top of page
  • ..

প্রথম শিমুল ফুল

বসন্তের গল্প বনেপাহাড়ের পাতায়। অবশ্যই বন-জঙ্গল, পাহাড়ের পটভূমিতে। অপূর্ব কুমার রায়ের কলমে।





কাল রাতটা ভাল ঘুম হয়নি একটা নাইটজার পাখির ডাকে। সারারাত পিছনের জঙ্গলটায় ডেকে গেছে পাখিটা। ফলত: বিছানায় এপাশ আর ওপাশ করে গেছে প্রশান্ত।শেষ রাতের দিকে চোখটা একটু লেগে আসে।ঘুম ভাঙ্গল লছমনের ছোট মেয়ে কমলির ডাকে।হাতে চা’য়ের গ্লাস নিয়ে দরজার বাইরে থেকে ডাকছে। বেশ বেলা হয়ে গেছে।এ:! আজ এখানে প্রশান্তর শেষ দিন এবারের মত। সন্ধের ট্রেন ধরে আবার ফেরা নিজের খাঁচায়। নিজের শহরে। আজ সারাদিন জঙ্গল পাহাড়ের পথে পথে ঘুরে বুকের সিলিন্ডারটা অক্সিজেনে যতটা সম্ভব ভরে নেবার কথা ছিল।হতচ্ছাড়া পাখিটার ওপর রাগ হল। অবশ্য ওদের আর দোষ কী! বসন্ত এসে গেছে প্রায়। মধুঋতুর আগমন বার্তা তো ওদের কাছেই আগে পৌঁছায়।

কম্বলটা টান মেরে সরিয়ে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলল।একমুখ হাসি নিয়ে কমলি দাঁড়িয়ে। বাইরের শেষ শীতের উজ্জ্বল সকালটার মতই। চায়ের গেলাসটা ওর হাতে ধরিয়েই দে ছুট। দেখতে দেখতে লছমনের এই মেয়েটারও সমত্থ বয়স হয়ে গেল। বড় মেয়ে বিমলিটার বিয়ে দিতে গিয়ে যা আতান্তরে পড়েছিল। ধারকর্জ করে শেষে একমাত্র সম্বল এই ভিটেমাটিটাই চলে যেতে বসেছিল। প্রশান্ত সেদিন সময় মত এসে না দাঁড়ালে আজ কোথায় থাকত এই জমি, বাড়ি আর কমলির মুখের হাসি!

চা টা শেষ করে গুটি গুটি রোদ আর ছায়া মাখতে মাখতে লছমনের বাড়ির দিকে এগোল প্রশান্ত। দক্ষিণ কলকাতার এক স্বল্পখ্যাত চেস্ট মেডিসিন চিকিৎসক প্রশান্ত সিনহা। লছমনদের সাথে, এই বানারার জঙ্গলের সাথে ওর তো আজকের পরিচয় নয়। বত্রিশ বছরের আলাপ। মনে আছে স্পেশালাইজেশানের পর যেদিন স্টিল কোম্পানির কারখানার হসপিটালে যোগ দিতে ওড়িশার এই বন-পাহাড়ের রাজত্বে প্রথম পা দিয়েছিল- তখনই একটা জাদু ভর করে গেছিল ওর ওপর।তা ছেড়ে যেন আজও বার হতে পারেনি।দীর্ঘ এতগুলো বছরের এত আঘাত, বিচ্ছেদ, শহরের বিষ হাওয়াতেও প্রথম দিনগুলোর সেই আবেশ আজও জড়িয়ে আছে ওকে।

প্রশান্তকে দেখে সবিতা এগিয়ে এল। লছমনের বউ। মাথায় দেহাতি মেটিয়া সিঁদুর।পরনে হলদে একটা ময়লা শাড়ি। আগেরবার যখন এসেছিল এই শাড়িটা নিয়ে এসেছিল প্রশান্ত ওর জন্য।“সাবজি, নাস্তা বানিয়ে কখন থেকে বসে....দাঁড়ান গরম করে দি”। ওদের আন্তরিকতা সময়ের সাথে বদলায়নি।সেই ৮০র দশক থেকে ওদের চেনে প্রশান্ত।স্টীল কোম্পানির গাড়ির ঠিকে ড্রাইভার ছিল লছমন। কোয়ার্টার থেকে ওকে দিয়ে আসা, নিয়ে আসার বাইরে ওকে এই বন-পাহাড়ের দেশের সাথে নিবিড় আলাপ করিয়েছিল ও। তখন টাউনশিপের ঘুপচি ঘরেই থাকত লছমন। কিন্তু মানুষটার মধ্যে বেঁচেছিল যে বানারার সবুজ জঙ্গল, আবদাবুরুর বিরাট পাহাড়- সেই পৃথিবীটা চুম্বকের মত টেনেছিল প্রশান্তকে। বর্ষার দুপুরে বা শীতের সকালে লছমনের কমান্ডার জীপে সওয়ার হয়ে দক্ষিণ কলকাতার শহুরে বাবু বুনোপথে পথে ধুলো মেখে যেন এদেশেরই হয়ে গেছিল।ভেবেছিল এ জীবনের পরম আশ্রয় পেয়ে গেল।তারপর জীবনে এল বনানী। শুধু নামটা শুনেই যেন বিয়েতে রাজি হয়ে গেছিল মা’র ফোনে।শহুরে রোমান্টিকতায় বেড়ে ওঠা যুবতীও প্রশান্তের মুখে দূরের কোন আধো-অন্ধকার রহস্যে মোড়া দেশের গল্প শুনে নতুন জীবনের বন্য স্বপ্নে মতে উঠেছিল।ঢাকুরিয়া লেকের ধারেই যেন হয়ে গেছিল আবদাবুরুর পাহাড়কে স্মরণে রেখে বাগদান।এখনও সেই দিনগুলো বনের মধুর মত লেগে আছে যেন প্রশান্তর ঠোঁটে।

