top of page
KANHA MAY 26.jpg

উত্তর রামচরিত

  • ..
  • May 13
  • 7 min read

বনবিভাগের কর্তার হাতে যদি সাহিত্যগুণ থাকে তবে উঠে আসে অরণ্যের বিবিধ কাহিনী সরস ভঙ্গিতে। তেমনই আজকের এই রচনা নীল মজুমদারের কলমে।



মহারাজ শিবাজির রাজত্বকাল দেখবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। উনি লোকান্তরিত হওয়ার কয়েক বছর পর, মহারাষ্ট্রে গড়চিরোলি জেলার এক গভীর অরণ্যে আমার জন্ম হয়েছিল, ১৬৮৩ সালের জুন মাসে। আমরা ছিলাম, আহেরি রাজার সম্পত্তি।

অখ্যাত এই জায়গাটির নাম, আলাপল্লি। যেদিকে চোখ যায় থমথমে নির্জন বন। কোথাও মানুষের বসতি নেই। সূর্য্যের আলো খর হয়ে ওঠার অনেক আগেই পাখিদের শিস দেওয়া আর গান শুরু হয়ে যায় এখানে। পুরোনো ডালে পাতায় মাকড়সারা মরণ ফাঁদ সাজিয়ে রাখে। গরমে দীর্ঘায়ত অপরাহ্নে  ভনভন করে ওড়া মাছি কিংবা অন্য পোকামাকড় কিসের লোভে জানিনা সটান দেখেছি সেইখানে গিয়ে সেঁধিয়ে যায়, আর বের হয়না। মহুয়ার গন্ধের টানে সন্ধের দিকে নিঃসঙ্গ ভালুক ঘুরঘুর করে, মাঝেমাঝে পিঠ ঘষে নেয় গাছে। বর্ষায় চারিদিক আচ্ছন্ন করে বৃষ্টি নামে। প্রকৃতির নিয়মে আমাদের শতসহস্র সন্তান সন্ততিরা জন্ম নেয়। আবার হয়তো একদিন দমকা হাওয়ায় পাখির বাসা নিচে পড়ে যায়। ডিম ভাঙ্গে, জন্মদ্রব গড়িয়ে যায় ঘাসে। আমারই কোনো শূন্য ডালে হয়তো দেখি, মা পাখি গোমড়া মুখে বসে আছে।

আমার ভাই সম্ভবতঃ আমার থেকে বছর দুয়েকের ছোট। সম্ভবতঃ বলছি কারণ এটা আমার অনুমান। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখছি, আমার থেকে হাত খানেক ছোট ও দাঁড়িয়ে আছে আমার পাশে। আমার উচ্চতা আর ঋজু শরীর দেখে বন বিভাগের লোকরা যখন আমার নাম দিলেন রাম, স্বাভাবিক ভাবেই আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার ভাইয়ের নাম দেওয়া হল, লক্ষণ।

শিবাজি মহারাজের রাজত্ব না দেখলেও তাঁর সিলমোহর লাগানো সেই বিখ্যাত ‘আজ্ঞাপত্রের’ কথা খুব শুনতাম আমাদের ছোটবেলায়। অরণ্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রয়োজনীয়তার কথা হৃদয়ঙ্গম করে, সেই দূরদর্শী মানুষটি বন সংরক্ষণের আদেশ জারী করেছিলেন। কিন্তু আমাদের এই জায়গাটি তো তখনও তাঁর রাজত্বের এক্তিয়ারে আসেনি। তাই ভয় ছিল, কে জানে কবে, কখন কুড়ুল এসে পড়ে আমাদের গায়ে।

