রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতন: প্রকৃতিই যেখানে আসল শিক্ষক
- ..
- Dec 31, 2025
- 11 min read
এই পৌষমাসে শান্তিনিকেতনে মেলার মাস। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা ও শান্তিনিকেতনে ব্রাহ্মমন্দির স্থাপন উপলক্ষে এই সময় শান্তিনিকেতন সাজে উৎসবের সাজে। যদিও সব ঋতুতেই শান্তিনিকেতনে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে উদযাপন লেগে থাকে। কারণ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তৈরি করেছিলেন প্রকৃতির এক বৃহৎ পাঠশালা রূপে, যেমনটা ছিল প্রাচীন যুগে তপোবনে মুনিঋষিদের গুরুকুল। কেমনভাবে তাঁর চিন্তায় রূপ পেয়েছিল এই অদ্বিতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি তার আলোচনায় দীপ্তার্ক ঘোষ।

শব্দগতভাবে Education শব্দটি ল্যাটিন educere শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো ‘ভেতর থেকে বিকশিত করে বাইরে নিয়ে আসা’। এর মাধ্যমে মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা, সক্ষমতা ও প্রতিভাকে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে এবং বাহ্যিক জ্ঞান দ্বারা আলোকিত করে প্রকাশ করার ধারণাকে বোঝানো হয়।
প্রাচীন ভারতের বৈদিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল এই ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য ও অন্তরের সত্যকে উদ্ভাসিত করা—যা একটি সামগ্রিক শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা, কৌতূহল ও সৃজনশীলতার বিকাশ, এবং প্রাকৃতিক জগতের সঙ্গে গভীর নান্দনিক ও আত্মিক সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিত।
এই শিক্ষাদর্শনের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন আশ্রম ব্যবস্থায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাঁদের গুরুদের সঙ্গে অরণ্যের আশ্রমে বসবাস করতেন। সেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন শ্রেণিকক্ষের ভূমিকা পালন করত, তেমন এক ‘দৈব সত্তা’ হিসেবে যেন শিক্ষার্থীদের জীবনের চক্র ও পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিত।
"যে বিরাট বিশ্বপ্রকৃতির কোলে আমাদের জন্ম তার শিক্ষকতা থেকে বঞ্চিত বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলে মানুষ সম্পূর্ণ শিক্ষা পেতে পারে না। বনস্থলীতে যেমন এই প্রকৃতির সাহচর্য আছে তেমনি অপর দিকে তপস্বী মানুষের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাসম্পদ সেই প্রকৃতির মাঝখানে বসে যখন লাভ করা যায় তখনই যথার্থ ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের মধ্যে বাস করে বিদ্যাকে গুরুর কাছ থেকে পাওয়া যায়। শিক্ষা তখন মানবজীবন থেকে বঞ্চিত হয়ে একান্ত ব্যাপার হয় না। বনের ভিতর থেকে তপোবনের হোমধেনু দোহন করে অগ্নি প্রজ্বলিত করে নানা ভাবে প্রকৃতির সঙ্গে নিত্যযুক্ত হয়ে যে জীবনযাপনের ব্যবস্থা প্রাচীন কালে ছিল তার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল। যাদের গুরুরূপে বরণ করা হয় তাদের সঙ্গে এইরূপ জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে একত্র মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যে খুব একটা বড়ো শিক্ষা আছে। এতে করে শিক্ষা ও জীবনের মধ্যে যথার্থ যোগ স্থাপিত হয়, গুরুশিষ্যের সঙ্গে সম্বন্ধ সত্য ও পূর্ণ হয়, বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবপ্রকৃতির সঙ্গে মিলন মধুর ও স্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। তাই আমার মনে হয়েছিল যে, তখনকার দিনে তপোবনের মধ্যে মানবজীবনের বিকাশ একটি সহজ ব্যাপার ছিল বটে, কিন্তু তার সময়টি এখনো উত্তীর্ণ হয়ে যায় নি; তার মধ্যে যে সত্য ও সৌন্দর্য আছে তা সকল কালের। বর্তমান কালেও তপোবনের জীবন আমাদের আয়ত্তের অগম্য হওয়া উচিত নয়।"
