বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ৩
Updated: Sep 6
বনেপাহাড়ের পাতায় এই ধারাবাহিক আখ্যানে উঠে আসছে ভারতের বাঘবনের সব গূঢ়, গোপন কথা। সেখানে যেমন জীবজগতের জটিল জীববিজ্ঞান গল্পের আকারে উঠে আসছে, তেমনই কত না-জানা, স্বল্পজানা ইতিহাস ধরা দিচ্ছে বনজ গন্ধ মেখে। আজ তৃতীয় পর্ব। কলম চলছে সায়ন্তন ঠাকুরের।

আজ অন্যান্যদিনের মতন বৈজ্ঞানিক আলোচনা বরং থাক, এক প্রিয়দর্শিনী এই ধারাবাহিক পড়ে গত হপ্তায় মৃদু অনুযোগের সুরে বললেন, ‘শুধু তথ্য আর তথ্য! জঙ্গলের গল্প কি একটুও বলবে না তুমি?’
তাঁর কথা মেনেই, চলুন, আজ আপনাদের খৈরির গপ্পো বলি। আদতে গপ্পো নয়, সত্যি ঘটনা। তবে নিজের চোখে দেখা নয়, এই কাহিনি আমায় যিনি বলেছিলেন তাঁকে আমার পাঠক-পাঠিকারা চেনেন; তাঁর বালিগঞ্জের বাড়ির নাম ছিল ‘জঙ্গল মহল’! অকৃতদার, প্রৌঢ় মানুষটির নাম নিশ্চয়ই সবাই অনুমান করতে পারছেন—সুধীররঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। যিনি আমাকে জঙ্গল চিনিয়েছিলেন, আক্ষরিকার্থেই; যাঁরা পড়েননি তাঁর কথা, সেইসব উৎসাহী পাঠক-পাঠিকারা ধানসিড়ি প্রকাশনার ‘অরণ্যকথা’ সিরিজের বইগুলি পড়লেই জানতে পারবেন।
সে যাই-হোক, খৈরির কথা বরং শুরু করি এখন। এই কাহিনি তিনি আমায় পালামৌ বাঘবনের নিভৃতে রুদ বনবাংলোর বারান্দায় বসে শুনিয়েছিলেন; তখন চৈত্র মাস, প্রবল জংলা বাতাস ঝরা-বনের সুবাসে উতলা, যেন এক চির-উদাসী নিজের গৈরিক উত্তরীয়খানি বনপাহাড়ে আনমনে ফেলে রেখে একাকী হারিয়ে গেছেন। কয়েক মুহূর্ত পর সুধীরবাবু আমার পানে চেয়ে বললেন, ‘জানো, এইরকমই এক চৈত্র মাসে প্রথম খৈরির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল!’
প্লাস্টিকের বোতল থেকে মহুয়া শালের দোনায় ঢেলে একচুমুকে শেষ করে শুধোলাম, ‘খৈরি? সে আবার কে?’
‘সে এক বিচিত্র কাহিনি, তোমার অবশ্য জানার কথা নয়, সম্ভবত তোমার জন্মের আগেই খৈরি মারা গেছিল। গল্পটা খুলেই বলি, শোনো, এমন ঘটনা ইতিহাসে খুব বেশিবার ঘটে না, ভারতে তো এর দ্বিতীয় নজির এখনো অবধি খুঁজে পাওয়া যায় না।’
‘উনিশশো আটাত্তর সালের এপ্রিল মাস, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর কলকাতা তখন বেশ শান্ত, নতুন বামফ্রন্ট সরকার, জ্যোতিবাবু মানুষের চোখের মণি, আমাদের কাগজ কলের ব্যবসাও বেশ চলছে, হঠাৎ একদিন কলকাতার বাড়ির ঠিকানায় পালামৌ টাইগার রিজার্ভের ডেপুটি ডিরেক্টর মি. সহায় আমাকে একখান তার পাঠালেন।’
কথার মাঝেই শুধোলাম, ‘তার মানে টেলিগ্রাম?’
‘হ্যাঁ টেলিগ্রাম, লেখা, প্লিজ ভিজিট সিমলিপাল, যোশিপুর। উইল বি সারপ্রাইজড। রিগার্ডস। ’
‘শুধু এইটুকু কথা?’