সেই কবে, দক্ষিণ থেকে আসা গোন্ড ও মাড়িয়া উপজাতির লোকরা তখন এই অঞ্চলে জঙ্গলের একটা অংশ কেটে সাফ করে জ্বালিয়ে দিত। তারপর সে খোলা জায়গায় ছাই ভস্মের ওপর ছড়িয়ে দিত ফসলের বীজ। দু’তিন বছর কম খরচায় চলতো চাষবাস। তারপর তারা চলে যেত জঙ্গলের অন্য অংশে এবং সেখানেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হত। স্থানীয় ভাষায় এটাকে বলা হত ‘পোডু’ চাষ। তবে আমরা হয়তো বেঁচে গিয়েছিলাম, আহেরি রাজাদের সম্পত্তি হওয়ার সুবাদে।

আঠেরো শতকের গোড়ার দিকেই মারাঠা শক্তির প্রবল পরাক্রমের কাছে নতি স্বীকার করে গোন্ডরা ক্রমশঃ নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছিলেন গভীরতর অরণ্যে, পাহাড় পর্বতের দুর্গম খাঁজে এবং উপত্যকায়। ১৭১৮ সালেই দিল্লী অবধি ধাবিত হয়েছিল মারাঠা শক্তি। ১৭২৭ এ হায়দ্রাবাদের নিজামকে অবলীলাক্রমে পরাজিত করেছিল। চন্দ্রপুর, বস্তর, এমন কি উড়িষ্যার বেশ কিছু অঞ্চলও তাঁদের অধিকারবুক্ত করেছিলেন ভোঁসলে রাজারা।

এদিকে সাহেবদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেশের বিভিন্ন জায়গায় সিঁদ কাটতে শুরু করেছিল ১৬০০ সাল থেকেই। তবে বানিজ্যের আড়ালে তাদের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য যে আসলে কি সেটা বোঝা গেল ১৭৫৭ তে। সুদূর বাংলায় পলাশির মাঠে নবাব পরাজিত হওয়ার পর যেন স্বদেশী প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ার ধারাপ্রবাহ শুরু হয়ে গেল। ১৭৬১ তে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠারা পরাজিত হলেন। ১৭৬৪ তে বক্সারের যুদ্ধেও কোম্পানির পরাক্রমের কাছে ধরাশায়ী হল স্থানীয় রাজাদের সম্মিলিত শক্তি।

কোম্পানির সেই উর্দ্ধশ্বাস রাজ্য বিস্তারের কাল সারা ভারতের অরণ্যের জন্যে ছিল এক গভীর দুঃসময়।  রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে অরণ্য সংহারের ঘনিষ্ঠ সম্মন্ধ আছে বলেই শুধু নয়, কোম্পানির অনেক রকম পণ্যের তালিকায় ভারতের বিখ্যাত সেগুন কাঠ ছিল অন্যতম। মহার্ঘ্য এই গাছ বিক্রী করে সেই সময় তাঁরা প্রভুত অর্থ উপার্জন করেছিলেন। জঙ্গলে জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়েছিল বিশিষ্ট এক জীবিকার মানুষ, তাদের বলা হত ‘ঠিকাদার’। ছত্রিশ ইঞ্চি এবং তার থেকে বেশি ঘেরের দীর্ঘতনু সব সেগুন গাছ করাতের ঘষায় কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আছড়ে পড়ত মাটিতে। আহেরির রাজারাও জঙ্গলের কয়েকটি অংশ বিক্রী করে দিয়েছিলেন ঠিকাদারের কাছে। তবু যে আমরা বেঁচে গেলাম, তাতে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় !

বৃটিশ শক্তি ক্রমেই ফুলে ফেঁপে উঠছিল। এই শক্তির মূল কথাই ছিল জলের ওপর আধিপত্য। এই আধিপত্য বজায় রাখার জন্যে তাঁদের প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী জলযানের। ইউরোপে জাহাজ তৈরির জন্যে ওই সময় যে ‘ওক’ কাঠের ব্যাবহার হত, তার অভাব দেখা দিয়েছিল বেশ কয়েক বছর ধরে। ১৮০৫ সালের কাছাকাছি এই অভাব এতটাই তীব্র হয়ে উঠল যে ‘কোর্ট অফ ডাইরেক্টরস’ এর একটি সভায় বলা হল, ওক কাঠের সমরূপ বা আরও উন্নত কোনো কাঠের সরবরাহ না হলে, জাহাজ তৈরি লাটে উঠবে।  