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে সময়ে শিক্ষা ক্রমশ চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ছিল, সেই সময়ে নোবেলজয়ী এই বাঙালি, যিনি একজন বহুমুখী প্রতিভা- সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাচীন ভারতের বৈদিক ঐতিহ্যের দিকে ফিরে তাকিয়ে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন শিক্ষাভাবনার কল্পনা করেন। তিনি এমন এক আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সীমারেখা অতিক্রম করবে, এবং যেখানে শিক্ষা প্রচলিত শ্রেণিকক্ষের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকবে না। বরং তা প্রসারিত হবে মুক্ত আকাশের নিচে, রৌদ্রছায়া মাখা পথের পাশে, এবং সুউচ্চ বৃক্ষের ছায়াতলে—যেখানে শিক্ষক থাকবেন কেন্দ্রে এবং শিক্ষার্থীরা সামনের দিকে অর্ধবৃত্তাকারে বসে থাকবে—প্রকৃতির সঙ্গে হৃদয়ের সংলাপের মাধ্যমে।

এই প্রবন্ধে অনুসন্ধান করেছি কীভাবে শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথের সেই বিশ্বাসের এক জীবন্ত উদাহরণ যেখানে, ‘প্রকৃতি হলো সর্বাগ্রে থাকা এবং সবথেকে দক্ষ শিক্ষক’, যা যথার্থভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাঁর এই কথায়:
“আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি একে গ্রহণ করার জন্য, কেবলমাত্র জানার জন্য নয়। জ্ঞানের দ্বারা আমরা শক্তিশালী হতে পারি, কিন্তু সহমর্মিতার মাধ্যমে আমরা পরিপূর্ণতা অর্জন করি। সর্বোচ্চ শিক্ষা সেই শিক্ষা, যা শুধু আমাদের তথ্য দেয় না, বরং সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে আমাদের জীবনকে সুরে ও সামঞ্জস্যে আবদ্ধ করে।”
কীভাবে এক অনুর্বর ভূমি ও দুটি ছাতিম গাছ শান্তিনিকেতন আশ্রমের প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছিল
"খোয়াইয়ের মধ্যে একজায়গায় মাটি চুঁইয়া একটা গভীর গর্তের মধ্যে জল জমা হইত। এই জলসঞ্চয় আপন বেষ্টন ছাপাইয়া ঝির্ঝির্ করিয়া বালির মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইত। অতি ছোটো ছোটো মাছ সেই জলকুণ্ডের মুখের কাছে স্রোতের উজানে সন্তরণের স্পর্ধা প্রকাশ করিত। আমি পিতাকে গিয়া বলিলাম, “ভারি সুন্দর জলের ধারা দেখিয়া আসিয়াছি, সেখান হইতে আমাদের স্নানের ও পানের জল আনিলে বেশ হয়।” তিনি আমার উৎসাহে যোগ দিয়া বলিলেন “তাইতো, সে তো বেশ হইবে” এবং আবিষ্কারকর্তাকে পুরস্কৃত করিবার জন্য সেইখান হইতেই জল আনাইবার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন।
আমি যখন-তখন সেই খোয়াইয়ের উপত্যকা-অধিত্যকার মধ্যে অভূতপূর্ব কোনো-একটা কিছুর সন্ধানে ঘুরিয়া বেড়াইতাম। এই ক্ষুদ্র অজ্ঞাত রাজ্যের আমি ছিলাম লিভিংস্টোন। এটা যেন একটা দূরবীনের উলটা দিকের দেশ। নদীপাহাড়গুলোও যেমন ছোটো ছোটো, মাঝে মাঝে ইতস্তত বুনো-জাম বুনো-খেজুরগুলোও তেমনি বেঁটেখাটো। আমার আবিষ্কৃত ছোটো নদীটির মাছগুলিও তেমনি, আর আবিষ্কার-কর্তাটির তো কথাই নাই।" (জীবনস্মৃতি)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈদিক ‘গুরুকুল’ শিক্ষাধারার আদর্শের সঙ্গে পরিচিত হন মূলত তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাবেই। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় দার্শনিক, যিনি ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন । তিনি বেদ ও উপনিষদে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন।
