সোনানদী অভয়ারণ্যে হালদুপারাও বনবাংলোয়
- ..
- 2 days ago
- 14 min read
করবেটের একটি অন্য দিক হল সোনানদী। কম পর্যটকের যাতায়াতের কারণে বড় রহস্যময় সে অরণ্য। তার কথা উঠে এল তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত'র কলমে।

করবেট ন্যাশনাল পার্কে পাঁচ রাতের ভ্রমণ। প্রথম দুই রাত মালানির বনবাংলোতে কাটিয়ে পরের দিন হালদুপারাওর উদ্দেশ্যে বেরোলাম । এপথ সেপথ দিয়ে জঙ্গলের কাঁচা রাস্তা ঘুরে এগোতে লাগলাম। লক্ষ্য করলাম একই রাস্তার দুধারে জঙ্গলের পরিবেশ দিনের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন রকম । আবার একেক দিন একেক রকম । অন্ততঃ আমার চোখে তো তাই লাগে । একেক সময়ে এক এক রকম সাজে যেন এই অরণ্য প্রকৃতি সেজে উঠেছে ।
আজ প্রায় সারাদিনের যাত্রা । যাবো সোনানদী জোনে হালদুপারাও ফরেস্ট রেস্ট হাউসে । মালানি থেকে অনেকখানি পথ । এর আগে ইন্টারনেটে পড়েছি , পরে ইরফানের কাছেও শুনেছি মালানি থেকে হালদুপাড়াও যাবার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাবার পথটা ভারী সুন্দর । ছায়া ছায়া বনপথ । বিরাট উঁচু উঁচু বহু শতাব্দী প্রাচীন গাছ । পাহাড়ী উঁচু নিচু রাস্তা । নুড়ি বিছানো নদী পথ। প্রচুর অগভীর নালা। আর যাবার পথে অপূর্ব সব ব্রিটিশ আমলে নির্মিত বনবাংলো । সব মিলিয়ে দারুন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হব বুঝতে পারলাম । খুব সকালে ব্রেকফাস্ট করেই মালানি থেকে বেরিয়ে সোজা আমডান্ডা গেট । গেট পেরিয়েই আবার বড় রাস্তা । বড় রাস্তায় উঠেই পূবমুখে চলল জিপসি । জঙ্গল থেকে আবার শহুরে পথে । প্রায় ২৬ কিলোমিটার গিয়ে চলে এলাম দুর্গাদেবী গেট ।
দুর্গাদেবী জোন পার্বত্য অঞ্চলে । বিজরানির মতন সমতলে নয় । গেটে পারমিট দেখিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখি প্রকৃতির কি অনন্য শোভা! পাহাড়ী অঞ্চলে হওয়ার দরুন উঁচু নিচু রাস্তা । রামগঙ্গা নদী ও মন্ডল নদী এই বিস্তীর্ণ দুর্গাদেবী জোনের বিভিন্ন অংশে কাটাকুটি করেছে । উঁচু উঁচু চীর পাইন , শিশু , জাম , আমলা , চীর চটি , ওক , কাজু ইত্যাদি বহু প্রাচীন বৃক্ষরাজির সমাবেশ । এত উঁচু গাছের ছায়ায় আলো আঁধারির পরিবেশ । রামনগর থেকে এই দিকটা খানিকটা উঁচুতে হওয়ায় বাতাসে একটা ঠান্ডা শিরশিরানি ভাব আছে । তার উপরে ডিসেম্বর এর শেষ সপ্তাহ । দারুণ লাগছিল । দম ভরে অক্সিজেন ভর্তি বিশুদ্ধ বাতাস নিলাম । ইরফান গাছ চেনাতে চেনাতে যাচ্ছিল । শুনলাম এই জোনটা নানাধরনের পাখি দেখার জন্যে বিখ্যাত । আর দেখা যায় বন্য হাতি। পক্ষী আর হস্তীপ্রেমীদের স্বর্গ রাজ্য । যাইহোক আমরা অবশ্য জ্যাক অফ অল ট্রেডস , সব বিষয়েই আমাদের আগ্রহ ।
একটু এগিয়ে আঁকা বাঁকা ছায়াপথ পেরিয়ে সামনেই পড়ল একটা ফরেস্ট চেকপোস্ট । ছোট্ট একটা গুমটি ঘর । তাতে একটা চৌকি পাতা । একজন ফরেস্ট গার্ড থাকার মতন ব্যবস্থা । ঘরটা ফাঁকাই ছিল। ইরফান জিপসি থেকে নেমে মধ্যবয়সী খাঁকি পোশাক পরা একজনকে কোথা থেকে জানি ডেকে নিয়ে এলো। কাছেই ছিল বোধহয়। ইনিই ফরেস্ট গার্ড। আমাদের পারমিট ইত্যাদি চেক করে ইরফানের সাথে একটু সুখ দুঃখ ভালো মন্দ কথা বলে ছেড়ে দিলেন আমাদের । আমরাও শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। মনে মনে ভাবলাম কেমন হবে এর জীবন । শীত গ্রীষ্ম বর্ষা এই একটা ছোট্ট ঘরে ফরেস্ট গার্ডের ডিউটি করে যাচ্ছেন। সাক্ষী থাকছে প্রকৃতির এই রঙ্গশালার। এই দিকটা অতটা টুরিস্টের ভিড় থাকেনা বলে গাড়িও বেশি চলেনা । দু'দন্ড কথা বলারও কেউ নেই । " একা বোর হয়ে যান না ?" - জিজ্ঞেস করি ।
