সবুজ অরণ্যে হাত-পা মেলে দাঁড়িয়ে আছে ওই ভূত-গাছ
- ..
- Mar 10
- 5 min read
মধ্য ভারতের লাল মাটির অরণ্যে শাল, সেগুন বা নানা ধরনের হরজাই বৃক্ষের মধ্যেও আলাদা করে নজর টানে অদ্ভুত দর্শন ভূত-গাছ। তাদের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় সুমন্ত ভট্টাচার্য্য।

গ্রীষ্মের দিন শেষে মধ্য ভারতের অরণ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। দিনের বেলা সূর্য যেন পাহাড়ি জঙ্গলের উপর তামাটে আগুন ঢেলে দেয়, কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই বনভূমির স্বভাব পাল্টে যায়। বাতাসে শুকনো পাতার গন্ধ ভেসে আসে, কোথাও দূরে বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে হালকা হাওয়া বয়ে যায়—আর সেই শব্দ যেন অরণ্যের নিঃশ্বাসের মতো শোনায়।
আমি তখন পাহাড়ের এক পাথুরে ঢালে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে অসংখ্য সেগুন ও শালগাছের কালচে কাণ্ড, তাদের মাথায় ধুলো-লাগা সবুজ পাতা। আকাশে তখন সদ্য উঠেছে শুক্লপক্ষের চাঁদ। প্রথমে মনে হল যেন বনভূমির অন্ধকারে কোথাও কোথাও সাদা আলো জমে আছে। একটু ভালো করে তাকিয়ে বুঝলাম—ওগুলো গাছ।
এই অদ্ভুত গাছগুলোর কাণ্ড সাদা, মসৃণ, যেন কোনো ভাস্কর পাথরের স্তম্ভ গড়ে রেখে গেছে জঙ্গলের মধ্যে। আশপাশের গাছগুলো যখন পাতায় ঢাকা, তখনও এরা অনেক সময় প্রায় পত্রহীন দাঁড়িয়ে থাকে—ডালপালা ছড়িয়ে যেন নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। দূর থেকে মনে হয় যেন জঙ্গলের ভেতর কোনো অদৃশ্য প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে।
চারদিকে তখন অদ্ভুত এক শব্দের জগৎ। কোথাও দূরে শেয়ালের ডাক, আবার কোথাও অরণ্যের ভেতর থেকে সাম্বার হরিণের সতর্ক স্বর। মাঝে মাঝে শুকনো পাতার উপর দিয়ে কোনো অদৃশ্য প্রাণী হেঁটে যায়—টুপটাপ শব্দ হয়। কিন্তু সেইসব শব্দের মাঝেও ভূতগাছগুলো দাঁড়িয়ে থাকে একেবারে নিশ্চল, নির্বিকার।
সবুজ অরণ্যের মধ্যে একা একা হাত-পা মেলে দাঁড়িয়ে থাকে ওরা। আপাদমস্তক সাদা অবয়বে মোড়া। দিনের বেলা ঘন জঙ্গলের সবুজের মধ্যেই বেশ চোখ টানে। আর রাতে, যদি হালকা তারার আরো থাকে তো অন্ধকারে সাদা মূর্তির মত এক দণ্ডায়মান প্রতিমা যেন। দেখলে হঠাৎ বুকের হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মহারাষ্ট্রে জঙ্গলের লোকরা তাই একে ‘ভূতিয়া গাছ’ বলে ডাকে।
আমরা যারা জঙ্গলে যাই নিয়মিত, অনেকেই দেখেছি মধ্য ভারতের জঙ্গলে এই Ghost Tree কে। ব্যক্তিগত ভাবে আমি এর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম প্রিয় অরণ্যচারী লেখক বুদ্ধদেব গুহ’র বিভিন্ন লেখায় বারবার এর উল্লেখ দেখে। ঋজুদা সিরিজের গল্প-উপন্যাস যারা পড়ছেন তারা নিশ্চই এটা নজর করেছেন। এই রচনা লিখতে লিখতে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে তাঁর রচিত উপন্যাস ‘সম’ -এ এই গাছের উল্লেখের কথা। "…সাদা গাছের কথা যদি বল তবে মহারাষ্ট্রের আন্ধারী-তাড়োবা অভয়ারণ্যে একরকমের সাদা গাছ আছে- আশ্চর্য সাদা- যখন পাতা ঝরে যায় তখন তাদের কাণ্ড ও শাখাপ্রশাখাকে এমন সাদা দেখায় যেন মনে হল স্নোসেম কোম্পানি তাদের রাঙিয়েছে। অন্ধকার রাতে তাদের দেখে গা ছমছম করে ওঠে। তাই তাদের নামই Ghost Tree ভূত গাছ। অমন গাছ আমি ভারতের এবং পৃথিবীরও আর কোথাওই দেখিনি। অবশ্য আমি আর কতটুকু দেখেছি।
সত্যি! এরকম গাছ আছে? তাদের বোটানিক্যাল নাম কী?
বোটানিক্যাল নাম Sterculia urens। অনেকে আবার বলেন GHOSTS OF THE FORESTS। দিশি নাম ‘কারু’। এই কারু গাছের আঠা অনেক ওষুধ-বিষুধ বানাতে কাজে লাগে।"