অতঃপর সেই অভাব পূরণের কথা মাথায় রেখে ‘বন সংরক্ষক’ হয়ে ভারতের মাটিতে পা রাখলেন ওয়াটসন নামের একজন ‘পুলিশ অফিসার’। এর ফলাফল দেখা গেল অচিরেই। ওয়াটসন কাজ শুরু করেছিলেন দক্ষিণ থেকে। দক্ষিণের দীর্ঘায়ু সব সেগুন গাছ প্রথমে ধরাশায়ী ও পরে বন্দর থেকে জাহাজ বাহিত হয়ে দেশের বাইরে চলে যেতে লাগলো রাতারাতি। মালাবারের শ্রেষ্ঠ অরণ্য বদলে যেতে লাগলো মহাশ্মশানে। আমাদের জন্যে এইটাই ছিল তখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, আজ যদি মালাবারে হয়, কাল তাহলে আলাপল্লিতে হবেনা কেন ? বাধা দেবে কে ? ১৮১৮’র ‘এ্যাংলো মারাঠা’ যুদ্ধে তখন সমস্ত স্বদেশী প্রতিরোধ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

অবশ্য পুরোনো কথা বলতে গিয়ে আজ মনে হচ্ছে, ইতিহাস শুধু দুর্ঘটনার সংগ্রহশালা নয়, ইতিবাচক উজ্জল চলচিত্রের প্রদর্শনীও বটে। এতোদিন মানুষ বয়েস নির্বিশেষ শুধু সেগুন গাছ কাটার কথাই জানত। সেই গাছের বীজ মাটিতে পড়ে প্রাকৃতিক ভাবে ধীরেসুস্থে অঙ্কুরিত, প্রস্ফুটিত হত, তাতেই তৈরি হত চারা, গড়ে উঠতো ভবিষ্যতের গাছ, ভবিষ্যতের জঙ্গল। কিন্তু সেগুনের বীজ থেকে চারা তৈরির কৌশল মানুষের আয়ত্বে ছিলনা মোটেই। ১৮৪২ সালে কিন্তু একেবারেই অন্যরকম একটি ঘটনা ঘটল। কেরলের এক গন্ডগ্রাম, ‘নীলাম্বুরে’। কনোলি নামের একজন বৃটিশ অফিসার, চাতু মেনন নামের স্থানীয় একজন কর্মচারীর সাহায্যে কঠিন পরিশ্রম করে সেগুনের বীজ থেকে চারা তৈরি করে ফেললেন এবং সেই চারা খোলা জায়গায় লাগিয়ে  তৈরি করলেন ‘কৃত্তিম বন’। সেগুনের এবং অরণ্যের ইতিহাসে এক সুবর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেল।

ডালহাউসির শাসনকালে ১৮৬৪ তে ভারতীয় বনের হর্তাকর্তা হয়ে এলেন ব্র্যান্ডিস নামের এক জার্মান। ‘ইন্ডিয়ান ফরেস্ট এ্যাক্ট’ এর মাধ্যমে ১৮৬৫ সালে ভারতের যাবতীয় অরণ্য কে নিয়মের শৃঙ্খলায় বেঁধে ফেললেন তিনি। সরকারি জঙ্গল যে কি বস্তু তা প্রথম দেখল এদেশের মানুষ। নিষিদ্ধ হল সরকারি জঙ্গলে যথেচ্ছ গাছ কাটা। শুধু তাই নয়, অবারিত ‘বন্ধ্যা জমি’ সরকারি জঙ্গলের ‘আয়ত্তে’ এনে সেখানে জ্বালানি হবার উপযুক্ত গাছ লাগান হল। জঙ্গলের পাশের শুকনো ঘাস আর আগাছা কেটে কিভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ার হাত থেকে জঙ্গল বাঁচান যায়, তাও প্রথম জানল মানুষ। জন্মস্থান ছেড়ে অন্যত্র সরে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই, তাই আমাদের ঠিকানা কখনই বদলায়না। কিন্তু ঠিকানা না বদলালেও এইসময় সহসা একদিন আমাদের পরিচয় বদলে গেল। ১৮৭৩ আর ১৮৮৩ সালে দু’দফায় আহেরির রাজাদের কাছ থেকে আমাদের বাসস্থান খুব সস্তায় কিনে নিল বৃটিশ শাসন। সম্পত্তির এই হাত বদলে আমাওরাও একদিন ‘রাজার গাছ’ থেকে ‘সরকারি গাছ’  হয়ে গেলাম।