" কেয়া করে সাব , আদাৎসি পড় গয়া "।
ওকে বিদায় জানিয়ে এরপর এগোতে থাকলাম । খানিক এগিয়েই বাঁ দিকে একটা শাখা পথ একটু উপরে এক জায়গায় উঠে যাচ্ছে দেখলাম । শুনলাম পথটা লোহাচূর বনবাংলোর দিকে গেছে । "বাহ্ নামটা তো বেশ সুন্দর", বললো ঋতু । আমি বলি -“ ঠিকই , হাতে সময় থাকলে এই লোহাচূর বাংলোতে এক রাত কাটিয়ে যেতাম "। এই আরণ্যক পরিবেশে সব বনবাংলো গুলিতে ঘুরে ঘুরে রাত কাটানোর মজাই আলাদা । এক একটা বনবাংলো এক এক রকম পরিবেশে অবস্থিত হওয়ার দরুন সেখানে থাকার অভিজ্ঞতারও তারতম্য হবে বেশ বুঝতে পারলাম, কিন্তু একই ভ্রমণে সবরকম স্বাদ পাওয়া সময়ের অভাবে সত্যিই দুষ্কর ।
হঠাৎ জিপসি দাঁড় করিয়ে একটা আলো আঁধারি জায়গায় গাছের ডালে বাইনোকুলার দিয়ে ইরফান কি সব দেখতে লাগলো । "স্যার উও দেখিয়ে ব্লু থ্রোটেড বারবেট" বলেই বাইনোকুলারটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে । দেখি টিয়াপাখির মতন সবুজ পাখি গলা আর মুখের কিছু অংশ নীল । ঋতুকেও দেখালাম । শুনলাম এছাড়াও লিনিয়েটেড বারবেট , ক্রিমসন ব্রেস্টেড বারবেট এখানে দেখতে পাওয়া যায় । আর দেখা যায় নানা প্রজাতির ঈগল । ক্রেস্টেড সার্পেন্ট ঈগল , ফিশিং ঈগল , বুটেড হক ঈগল ইত্যাদি । নদীর ধারে দেখা যায় নানা ধরণের মাছরাঙা বা কিংফিশার ।
জিপসি এগোতে থাকে এরপর আঁকা বাঁকা পথ ধরে । ছায়া ছায়া পথ । কিছুটা চলার পর উঁচু তে উঠে গেছে একটা পথ । গিয়ে মিশেছে সোজা আরেকটা ফরেস্ট বাংলোয় । আরেকটা পথ সোজা রামগঙ্গা নদী পেরিয়ে ওপারে ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে মন্ডল গেটের দিকে এগিয়ে গেছে । আমরা সেই পথ ধরে নদীর দিকে এগিয়ে গেলাম । তারপর নুড়ি পাথর বেছানো নদীখাতে নেমে পড়ল আমাদের জিপসি । জল কেটে একটু এগিয়েই শুকনো জায়গায় গিয়ে উঠলো । জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না । সেই কলমের জোর আমার অন্ততঃ নেই । দু'পাশে ঘন জঙ্গল ভরা পাহাড় । আর নদী খাতে যে জায়গাগুলি শুকনো সেখানে সাদা কাশফুলের মতন ঘাস জাতীয় এক ধরণের গাছ গজিয়েছে । অস্বাভাবিক রকম নিস্তব্ধ জায়গাটা ।
ঘাসবনের দিকে তাকিয়ে পিঠ দিয়ে ঠান্ডা স্রোত খেলে গেল । খালি মনে হচ্ছিল এই সব জায়গাই বাঘের লুকিয়ে থাকার পক্ষে সেরা জায়গা । দূরে কয়েকটা চিতল হরিণ চড়ে বেড়াচ্ছে দেখলাম । ইরফান জীপের স্টার্ট বন্ধ করে নেমে পড়ল । আমাদের জিপসিতেই বসতে বলল । অনেকটা জল পেরিয়ে এসেছে বলে গাড়িরর ইঞ্জিন ও অন্যান্য অংশ নিরীক্ষণ করল কিছুটা সময় নিযে । ওই মুহূর্তটুকু একটা অদ্ভুত ভয় মেশানো ভালো লাগার অনুভূতি মনের মধ্যে হচ্ছিল । ঘন নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মাত্রার সবুজ বনানী দু'ধারে। মাঝে মাঝে পাথুরে পাহাড়। এদিকে সাদা বালি ও নুড়িপাথর বিছানো নদীখাতে কাশবনের মতন ঘাসবন । আর সাথে কুলকুল শব্দে বয়ে যাওয়া রামগঙ্গা নদীর টলটলে জল। সব মিলিয়ে ভালো লাগায় ভরে গিয়েছিল মনটা ।
পড়ুন এই লেখকের অন্য রচনা: ছোটগল্প: উত্তরণ
অন্যদিকে একটা ভয়ের শিরশিরানি চলছিল । মনে হচ্ছিল আড়াল থেকে বোধহয় বাঘ নজর রাখছে । চলন্ত গাড়িতে যে ভয়টা ছিলনা , এখানে কয়েক মিনিটের অপেক্ষায় সেটা দ্বিগুন আকার নিয়েছিল । সেই অনির্বচনীয় শোভা পুরোপুরি মুক্ত মনে উপভোগ ও করতে পারছিলাম না। তারমধ্যেই বেশ কিছু ছবি তুললাম। ইরফানও জিপসিতে স্টার্ট দিল । আমাদেরও যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল ।