Sterculia urens. হ্যাঁ এটাই এই গাছের বিজ্ঞানসম্মত নাম। মধ্য ভারতের ছত্তিশগড়, মধ্য প্রদেশে, মহারাষ্ট্রের মিশ্র, পর্ণমোচী অরণ্যে এমনকি রাজস্থানে বা দাক্ষিণাত্যেও কিছু স্থানে এই গাছ দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায় একটি পাথুরে ঢালে চারপাশে গাঢ় সবুজ সেগুনের বন, আর তার মাঝখানে কয়েকটি ফ্যাকাসে কাণ্ডের গাছ—যেন বনভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অদ্ভুত কোনো ভাস্কর্য। বছরের বেশিরভাগ সময়ে এই গাছের বাকল ধবধবে সাদা থাকে । বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বাকল পাতলা স্তরে উঠে আসে এবং খসে পড়ে। ফলে কাণ্ডে দেখা যায় নানা রঙের স্তর—কখনো সাদা, কখনো সবুজাভ, কখনো হালকা তামাটে। এদের এই অদ্ভুত রূপের জন্য স্থানীয় মানুষদের মধ্যে এই গাছ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক গল্পকথা, আর প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ ও গবেষকদের মধ্যেও তৈরি করেছে কৌতূহল।
Malvaceae বর্গের এই গাছের বিজ্ঞানসম্মত নামটি দেন বটনিস্ট উইলিয়াম রক্সবার্গ। Sterculia গণের এই প্রজাতির নাম urens দেওয়া হয়েছে এদের ফুলে একরকম তীক্ষ্ণ রোম থাকে বলে। মহারাষ্ট্রে এদের যেমন ভূতিয়া গাছ বলে কোথাও বলে কারু বা কারুয়া, কোথাও বা কুলু। দেখা যায় অরণ্যভূমিতে কোন পাথুরে জমিতে এরা গজিয়ে উঠেছে। অর্থাৎ জলহীনতাতেও এরা টিকে থাকতে পারে ও মাটিকে শক্তি যোগান দিতে পারে।
১০-১৫ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট এই গাছেদের কান্ড হয় সোজা, ডালপালা থাকে ছড়ানো। যেন হাত-পা মেলা নৃত্যরত নারী।যখন পাতা থাকে তা থাকে ডালের আগার দিকে। গাছের কান্ড মসৃণ, পেলব , সাদা রঙের হয়। পাতলা ছাল-বাকল উঠে আসে সহজেই হাতে। বাকলের রঙ সবুজাভ থেকে ধবধবে সাদা হয়ে থাকে। নতুন ডালের রঙ অনেক সময় তামাটে বর্ণের হয়ে থাকে। চাঁদনি রাতে এই মসৃণ, পেলব, সাদা কাণ্ডে চাঁদের আলো পড়ে চকচক করে। অন্ধকার জঙ্গলে তা এক অন্য রূপ নেয়। মানুষের কল্পনায় সে হয়ে ওঠে- Ghost tree ।

বর্ষার প্রথম বৃষ্টি পড়তেই ডালের ডগায় নতুন সবুজ পাতা গজায়। তখন ভূতগাছ অন্য গাছের সঙ্গে মিশে যায়। বর্ষা বা শরতে যে পাতা আসে তা শীতেই ঝরে যায়। বছরের বড় একটা সময় গাছ থাকে পত্রহীন।গ্রীষ্মের সময় গাছটি প্রায় পত্রহীন হয়ে পড়ে। দূরের পাহাড়ে তখন অসংখ্য সাদা কাণ্ড দেখা যায়। ফুল আসে ডিসেম্বার থেকে মার্চের মধ্যে আর তারপর গরম পড়তে আসে ফল। পাখি ও মৌমাছি এদের পরাগমিলনে সহায়তা করে। ফুলগুলি হয় সবুজাভ হলদে।

চ্যাটচ্যাটে রোমে এরা আবৃত থাকে।ফলগুলি হয় লম্বাটে, লাল ও রোমে আবৃত। এদের ভিতরে কালো বা খয়েরি বীজ থাকে।