সরকারি বনে এইসময় নানা পরিবর্তন ঘটছিল ধারাবাহিক ভাবে। বনের ব্যাবস্থাপনা কেমন হওয়া উচিত তার যোজনা তৈরি হল ফ্রান্স ও জার্মানির আদর্শে। সারা দেশের সরকারি অরণ্যকে ‘দশ বছরী’ প্ল্যানের আয়ত্তে আনা হল, যাকে বলা হল ‘ওয়ার্কিং প্ল্যান’। পরাধীন ভারিতের প্রথম ‘বন নীতি’ও লেখা হয়েছিল এই সময়, ১৮৯৪ সালে। অনেকে বিশ্বাস করেন না, বৃটিশদের লেখা এই বন নীতি কিন্তু সত্যি ছিল সাধারণ, অরণ্য নির্ভর মানুষের জীবনের অনেক কাছাকাছি। গাছ লাগিয়ে যে মাটির ক্ষয় রোধ করা যায়, এই প্রয়োগ নিয়েও তখন খুব তোলপাড় হয়েছিল, দেশের নানা জায়গায়। তার কয়েক বছরের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

বিশ্বযুদ্ধের মত একটি তান্ডব যে প্রকৃতির জন্যে বেশ কিছু অভিশাপ বয়ে আনবে, এতে আশ্চর্য্য হওয়ার কিছুই নেই। প্রথম এবং তার চেয়েও বেশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, এদেশের অরণ্যে সেই সংক্রান্তিকাল প্রত্যক্ষ করেছিলাম আমরা। যুদ্ধে জোগান দেবার জন্যে তখন কাটা হয়েছিল লক্ষাধিক গাছ। আমি, লক্ষণ বা আমাদের জ্ঞাতিগোষ্ঠিরা যে এই ধ্বংসলীলা এড়িয়ে যেতে পেরেছিলাম, তা সম্ভবতঃ মধ্যভারতের অতি দুর্গম, যাতায়াত ব্যাবস্থাহীন, অজ্ঞান, অন্ধকার এক অরণ্যের অধিবাসী হওয়ার জন্যেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কাঠের বিভিন্ন প্রয়োগ নিয়ে গবেষণার ফল দেখা গেল এদেশেও। স্থাপিত হল প্লাইউড ও পাল্পউডের কারখানা। ১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা লুপ্ত হওয়ার সময় আর একটি মজার ব্যাপার হল। অনেক ‘নিজস্ব’ বা প্রাইভেট জঙ্গল, যা কিনা তখনও বড়বড় জমিদারদের দখলে ছিল চলে এলো সরকারি খাতায়। যদিও সরকার কে দেবার আগে বেশ কিছু ‘বুদ্ধিমান’ জমিদার সেই সব জঙ্গলের গাছগুলি কেটে নিয়েছিলেন।