অল্প হেসে সুধীরবাবু বললেন, ‘প্রথমে আমিও তোমার মতনই অবাক হয়েছিলাম, পরে মনে হল, নিশ্চয় ওখানে কিছু একটা ঘটেছে, নাহলে শুধু শুধু কি আমাকে যেতে বলবেন সহায়, আমায় খুব স্নেহ করতেন ভদ্রলোক। সাতপাঁচ না ভেবে লিখে দিলাম, সিওর, আই স্যাল গো। তখন অল্প বয়স, অত ভাবনা চিন্তা করার অবকাশ কোথায়! তারপর জঙ্গলের নিমন্ত্রণ, আমি তো একপায়ে রাজি। কলকাতার বনদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভের ফিল্ড ডিরেক্টর সরোজ রাজচৌধুরী নাকি অসাধারণ এক মানুষ, যোশিপুরেই বনদপ্তরের কোয়ার্টারে থাকেন, আরও একটি কথা অবশ্য শুনলাম আর সে-কথা শুনেই তো আমার চক্ষু চড়কগাছ! পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, কেন সহায় লিখেছেন, উইল বি সারপ্রাইজড!’
অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী কথা?’
‘খৈরির কথা! সে হল এক প্রকাণ্ড রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, বাঘিনী!’
‘বলেন কী!’
পাইপ ধরিয়ে হাসলেন সুধীরবাবু, ‘শুধু তাই নয়, খৈরি নাকি যোশিপুর কোয়ার্টারে সরোজ বাবুর সঙ্গেই থাকে! সারাদিন পায়ে পায়ে ঘোরে, রাতে একই বিছানায় শোয়, মোদ্দা কথা খৈরিকে একজন সেলিব্রিটিই বলা চলে! ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিয়মিত তার খোঁজখবর নেন, দেশ- বিদেশের মানুষ আসে্ন দেখতে, এমন বাঘিনী পোষ মানানোর কথা ভূ-ভারতে কেউ শোনেনি!’ আরেক দোনা মহুয়া গলায় ঢেলে বিস্মিত স্বরে শুধোলাম, ‘সরোজবাবু একে পেয়েছিলেন কোথায়?’
‘সে কথা সরোজ বাবুর মুখেই শুনেছিলাম, উনিশশো চুয়াত্তরের অক্টোবর মাসে বিকেলের দিকে খড়িয়া উপজাতির কিছু মানুষ জঙ্গলে মধু নিয়ে ফেরার পথে দেখে অস্ফুট আলোয় খৈরি নদীর তীরে এক বাঘিনী তার তিনটে বাচ্চা নিয়ে জল খেতে এসেছে। বাঘিনী বাচ্চাদের সম্ভবত কিছু ট্রেনিংও দিচ্ছিল, এদিকে আদিবাসীরা তো বাঘ দেখে ততক্ষণে ক্যানেস্তারা পেটাতে শুরু করেছে, আগুন জ্বালিয়েছে, সেসব দেখে ভয় পেয়ে বাঘিনী তার দুই ছানা নিয়ে পালায়, পড়ে রইল একটি দুবলা-পাতলা বাচ্চা, সে পারল না পালাতে, একে আদিবাসীরা তুলে নিয়ে সোজা বনদপ্তরের বিট আপিসে হাজির হয়। সেখান থেকে খবর যায় সরোজ বাবুর কাছে, তিনি এসে দেখেন একেবারেই গাদা বাচ্চা, দু-আড়াই মাস বয়স, জঙ্গলে ছাড়লে অন্য পশুদের হাতেই মারা যাবে। সব দেখেশুনে সরোজ বাচ্চাটিকে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে আসেন, ফিডিং বোতলে দুধ দিতেই সে বেশ জুলজুল করে খেল, তারপরেই এক লাফে সরোজের কোলে এসে মাথা নিচু করে সে কী আদর! মুখে ঘড়ঘড় আহ্লাদি শব্দ, ভারি মায়া হল দেখে সরোজের, রেখে দিলেন নিজের কাছে, খৈরি নদীর তীরে পাওয়া গেছিল বলে নাম দিলেন খৈরি! আমাকে বলেছিলেন, ও আমার মেয়ে! একটি চমৎকার বইও লিখেছিলেন সরোজ রায়চৌধুরী, খৈরিঃ দ্য বিলভড টাইগ্রেস!’
এমন উত্তেজক কাহিনি তখন মহুয়ার ঝিমঝিম নেশা তাড়িয়ে আমায় পেয়ে বসেছে, শুধোলাম,
‘তারপর?’