এরপর লাফাতে লাফাতে জিপসিটা নির্জন জঙ্গল পথ ধরে এগোতে লাগল। একটু এগিয়েই একটা মোড় ঘুরতেই দেখি দু'পাশের পাহাড়টা বাঁক নিয়ে “এল” এর মতন উত্তর মুখে এগিয়ে গেছে আর তার সাথে রামগঙ্গা নদীও । ঠিক এই অংশে প্রকৃতির সেই অপরূপ শোভা মনের ফ্রেমে সারাজীবনের মতন বন্দী হয়ে গেলো । ছবিও তুললো ঋতু অনেক । ইরফান এরপর এই করবেট কে ঘিরে একটা প্রচলিত লোককথা শোনালো । " চুঁড়েল" নামে নাকি এক অতৃপ্ত আত্মা এই বনে বাঁদাড়ে ঘুরে বেড়ায় । চুঁড়েল হল শাঁকচুন্নি । হাতে শাঁখা থাকে তাই এই নাম । অনেক সময়ে কোনো নারীর রূপ নিয়ে দিকভ্রষ্ট কোনো পথিক কিংম্বা একাকী কোনো পর্যটক কে বিভ্রান্ত করে মেরেও ফেলে । “চুঁড়েল” নামে একটি পাখিও আছে এই অরণ্যে যা প্রায় চোখেই পড়েনা । করবেট সাহেবও সারাজীবনে তিনবার মাত্র এই পাখি শনাক্ত করতে পেরেছিলেন । একবার তার বাংলোর পাশের গাছে এই পাখিকে বসতে দেখে তিনি ভেবেছিলেন গুলি করবেন যাতে মৃত পাখিটিকে ভালো করে পর্যবেক্ষন করে এই পাখি সম্বন্ধে জানবেন। কিন্তু তাঁর বোন তাকে বাধা দেন এই বলে যে কোনো কারণে যদি গুলি ফস্কায় তো গ্রামবাসীরা ধরে নেবে জিম করবেটের মতন এতো বড় শিকারি যখন এই চুঁড়েল পাখি মারতে পারলনা তার মানে এই পাখি কোনো সাধারণ পাখি নয় । এ হল সেই অতৃপ্ত আত্মা "চুঁড়েল" যা পাখি হয়ে এখানে এসেছে । এমনি সব বিশ্বাস আছে এই জঙ্গল সংলগ্ন গ্রামের সাধারণ সব মানুষজনের মধ্য । পাহাড় জঙ্গলের এই নিঝুম পরিবেশে এই লোককাহিনী শুনতে শুনতে মনের মধ্যে একটা ভয় ভয় ভাব আসছিল অস্বীকার করব না । কলকাতায় ড্রইং রুমে বসে এসব গল্প শুনলে নির্ঘাত আষাঢ়ে গল্প বলে হেসে উড়িয়ে দিতাম ।
ছোটি হলদওয়ানি নামে রামনগর থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে করবেট অরণ্যের লাগোয়া একটা গ্রাম আছে । পাঁচশো একুশ বর্গকিলোমিটার ব্যাপ্ত সেই গ্রাম সেই আমলে করবেট সাহেব কিনে সেখানে ঘরবাড়ি বানিয়ে ভাড়াটিয়াদের বসান । পাঁচিল দিয়ে ঘেরার ব্যবস্থা করেন সেই গ্রাম যাতে বন্য জীবজন্তু সেখানে অবাঞ্চিত ভাবে প্রবেশ করতে না পারে । ভারত স্বাধীন হবার কয়েক বছর পর এই গ্রাম ভাড়াটিয়াদের হাতে ছেড়ে দিয়ে করবেট সাহেব কেনিয়ায় চলে আসেন এবং শেষ জীবন কেনিয়ায় কাটান । এই ছোটি হলদওয়ানি ও অভয়ারণ্য সংলগ্ন অন্যান্য গ্রামে এমন নানান উপকথা ও লোককথা পুরোনো দিনের মানুষ জনের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে ।
আঁকা বাঁকা আলো ছায়া পথ ধরে বুনো গন্ধ গায়ে মেখে চারিদিকে নজর রেখে ধীরগতিতে জঙ্গলের পথ ধরে এগোতে থাকলাম । প্রথম দিকে চুপচাপ থাকলেও আজকে দেখি আমার তিন বছরের ছোট্ট কন্যাও জঙ্গল সফরে খুব উত্তেজিত । অনর্গল এটা কী ওটা কী ইত্যাদি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে আর আমার মুখ থেকে তার হিন্দি তর্জমা শুনে ইরফান একভাবে উত্তর দিয়ে চলেছে । বেশ বুঝতে পারলাম দু'রাত্তির জঙ্গলে থাকার পর ক্রমশঃ এই প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব শিশু মনেও পড়ছে ।