প্রথম দেড়টা বছর বনানী বেশ কাটিয়েছিল ওড়িশার আধাগ্রাম্য শিল্প শহরে। লছমনের জীপটা ধার করে ছুটির দুপুরে, সন্ধ্যায় দলছুট টিয়ার মত ঘুরে বেড়াত ওরা বন-পাহাড়ের পথে পথে।এমনকি দু:সাহসে ভর করে কিছু রাতও কেটেছে বন-ফায়ারের আগুনে নদীর পাড়ে। কিন্তু মোহ আর জীবনবোধ হয়ত কখনই এক সুতোয় বাঁধা থাকে না। যে জীবনটা প্রশান্তর কাছে ছিল কুড়িয়ে পাওয়া এক খণ্ড হীরের টুকরো, তাই ধরা দিল বনানীর কাছে কাঁচের চুরি হয়ে। বান্ধবীদের নতুন ফ্ল্যাটের দর্শন যখন পাওয়া গেল বালিগঞ্জে বা মামাতো দিদি মিলি যখন ডাকে ছবি পাঠাল বিদেশ ভ্রমণের, চিরকাল গড়িয়াহাট আর প্রিয়া সিনেমার ইভনিং শোয়ে মোড়া পুরানো জীবনটা যেন জেগে উঠল ওর মধ্যে। “কী আছে তোমার এই কম মাইনের চাকরিতে? ক’টা দেহাতি মজুর আর কেরানি-‘ডাক্তার সাব’ বলে সেলাম ঠুকবে এই আশায় পড়ে আছ এই ক’টা মাইনের চাকরিতে। নাকি বনের ছায়ায় আদিবাসী মেয়েদের শরীরের মোহে এই রামের বনবাস? তোমার বন্ধু অপ্রতিমকে দেখ! তোমার সাথে পাশ করে উডল্যান্ডস হসপিটালের চকচকে কনসালটেন্ট! আরতুমি? গ্রামের কুলি মজুরের ভগবান? আর গাছ-নদী-পাহাড় দেখে মুগ্ধ হয়ে যাওয়া কবি? এই জীবন দিতেই কি আমায় বিয়ে করেছিলে?”

“কী বলছ তুমি বনী! এই জীবনের কথা কি আমি তোমায় বলিনি বাগদানের আগে? কোন ধোঁকা দিয়ে কি তোমায় নিয়ে এসেছি এই দেশে? তুমি তো আমায় জেনে, চিনেই আমার সাথে এসেছ। আমার জীবনের কোন কিছুই কি গোপন তোমার কাছে? এই উন্মুক্ত আকাশ, এই দূর থেকে দূরে চলে যাওয়া ধূসর পাহাড়ের ঢেউ- এরা তো টিবি, এ এফ বি, রিফ্যাম্পিসিন, ক্রফটনের টেক্সট বইয়ের মতই আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ডাক্তার হয়েছি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা অর্জনের জন্য। নিছক ক্ষুন্নিবৃত্তি আর কাঁচের ঝাড় লন্ঠেন মোড়া নকল জীবনের থেকে এই কাঁচপোকার জীবন আমার কাছে অনেক বেশি অর্জন করা। আমার শিক্ষা আর অধ্যবসায়ের ফসল”।

“তাহলে থাকো তুমি তোমার এই কাঁচপোকার জীবনে। আমায় ট্রেনের টিকিট কেটে দাও। তোমার গৃহিণী হয়ে এই ছোট কোয়ার্টার আলো করে আর বসেথাকতে পারব না।আমারও জীবনে অনেক কিছু করার আছে। এখানে দমবন্ধ হয়ে আসছে আমার। আমি চলি কলকাতা। তুমি ভেবে দেখ আমার কাছে ফিরবে না জংলী হয়েই থেকে যাবে”!