‘তার পরদিন সকালে আমি সোজা গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম, কলকাতা থেকে যোশিপুর খুব বেশি পথ তো নয়, তখন আমার একটা লেফট হ্যান্ড ফোর হুইল ড্রাইভ জিপ ছিল, জঙ্গলে ওটি নিয়েই ঘুরতাম। তা ভোরবেলা বেরিয়ে যোশিপুর পৌঁছালাম বেলা প্রায় সাড়ে তিনটে হবে, মি. সহায় সরোজবাবুকেও তার দিয়ে রেখেছিলেন। যোশিপুরে বনদপ্তরের আপিসে পৌঁছে সাহেবের খোঁজ করতে নিজেই বেরিয়ে এলেন, লম্বা দোহারা চেহারা, একমুখ হাসি, চোখ দুটি আত্মবিশ্বাস আর সাহসে ঝকমক করছে, বয়স হয়েছে, প্রৌঢ়ই বলা চলে কিন্তু হাঁটাচলা কথাবার্তায় একেবারে যুবক।
আমাকে দেখেই হ্যান্ডসেক করে বললেন, “আপনার কথা মি. সহায়ের মুখে অনেক শুনেছি। এমন সাহসী, ক্র্যাকশট, জঙ্গলের খবর নখদর্পণে নিয়ে চলা মানুষ তো এখন বিরল প্রজাতির প্রাণীর মতনই দুর্লভ!”
হেসে বললাম, “আরে ওসব কিছু নয় মশায়, উনি আমায় বড়ো স্নেহ করেন বলেই এসব বাড়িয়ে বলেছেন! আসল সাহসী হলেন আপনি, খৈরিকে নিয়ে সংসার! ভাবা যায়! শুনেই তো আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি!”
সরোজও হাসলেন, “শুনেই এসেছেন তাহলে!”
“শুনব না, বলেন কী! ভারতের বনদপ্তরে আপনার কথা তো প্রবাদের মতন হয়ে গেছে!”
“আসুন আসুন, সারাদিন গাড়ি চালিয়ে এসেছেন, কোয়ার্টারে চলুন, ওখানেই তার সঙ্গে দেখা হবে!”
একটানা কথা বলে কয়েক মুহূর্ত জিরিয়ে নিয়ে পাইপে কতগুলি ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছেড়ে, মহুয়ায় সামান্য গলা ভিজিয়ে সুধীরবাবু আবার শুরু করলেন খৈরির চমকপ্রদ আখ্যান।
‘আপিস থেকে শাল গাছে সাজানো একটি রোগা মোরামের পথ সোজা চলে গেছে বাংলোর দিকে, সামনে গেটে দুজন বনরক্ষী বসে রয়েছে, আমাদের দেখে উঠে দাঁড়িয়ে সেলাম করে গেট খুলে দিল।বেশ বড়ো ক্যাম্পাস, অদূরে একখানি বাংলো দেখা যাচ্ছে, গোটা চারেক ঘর, বাংলোর একপাশে অনেকখানি জায়গা নিয়ে কৃত্রিম জঙ্গল, মানে পুটুস ঝোপ, শাল, গামহার, কুসুম গাছ লাগানো হয়েছে,
চারপাশ লোহার শেকল দিয়ে ঘেরা, এখান থেকেই একটি পথ বাংলোর পেছনে গহিন অরণ্য পানে চলে
গেছে। সেদিকে আঙুল তুলে সরোজ আমায় বললেন, “বাংলোর এইদিকে দুটো ঘরে খৈরি, আমি আর নিহার থাকি, আর ওইদিকের দুটো ঘর অতিথির জন্য বরাদ্দ। মাঝে একটা ডাইনিং রুম রয়েছে।”
শুধোলাম, “খৈরি ওদিকে যায় না?’
প্রথম পর্ব: বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ১

আমার কথা শুনে হা হা শব্দে হাসলেন সরোজ, “খুব যায়! নতুন কেউ এলে ওর প্রথম কাজ কী জানেন, সেই মানুষের পায়ে কিছুক্ষণ নিজের শরীর ঘষবে, তারপর মুখে মুখ দিয়ে গন্ধ নেবে, শেষে নিশ্চিন্ত হয়, এ ওর কোনো ক্ষতি করবে না!”
সত্যি কথা বলতে আমার পেটের ভেতর শিরশির করে উঠল, জঙ্গলে বহুদিন ঘুরছি, বাঘ দেখেওছি,
শিকারও করেছি, এমনকি ম্যান-ইটার কিন্তু তাই বলে বাঘ মুখে মুখ ঠেকাবে, এ জিনিস মেনে নেওয়া
অসীম সাহসীর পক্ষেও মুশকিল। এখন মনে হচ্ছে, না এলেই হত, যতই পোষা হোক, আফটার অল
বাঘ তো, বুনো জন্তু, আলতো থাবা দিলেই তো প্রাণবায়ু নিমেষে শরীরের খাঁচা ছেড়ে উড়ে যাবে!