আমরা এরপর মূল জঙ্গলের কাঁচা পথ ছেড়ে পিচ বাঁধানো পাহাড়ি পথে এসে পড়লাম । লোহাচুর জোন থেকে বেরিয়ে এলাম ।সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেকটা উঠে এসেছি । আশেপাশে বেশ কিছু বাড়ি ঘরদোর দেখা যাচ্ছে এবারে । ছোট বাচ্চারা ব্যাগ কাঁধে স্কুলে যাচ্ছে । করবেট টাইগার রিজার্ভের গা ঘেঁষে চলেছি আমরা । একটু এগিয়ে আবার বাঁ দিকে একটা ছোট পথ ধরে আবার পাহাড়ের গা দিয়ে উঠতে লাগলাম । কাঁচা সরু পথ। লাফাতে লাফাতে জীপসি চলল । প্রচুর পাখির ডাক চারিদিকে । এই অংশটা করবেট টাইগার রিজার্ভের একদম উত্তর দিকে । ঘুরে ঘুরে অনেকটা উপরে এসে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গয়ে এসে দেখলাম দারুন সুন্দর খুব প্রাচীন একটা বনবাংলো । নাম কান্দা বাংলো । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১১০০ মিটার উঁচুতে । বাংলো চত্বর থেকে পুরো করবেট রিজার্ভের একটা সামগ্রিক দৃশ্য দেখা যায় । এটাই করবেটের উচ্চতম বাংলো । দু'কামরার এই বাংলোর সামনের দিকে টানা বারান্দা ।
স্বয়ং জিম করবেট এখানে থেকে গেছেন কান্দার মানুষখেকো বাঘ অভিযানে বেরিয়ে । দারুণ সুন্দর পরিবেশ । ভারী ভালো লাগছিলো ।ইচ্ছা হচ্ছিল এই নিরালা বাংলোয় এক রাত কাটিয়ে যাই । কিন্তু আমাদের যে সব অগ্রিম বুকিং করা , তাই এখানে আর থাকা হলো না । পাশেই ঘাষজমিতে জীপটা দাঁড় করিয়ে আমরা চৌকিদারের বদান্যতায় বাংলোর ভিতরটা ঘুরে দেখলাম । মোটা মোটা দেয়ালের বড় বড় ঘর । ভেতরে ফায়ারপ্লেস রয়েছে । সেগুন কাঠের আসবাবপত্র । দুটো ঘরই খালি , আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। তারপর পাশের লনে এসে বসলাম বেতের চেয়ারে । এমন সুন্দর পরিবেশ ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছিলনা । চৌকিদার চিনামাটির রেকাবিতে করে চা নিয়ে এলো। আমাদের সাথে বিস্কুট ছিল। তাই দিয়ে চা পান হল । চৌকিদারের কাছে শুনলাম করবেটের অন্য অঞ্চলের তুলনায় এদিকে গাছপালা অন্যরকম । উঁচুতে হওয়ার জন্য হিমালয় অঞ্চলের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য এখানে চোখে পড়ে । চিতাবাঘ , হিমালয়ান ভাল্লুক ভালোই দেখা যায় এদিকে । যদিও আমাদের চোখে পড়েনি ।
চৌকিদারকে বিদায় জানিয়ে এরপর কান্দা থেকে হালদুপারাওয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম । খানিকক্ষণ পাহাড় জঙ্গলের পথ ঘুরে নেমে এলাম আবার একটু নিচে পিচ বাঁধানো পাহাড়ি পথে । জিপসির গতিবেগ সভ্য জগতে বেড়ে গেলো অনেকটাই ।
খানিক্ষনের মধ্যেই চলে এলাম করবেট টাইগার রিজার্ভের সোনানদী জোনের ভাতানভাসা গেট-এর সামনে । হালদুপারাও বাংলো এই সোনানদী জোনের গভীরে পালাইন নদীর ধারে অবস্থিত।ভাতনভাসা গেটে কাগজপত্র , হালদুপারাও বাংলোর বুকিংয়ের কাগজপত্র ইত্যাদি চেকিং হলো। আর তারপরেই গেট পেরিয়ে ঢুকে গেলাম আমরা এক আশ্চর্য জগতে। করবেটের সোনানদী জোনের গভীরে ক্রমশঃ এগোতে থাকলাম । এদিকটা জঙ্গল খুব গভীর । মানুষের উপস্থিতি নেই বললেই চলে । আমরা তিনটি প্রাণী আর চালক ইরফান। আর বোধহয় এই বিস্তৃত অরণ্যে কোনো মানুষই নেই । মনে মনে একটু ভয় যে করছিল না তা নয় , যে হঠাৎ জিপসি যদি খারাপ হয়ে যায় এই অরণ্য প্রকৃতিতে তখন কি করব! কিন্ত সেই ভয় বেশিক্ষন স্থায়ী হল না দু'ধারের এই অসামান্য জঙ্গলের রূপ দেখে । কি যে দারুণ লাগছিল তা বলে বোঝাতে পারব না । কত যে ছোটোখাটো নালা পেরোলাম তা বলে বোঝাতে পারব না । উঁচু নিচু পথ ।
শুনলাম এই সোনানদী জোনের বাঘ খুবই লাজুক স্বভাবের । মানুষ প্রায় দেখেই না বলে মানুষের উপস্থিতি সামান্য টের পেলেই আড়ালে চলে যায় । আড়চোখে দেখলাম আমার কন্যা আর স্ত্রী ঋতু হাঁ করে বিস্ময় ভরে এই অরণ্য প্রকৃতির শোভা উপভোগ করছে । হাতির প্রচুর উপস্থিতি আছে এই অঞ্চলে শুনলাম । হঠাৎ একটা মোড় ঘুরতেই মনে হলো ফ্ল্যাশ এর আলোর মতন একটা আলোর ঝলকানি হল ।
"কেয়া হুয়া ইরফান ?" "