পরের দু’টো মাস যেন ঝড় বয়ে গেল প্রশান্তের মনের ওপর দিয়ে। বনানী চলে গেছে কলকাতায়।চিঠি পাঠালে উত্তর আসে সংক্ষিপ্ত, কখনও তাও না। ট্রাংকল করলে ফোন ধরে না বাড়িতে। জীবনের মোড়ে যেন এসে দাঁড়িয়েছে প্রশান্ত সিনহা। কী করা উচিত, না উচিত সে নিয়ে কার সাথেই বা পরামর্শ করে সেই পাহাড়-বনের দেশে।হ্যাঁ। প্রকৃতিকে মনের কথা, যন্ত্রণা বলত প্রশান্ত। মনে হত গাছেরা, নদীর জল, দূরের পাহাড় ওর কথা মন দিয়ে শুনছে। কিন্তুওরাও কিছু বলতে পারত না যে কী করাউচিত। শুধু মনে হত প্রশান্তর, ওরা এটুকু বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, সে চলে গেলে ওরাও যে খুব কষ্ট পাবে। কেইবা আর সাইকেল থেকে নেমে জঙ্গলের ধারের ঝিলের পাড়ে বসে জলে ঘন হয়েআসা বনের ছায়াকে নতুন লেখা কবিতা পড়ে শোনাবে, লাল ধুলোর পথে যেতে যেতে গুনগুন সুরে গান শোনাবে বিকেলের পাখিদের! মা’র চিঠি আসে। শহরে বসে একা একা উদ্বিগ্ন হন ছেলের কথা ভেবে। মা মুষড়ে পড়েছেন ছেলের এই সাংসারিক বিপর্যয়ে। একমাত্র বাবা-হারা ছেলে তার।

ফিরতেই হয় প্রশান্তকে। তিন বছরের যে বিনি সুতোর মালায় গাঁথা জীবন গড়ে উঠেছিল প্রকৃতির কোলে, আদিবাসী গ্রামের পথে, স্টীল ফ্যাক্টরির কর্মীদের সকাল বিকেল ‘ডাক্তারসাব’ বলে দিলখোলা হাসির স্পর্শে- তা ছেড়ে ফিরতেই হল মহানগরীর রাজপথে। একটা ঘোরের থেকে শক্ত, রুক্ষমাটিতে পড়লে যে আঘাত লাগে, নাকে ভেসে আসে পোড়া একটা গন্ধ- তা এখন প্রশান্তর সর্বাঙ্গে। নতুন কাজ খুঁজে রোজকার এক সাদা-কালো জীবন।কেমন যেন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে ও। পসারতো বাড়ছে, বেড়েই থাকে আস্তে আস্তে। কিন্তু জীবনীশক্তি যেন গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে রোজনামচায়। বনানীর সাথে আজকাল আর ভাল করে কথা হয় না। রাতটা এক ছাদের তলায় কাটে বটে।কখনও শরীর পেতে চায় অন্য শরীরকে অবকাশ পেলে।কিন্তু কোথায় চলে গেল ওদের সেই সোনালী-সবুজ দিনগুলো! এর মাঝেই তবু সন্তান এল ওদের জীবনে। যেমনটা আসে সময়ের জং ধরতে থাকা অনেক মধ্যবিত্ত জীবনেই। কেউ কেউ সেই প্রাণের স্পর্শেআবার শুরু করে পথ চলা জং ধরা সময়টাকে পাশে সরিয়ে।আবার যখন বনানীর মত কেউ কেউ সেখানে উঁচুতে লাফ দিতে হ্যাঁচকা টান দেয় তখন আবার শুরু হয় ভাঙ্গন।

“ আচ্ছা। তুমিএই ছোট নার্সিংহোম আর চেম্বার করে কতদিন আর চালাবে! এত বড় বড় হসপিটাল হচ্ছে শহরে সেগুলোয় তো চলে যেতে পার। তোমার বন্ধুদের দেখ যারা ওসব জায়গায় আছে। দু’বছর পর পর গাড়ি পাল্টাচ্ছে। বড় ফ্ল্যাট হচ্ছে। আর তুমি? সেই পৈতৃক বাড়ি, আটপৌড়ে পাড়া থেকে মারুতি চালিয়ে ডাক্তারি করতে যাচ্ছ।আচ্ছা আমারও তো একটা চাহিদা আছে। ডাক্তারের বউয়ের গালভরা নাম নিয়ে পুরানো বন্ধুদের সামনে নিজেকে আজকাল আর মেলে ধরতে পারি না। মেয়েও তো বড় হচ্ছে।বড় স্কুলে দিতে হবে। নাকি সেই বাংলা মিডিয়ামের সরকারি স্কুলের কথা তোমার মাথায় আছে? তোমার যা মতিগতি, তাতে ওই বানারার স্টীল ফ্যাক্টরির কুলি-কামিনদের মতই ভাবনা-চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেখছি”!

“ তোমার চাহিদা মেনেই তো ফিরেএলাম বনী! আবার কেন বড় কর্পোরেটের পরাধীনতার পাশে ফেলতে চাও আমাকে। ডাক্তারির পাশাপাশি নিজের জন্যও সময় চাই আমার। মন খারাপ হলে এক-দুদিনেরজন্য একটু শহর থেকে পালিয়ে যাওয়া। আমার লেখালেখি। ওদেরওখানে চাকরিতে....”