১৮৬০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মধ্য দিয়ে ভ্রমণের সময়, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ একদিন হঠাৎই সেখানকার নিসর্গসৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়েন। সেখানে ছোট একটা গ্রাম বোলপুরের লালচে মাটির প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘দুটি বিশাল ছাতিম গাছ’ ( Alstonia scholaris ) স্নিগ্ধ ছায়া বিস্তার করছিল। এই বন্য ও অপার সৌন্দর্যময় ভূমি তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে।
১৮৬২ সালে তিনি তৎকালীন স্থানীয় জমিদার ভুবন মোহন সিংহের কাছ থেকে স্থায়ী বন্দোবস্তে (পার্মানেন্ট লিজে) এই জমির ২০ একর অংশ ক্রয় করেন। তখন এই অঞ্চলটি স্থানীয় এক ডাকাত ভুবন ডাকাতের নামানুসারে ‘ভুবনডাঙা’ নামে পরিচিত ছিল।

নগরজীবনের উন্মত্ততা থেকে দূরে, শান্তি অন্বেষণকারী মানুষের জন্য নির্বিঘ্ন ধ্যানের সুযোগ করে দিতে একটি আধ্যাত্মিক আশ্রম গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে সকল ধর্মের সমন্বয়ের প্রতীক হিসেবে দ্বি-তলবিশিষ্ট ‘শান্তিনিকেতন গৃহ’ নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে এই গৃহের নামানুসারেই সমগ্র অঞ্চলটি ‘শান্তিনিকেতন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে, যার অর্থ—‘শান্তির নিবাস’।
কথিত আছে, প্রাথমিকভাবে এই এলাকা ছিল ভয়ানক ডাকাতদের আড্ডা। তারা মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করত, স্থানীয় মানুষ আতঙ্কে থাকত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহর্ষির মহানুভবতা ও মানবিক আদর্শ সেই ডাকাতদের মন পরিবর্তন করে দেয়, এবং তারাই পরে শান্তিনিকেতনকে শান্তি ও সাধনার এক কেন্দ্রে গড়ে তুলতে হাত বাড়িয়ে দেয় সহযোগিতার।
"তখন শান্তিনিকেতনে আর একটি রোমান্টিক অর্থাৎ কাহিনী রসের জিনিস ছিল। যে সর্দার ছিল এই বাগানের প্রহরী, এককালে সেই ছিল ডাকাতের দলের নায়ক। তখন সে বৃদ্ধ, দীর্ঘ তার দেহ, মাংসের বাহুল্য মাত্র নেই, শ্যামবর্ণ, তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি, লম্বা বাঁশের লাঠি হাতে, কণ্ঠস্বরটা ভাঙা ভাঙা গোছের। বোধ হয় সকলে জানেন, আজ শান্তিনিকেতনে যে অতিপ্রাচীন যুগল ছাতিম গাছ মালতীলতায় আচ্ছন্ন, এককালে মস্ত মাঠের মধ্যে ঐ দুটি ছাড়া আর গাছ ছিল না। ঐ গাছতলা ছিল ডাকাতের আড্ডা।" ( আশ্রমের রূপ ও বিকাশ/ রবীন্দ্রনাথ )
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের ছাতিম গাছের নীচে একটি তাঁবু খাটিয়ে টানা বহু সপ্তাহ প্রার্থনা ও ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন। বর্তমানে যে মার্বেলের ফলকটি তাঁর ধ্যানস্থানের স্মারক হিসেবে রয়েছে—যা ‘ছাতিমতলা’ নামে পরিচিত—সেখানে সৃষ্টিকর্তার ধ্যানে নিমগ্ন অবস্থায় মহর্ষির অন্তরে উদিত যথার্থ ভাবনাগুলিই উৎকীর্ণ রয়েছে। সেখানে লেখা আছে—
“তিনি আমার জীবনের আশ্রয়,
আমার হৃদয়ের আনন্দ,
আমার আত্মার শান্তি।”

মহর্ষি ঘোষণা করেছিলেন যে শান্তিনিকেতনে, “কোনো মূর্তির পূজা করা হবে না, এবং কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের অবমাননাও সহ্য করা হবে না। সেখানে এক অদৃশ্য ঈশ্বরেরই উপাসনা করা হবে, এবং এমন শিক্ষাই দেওয়া হবে যা বিশ্বের স্রষ্টা ও ধারকের উপাসনা, স্তব ও ধ্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং যা সুনীতি, ধর্মীয় জীবন ও সার্বজনিক ভ্রাতৃত্ববোধের বিকাশে সহায়ক।”