শিক্ষানবীস তরুণ অফিসাররা এই অঞ্চলে এলে, তাদের এই আলাপল্লিতে নিয়ে আসা এবং আমাকে ও লক্ষণ কে দেখিয়ে নানা রকম আলোচনা, এসব ছিল অবধারিত। সেইসময়, যে সব অভিজ্ঞ আধিকারিকরা তরুণদের নিয়ে আসতেন, এইখানে আমার ছায়ার দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতেন তাঁদের একজন বড় অদ্ভুত একটা কথা বলেছিলেন একবার। কথাটি আজও বুকে বিঁধে আছে। তিনি বলেছিলেন,  ‘মানুষের সভ্যতার ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে অরণ্য হননেরই ইতিহাস। নতুন কল কারখানা, শিল্পোদ্যোগের বেড়ে ওঠা, শহরের নিত্য ছড়িয়ে পড়া, ক্রমশঃ বেড়ে ওঠা জনসংখ্যার জন্যে জায়গা নিয়ে টানাটানি, খাদ্যের জন্যে চাষ জমির নিরন্তর অভাব, জ্বালানি কাঠের অভাব, এই সমস্ত প্রক্রিয়াগুলির চাপ জঙ্গলের ওপর এসে পড়ে। তাছাড়াও আছে মানুষের লোভ লালসা’। বয়েস বাড়ার সাথে সাথে, এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও যত দেখতাম, যত শুনতাম, সেই কথাটি নতুন করে মনে পড়ে যেত।



আলাপল্লির সেগুন মাত্রেই মহীরুহ। তবু স্বীকার করতে কুন্ঠা নেই, কোনো অজ্ঞাত কারণে আমি এবং লক্ষণ যেন একটু বেশি প্রিয় ছিলাম সকলের। ‘এই গাছ দুটি কখনই কাটা হবেনা’ বন বিভাগের কর্মচারীদের এরকম কথা আলোচনা করতে আমি শুনেছি অনেকবার। ওই সময় বছরে একবার আমাদের উচ্চতা ও মানুষের বুকের উচ্চতার কাছে বেড় মাপা হত। বল্মীক আমাদের শরীর স্পর্শ করতে পারেনা। তবু তবু ধারে কাছে কোথাও মাটির ঢিপি দেখতে পেলে তা ভেঙ্গে দিতেন ফরেস্ট গার্ডরা। লতা পলাশ আমাদের পায়ের কাছে প্যাঁচ দিয়ে উঠবার চেষ্টা করলে কেটে সাফ সুতরো করে দিতেন নিজের হাতে। শেষবার এসব করা হয়েছিল  ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাসে। তখন আমার উচ্চতা ছিল আটত্রিশ মিটার আর বেড় সাড়ে তিন মিটারের একটু বেশি।

পরের বছর এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে একদিন চরাচর আঁধার করে কালবৈশাখী ঝড় উঠেছিল। সমুদ্রের মত গর্জন করে আছড়ে পড়ছিল হাওয়া। অযুত হাতির শক্তি নিয়ে ডালপালা ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল, সমূলে নাড়িয়ে দিচ্ছিল বারবার। ২৭৫ বছরের পাদপ জীবন মুক্ত হয়ে সেইদিন আমি ধরাশায়ী হলাম। অপরাজিত লক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল সেইখানেই।

অসংখ্য অন্য গাছের শরীর পিষ্ট করে পড়ে থাকা আমার আট ঘনমিটারের সেই প্রকান্ড অবয়ব জঙ্গল থেকে অবিকৃত ভাবে বার করা সম্ভব হয়নি। ডালপালা ছাঁটার পরেও প্রচন্ড পরিশ্রমে আমাকে সাত টুকরো করে কাটতে হয়েছিল। বনবিভাগের একটি ট্রাক, দুটি হাতি ও পঁচিশ জন শ্রমিকের সাহায্যে অতঃপর আমার ১২৫ কিলোমিটারের শেষ যাত্রা শুরু হয়েছিল আলাপল্লি থেকে।

