top of page
KANHA MAY 26.jpg

কাজিরাঙ্গার সংকট

2 minutes ago
4 min read


ভোরের আলোয় কাজিরাঙ্গা
ভোরের আলোয় কাজিরাঙ্গা

সম্প্রতি আলোচনার শিরোনামে অসমের কাজিরাঙ্গা ন্যাশানাল পার্ক। এই টাইগার রিজার্ভের যে ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত ইকো-সেনসিটিভ জোন রয়েছে বর্তমানে তা কমিয়ে ১ কিলোমিটারে নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছে অসম সরকার। তাদের এই সিদ্ধান্তের ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ অরণ্যের বন্যপ্রাণীদের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এই নিয়ে আলোচনায়  অসমের বিশিষ্ট গবেষক, অধ্যাপক ও IUCN এর সদস্য ড. সঞ্জীব কুমার বরকাকতি।




কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ও টাইগার রিজার্ভ (KNPTR) অসমের একটি UNESCO ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। এটি রাজ্যের গোলাঘাট, শোণিতপুর, বিশ্বনাথ এবং নগাঁও জেলাজুড়ে বিস্তৃত। উদ্যানটি একশৃঙ্গ গণ্ডারের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। কিন্তু রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তের কারণে অরণ্যের ভবিষ্যৎ আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

অসম সরকার হাতির চলাচলের করিডোরে দুটি বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে একটি হোটেল বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের ভেতরে এবং অন্যটি বাফার জোনে নির্মাণ করা হবে। ফলে, উভয় নির্মাণই বেআইনি।

হোটেল নির্মাণের সময় পরিবেশ দূষণ ঘটবে। শুধু নির্মাণপর্বেই নয়, হোটেল দুটি চালু হওয়ার পরেও সেখানকার আলোকদূষণ কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ও টাইগার রিজার্ভের (KNPTR) বন্যপ্রাণীর উপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

এছাড়া, হাতির একটি চলাচলের করিডোরের উপর কাঞ্চাজুড়িতে ইতিমধ্যেই একটি বড় রিসর্ট গড়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, ভারতে মোট ১৫০টি হাতির করিডোরের মধ্যে ৯টি কাজিরাঙায় অবস্থিত। এই তথ্যই কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ও টাইগার রিজার্ভের (KNPTR) পরিবেশগত গুরুত্বের পরিচয় বহন করে।

এভাবে হাতির চলাচলের করিডোরগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত আরও বাড়বে। চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি হলে হাতিরা গ্রামবাসীদের উপর হামলা চালাতে পারে। এমনিতেই কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানে পর্যটকের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। হোটেল ও অন্যান্য পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে উঠলে পর্যটকের আনাগোনা আরও বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে অরণ্যের পরিবেশগত ভারসাম্যকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।


হোটেলগুলি ধীরে ধীরে এই এলাকাটিকে ছোট ছোট শহরের আদলে গড়ে তুলবে। আরও উদ্বেগের বিষয় হল, হোটেল নির্মাণের সুবিধার্থে ইঙ্গলেই-পাথরের মতো এলাকা থেকে আদিবাসী কৃষকদের জোর করে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এর পাশাপাশি, এক প্রতিবাদকারীকে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (NSA)-এ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে অসম সরকার কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ও টাইগার রিজার্ভের (KNPTR) বর্তমান ১০ কিলোমিটার পরিবেশগত সংবেদনশীল অঞ্চল বা ইকো-সেনসিটিভ জোন (ESZ) কমিয়ে সর্বত্র ১ কিলোমিটার করার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু এর ফলে বিপদ আরও বাড়বে। কারণ, ন্যাশানাল পার্ক সংলগ্ন পাহাড়গুলিতে ইতিমধ্যেই যে বেআইনি খনিগুলি চলছে, ESZ-এর পরিধি কমে গেলে তা আরও ব্যাপক আকার নিতে পারে।

আসলে, সব জায়গায় ESZ-এর প্রস্থ সমান হওয়ার প্রয়োজন নেই। এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এর পরিধি পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন, কাজিরাঙার উত্তর দিকে ব্রহ্মপুত্রের উত্তর পাড়কেই ESZ-এর সীমানা হিসেবে ধরা যেতে পারে। কারণ, তেজপুর, বিশ্বনাথ প্রভৃতি শহর নদীর পাড় থেকেই শুরু হয়েছে। তাই এই দিকে নদীর গতিপথ ও ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে গড়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ESZ রাখা যেতে পারে।

দক্ষিণ পাড়ের কালিয়াবর, জখলাবন্ধা ও বোকাখাতের মতো শহরগুলির ক্ষেত্রে ESZ-এর পরিধি প্রায় ৩ কিলোমিটার রাখা যেতে পারে, কারণ এই শহরগুলি উদ্যানের খুব কাছেই অবস্থিত। তবে কাজিরাঙার দক্ষিণ সীমানায় বর্তমানে যে ১০ কিলোমিটার ESZ রয়েছে, তা কঠোরভাবে বজায় রাখা জরুরি। কারণ, বন্যার সময় বন্যপ্রাণীরা এই অঞ্চলেই আশ্রয় নেয়।