মহর্ষির এই আদর্শ অনুসরণ করে আজও প্রতি বুধবার সকালে ব্রাহ্ম প্রার্থনার আয়োজন করা শান্তিনিকেতনের উপাসনা গৃহে যা টালির ছাদ, মার্বেল পাথরের মেঝে ও রঙিন বেলজিয়ান কাচে নির্মিত এক প্রার্থনাকক্ষ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শৈশবকালে পিতার সঙ্গে শান্তিনিকেতনে যেতেন। ধীরে ধীরে এই স্থানটির প্রতি তাঁর মনে গভীর ভালোবাসার বীজ রোপিত হয়, যার স্পষ্ট বিবরণ তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিপিবদ্ধ করেছেন—
"সেই বালকবয়সে এখানকার প্রকৃতির কাছ থেকে যে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেম— এখানকার অনবরুদ্ধ আকাশ ও মাঠ, দূর হতে প্রতিভাত নীলাভ শাল ও তাল শ্রেণীর সমুচ্চ শাখাপুঞ্জে শ্যামলা শান্তি, স্মৃতির সম্পদরূপে চিরকাল আমার স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। তার পরে এই আকাশে এই আলোকে দেখেছি সকালে বিকালে পিতৃদেবের পূজার নিঃশব্দ নিবেদন, তার গভীর গাম্ভীর্য। তখন এখানে আর কিছুই ছিল না, না ছিল এত গাছপালা, না ছিল মানুষের এবং কাজের এত ভিড়, কেবল দূরব্যাপী নিস্তব্ধতার মধ্যে ছিল একটি নির্মল মহিমা।" ( আশ্রমের রূপ ও বিকাশ)
বীরভূম জেলা গেজেটিয়ারের নথি অনুযায়ী, ঔপনিবেশিক যুগের পূর্বে বীরভূম জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বনভূমি ছিল। তবে ক্রমাগত বন উজাড়ের ফলে ছিদ্রযুক্ত ল্যাটেরাইট মাটির উপর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। গ্রীষ্মকালে প্রবল ধূলিঝড় আলগা মাটিকে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে দিত। বর্ষাকালে আবার তীব্র ভূমিক্ষয় ঘটত—প্রতিটি ভারী বৃষ্টির পর ঢেউখেলানো ভূমির উপর দিয়ে জল প্রবল বেগে বয়ে গিয়ে খাত ও খাঁজ সৃষ্টি করত তার নিরন্তর প্রবাহে।

উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বনসৃ্জনের কর্মসূচির সূচনা করেন। শুষ্ক ও দানাদার মাটির উপরিভাগ সরিয়ে তার পরিবর্তে উর্বর পলিমাটি আনা হয়। ফল ও ছায়ার জন্য চারদিকে নানা প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়। ‘শান্তিনিকেতন গৃহ’-এর চারপাশে গড়ে তোলা হয় এক মনোরম উদ্যান।
আশ্রমের পরিসর সম্প্রসারণ
"আমি যখন এই শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপন করে এখানে ছেলেদের আনলুম তখন আমার নিজের বিশেষ কিছু দেবার বা বলবার মতো ছিল না। কিন্তু আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল যে, এখানকার এই প্রভাতের আলো, শ্যামল প্রান্তর, গাছপালা যেন শিশুদের চিত্তকে স্পর্শ করতে পারে। কারণ প্রকৃতির সাহচর্যে তরুণ চিত্তে আনন্দসজ্ঞারের দরকার আছে; বিশ্বের চারি দিককার রসাস্বাদ করা ও সকালের আলো সন্ধ্যার সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করার মধ্য দিয়ে শিশুদের জীবনের উন্মেষ আপনার থেকেই হতে থাকে। আমি চেয়েছিলুম যে তারা অনুভব করুক যে, বসুন্ধরা তাদের ধাত্রীর মতো কোলে করে মানুষ করছে। তারা শহরের যে ইঁটকাঠপাথরের মধ্যে বর্ধিত হয় সেই জড়তার কারাগার থেকে তাদের মুক্তি দিতে হবে। এই উদ্দেশ্যে আমি আকাশ-আলোর অঙ্কশায়ী উদার প্রান্তরে এই শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেছিলুম। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, শান্তিনিকেতনের গাছপালা-পাখিই এদের শিক্ষার ভার নেবে। আর সেইসঙ্গে কিছু কিছু মানুষের কাছ থেকেও এরা শিক্ষা লাভ করবে। কারণ, বিশ্বপ্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে যে শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা আছে তাতে করে শিশুচিত্তের বিষম ক্ষতি হয়েছে।"