পাখি ও কীটপতঙ্গদের জন্য এই ধরনের গাছ খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক রকমের প্রজাপতির লার্ভার বিকাশ ঘটে এই গাছে। পত্রহীন ডালগুলি শিকারি পাখিদের বসে নজর রাখার জন্য বেশ উপযোগী। এছাড়াও ফিঙে বা হাঁড়িচাচার মত পাখির জন্যেও এই গাছ খুব প্রিয়। এই গাছের কাণ্ডে আঘাত করলে একধরনের আঠালো রসের নির্গমন ঘটে যা কারুয়া আঠা নাগে পরিচিত। এর বেশ ভালোই অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে। এই আঠা মিষ্টান্ন বানাতে, আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে, বস্ত্র ও কাগজ শিল্পে, প্রসাধনী নির্মাণে ও ডেন্টিস্ট্রিতে আঠা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় অর্থনীতিতে তাই এই গাছের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে।
যদিও এই গাছের সংখ্যা ইদানীং বেশ কমে যাচ্ছে। ব্যাপক অরণ্য নিধন তো একটা কারণ বটেই, আঠা বার করতে গিয়েও গাছের ক্ষতি হচ্ছে বারংবার আঘাতে। এই গাছের জন্ম ও বৃদ্ধি পাথুরে জমিতে বেশ কম হয়।

কানহা বা পেঞ্চ বা তাড়োবা বা সাতপুরার জঙ্গলের সাফারিতে গেলে কালো-সবুজ গাছের ভিড়ে এমন সাদা মূর্তির মত পত্রহীন গাছ যখনই দেখবেন, তখন অবশ্যই চিনে নিতে ভুলবেন না এই অদ্ভুত গাছটিকে। কারণ এই গাছ এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতির একটি বিশিষ্ট চিহ্নস্বরূপ।এই সব অঞ্চলের বন সাধারণত শাল, সেগুন, বাঁশ ও বিভিন্ন ঝোপঝাড়ে ভরা। কিন্তু যেখানে মাটি খুব অল্প, নিচে পাথরের স্তর, আর গ্রীষ্মে জল প্রায় থাকে না—সেখানেই ভূতগাছের আসল রাজত্ব। পেঞ্চের পাথুরে পাহাড়ের গায়ে বা কানহার বামনি দাদারের মাটিতে ছড়িয়ে থেকে ওরা যেমন সেখানকার কীট-পতঙ্গ থেকে প্রাণীকুলের আশ্রয় দেয়, তেমনই মাটিকে শক্তি যোগায়।

মধ্য ভারতের বনের কথা ভাবলে আমরা সাধারণত বাঘ, শালবন বা সেগুনের কথা ভাবি। কিন্তু সেই বিশাল অরণ্যের নীরব সৌন্দর্যের মধ্যে ভূতগাছেরও এক বিশেষ স্থান আছে। কখনো যদি গ্রীষ্মের রাতে মধ্য ভারতের কোনো অরণ্যে থাকার সুযোগ হয়, তবে এই গাছের আসল সৌন্দর্য দেখা যায়। চাঁদের আলোয় দূরের পাহাড়ে সারি সারি সাদা কাণ্ড দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে নীরব বন, মাঝে মাঝে শেয়ালের ডাক, কোথাও বনের মধ্যে কোন জন্তুর চলার শব্দ। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে ভূতগাছগুলো যেন নিঃশব্দে পাহারা দিচ্ছে অরণ্যকে। বছরের পর বছর, ঋতুর পর ঋতু, ঝড়-বৃষ্টি-খরার মধ্যেও তারা দাঁড়িয়ে থাকে—মধ্য ভারতের জঙ্গলের রহস্যময় প্রহরী হয়ে।
ছবি: লেখক।
ফুল ও ফলের ছবি: Wikimedia commons
লেখক পরিচিতি: লেখক পেশায় চিকিৎসক। প্রকৃতি ও অরণ্যপ্রেমী। 'বনেপাহাড়ে' ওয়েবজিনের সম্পাদনার দায়িত্বে।








খুব ভালো লাগল।
প্রসঙ্গত বলি যে - এই কুড়লু গাছ বা Ghost Tree র একটা Geobotanical importance বা পরিচিতি আছে । যে অঞ্চলে এই গাছ প্রচুর সংখ্যায় (in abundance) জন্মায় সেখানে মাটির নীচে খনিজ আকরিক
( Lead,Zinc,Copper,Iron,Manganese) পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে - Statistical Data অন্তত তাই বলে।