“ওদের ওখানে চাকরিতে পয়সা আছে বুঝেছ। এখন জীবনে সেটাই সব।তোমার এই আধা-কবিমার্কা রোমান্টিসিজমে নয়”।

না। রোমান্টিসিজমের ধার সত্যিই ধারেনি বনানী। প্রশান্তর সাথে থাকাটা ওর কাছে একটা শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রশান্ত যা যা দিতে পারত, তার কোন প্রত্যাশাই ও পূরণ করবে না বনানী বুঝতে পারছিল। বনের পাখিকে খাঁচায় তো এনেছে। কিন্তু পাখি আর ওর মনের মত গাইতে নারাজ।মেয়ের এক বছর হতে শ্বশুরবাড়ির চৌকাঠ ছাড়ল সে। এবার নতুন জীবন। প্রাইভেট ফার্মে নতুন চাকরি।মেয়ে থাকবে বনানীর মা’র কাছে।দরকারে আয়া রেখে দেবে। কিন্তু ওই একগুঁয়ে, ইমপ্র্যাক্টিকাল লোকটার সাথে আর না! মেয়েকে দেখতে মাঝে মধ্যেআসে প্রশান্ত। কিন্তু বনী বেশিরভাগ সময়েই সামনে আনেনা মেয়েকে। এক কাপ চা খেয়ে উঠে আসতে হয় প্রশান্তকে।আর একবার যেন শিকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণা চেস্টের ডাক্তারবাবুর বুকে। কলকাতার পথের ধুলো-ধোঁয়ার কষ্ট আর মাথায় ঘুরতে থাকা আকাশপাতাল চিন্তার আগুন। হেঁটেহেঁটেই এক একদিন বালিগঞ্জ থেকে ভবানীপুরের বাড়িতে টলতে টলতে ফেরে সেই মানুষটা, যাকে এই তো দু-তিনবছর আগেও লছমনের জীপে বা সাইকেলের পিঠে হাসি হাসিমুখে সরু পিচের রাস্তায় কি বনের পথে, হাসপাতালের চত্ত্বরে দেখা যেত।

মেয়েকে শেষ দেখল প্রশান্ত ওর দু বছরের জন্মদিনে।বনানীর দেওয়া বার্থ ডে পার্টিতে অপ্রস্তুত অতিথির মতই বসেছিল এক কোনায়। এর এক সপ্তাহ পরেই বনানী পাড়ি দিল বোম্বাই।চাকরিতে প্রোমোশান হয়ে হেড অফিসে। বেশি মাইনে। বড় ফ্ল্যাট। কলকাতার থেকেও জাঁকজমকের জীবন। প্রশান্তকে যাবার আগের দিন রাতে ফোন করে জানিয়েছিল।সঙ্গে এটাও বলেছিল, গিয়েইও খুব তাড়াতাড়ি ডিভোর্সপেপারটা পাঠিয়ে দেবে।কোন দাবি নেই।শুধু প্রশান্ত যেন ওকে মুক্তি দেয়। তাদের খোঁজ রাখার ওর কোন দরকার নেই।

“কিন্তু আমার মেয়ে...কোয়েল”!

“কেন ডক্টর সিনহা! মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য কতটা ভেবে রেখেছিলে তুমি! আজ মেয়ের খোঁজ চাইছ”

“ভবিষ্যৎ বলতে কি বোঝ তুমি! কোন জীবন তোমরা রেখে দিতে চাও আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য বনানী! মায়াহীন, পিছুটানহীন, প্রকৃতির স্পর্শহীন, শুধু কোন ভোগের জীবন....”

ফোনটা রেখে দিয়েছিল বনানী। ওই দার্শনিক কথা অনেকে শুনেছে ও। বিয়ের পর মধুমাসগুলোয় এই সব কথা বেশ লেগেছিলও অস্বীকার করবে না।কিন্তু, জীবনের রেসে পিছিয়ে দেয় এমন আগোছাল চিন্তা। জীবনটা তো দৌড় একটা মৃত্যু অবধি। ও সেই শিক্ষাই পেয়েছে ওর বেড়ে ওঠায়। ওর বিশ্বাস নিজের মতই দৃঢ় করে বড় করবে মেয়েকে। প্রশান্ত সিনহার রক্ত শরীরে বইলেও, তা যেন ওর মনে-মাথায় কোন ছাপ না ফেলে সেভাবেই বেড়ে উঠবে ও।

ডিভোর্সটা হয়ে গেছিল কয়েক মাসের মধ্যেই। প্রশান্ত আর বাধা দিতে চেষ্টা করেনি। লাভও হত না। ডুবে গেল নিজের কাজে।জীবনের ছিঁড়ে যাওয়া শিরাগুলোয় যে যন্ত্রণা, তা কাজে কাজেই ভুলে থাকা। সঙ্গে শহর ছেড়ে বেড়িয় পড়া সময় পেলেই। প্রকৃতির মাঝে, তার মধ্যে বেঁচে থাকা মানুষদের মাঝে। পায়ে পায়ে পার হয়ে যাওয়া নদী, বন, জঙ্গল, বুগিয়াল, গিরিপথ। মেয়ের খোঁজ নিতে চেষ্টা করেনি এসবের মাঝে তা নয়। কিন্তু বনানীর থেকে সাড়া পায়নি। জোর করা ওর স্বভাবে ছিলনা কোনদিন। মুঠো খুলে ভেসে যাওয়া রঙিন মাছের মতই চলে গেছে যে জীবন, তার কথা মনে তো থেকে যায়, কিন্তু তার পিছু তাড়া করার অহেতুক শক্তিক্ষয়ে ও উৎসাহ পায়নি। শুধু বছরগুলো পার করেও শেষরাতে কখনও কখনও মেয়ের সেই ছোট মুখটা ভেসে ওঠে ঘুমের মধ্যে। ধড়ফড় করে উঠে বসেছে প্রশান্ত। কোন একটা লোহার জাল যেন মেয়েকে ঘিরে ধরেছে।আর দূর থেকে ভেসে আসছে- বাবাআআআ...ডাক! ঘুম আসেনা আর। পায়ে পায়ে বাড়ির সামনের ছোট্ট বাগানটায় এসে দাড়ায়।এখানে মাটি এখনও ভিজে। গতসন্ধ্যায় হয়ে যাওয়া বৃষ্টিতে। এখনও বেঁচে সজীবতা।