১৮৮৮ সালে প্রণীত তাঁর ট্রাস্ট ডিডে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের জমি ও ভবনসমূহ ‘ব্রহ্মবিদ্যালয়’ এবং একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতা থেকে মাত্র ১৫২ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই স্থানটিকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘পরীক্ষামূলক বিদ্যালয়’ স্থাপনের জন্য নির্বাচন করেন। কারণ তিনি জানতেন, এই স্থানের পরিবেশ ‘প্রকৃতি-নির্ভর বৈদিক চিন্তাধারা’ প্রসারের জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী ও নির্ভুল।
রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস ছিল যে, ‘একটি শিশুকে এমন পরিবেশে মানুষ করে তুলতে হবে, যেখানে সে প্রকৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ সংযোগ স্থাপনের সুযোগ পায়।’ এই আদর্শকেই সামনে রেখে শান্তিনিকেতন তাঁর শিক্ষাদর্শের বাস্তব রূপ হয়ে ওঠে।
মোদের তরুমূলের মেলা, মোদের খোলা মাঠের খেলা,
মোদের নীল গগনের সোহাগ-মাখা সকাল-সন্ধ্যাবেলা।
মোদের শালের ছায়াবীথি বাজায় বনের কলগীতি,
সদাই পাতার নাচে মেতে আছে আম্লকী-কানন॥
১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর, প্রাচীন ভারতীয় প্রথা অনুযায়ী—যেখানে কিশোর ছাত্ররা তপোবন বা বনাশ্রমে গুরুদের সঙ্গে বসবাস করত—সেই ধারার অনুসরণে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নামক পরীক্ষামূলক বিদ্যালয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। শুরুতে প্রায় ৫ জন ছাত্র ভর্তি হয়েছিল, যাদের শিক্ষা দিতেন উদারমনস্ক ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার শিক্ষকরা। ১৯২৫ সাল থেকে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’-এর নাম পরিবর্তিত হয়ে পরিচিত হয় ‘পাঠভবন’ নামে।

বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা—এক আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান
"এই বিশ্বভারতী ভারতবর্ষের জিনিস হলেও একে সমস্ত মানবের তপস্যার ক্ষেত্র করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেবার কী আছে। কল্যাণরূপী শিব তাঁর ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বেরিয়েছেন। সে ঝুলিতে কে কী দান করবে? শিব সমস্ত মানুষের কাছে সেই ঝুলি নিয়ে এসেছেন। আমাদের কি তাঁকে কিছু দেবার নেই? হাঁ, আমাদের দেবার আছে, এই কথা ভেবেই কাজ করতে হবে। এইজন্যই ভারতের ক্ষেত্রে বিশ্বভারতীকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।" (প্রবন্ধ: বিশ্বভারতী)
বিদ্যালয়ের বিকাশের প্রারম্ভিক বছরগুলিতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করে ইউরোপ-বহির্ভূত বিশ্বের প্রথম সারির বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এই নোবেল পুরস্কার শান্তিনিকেতন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমস্ত কর্মকাণ্ডকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়। তবে নোবেল পুরস্কারের অর্থ এবং তাঁর কবিতার বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ থেকে প্রাপ্ত আয় বিদ্যালয়ের অর্থসংস্থানে কিছুটা সহায়তা করলেও অর্থাভাব পুরোপুরি কাটেনি, কারণ রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক সরকারগুলির কাছ থেকে কোনো অর্থ গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না।