শুকনো গলায় শুধোলাম, “তাকে দেখছি না যে?”
“ওই যে শেকল ঘেরা পথটা দেখছেন, আ স্মল প্যাচ, ওই পথে ও মাঝে মাঝে মূল জঙ্গলে বেড়াতে যায়! এখন ওদিকেই গেছে, তবে আপনি চিন্তা করবেন না, এখনই এসে যাবে। আপনি আসুন, ঘরে ঢুকে ফ্রেস হয়ে নিন, আমি ডাইনিংএ আপনার খাবার দিতে বলছি।”'
সুধীরবাবু চুপ করতেই আমি বললাম, ‘ এ তো সাঙ্ঘাতিক কান্ড! তারপর দেখা হল খৈরির সঙ্গে?’
হাসলেন সুধীরবাবু, ‘দেখা হল, ভাব হল, আদর হল! নিজের চোখে না দেখলে ও জিনিস আমার কখনো
বিশ্বাসই হত না! বলছি শোনো সে-কথা, গায়ে কাঁটা দেওয়া অভিজ্ঞতা!’‘বামদিকের একটা ঘর খুলে সরোজ আমায় বললেন, “আসুন, আপনি ফ্রেস হয়ে নিন। আর
হ্যাঁ, একটা কথা, ঘরের দরজা কিন্তু বন্ধ রাখবেন, নাহলে খৈরি এসেই সোজা ঘরে চলে আসবে!’
দরজায় ভালো করে খিল তুলে বাথরুমে যাওয়ার আগে মনে হল, বাঘের কাছে এই খিল আর এমন কী!
দুবার জোরে ধাক্কা দিলেই ভেঙে যাবে। হল্যান্ডের রাইফেলটা সঙ্গে আনলেই ভালো হত, এখন তো আর কিছু করার নাই, মোগলের হাতে যখন পড়েছি, খানা একসঙ্গেই খেতে হবে!
স্নান করে বেরিয়ে মাথা মুছে দরজা খুলেছি কি খুলিনি, হঠাৎ দেখি, দরজার পাশ থেকে একলাফে সে
ঘরের মধ্যে হাজির, আমি কয়েক পা পেছনে সরে এসে পাথরের মতন স্থির হয়ে গেছি, অত ভয় জীবনে খুব বেশিবার পাইনি। আর কী রূপ তার, লম্বায় প্রায় দশফুট, গায়ের চামড়ায় আলো অবধি
পিছলে যায়, মুখে ঘড়ঘড় শব্দ, মাঝে মাঝে হাঁ করায় তীক্ষ্ণ দাঁতগুলি দেখা যাচ্ছে, জিভ টকটকে
লাল। ধীর পায়ে এসে প্রথমেই পেছনের দু’পায়ে ভর দিয়ে আমার মুখের একেবারে সামনে মুখ নিয়ে
এল, জিভ বেরিয়ে আসছে, কী বোঁটকা গন্ধ, কাঁচা মাংসের, ভালো করে আমার মুখ চাটল, আমার
সারা মুখে বাঘের লালা, প্রতিটা মুহূর্ত মনে হচ্ছে সহস্র কোটি বছর, তারপর একসময় কী খেয়ালে পায়ের উপর সারা শরীর ঘষতে শুরু করল, পারস্যের মলমলের মতন নরম শরীর…শেষে রেহাই দিয়ে
মুখ ঘুরিয়ে বাইরে যেতেই আমার মনে হল, এখনই বোধহয় অজ্ঞান হয়ে যাব।
সংবিত ফিরল সরোজবাবুর গলায়, “ব্যাস! আর চিন্তা নাই! আপনার সঙ্গে ভাব হয়ে গেল খৈরির!”’