স্যার , ক্যামেরা ট্র্যাপ থা , জঙ্গল মে জানোয়ার কা তসবির খিঁচ লেতা হায় ক্যামেরা । পেড় পর ইসকো বাঁধ দিয়া যাতা হায় । সামনেসে কোই ভি যায়গা , চাহে উও জানোয়ার হো ইয়া কোই আদমি হো ইয়া গাড়ী জাইসা হামলোগোকা য়ে জীপ , তো তুরন্ত উও ফটো খিঁচ লেতা হায় । দেখিয়ে উও পেড় পর হ্যায় ক্যামেরা"।
বলেই ইরফান পাশের বড় গাছটার মোটা গুঁড়ির দিকে দেখালো । দেখলাম একটা বাক্সের মতন ক্যামেরা ট্র্যাপ । সামনে দিয়ে কোনো চলমান কিছু গেলেই সাথে সাথে ইনফ্রারেড লাইট বিম ব্যবহার করে প্যাসিভ বা এক্টিভ ইনফ্রারেড সেন্সর দিয়ে চলমান জীবকে ক্যামেরাবন্দী করে এই যন্ত্র । আলোর ঝলকানিতে বিরক্ত হয়ে অনেক জানোয়ার আবার অনেক সময়ে এই ক্যামেরা ট্র্যাপ খুঁজে বার করে ভেঙেও ফেলে এরকমও শুনলাম । তাও যতটুকু ধরা পরে এই ক্যামেরায় তাতেই এই জঙ্গলের জীববৈচিত্র্য সম্বন্ধে অনেক কিছু জানা যায় ।
প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট জঙ্গল পথে এসে নুড়ি বিছানো একটা নদী পেরোলাম , নাম পালাইন নদী । নদী পেরিয়ে একটু উপরে উঠেই পেয়ে গেলাম হলদুপারাও বনবাংলোর গেট । কানে আসতে লাগলো বেশ কিছু মানুষের কণ্ঠস্বর । অনেক্ষন বাদে আবার মনুষ্যজগতে ফিরলাম । ঢুকেই একটা বড় ফাঁকা চত্বর । সামনেই দোতলা বড় বাংলো । ডানদিকে লম্বা বারান্দা ওয়ালা ঢালু ছাদের একতলা বাংলো ।
একতলা বাংলোর হাতায়ে একটা বড় বট গাছ । গাছ কে ঘিরে একটা বেদি । আরেকটু দূরে একটা ছোট নজরমিনার আর তার সামনেই জমিটা ঢালু হয়ে অনেকটা নীচে নদীখাতে চলে গেছে । ওপারে গভীর জঙ্গল হাতছানি দিচ্ছে তার সমস্ত রহস্যের উপাদান নিয়ে । চারিদিকে ইলেকট্রিক ফেন্সিং করা যা সৌরবিদ্যুতে চলে । বনদপ্তরের কর্মীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে । প্রায় বিকেল হয়ে এসেছিলো তখন । খুব নির্জন এই অঞ্চলটা সাথে একটানা ঝিঁঝি পোকার ডাক । ভাবছিলাম এই এতো গভীর বনের ভিতরে সভ্যতার থেকে এতো দূরে বনদপ্তরের এই কর্মীরা থাকে কি করে কে জানে । চাকুরীর প্রয়োজনে থাকতেই হয় কিংবা হয়ত এদের মধ্যেই কেউ কেউ প্রকৃতই জঙ্গলপ্রেমিক বা হয়ত অনেকদিন থাকতে থাকতে জঙ্গলকে ভালোবেসে ফেলেছে । অনেকের মধ্যেই হয়ত বা একজন সুপ্ত “যুগলপ্রসাদ” বাস করেন । প্রকৃতির কোলে থাকতে থাকতে সে সত্যিই একদিন জেগে ওঠে ।

আমাদের জায়গা হল একতলা বাংলোর একদম বাঁ দিকের কোনার ঘরে । ঘরটা মাঝারি সাইজের , সাথে ফায়ার প্লেস আর বড় এটাচ্ড বাথরুম । তবে ঘরটা একটু অন্ধকারাছন্ন ও স্যাঁতস্যাঁতে । বারান্দায় এসে বসলাম । জঙ্গলে বিকেলের পর ঝুপ করে সন্ধ্যে নেমে যায় । চৌকিদার চা দিয়ে গেল ।
পুরো হালদুপাড়াও তে আমরাই একমাত্র পর্যটক । আর বাকিরা সবাই বনদপ্তরের কর্মী । টানা বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে পুরো এলাকার দৃশ্য উপভোগ করছিলাম । সময় যেন পুরো থমকে আছে । বিকেলের এই সময়টা প্রকৃতি একটু অন্যরকম আসন্ন রাতের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য । পাখিরা ঘরে ফেরায় ব্যস্ত রাঙা আকাশের বুকে ডানা মেলে ।ওদের কলকাকলিতে চারিদিক মুখরিত । আসতে আসতে বাইরের আলো কমে আসছে । মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে কেউ যেন চাদর দিয়ে প্রকৃতিকে ঢেকে দিচ্ছে ।