২৩ ডিসেম্বর ১৯১৮ সালে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। বিশ্বভারতীকে পরিকল্পিত করা হয়েছিল বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র হিসেবে—যেখানে জাতি ও নৃতাত্ত্বিক বিভাজনের সীমা অতিক্রম করে, এক অভিন্ন মানবিক ঐতিহ্য ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটবে এবং সকল মানবকল্যাণের জন্য সত্যের যৌথ অনুসন্ধান সম্ভব হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’—অর্থাৎ “সমগ্র বিশ্ব এক পরিবার”—এই দর্শনের প্রসার ও প্রচারের উদ্দেশ্যে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর এই স্বপ্নকে সংক্ষেপে প্রকাশ করতে ‘যত্র বিশ্বং ভবত্যেক নীড়ম্’ (“যেখানে সমগ্র বিশ্ব একটি নীড়ে পরিণত হয়”)—এই সংস্কৃত বাক্যটি প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে তিনি এমন এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কল্পনা করেছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে নিজেদের পরিবেশ অন্বেষণ করতে পারবে, প্রকৃতি থেকে তাদের অস্তিত্বের জীবনীশক্তির ইঙ্গিত সংগ্রহ করবে, নানা সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করবে এবং পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ জ্ঞানের দ্বারা নিজেদের পুষ্ট ও সমৃদ্ধ করবে।
১৯৫১ সালে সংসদের একটি আইন অনুযায়ী বিশ্বভারতীকে একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শক (Paridarsaka/Visitor), পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল প্রধান/রেক্টর (Pradhana/Rector) এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী আচার্য/চ্যান্সেলর (Acharya/Chancellor) পদে অধিষ্ঠিত থাকেন।
মুক্ত আকাশের নিচে শিক্ষা – জীবন্ত পাঠ্যপুস্তক হিসেবে প্রকৃতি
“আর সেখানে আমার চারপাশে কয়েকজন শিশু জড়ো হয়েছিল, আর আমি তাদের পড়াতাম। আমি ছিলাম তাদের সহচর। আমি তাদের গান শোনাতাম। আমি সংগীত রচনা করেছি, অপেরা ও নাটক লিখেছি, আর তারা সেই পরিবেশনায় অংশ নিয়েছে। আমি তাদের আমাদের মহাকাব্যগুলি পাঠ করে শোনাতাম—এভাবেই এই বিদ্যালয়ের সূচনা হয়েছিল।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ সরকারের প্রবর্তিত কঠোর, পরীক্ষাকেন্দ্রিক ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি একে নির্বোধসুলভ, যান্ত্রিক এবং প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন বলে অভিহিত করেন। সৃজনশীলতা ও প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তার প্রেক্ষাপটে প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাপদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই তিনি শান্তিনিকেতনে তাঁর বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে এই বিদ্যালয় ও তার পাঠ্যক্রম শিক্ষা ও শিক্ষাদান সম্পর্কে দেশের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্পষ্টভাবেই আলাদা হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—শিশুদের নিজস্ব অন্তর্নিহিত প্রতিভা বিকশিত হওয়ার জন্য তাদের স্বাধীনভাবে শেখার সুযোগ দিতে হবে, একরকম পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য করা যাবে না, যা শেষ পর্যন্ত তাদের স্বকীয়তা কেড়ে নেয়। তাই তিনি একটি খোলামেলা পাঠ্যক্রম তৈরি করেন, যা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব উদ্যোগ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মৌলিকতাকে উৎসাহ দেয় এবং একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কার্যকর পাঠ্যক্রম গঠনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করে।