‘দুদিন ছিলাম, তা সত্যিই ভাব হয়ে গেছিল। ভয়ও চলে গেছিল একেবারে! কী খেলা আমার সঙ্গে সারাদিন। খৈরির খাওয়া ছিল দেখার মতন, সরোজ নিজে হাতে প্রতিদিন দশ কেজি খাসির মাংস খাওয়াতেন, উপরে আবার আমুল দুধের গুঁড়ো মাখিয়ে দিতেন। সরোজ বাবুর আরও দুই পোষ্য ছিল, একটি মা-মরা ভালুক ছানা, তার নাম জম্বু, আরেকজন হল এক বৃদ্ধ অন্ধ হায়না, সরোজ ওর নাম দিয়েছিলেন, ভায়না! বিচিত্র সংসার।
দ্বিতীয় পর্ব: বাঘবনের অন্তরমহল: পর্ব ২

শেষে আসার দিন খৈরি ডাইনিং টেবিলে আমার কোলে মাথা রেখে কী আদরই না করল! আমারও ভারি মায়া পড়ে গেছিল। সরোজবাবুর মুখে শুনেছিলাম, খৈরিকে মেটিং সিজনে বনে নিয়ে যেতেন কিন্তু আসল জংলি বাঘ একেবারেই নাকি তাকে পছন্দ করত না, হয়তো মানুষের গায়ের গন্ধ লেগেছিল খৈরির গায়ে, প্রতিবার ফিরে আসত রক্তাক্ত হয়ে, সরোজ বুঝতে পেরেছিলেন, ও আর কখনো জঙ্গলে একা থাকতে পারবে না।’
এদিকে বেলা পড়ে এসেছে, খর রৌদ্র আর নাই, ঝিরঝির বাতাস পুটুস ফুলের গন্ধে উচ্ছল, বনদেবীর মায়াঞ্জনের মতন অপরূপ অপরাহ্নে আজ জগত রূপবতী, সেদিকে তাকিয়ে আনমনা গলায় শুধোলাম, ‘শেষ অবধি খৈরির কী হল? ওখানেই ছিল?’

শেষবেলার মলিন হাসি ফুটে উঠল সুধীরবাবুর মুখে, ‘ছিল, কিন্তু শেষটা বড়ো করুণ! একাশি সালে সরোজবাবু বনদপ্তরের সেমিনারে দিল্লি গেছিলেন, তখন হঠাৎ একটা পাগলা কুকুর বাংলোর মধ্যে ঢুকে পড়ে, খৈরি তাকে নিমেষে মেরে দিয়েছিল বটে কিন্তু কামড়ও খেয়েছিল। ফিরে এসে সরোজ দেখেন, জলাতঙ্ক শুরু হয়ে গেছে, অসম্ভব কষ্ট পাচ্ছিল, শেষে বেশি মাত্রায় ঘুমের ওষুধ দিয়ে নিজের হাতেই একদিন খৈরির চোখে চিরঘুমের আলপনা এঁকে দেন।’
‘আর সরোজবাবু?’
‘এই ঘটনার বছরও পেরোয়নি, সরোজ যোশিপুর আপিসেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান, তখন ওঁর ষাট
বছর বয়সও হয়নি। খৈরি চলে গেছিল সাত বছর বয়সে, যোশিপুর বাংলোর হাতায় এখনো তার সমাধি
রয়েছে, পাশেই একটা কুসুম আর নিম গাছ-ওরাই যেন সেই রাজকুমারীর, সরোজের প্রিয়তমা খৈরির
পাহারাদার। আজও হয়তো চিরশিকারের আনন্দ-অরণ্যে খৈরি তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসার ধন সরোজের সঙ্গে খেলা করে, জীবন কি আর একজন্মে শেষ হয়!’
এরপর আর কথা চলে না, শেষ দোনা মহুয়া গলায় ঢেলে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘একটা কথা বারবার মনে হচ্ছে, সরোজবাবু খৈরিকে ছোট বয়সেই জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এলেই বোধহয় ভালো হত। খৈরির যে কখনো নিজের ঘরে ফেরা হল না!’
দু-এক মুহূর্ত আমার দিকে চেয়ে রইলেন প্রৌঢ় সুধীরবাবু, কুসুমগাছের লাল পাতা-পিছলানো আলোয় মুখখানি ভালোবাসায় যেন টলমল করছে, মৃদু স্বরে বললেন, ‘হয়তো ভালো হত, হয়তো হত না! আরেকটু বয়স হোক তোমার, বুঝতে পারবে, সবার ঘরে ফেরা হয় না। কেউ কেউ ফিরতেও চায় না, ঘর আর কোথায় আছে, যেখানে ভালোবাসা সেখানেই তার ভিটেমাটি! চিরকালের বসতবাটি!’

লেখক পরিচিতি: শ্রী সায়ন্তন ঠাকুর, বাংলা ভাষার একজন কথাকার ও ঔপন্যাসিক। এখনও অবধি বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে গল্প-উপন্যাস-রম্য রচনা নিয়ে বাইশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ধানসিড়ি প্রকাশন থেকে 'অরণ্যকথা' সিরিজের বইগুলি অন্যতম।