অরণ্যের যে কোনো গাছের এই যাত্রা যেখানে গিয়ে শেষ হয়, ভেবেছিলাম আমিও সেখানেই যাচ্ছি। ১৮ দিন পর দেশের সবচেয়ে বড় কাষ্ঠ আগার বল্লারশাহ’র বিখ্যাত নীলাম্ ভুমিতে পৌঁছে দেখি সেখানে আমার জন্যে অভূতপূর্ব একটি চমক অপেক্ষা করে আছে। ইঁট সিমেন্ট দিয়ে একটি বিরাট বড় আয়তাকার বেদি সেখানে তৈরি করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। বেদির ওপর সুন্দর রং করা টিনের ছাত। বেদির পাশে বড় একটি বোর্ড টাঙ্গিয়ে তার ওপর আমার এই যৎকিঞ্চিত জীবনের ইতিবৃত্ত লেখা। আমার শরীরের ১৫ মিটার দীর্ঘ একটি অংশ এই বেদির ওপর যত্ন করে শায়িত করা হল, চালার বাইরে টাঙ্গানো হল সাইন বোর্ড।

জন্মলগ্নের অমোঘ বিশ্বস্ততা মানুষকে অরণ্য নির্ভর করেছে। শুনতে পাই এদেশে সভ্যতার সূত্রপাতও হয়েছিল অরণ্যেই। একদা অরণ্যোপনিষদ লেখা হয়েছিল এই দেশেই। আবার এই দেশের পূরাণেই খান্ডব-বন দহনের উল্লেখ পাওয়া যায়। মানুষ নির্বিচারে গাছ কেটেছে, জ্বালিয়েছে, চুরি করেছে, নষ্ট করেছে, পদদলিত করেছে এবং করছে সততই। সেই মানুষই আবার গাছ ও অরণ্য নিয়ে রচনা করেছে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিজ্ঞান, কালজয়ী অমর কিছু সাহিত্যসম্ভার। চরিত্রের এই অদ্ভুত বিসম্বাদ সম্ভবতঃ শুধু মানুষকেই মানায়। একটি সেগুন গাছকে যে সন্মান দেওয়া হয়েছে এখানে তার জন্যে শুধু আমার নয়, মানুষের কাছে সম্পূর্ণ বৃক্ষ প্রজাতির কৃতজ্ঞ থাকার কথা। তবু জানতে ইচ্ছা করে, কী হবে আগামী দিনে? কী হবে ভবিষ্যতে? এই পৃথিবীর তাবৎ গাছপালা এবং অরণ্যের জন্যে করজোড়ে প্রার্থনা করতে ইচ্ছা করে, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’।

 

(পুনশ্চঃ রামায়ণের লক্ষণ কে দেহ বিসর্জন করতে হয়েছিল রামের আগেই। আলাপল্লির লক্ষণ কিন্তু পেয়েছিল রামের চেয়ে দীর্ঘতর জীবন। তবে, জীবিত অবস্থায় এদের কাউকেই দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। গাছেরা কথা বলেনা, অন্ততঃ মানুষের ভাষায় তো নয়ই। তাই মহারাষ্ট্রের বল্লারশাহ কাষ্ঠ আগারে সসন্মানে রক্ষিত ‘রাম’ নামের সেই বিখ্যাত সেগুন গাছটির আত্মকথা এই অধমকেই লিখতে হল আরকি !)

লেখক পরিচিতি: লেখক অবসরপ্রাপ্ত আই এফ এস আধিকারিক এবং ঔপন্যাসিক।



পাঠকদের মতামত জানাবার জন্য রয়েছে কমেন্ট বক্স এই পাতার নীচে। রচনাটি সম্বন্ধে আপনার মতামত জানাতে পারেন সেখানে।

1 Comment


Samudra Mitra
19 hours ago

অসাধারণ লাগল দারূরুপী রামের আত্মজিবনী । অনেক তথ্যসমৃদ্ধ "রামচরিত" সত্যিই অনবদ্য।

আমার খুবই ভালো লাগল।

-নমস্কার

Like
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG

Editor: Dr. Sumanta Bhattacharya
 

  • Facebook

follow our facebook page to stay updated

© 2021 by Boney Pahare. All rights reserved.

bottom of page