আমরা একটু এগিয়ে গেলাম নজর মিনারের দিকটা । জমিটা সেখানে ঢালু হয়ে নিচে পালাইন নদীখাতে গিয়ে পড়েছে । একদম সীমানায় ইলেক্ট্রিক ফেন্সিং । ওদিকে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় জঙ্গলটা ভারী রহস্যময় লাগছিল । মনে হচ্ছিল যেন নদীর ওপারের ওই জঙ্গল হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের । কোনো বাঘ বা বাঘিনীর রাজত্ব হবে হয়ত ওই জায়গা । সে হয়ত এখন দীর্ঘ রাতের শিকার পর্বের প্রস্তুতি নিচ্ছে । জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে সে আমাদের দেখতে পাচ্ছে নাকি কে জানে । হয়ত পাচ্ছে। অনেক্ষন চুপচাপ একদৃষ্টে ওপারে তাকিয়ে রইলাম । যদি রাজার দর্শন পাই । কতক্ষন যে চুপচাপ কেটে গেল কে জানে। এরপর আরো একটু বেশি অন্ধকার হলে বাংলোয় ফিরে বারান্দায় এসে বসলাম ।
বাংলোটা একদম এক কোনায় হওয়ার জন্য বাঁদিকে একদম পাশেই জঙ্গলের সীমানা । বেশ গা ছমছমে লাগছিল আমাদের তিনজনেরই । অন্ধকার অনেকটা গাঢ় হলে পরিবেশটা পুরো ভয় মিশ্রিত রহস্যময়তায় ডুবে গেল । ঘরের ভিতরে টিমটিমে সৌরবিদ্যুতের আলো জ্বলছে । বারান্দা পুরো ঘুটঘুটে অন্ধকার । দূরের মূল বাংলোর সামনের আলো তে কিছুটা এদিক ওদিক দেখা যাচ্ছে । বনকর্মীদের কথাবার্তা ভেসে আসছে । ওরা বোধহয় নৈশভোজের আয়োজনে ব্যস্ত ।

বাঁদিকে জঙ্গলের সীমানায় ইলেক্ট্রিক ফেন্সিংয়ের গায়ে মনে হলো অজস্র চোখ জ্বল জ্বল করছে । একটানা ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ঐদিক থেকে ভেসে আসছে । হঠাৎ ঋতু আমায় একটু ঠেলা দিয়ে ফিসফিস করে বললো “ ওটা কি ? “ দেখি মাটি থেকে সামান্য উপরে একজোড়া সবুজ আলো ধীরে ধীরে সামনের ওয়াচটাওয়ারে র দিক থেকে এগিয়ে আসছে ।
“ সত্যি ই তো ওটা কি ? কোনো একটা জন্তু তো বটেই , কিন্তু কি ?” বললাম আমি উত্তেজনায় । আরেকটু আলোয় কাছে এলে দেখি বিরাট একটা ভাম বিড়াল জাতীয় প্রাণী । ধীরে ধীরে আমাদের এড়িয়ে একটু দূর দিয়ে মূল বাংলোর দিকে চলে গেল । বোধহয় খাবারের খোঁজে । হেসে উঠলাম নিজেরাই ,ভয় পেয়েছিলাম বলে । কিন্তু এরকম আদিম আধিভৌতিক পরিবেশে আমাদের মতন শহুরেদের পক্ষে সেটা কিছু অস্বাভাবিকও না । বেশ বুঝতে পারলাম হালদুপারাও তার আদিম রহস্যময়তা নিয়ে আমাদের স্বাগত জানালো ।
একটু বাদেই নৈশভোজের ডাক পড়ল । আমরা মূল বাংলোর একতলার ডাইনিং রুমে এসে বসলাম । আমরা ছাড়া কেউই নেই । ভাত , রুটি, ডাল , স্যালাড , ফুলকপির তরকারি,পাঁপড় ভাজা সহযোগে ডিনার সারা হলো । ফেরার সময়ে বাংলোয় আসার পথটাও বেশ ছমছমে লাগছিল । শীতের রাতে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই । রাতে চাঁদের আলো থাকলে রাতচড়া পাখির ডাকে চারিদিক মুখরিত থাকত । সামনেই অমাবস্যা বলে চাঁদের দেখাও নেই । মিশকালো জঙ্গল একটা কুয়াশার আস্তরণে ঢেকে রয়েছে।
ঘরে ঢুকে সোজা ঘুমে ঢলে পড়লাম । মাঝরাতে বার্কিং ডিয়ারের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল । সামনের জঙ্গলেই আছে বোধহয় সে। আল্যার্ম কল নাকি ? তার মানে কি বাঘ আশেপাশেই আছে ?বেশ উত্তেজনা বোধ করলাম । ক্লান্ত থাকার জন্য ঋতু আর আমার তিন বছরের কন্যা অকাতরে ঘুমাচ্ছিল। আল্যারম কল শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙলো অজস্র পাখির কিচির মিচির আওয়াজে । জানালাটা একটু ফাঁক করে দেখি সামান্য আলো ফুটেছে । তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে জীপে চড়ে বসলাম সোনানদী ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি তে মর্নিং সাফারির জন্য ।