লছমনদের বাড়ি থেকে বার হয়ে বনের মধ্যে দিয়ে পায়ে হাঁটা রাস্তাটায় যেতে যেতে পুরানো সব কথা মাথায় ভিড়করে আসছিল প্রশান্তর।এখানে বনানীর সাথে কাটিয়ে যাওয়া দেড়টা বছর মনে তো আসেই, তার পিছু পিছু আসে পরের দু:স্বপ্নগুলোর স্মৃতি। এই পথে গেলে হঠাৎ চকিতে চোখে পড়ে একটা শেয়াল, কী গাছের ডালে বড় কাঠবিড়ালী। গোটা অঞ্চলেই জঙ্গল কমে আসছে। আরও কারখানা, হাইওয়ে, শহর হচ্ছে।উন্নয়ন হচ্ছে বলে ওরা। দেশের মানুষগুলো সব বনানীর মতহয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ওরাই বোধহয় ঠিক। বেখাপ্পা প্রশান্ত। তবুও স্টীল প্ল্যান্টের শহর ছাড়িয়ে লছমনদের এই গাঁ-দেশের দিকটায় এখনও জঙ্গল আছে আগের মতই। জন্তু-জানোয়ার কমে গেছে অনেক বটে। কিন্তু কান পেতে শুনলে পাতারা, পথের ধুলোর ঘূর্ণি আর নদীর জলের হালকা স্রোতএখনও আগের মতই গল্প করে। গত দশ বছর ধরে সুযোগ পেলেই আবার বানারার দিকে চলে আসে প্রশান্ত।লছমন আর হসপিটালের দু-একজন স্টাফের সাথে চিঠিতে যোগাযোগ ছিলই। আস্তে আস্তে সেটা শুধু লছমনের সাথেই থেকে যায়।ভাঙ্গা ভাঙ্গা ওড়িয়াতে কিছু শব্দ সাজিয়ে অপটু অক্ষরে চিঠি পাঠাত লছমন।আর অপটু ওড়িয়াতে লিখে পাঠাত প্রশান্ত। ওই তিন-চার বছরে যেটুকু শিখেছিল। ডাক্তার মানুষ। স্হানীয় ভাষা শিখে নিতে হয়। কিন্তু ওই অপটু অস্পষ্ট লেখারা ওদের হাজার শ্রেণীগত, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ব্যবধানের মাঝেও হাত বাড়িয়ে রেখেছিল। অনেক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অফিসারই তো এল গেল ওদের কারখানায়। এমন লোক তো আর দেখল না লছমনরা। তাই পাঁচ বছর আগে লছমন যখন জানাল, ডাক্তারসাব রিটায়ারমেন্টের পর গাঁ-জঙ্গলের ধারেজমি-বাড়ি করে রয়েছি, এসে দেখে যান, আশীর্বাদ করে যান আমাদের- সেইদূর বনদেশের অমোঘ টান যেন আবার আগের মত ধরা দিল ওর কাছে। আবার পায়ে পায়ে এসে পড়ল বানারার দেশে। একটু ছুটি ছাটা পেলেই মাঝেমাঝেই লছমনের বাড়ির উঠোনের আউটহাউসটাহয়ে উঠছে ওর বনের ঠিকানা। নিজেই বানিয়ে নিয়েছে খরচ করে প্রশান্ত।সঙ্গে লছমনের ক্ষেতিবাড়ির কাজেও খরচাপাতিতে সাহায্য করা, গাঁ-দেশে এসে দুটো মানুষকে চিকিৎসা করা ঘুরে ঘুরে। আগের মত সেই ছটফটে তরুণটি নেই। তাই দেশের এ মুড়ো, ও মুড়ো ঘোরা আর শরীরে দেয় না বেশি। চুলে পাক ধরেছে। ক’বছর আগে মাও চলে গেল। এখন প্রশান্ত সত্যিই একা।ইদানিং লেখক হিসাবেও অল্প-আধটু নামডাক জুটেছে। কেউ কেউ বলছে বিভূতিবাবুর পর প্রকৃতির এই জলছবি তেমন করে কেউ আঁকেনি বাংলা অক্ষরে। যদিওএসব শুনলে এক ছুটে শহুরে সভা থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে প্রশান্তর লজ্জায়। তবু চোখটা চিক চিক করেওঠে মা’র কথা ভেবে। শেষ ক’টা বছর ওর একলা জীবনের কথা ভেবেই মা’র শরীরটা পাত হল। মা যদি এই মিষ্টি প্রশংসার দু’টো শুনে যেত... ।থেকে থেকেইএসব ভাবনা ভর করে আজ ক’টা বছর ধরে ওর মাথায়।

হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ে এসে বসল প্রশান্ত। ছোট ঝোলাব্যাগটা থেকে বার করল হুইস্কির ফ্লাস্কটা। হালকা রোদ এসে শরীরটা ওমে ভরে দিচ্ছে। একটা মাছরাঙা অনেকক্ষণ ধরে ওদিকের ছোট একটা পলাশগাছের ডালে বসে।জলের দিকে তাক করে। একটু একটু কুঁড়ি এসেছে রুক্ষগাছে। হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে গায়ের চাদরটা খুলে নিল প্রশান্ত।আজ এখানটাতেই অনেকক্ষণ কাটাবে।বড্ডপ্রিয় শিমুলগাছের নীচে এই জায়গাটা। লছমনকে বলেছে দুপুরের খাবারটা এখানেই নিয়ে আসতে। লছমনের ঘরটায় কিছু সারাইয়ের কাজ করতে টাকা দিয়ে যাবে আজ। আবার একমাস পরে ফিরবে ও। তবে এবার আর একা নয়। প্রশান্তর সঙ্গে আসবে কোয়েল।ওর বিশ বছর না-দেখা মেয়ে। নিজের ঔরসজাত সন্তান। হ্যাঁ। ওর মেয়ে। তিনমাস আগে সন্ধ্যাবেলা হসপিটাল থেকে ফিরে স্পীডপোস্টে আসা চিঠিটা পড়ার টেবিলে পায় ও। বাড়ির কাজ করা জগা রেখে গেছিল।চিঠিটা খুলতেই তলায় নামটা দেখে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রশান্ত।কোয়েল! এই কি সেই কোয়েল? জীবন আবার কোন খেলা খেলতে চায় ওর সাথে!

‘.... মাম্মা আমাকে তোমার একটা বই এনেদিল গত বছর।আমি তো আগে বাংলা বই তত পড়তাম না। পড়তে জানতাম বাংলা। কিন্তু বই গত তিনবছর ধরে পড়ছি। মাম্মাই বলেছে পড়তে। অথচ জান আগে কোনদিন মাম্মা কোন বাংলা বই পড়ার কথা আমায় বলেনি। বাংলায় যে এত splendid সব গল্প, নভেল রয়েছে আমার কোন ধারনা ছিল না বাবা’।

বাবা!! হতভাগ্য প্রশান্ত সিনহা। জীবনে যে মেয়ের মুখে বাবা ডাক শোনার সৌভাগ্য পায়নি, চিঠিতে এই সম্বোধনটাই যেন হাজার মাইল দূরের আরব সাগর থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়েছিলওর বুকে। সারারাত সেদিন আলো জ্বেলে জেগেছিল প্রশান্ত। পরের দিন, তার পরের দিন কাজে যায়নি। চেম্বার, হসপিটালে বলে দিয়েছিল শরীর ভাল নেই।

‘মাম্মা গত পাঁচ বছর ধরে ডিপ্রেশানে ভুগছে খুব।সাইকিয়াট্রির ডাক্তার আঙ্কল মাকে কাজ কমাতে বলছে কবে থেকে। কিন্তু মা তো সেসব ছেড়ে বেরোতেই পারছে না।একদিন তো মা সারারাত বাড়ি ফেরেনি। আমি আর রিষভ সকাল বেলা গাড়ি করে খুঁজতে খুঁজতে নিয়ে আসি। একটা পার্কে বসেছিল অন্ধকার কোনে। রিষভ আমার বয়ফ্রেন্ড। ওর থেকে আমি এখন ফটোগ্রাফি শিখছি। পাখির ছবি তোলা, ওয়াইল্ড লাইফেরছবি তোলা। গত বছর আমরা তাড়োবায় গেছিলাম। আমি তো আগে তত বাইরে যাইনি মা’র সাথে। কি এক্সাইটিং বাবা! আমরা বন্ধুরা মিলে মুম্বইতে রাস্তার কুকুরদের ট্রিটমেন্ট করি। মাআগে রেগে যেত।কিন্তু ডাক্তার আঙ্কল মাকেই বললেন, এসব করতে পারলে আপনিও ভাল থাকবেন। উনিই মা’কে বললেন, বাংলা বই- যা মা আগে পড়তে ভালবাসত, সেগুলো আবার পড়তে।তখনই আমার প্রথম রবীন্দ্রনাথ, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেব গুহ, সমরেশ বসু পড়া। এমনটা তো আমি ইংলিশে পড়েও এত আনন্দ পাইনি বাবা!’

রক্ত! রক্তের দোষ বনানী।তুমি মেয়েকে আটকাতে পারলে না। চেষ্টা করেছিলে ওকে কৃত্রিম শহুরে জীবনে ছাঁচে ফেলতে।করেওছো হয়ত অনেকটাই।কিন্তু রক্ত যাবে কোথায়। প্রশান্ত সিনহার রক্ত। প্রশান্তর বাবার রক্ত। বাবা বলত, খোকন যখনই সময় পাবি সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকবি। চোখ সতেজ থাকবে। খালি পায়ে মাঠে নেমে পড়বি। ঘাস মাড়াবি। রক্ত সতেজ থাকবে। রোজ ভোরে পাখিদের খেতে দিবি।আত্মা ভাল থাকবে।মেয়ে তার পাখির ছবি তুলছে, পথের কুকুরের ঘা-রক্ত ঘাঁটছে ভালবেসে। বাংলা শব্দে আনন্দ পাচ্ছে এত বছরের খরার পরেও।