স্বধীনতা, সৃজনশীলতা, নিজেকে জানা
"আমি বাল্যকালের শিক্ষাব্যবস্থায় মনে বড়ো পীড়া অনুভব করেছি। সেই ব্যবস্থায় আমাকে এত ক্লেশ দিত আঘাত করত যে বড়ো হয়েও সে অন্যায় ভুলতে পারি নি। কারণ প্রকৃতির বক্ষ থেকে, মানবজীবনের সংস্পর্শ থেকে স্বতন্ত্র করে নিয়ে শিশুকে বিদ্যালয়ের কলের মধ্যে ফেলা হয়। তার অস্বাভাবিক পরিবেষ্টনের নিষ্পেষণে শিশুচিত্ত প্রতিদিন পীড়িত হতে থাকে।"(প্রবন্ধ: বিশ্বভারতী)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে প্রাকৃতিক পরিবেশ কেবল শিক্ষার একটি পরিসরমাত্র ছিল না—তা ছিল শিশুর শিক্ষাযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা তার চরিত্র, সৃজনশীলতা ও সহমর্মিতাকে গড়ে তোলে। করুণা, ধৈর্য, পারস্পরিক নির্ভরতা ও বিনয় কোনো উপদেশের মাধ্যমে নয়, বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই অর্জিত হতো। আকাশে উড়ে যাওয়া একটি পাখি কিংবা অবাধে প্রবাহিত একটি নদী আত্মপ্রকাশ ও স্বাতন্ত্র্যের পাঠ দিত। আবার একটি চারাগাছের নমনীয়তা বা নদীর নীরব অথচ অবিচল প্রবাহ এমন শিক্ষা দিত, যা কোনো বক্তৃতা দিতে পারে না।
গাছের ছায়ায়, খোলা আকাশের নিচে শ্রেণি পরিচালিত হতো—এই পরিবেশই শিক্ষার্থীদের পরিচয় ও শিক্ষাজগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। দৃষ্টিকে বা কল্পনাকে সীমাবদ্ধ করার মতো কোনো দেওয়াল সেখানে ছিল না, আর প্রকৃতির শান্ত আবহ মনোযোগ ও ধ্যানচিন্তাকে স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহিত করত। এমন পরিবেশে শিক্ষা হয়ে উঠেছিল স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত—আরোপিত নয়।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, যে ছাত্র একটি পাতা ঝরে পড়া বা একটি পাখির বাসা বাঁধা মনোযোগ দিয়ে দেখতে শেখে, তার মধ্যে সূক্ষ্ম উপলব্ধির ক্ষমতাসম্পন্ন এক মন গড়ে ওঠে। তাই প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সংবেদনশীলতা, কৌতূহল এবং প্রাকৃতিক জগতের সঙ্গে এক অন্তর্দৃষ্টি-নির্ভর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
ঋতু যখন শিক্ষক
“ফুল ও পাখির কলরবের মাঝে শিশুই থাকে তার স্বাভাবিক পরিবেশে। কেবল এই অবস্থাতেই সে তার অন্তর্নিহিত ব্যক্তিগত সম্পদের গুপ্ত ঐশ্বর্য সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে। প্রকৃত শিক্ষা কখনোই বাইরে থেকে গুঁজে দেওয়া বা জোর করে ঢোকানো যায় না; বরং তার কাজ হলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে অন্তরের গভীরে নিহিত অসীম জ্ঞানের ভাণ্ডারকে উপরে উঠে আসতে সহায়তা করা।”
শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীরা গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত ও বসন্তের ঋতুগুলোর পরিবর্তন লক্ষ্য করত, ফলে প্রাকৃতিক চক্রগুলো তাদের শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে। মাটি থেকে উঠে আসা ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনুসারে, শান্তিনিকেতনে উদযাপিত বেশিরভাগ ঋতুভিত্তিক উৎসবই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আজও পৌষ মেলা (শীত), বসন্তোৎসব (বসন্ত), বর্ষা-মঙ্গল (বর্ষা), বৃক্ষরোপণ/গাছ লাগানোর অনুষ্ঠান, হলকর্ষণ/হল চালানোর অনুষ্ঠান, এবং মাঘোৎসব শান্তিনিকেতনে প্রকৃতির উদযাপনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে।