আনুমানিক তিনশো বর্গকিলোমিটার ব্যাপ্ত এই সোনানদী ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি উনিশশো একানব্বই তে করবেট টাইগার রিজার্ভের অন্তর্ভুক্ত হয় । এখানকার নদীতে এক কালে নাকি সোনা পাওয়া যেত । সেই থেকেই নাকি এই নাম । এখানকার উদ্ভিদ বৈচিত্র্য একটু অন্যেরকম, মূল করবেটের জোনগুলির মতন নয় । মূলত তরাই অঞ্চলের উদ্ভিদ বৈচিত্র এখানে দেখা যায় । শালের জঙ্গলে ভর্তি । হাতির জন্য বিখ্যাত এই স্যাংচুয়ারি । এই অঞ্চলই সমগ্র করবেট ফরেস্টের মধ্যে একমাত্র জায়গা যেখানে গাড়ি থেকে নেমে মাটিতে হাঁটার অনুমতি আছে ।শুনলাম পাখি আর হাতির জন্য এই সোনানদী স্যাংচুয়ারি বিখ্যাত । প্রায় পাঁচশো পঞ্চান্ন প্রজাতির পাখি আছে এই অরণ্যে । শুনলে আশ্চর্য হবেন সমগ্র পৃথিবীর পাখি প্রজাতির প্রায় ছয় শতাংশ পাখি এই বিস্তীর্ন অঞ্চলে পাওয়া যায় । যাকে বলে বার্ডার্স প্যারাডাইস ।
বাংলো থেকে বেরিয়েই সোজা পালাইন নদীর ধারে এলাম । ভোরের অল্প আলোয়ে দারুণ মায়াবী লাগছিল অঞ্চলটা। কিছু ছবি তুলে নুড়িপাথর বিছানো নদীখাত পেরিয়ে ওপাশের গভীর জঙ্গলের ভেতরে জিপসি নিয়ে প্রবেশ করলাম । সত্যি হালদুপারাও -এ না এলে অরণ্যের যে একটা মায়াবী ভাব আছে, একটা স্নিগ্ধ অথচ রহস্যে ভরা রোমাঞ্চ আছে সেটা জানতে পারতাম না । অনুভবও করতে পারতাম না । পর্যটকদের ভিড় ধিকালা , বা বিজরাণী জোনের মতন একেবারেই নয় বলে এদিকের অরণ্য অনেক আদিম । কত সহস্র বছর ধরে সেই আকাশ ছোঁয়া বনানী এই জঙ্গলকে ঘিরে রেখেছে , তার জীববৈচিত্র্য কে রক্ষা করে চলেছে । মানুষের পদস্পর্শ কম বলেই বোধহয় এই অরণ্য এত আদিম । মুগ্ধ হয়ে সেই অপার্থিব দৃশ্য মনের মণিকোঠায় বন্দী করলাম , খানিকটা ক্যামেরাবন্দী ।

এদিক ওদিক ঘুরে জিপসিটা রামগঙ্গা নদীর ধারে এলো । সূর্য পুরোপুরি ওঠেনি তখনো । চারিদিকে কুয়াশার আস্তরণ । যেন প্রকৃতিদেবী সুন্দরী জঙ্গলের মুখ হালকা সাদা নেটের ঘোমটায় ঢেকে রেখেছেন । বিভিন্ন পাখির হালকা কলতানে জায়গাটা মুখরিত । নদীর ধারে জঙ্গল পথটা গিয়ে শেষ হয়েছে । কিছুটা পাশে একটা ঝোপের ধারে জীপটা পার্ক করে স্টার্ট বন্ধ করে বসে রইলাম আমরা । নদীটা এই জায়গায় বেশ চওড়া । জঙ্গলে এইসব স্থানেই জীবজন্তুদের দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী । নদীতে জল খেতে তারা আসতেই পারে আর তখনই সুযোগ বুঝে ক্যামেরাবন্দী করা হবে সেই দৃশ্য । এমনই পরিকল্পনা হল । কিন্তু বিধি বাম , প্রায় পৌনে এক ঘন্টার কাছাকাছি ঝোপের আড়ালে অপেক্ষা করেও বাঘ তো দূরের কথা অন্য কোনো বন্য জীবই চোখে পড়লনা । শীতের সময়ে জঙ্গলে ঘুম ভাঙে দেরিতে , তাই বাঘ বাবাজী কিংবা অন্য কেউই আলসেমি ভেঙে জল খেতে এসে আমাদের সামনে ক্যামেরায় পোজ দেওয়ার চেষ্টাও করলনা । তবে সেই পৌনে এক ঘন্টা সময় আমার কিন্তু বেশ কাটলো । প্রতিমুহূর্তের টান টান উত্তেজনা , একদম নিস্তব্ধ কুয়াশা ঘেরা শান্ত বনের রহস্যময়তা , যেকোনো মুহূর্তে ডোরাকাটা দাগ দেখতে পাওয়ার এক অদম্য হাতছানি , একটানা চলা পাখির কলতানের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসা বার্কিং ডিয়ারের ডাক সবমিলিয়ে দারুন রোমাঞ্চকর মুহূর্ত । সেইসব মুহূর্তগুলি ভোলা যাবেনা কোনোদিনই । আর যেটা একদম কথা না বলে এই নিস্তব্ধ আরণ্যক পরিবেশে হয় সেটা হলো contemplation । আমার প্রিয় লেখক বুদ্ধদেব গুহ তাঁর অনেক লেখায় এই contemplation নিয়ে বলেছেন । শুধু নানারকম ভাবনাচিন্তা খেলা করে ওই contemplation এর সময়ে । আমারও তাই হচ্ছিলো । মাঝে মাঝেই গাছের পাতা থেকে শিশির , জল হয়ে খসে পড়ছিল । সেই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবনার জাল মাঝে মাঝেই ছিঁড়ে যাচ্ছিল যখন বার্কিং ডিয়ারের ডাক আসছিল ভেসে। তখন চোখ কান সব সজাগ , যদি কিছু দেখা যায় । কিন্তু সব ভালো মুহূর্তই একসময় পেরিয়ে যায় , শেষ হয়ে আসে । আমরা আবার জীপে স্টার্ট দিয়ে ঢুকে গেলাম জঙ্গলের আরো গভীরে ।