‘মাম্মা গত বছর তোমার 'বনপরীর দেশ'- বইটা কিনে এনেদিল। আমি তো এক নি:শ্বাসে পড়ে ফেললাম। মাম্মা বলল, কেমন লাগল? আমি বললাম, মার্ভেলাস মাম্মা! আগে দাওনি কেন আমায়। তুমি পড়নি এই বই? মাম্মা জানাল, এই বই নতুন। তবে এই কথাগুলো মাম্মার খুব চেনা।সুরগুলো তার কানে অনেক পুরানো। এই বই যিনি লিখেছেন, তিনিই নাকি আমার বাবা! আমি তো অবাক! আমার বাবা- সে তো সুবিধার লোক নয় বলেই জানতাম বরাবর। আমাকে, মাম্মাকে দেখত না।অবহেলা করত। তাইতো মাম্মা এত কষ্ট করে আমায় নিয়ে মুম্বইতে চলে আসে। কিন্তু এমন লোক কী করে এই বই লেখে।এই বইয়ের লেখক তো মাম্মার বর্ণনার সাথে মেলে না। মাম্মাই বা কেন কিনে এনে দিল আমাকে আজ? আর এই সব কথাই যদি মাম্মা আগে শুনে থাকে আর তাকে মাড়িয়ে চলে আসে- তাহলে তো আমারও অনেক হিসাব গুলিয়ে যায়। আমি দুদিন মাম্মার সাথে ভাল করে কথা বলতে পারিনি।কিন্তু মাম্মার কষ্ট তাতে বেড়ে গেল। রাতের বেলা ঘরে বসে কাঁদছিল। আমি গিয়ে জড়িয়ে ধরতে আমার বুকে মুখ রেখে সেকী কান্না। মাম্মাই আমায় তোমার ঠিকানা দিল। আসলে আমার বাড়িরও ঠিকানা’।

লছমন খাবার দিয়ে গেল।হুইস্কিরহালকা নেশায় একটা মৌতাত মত এসেছিল। বনের গন্ধ, জলের গন্ধ আর পাতার আওয়াজে নেশাটা বুকের ভিতরটা খুশিতে আজ ভরিয়ে দিচ্ছে প্রশান্তর। লছমনের বউয়ের রান্নার হাতটা জমপেশ।একটু মোটা চালের ভাত, অড়হড় ডাল, আলু ছোকা, ভিন্ডি দইয়ের সব্জি আর ডিমের ঝোল। খাওয়ার সময়টা পাশে বসে থাকল লছমন।

“ডাক্তারসাব, আপনি এবার আর পয়সা দিয়ে যাবেন না।বেটিয়া আসবে আপনার সাথে। এতো আমারও খুশনসিবি।আমি ঘর সারিয়ে রাখব। চিন্তা করবেন না আপনি”।

“শোন লছমন। এঘর তোমার যতটা, গত কয়েক বছরে কি আমারও হয়নি কিছুটা? তোমাদের ওপর আমারও কি অধিকার ফলানো সাজে না? আমার মেয়ে আসবে।এটাই তো আমার দেশ গো। এখানে তাকে আপ্যায়ন আমিই তো করব। মেয়ে তার বনদেশে বাপের বাড়ি আসবে। বাবা হিসাবে আমি আমার এটুকু দায়িত্ব করব না? তোমার মেয়ের বিয়েতে কি তুমি করবে না? ঘরটার দেওয়ালটা আর চালে যেটুকু অংশ সারাতে হবে ওটা তুমিই দেখেশুনে কর। তোমারওতো মেয়ে। খরচটুকু আমি করছি। কিন্তু তার থেকে বড় কাজ, দেখাশুনাটা তো তুমিই করবে”।

ঘটি করে জল খেয়ে সাজানো পানটা মুখে দিল প্রশান্ত। এদিকে পান বড় ভাল পাওয়া যায়। আর লছমনটা বানায়ও বেশ।

“ এবার তুমি যাও হে।কাজ সেরে খেয়ে দেয়ে নাও। আমি বিকেলের মধ্যে যাচ্ছি।ব্যাগে এবার সব নেবনা। কিছু জিনিস রেখে যাব।হালকা হয়েই রাতের ট্রেনে উঠব।শিউচরনকে বলে রেখ।জীপটা সময় করে আনে যেন সাতটার মধ্যে”।

বনের পথ ধরে চলে যাচ্ছে লছমন থালা-বাটি হাতে করে। গাছে একটু ঠেস দিয়ে বুকপকেট থেকে কোয়েলের দু-সপ্তাহ আগে আসা শেষ চিঠিটা বার করল।সন্তানের হাতের স্পর্শ এখন বুকের কাছেই থাকে।