বন্যায় উঁচু জমিতে আশ্রয় নেওয়া গন্ডারের দল। ছবি: রাজর্ষি ব্যানার্জী।
বন্যায় উঁচু জমিতে আশ্রয় নেওয়া গন্ডারের দল। ছবি: রাজর্ষি ব্যানার্জী।

এছাড়া, এই পাহাড়গুলিতে গ্রানাইট, কাওলিন, প্ল্যাটিনাম, ভ্যানাডিয়াম, টাইটানিয়াম প্রভৃতি খনিজের মজুত রয়েছে। এই এলাকায় ESZ-এর সীমা ১ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হলে এসব খনিজের খনন শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ও টাইগার রিজার্ভের (KNPTR) পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এমনিতেই বর্তমানে এই এলাকায় বেআইনি পাথর ও খনিজ উত্তোলন চলছে।


কাজিরাঙ্গার বর্তমান ১০ কিমি বিস্তৃত ইকো-সেনসিডিভ জোন ও বিভিন্ন জনপদের অবস্থান। লাল মোটা রেখায় ইকো সেনসিটিভ জোনের বাউন্ডারি নির্দেশিত।   ম্যাপ নির্মান: বনেপাহাড়ে।
কাজিরাঙ্গার বর্তমান ১০ কিমি বিস্তৃত ইকো-সেনসিডিভ জোন ও বিভিন্ন জনপদের অবস্থান। লাল মোটা রেখায় ইকো সেনসিটিভ জোনের বাউন্ডারি নির্দেশিত। ম্যাপ নির্মান: বনেপাহাড়ে।

এমনকি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের গঠিত সেন্ট্রাল এমপাওয়ার্ড কমিটিও পর্যবেক্ষণ করেছিল যে, KNPTR-এর আশপাশে খননকার্য বন্ধ করতে অসম সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। এই পাহাড়গুলিই KNPTR-এর বাস্তুতন্ত্রকে জল জোগানো বিভিন্ন ঝরনা ও জলধারার জলসংগ্রহের অঞ্চল বা ক্যাচমেন্ট এলাকা। ফলে, এই পাহাড়গুলির পরিবেশগত ক্ষতি সরাসরি কাজিরাঙার সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

আমি IUCN-এর প্ল্যাটফর্মে এই বিষয়গুলির কয়েকটি তুলে ধরেছি। কাজিরাঙাকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসতে সমস্ত পরিবেশবিদের কাছে আমার আন্তরিক আবেদন রইল।

ভবিষ্যতে কোনো পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটলে, প্রস্তাবিত হোটেলগুলি ততদিনে নির্মিত হয়ে গেলেও সেগুলি ভেঙে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে। ভিয়েনার ক্ষেত্রে যেমন UNESCO হোটেল নির্মাণের পর তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। তাই পরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

কাজিরাঙার দক্ষিণ দিকে পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করা হলে তা অবশ্যম্ভাবীভাবে KNPTR-এর অস্তিত্বের অবসান ডেকে আনবে। চলতি বছরে অসমের চরাইদেও জেলায় দক্ষিণ দিকের পাহাড় ধ্বংসের পর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, কাজিরাঙাতেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।




পরিবেশ সংস্থা Aaranyak-এর অশোক কুমার দাস লিখেছেন, “KNPTR শুধুমাত্র একটি বনভূমি নয়; এটি বন্যপ্রাণীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। একে রক্ষা করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। আসুন, আমরা দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি এবং নিশ্চিত করি যে এই অমূল্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল বন্যপ্রাণী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ থাকে।”

দেখা যাচ্ছে, সরকারের প্রস্তাব কার্যকর হলে কাজিরাঙার কোহরা, বাগরি, বুড়াপাহাড়, হালদিবাড়ি প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ স্থানও ESZ-এর সীমানার বাইরে চলে যাবে। এমনকি ব্রহ্মপুত্র নদকেও সম্পূর্ণভাবে ESZ-এর আওতায় রাখা সম্ভব হবে না; নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে দক্ষিণ পাড়ের নদীতীরের কিছু অংশও ESZ-এর বাইরে চলে যাবে।



বর্তমানে কার্যকর ESZ-সহ KNPTR-এর একটি মানচিত্র এই রচনায় সংযুক্ত করা হয়েছে। সব দিক বিবেচনা করে বলা যায়, ESZ-এর সীমানা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এটি সর্বত্র একই পরিধির হওয়া উচিত নয়; বরং প্রতিটি এলাকার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্থানভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করা উচিত।


ছবি: রাজর্ষি ব্যানার্জী।
ছবি: রাজর্ষি ব্যানার্জী।


লেখক পরিচিতি:  অর্থশাস্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. সঞ্জীব কুমার বরকাকতি শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়নমূলক বিষয়, সাহিত্য সমালোচনা, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় পঁয়ষট্টিটি বই রচনা করেছেন। তিনি ‘সোসাইটি ফর শ্রীমন্ত শঙ্করদেব’ নামক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সভাপতি, যা মধ্যযুগের বহুমুখী প্রতিভা শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের আদর্শ প্রচারের জন্য কাজ করে।

 তিনি আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা IUCN-এর কমিশন অন এডুকেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন-এর সদস্য। এছাড়াও, তিনি ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস (ICOMOS)-এর সঙ্গে যুক্ত এবং এর আন্তর্জাতিক অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কমিটি ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পর্যটন কমিটি-র একজন বিশেষজ্ঞ সদস্য।

Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
 

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page