এদিক ওদিক জীপে স্কাউটিং করতে করতে এগোচ্ছিলাম ।
"স্যার , ওই শুনুন গাছের ডাল ভাঙার আওয়াজ"। ফিসফিস করে বলে ইরফান । একটু আগেই গাড়ীর স্টার্টটা বন্ধ করে দিয়েছে । একটা সরু কাঁচা রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে । বাঁ দিকে অগভীর খাদ আর নীচে নদী । এতক্ষনে জঙ্গলও ঘুম ভেঙে পুরোপুরি জেগে উঠেছে । প্রচুর পাখির ডাকে চারিদিক মুখরিত । ইরফানের হাতের ইশারায় বাঁ দিকে ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে দেখি খানিকটা উপরে পাহাড় জঙ্গলের আড়ালে বেশ কয়েকটা হাতি । তার মানে হাতির দল কাছাকাছিই আছে । সামনে রাস্তার উপরেও বেশ কিছু হাতির বিষ্ঠা পরে থাকতে দেখলাম । তার মানে ওদের ডেরায় চলে এসেছি । করবেটের এই অংশ মানে সোনানদী ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি হলো মূল করবেট ন্যাশনাল পার্ক ও রাজাজি ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে হাতীদের যাতায়াতের করিডোর । এরা হল এশিয়াটিক হাতি , বৈজ্ঞানিক নাম Elephus maximus । বাঁশ পাতা , ডাল এরা খেতে সব চেয়ে ভালোবাসে । ভালো করে নজর করে দেখি পুরো বাঁশের ঝাড় চারিদিকে । পুরো হাতির দলটাই বোধহয় ব্রেকফাস্ট সারছে । আমরা আর বেশি এগোনোর সাহস দেখলাম না । বুনো হাতির দল যদি গাড়ির সামনে পড়ে যায় তাহলে কেলেঙ্কারি । বিশেষ করে দলে যদি শিশু হাতি থাকে । হলদুপারাও থেকে অনেকদূর এগিয়ে এসেছিলাম । চটপট জীপ ঘুরিয়ে আবার ফিরতি পথে বাংলোর দিকে রওয়ানা দিলাম । প্রায় দশ টা'র আশেপাশে ফিরে এলাম হলদুপারাওয়ে ।
এতক্ষন জঙ্গল স্কাউটিং করে সর্বোপরি প্রচুর উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত কাটিয়ে খিদেও পেয়েছিল খুব । পুরি সবজি ডিমের ওমলেট সহযোগে ব্রেকফাস্ট শেষ করে সারাদিনটা বাংলো চত্বরেই কাটিয়ে দিলাম । হলদুপারাও বাংলো চত্বরটা ভারী সুন্দর । এত নিরিবিলি পরিবেশ আর এত গভীর বনের ভিতরে অবস্থিত যে মনে হয় যে অন্য জগতে আছি । তার উপরে যোগাযোগ ব্যাবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার দরুন আদিমতাটা একটা অন্য মাত্রা পায় । মাঝে মাঝে বিএসএনএল এর সিগন্যাল শুধু কিছু সময়ের জন্য আসে । সামনের ওয়াচটাওয়ারটা ভারী সুন্দর । নিচু কিছুটা । চেয়ার পেতে বসার ব্যবস্থা আছে যাতে দূরে নদীর ওপারে জঙ্গলের দিকে নজর রাখা যায় । বেশ কিছুক্ষন সময় সেখানে কাটালাম । আজ আর ইভনিং সাফারিতে বেরোলাম না । সারাদিনটা হলদুপারাও বাংলো চত্বরে কাটিয়ে বেশ বিশ্রাম হল শরীর আর মনের ।
পরের দিন সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে হলদুপারাও কে বিদায় জানিয়ে চললাম করবেট ন্যাশানাল পার্কের “ঝিরনা” বনবাংলোর র উদেশ্যে । পেছনে পরে রইল হলদুপারাও আর সোনানদী অরণ্য তার আদিমতা আর রহস্যময়তা নিয়ে ।
( লেখাটি 'করবেটের গহীনে পাঁচ রাত্রি' নামে ভ্রমণকাহিনীর অংশ যা দেশ বিদেশের জল জঙ্গলে বইটিতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশক: জয়ঢাক প্রকাশন )
ছবি: লেখক
লেখক পরচিতি: লেখক পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। অরণ্যপ্রেমী। বুদ্ধদেব গুহ'র পরম অনুরাগী। তাই অরণ্য নিয়ে লেখালেখি তার নেশায়।








Comments