‘ মাম্মাকে নিয়ে কলকাতায় আসছি বাবা।ডাক্তার আঙ্কল বলেছেনে এখান থেকে কিছুদিন ছুটি নিয়ে দূরে যেতে। মাম্মাকে আমি দু’ মাসের জন্য নিয়ে আসছি কলকাতায়।আমার ছুটি শেষ হবার পরেও কিছুদিন ক্লাস কামাই হবে। তা হোক। আমি জীবনের নতুন পর্বে ঢুকতে চলেছি। তোমার সাথে দেখা করব বাবা। তোমার কথা শুনব। তোমার সাথে বানারার জঙ্গলে নিয়ে যাবে আমায়? মাম্মা কিছুদিন ধরে খুব ওইসব জায়গার কথা বলছে। মাম্মা তোমার সামনে যেতে চাইছেনা এখন। কিন্তু আমায় বলছে তোমার কাছে গিয়ে ক’টা দিন থাকতে। মাম্মার ভেতরে একটা চেঞ্জ এসেছে। জানিনা সেটা ভাল হবে না অন্যকিছু! একটু টেনশানে আছি। তবু চাই মাম্মা এখন কলকাতায়গিয়ে মাসিদের বাড়িতে বিশ্রাম নিক। পরে না হয়...

তোমার চিঠিতে ফোন নং চাইলাম। তুমি দিলে না। বললে একবারে দেখা হলেই তবে আবার পুরানো নদীতে স্রোত আসবে। কী সুন্দর বল তুমি! তোমাদের বিয়ের ছবি মাম্মা সেদিন দেখাল। কী হ্যান্ডসাম আমার বাবা! আমি কলকাতায় যেদিন ফ্লাইটে পৌঁছচ্ছি, সেদিন বিকেলেই বাড়িতে যাব তোমার সাথে দেখা করতে।তুমি থেকো কিন্তু।আর কবে বানারার জঙ্গলে যাবে আমায় নিয়ে? আগাদাবুরুপাহাড় আর ঝিরনি নদীর কথা মাম্মার থেকে শুনছি ক’দিন ধরে।আমাকে ওই সব রাস্তায় নিয়ে যাবে যেগুলোয় তোমরা ঘুরতে?.....’

পড়তে পড়তে চোখটা জুড়িয়ে এল প্রশান্তর। আকাশে তখন একঝাঁক টিয়া ডাকতে ডাকতে উড়ে যাচ্ছে নদীরএপার থেকে ওপাড়।কী একটা বুনোফুলের গন্ধ ভেসে আসছে পিছনের জঙ্গল থেকে। আ: শান্তি!

**********************************

বেলা গড়িয়ে এল।সাব যে কী করছেন জঙ্গলের মধ্যে। মানুষটা খ্যাপা।

“সবিতা। আমি ডাকতারসাবকে ডেকে আনছি।তুই ওনার জন্য চা-পানি বসা।“

শেষ বিকেলের আলো তখন গাছের ডালে ডালে। লছমন তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলল।শিউচরনকে জিপ আনতে বলে দিয়েছে। খাবার বানিয়ে ব্যাগে দিয়ে তবে সাবকে স্টেশনে ছাড়তে যাবে লছমন। মানুষটা বড় একলা হয়ে গেছেন। তবু ভাল, এবার নাকি মেয়েটা দেখা করতে আসবে ওঁর সাথে। ভাবীকে এখনও একটু একটু মনে পড়ে লছমনের। কী থেকে যে কী হল মানুষের জীবন। ইয়ে সালা ভগবান ভি আছে কামিনা। ভালমানুষের সাথেই এসব করে। এ লছমন দেখে এসছে সারা জীবন।

ওই তো মানুষটা শুয়ে আছে গাছের তলায়।পাতা পড়েছে গায়ের ওপর হুঁশ নেই গো! ঘুমিয়ে কাঁদা। “ডাকতারসাব, ও ডাক্তারসাব।দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।কী করেন বলুন তো”।জোর ঘুমাচ্ছে তো লোকটা।একটু ধাক্কা দিল লছমন পাশে বসে। “ও ডাগদার সাব, ডাগদা....” এ কী! কোন সাড় নেই কেন!! আবার হাত ধরে টানল লছমন প্রশান্তর। “কী হল বাবু!” একটু ভয় পেয়ে গেল ও।নাড়িটা দেখার চেষ্টা করল। পাচ্ছে না। নাকের কাছে হাতের চেটোটা আনল। নি:শ্বাস লাগছে না হাতে। বুকে কান পেতে ধুকপুকানি শুনতে চাইল। পেলনা। সত্যিই কি নাড়ি, নি:শ্বাস, বুকের ধুকপুকানি নেই? নাকি অসাড় হয়ে গেছে লছমন নিজে?ও এখন কীকরবে! কাকে ডাকে এই সন্ধেবেলায়!

নদীর ওপাড়ে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে জলটা রাঙিয়ে দিয়ে। সেই রাঙা আলো এসে পড়েছে প্রশান্তর মুখে। আলগা একটা হাসি যেন মুখে লেগে। মায়ের কোলে মাথা রেখেই যেন ঘুমাচ্ছে, আর অনেকদিন পর ভাল কিছু স্বপ্ন দেখছে মনে হচ্ছে। হাতের পাশে একটা চিঠি পড়ে আছে মাটিতে। শিমুলগাছের উঁচু ডাল থেকে একটা লাল ফুল ঝড়ে পড়ল সেই হাতেই। মরশুমের প্রথম ফুল এসেছে।বনে প্রাণ ফিরেছে।








173 views0 comments
2 e paa_edited.jpg
Royal_Bengal_Tiger_Kanha.JPG
bottom of page