরাদুন ইস্কুলে ট্রেনিং শেষে হলেই তো আর প্রকৃত বন-সংরক্ষক হওয়া যায় না, কাগজে-কলমে ফরেস্টার বা বনকর্তা হয়তো হওয়া যায় কিন্তু কার্পিট সাহিব বা বিলির মতন মানুষ তৈরি করা যায় না। আগেও যায়নি, ভবিষ্যতেও কখনও হবে না। ফলে ‘তারা’র সঙ্গে তাদের দেখাও হয় না।


(ক্রমশ)



লেখক পরিচিতি: শ্রী সায়ন্তন ঠাকুর, বাংলা ভাষার একজন কথাকার ও ঔপন্যাসিক। এখনও অবধি বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে গল্প-উপন্যাস-রম্য রচনা নিয়ে বাইশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ধানসিড়ি প্রকাশন থেকে 'অরণ্যকথা' সিরিজের বইগুলি অন্যতম।

 
 
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
 

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page