শান্তিনিকেতনের স্থাপত্য
প্রকৃতি শান্তিনিকেতনের মূল স্থাপত্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গ্রামের নির্মাণ ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিকে পূর্ণভাবে সমর্থন করে, শান্তিনিকেতনের স্থাপত্য ও পরিবেশ একটি জলবায়ু সচেতন স্থাপত্য এবং ল্যান্ডস্কেপের অগ্রণী উদ্ভাবনের সাক্ষ্য বহন করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের শেষ দুই দশক কাটিয়েছেন আশ্রমের উত্তরের উত্তরায়ণ কমপ্লেক্সে তিনি যে পাঁচটি বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন সেগুলোতে। উত্তরায়ণের বাগান এবং বাড়িগুলোর স্থাপত্য নকশা—কোণারক, উদয়ন, শ্যামলী, পুনশ্চ এবং উদিচি—ঠাকুরের নান্দনিক ধারণা ও শিল্পসৃষ্টিকে প্রতিফলিত করে। উত্তরায়ণের বাগানগুলোতে স্থানীয় শাল এবং ছাতিম গাছের পাশে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি প্রজাতির গাছও লাগানো হয়েছে।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে শান্তিনিকেতনকে ভারতের ৪১তম বিশ্ব ঐতিহ্যময় স্থান হিসেবে ঘোষিত করা হয়। ইউনেস্কোতে শান্তিনিকেতনের জন্য জমাকৃত মনোনয়নে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘Santiniketan is a rare surviving example of an architectural ensemble and a man-made landscape that formed the canvas for art and education as a conscious departure from established European colonial paradigms and educational precepts.’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন এমন একটি অদ্বিতীয় শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা যেখানে প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়, বরং শিক্ষার্থীর মূল পথপ্রদর্শক এবং নৈতিক দিকনির্দেশক। শিশুদের সাথে প্রকৃতির অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপন করে, রবি ঠাকুর শিক্ষার প্রক্রিয়ায় আনন্দ, কৌতূহল, কল্পনা এবং সহমর্মিতা ফিরিয়ে আনেন। আজকের দিনে, যখন আধুনিক শিক্ষা বেড়ে চলা চাপ, একমুখীনতা এবং ডিজিটাল যুগের সঙ্গে লড়াই করছে,রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিমুখী শিক্ষামূলক মডেল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সত্যিকারের শেখা ঘটে তখনই যখন মানুষের আত্মা সূর্য ও আকাশের দিকে একটি পাতার মত খুলে যায়।
তথ্যসূত্র:
Education In Santiniketan (www.santiniketan.com)
A Poet’s School: Tagore’s Santiniketan as seen in photos by E.O.Hoppe. (www.theheritagelab.in)
Historical Festivals Of Santiniketan : Cultural Importance by Santosh Mandal (www.rrjournals.com)
Shantiniketan: the Bolpur School of Rabindranath Tagore: Pearson, William Winstanley, 1881-1923
The Aesthetics Tagore Saw In Nature by Brian G Williams (https://intheedition.wordpress.com)
Premangshu Chakrabarty; Singh, Rana P.B., and Biswas, Rishita (2024 f). Visva Bharati- Santiniketan, a UNESCO WHS: a Role Model of Deeply-Rooted Education and Re-Connecting Culture.
লেখক পরিচিতি: লেখক বন্যপ্রাণী প্রেমী। প্রাণীবিদ্যার ছাত্র। Worldatlas পত্রিকার সম্পাদনার কাজে নিযুক্ত।







Comments